আজ খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের সুরা আনকাবুতের ৪৫ থেকে সুরা রুম, সুরা লোকমান, সুরা সাজদা ও আহজাবের ১ থেকে ৩০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে। পারা হিসেবে ২১তম পারা তিলাওয়াত করা হবে। এই অংশে মাতৃভূমি ত্যাগ, সামাজিক শিষ্টাচার, নামাজের উপকারিতা, ধৈর্য, স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা, সুদ, সন্তানের প্রতি লোকমান (আ.)-এর উপদেশ, পাঁচ জিনিসের জ্ঞান, পালকপুত্রের বিধান, নবিপত্নীদের প্রতি নির্দেশ, জাকাতসহ নানা বিষয় আলোচিত হয়েছে।
নামাজের উপকারিতা
সুরা আনকাবুতের ৪৫ নম্বর আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে।’ ইমাম তবারি, ইবনে কাসির, কুরতুবি, আলুসিসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসিরবিদের মতে, ‘এই আয়াতের মর্ম হলো, তাকবির, তাসবিহ, কেরাত, আল্লাহর সামনে কিয়াম ও রুকু-সেজদাহসহ অনেক আমলের সমষ্টি হচ্ছে নামাজ। এ কারণে নামাজ যেন মুসল্লিকে বলে, তুমি কোনো অশ্লীল বা অন্যায় কাজ করো না। তুমি এমন প্রভুর নাফরমানি করো না, যিনি তোমার কৃত ইবাদতসমূহের প্রকৃত হকদার। তুমি এখন কীভাবে তাঁর অবাধ্য হবে, অথচ তুমি এমন আমল করেছ, যা তাঁর বড়ত্ব ও মহত্ত্বকে প্রকাশ করে। এর পরও যদি তাঁর অবাধ্য হও, তবে এর মাধ্যমে তুমি স্ববিরোধী কাজে লিপ্ত হলে। (আর স্ববিরোধী কাজের মাধ্যমে ব্যক্তি কোন স্তরে নেমে আসে, সেটা তোমার ভালোই জানা আছে।) (তাফসিরে রুহুল মায়ানি, ১০/৪৮২)
নবিজির বড় মুজেজা কোরআন
আল্লাহ বলেন, ‘কোরআনের মুজেজা কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয়।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৫১) রাসুলুল্লাহ (সা.) সত্য নবি হওয়ার এক সুস্পষ্ট আলামত হলো, তিনি ছিলেন উম্মি; লিখতে-পড়তে জানতেন না। যদি তিনি লিখতে-পড়তে জানতেন, তা হলে বাতিলরা এই বলে অপপ্রচার করত যে, তিনি হয়তো আগের কিতাবাদি থেকে এই ইলম অর্জন করে নিয়েছেন। এত স্পষ্ট দলিল সত্ত্বেও তারা মুজেজা দেখতে চায়। অথচ কোরআনের চেয়ে বড় মুজেজা আর কী হতে পারে? (৩০ মজলিসে কোরআনের সারনির্যাস, পৃষ্ঠা : ২২০-২২১)
সুরা রুমে রোমান জয়ের ভবিষ্যদ্বাণী
কোরআনের ৩০তম সুরা রুম মক্কায় অবতীর্ণ। এ সুরার আয়াত সংখ্যা ৬০। এই সুরার শুরুতে রোমান ও পার্সিয়ানদের যুদ্ধ ঘিরে মক্কার মুসলমান ও কাফেরদের আনন্দ-বেদনার কথা রয়েছে। তখন ৬০৩ খ্রিষ্টাব্দ। রোমানরা জীবন-মৃত্যুর চরম সংকটকাল অতিক্রম করছিল। একের পর এক যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছিল। ৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে পার্সিয়ানরা দামেস্ক, বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত দখল করে নেয়। এতে মুসলমানদের মন ভেঙে যায়। কাফেররা খুশি হয়। কারণ পার্সিয়ানরা ছিল তাদের মতো পৌত্তলিক। অন্যদিকে মুসলিমদের মতো রোমানরাও নবি, আসমানি কিতাব ও আখেরাত ইত্যাদিতে বিশ্বাসী ছিল। এ সময় কোরআন ভবিষ্যদ্বাণী করে, কয়েক বছরের মধ্যেই রোমানরা পারসিকদের ওপর বিজয় লাভ করবে। মুশরিকরা ভবিষ্যদ্বাণীটি শুনে বিদ্রূপ করেছিল। কিন্তু ঠিক ৯ বছরের মাথায় কোরআনের এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছিল।
ভাষার বৈচিত্র্যে স্রষ্টার নিদর্শন
এ সুরার ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য।’ ভাষা আল্লাহর নেয়ামত। সৃষ্টির প্রথম প্রভাত থেকে মানুষের জন্য ভাষা ছিল। পৃথিবীতে হাজারো রকমের ভাষা আছে। সব নবি-রাসুল স্বজাতির ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। তাঁরা জাতিকে মাতৃভাষায় দাওয়াত দিতেন। মানুষের মধ্যে আছে ভাষার ভিন্নতা, রুচির ভিন্নতা ও রঙের ভিন্নতা। ভাষাবৈচিত্র্যে রয়েছে আল্লাহর নিদর্শন।
জ্ঞানী ব্যক্তির নামে সুরার নাম
কোরআনের ৩১তম সুরা লোকমান মক্কায় অবতীর্ণ। এই সুরার আয়াত সংখ্যা ৩৪। এই সুরায় লোকমান হাকিমের কিছু প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ থাকায় এর নাম রাখা হয়েছে সুরা লোকমান। লোকমান ধার্মিক ও জ্ঞানী ছিলেন। মহান আল্লাহ তার তাকওয়ায় মুগ্ধ হয়ে তাকে প্রজ্ঞা শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি নবি ছিলেন না।
সন্তানের প্রতি পিতা লোকমানের অমূল্য উপদেশ
সন্তানের প্রতি লোকমান হাকিমের দেওয়া প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশগুলোয় আল্লাহ খুশি হয়ে সেগুলো কোরআনে বর্ণনা করেছেন। সুরা লোকমানের ১২ থেকে ১৯ নম্বর আয়াতে সেই উপদেশের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন-
১. আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না।
২. বাবা-মায়ের সঙ্গে সদাচার করো।
৩. বাবা-মা যদি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করতে বলে, তা হলে তাদের কথা গ্রহণ করবে না।
৪. মনে আল্লাহর স্মরণ জাগ্রত রাখো।
৫. নামাজ কায়েম করো।
৬. নেক কাজের আদেশ দাও।
৭. মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো।
৮. বিপদে ধৈর্যধারণ করো।
৯. অহংকারবশে মানুষকে অবজ্ঞা করো না।
১০. পৃথিবীতে গর্বভরে বিচরণ করো না।
১১. মধ্যপন্থা অবলম্বন করো।
১২. কণ্ঠস্বর নিচু রাখো।
সুরা সেজদার বিষয়বস্তু
কোরআনের ৩২তম সুরা সেজদা মক্কায় অবতীর্ণ। এ সুরার আয়াত সংখ্যা ৩০। এ সুরায় সেজদার আয়াত থাকায় এর নাম সেজদা রাখা হয়েছে। এ সুরায় কোরআনের সত্যতা, আল্লাহর একাত্ববাদ, বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের অবস্থা এবং বিশ্বাসীদের কিছু গুণের কথা আলোচিত হয়েছে।
পালকপুত্রের বিধান
সুরা আহজাবের ৪ থেকে ৫ নম্বর আয়াতে পালকপুত্র পুত্র নয়, তাকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকা, পরিচয় জানা না থাকলে ভাই-বন্ধু হিসেবে গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রাক-ইসলামি যুগে আরবে পালক সন্তানকে ঔরসজাত সন্তানের মতোই মনে করা হতো। ইসলাম মনে করে, বাবা-মা ও সন্তানের পরিচয়ের বাস্তব ভিত্তি হলো ঔরস ও গর্ভধারণ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও জায়েদ ইবনে হারেসা নামে এক সাহাবিকে দত্তক নিয়েছিলেন। তাকে সবাই জায়েদ ইবনে মোহাম্মাদ অর্থাৎ মুহাম্মদের ছেলে বলে ডাকত। কোরআনে বিষয়টি নিষেধ করে দেওয়া হয়। পরে সবাই তাকে জায়েদ ইবনে হারেসা বলেই ডাকা আরম্ভ করে।
এ ছাড়া তারাবির আজকের অংশে কোরআন অস্বীকারের পরিণাম, দীনের পথে বিপদ, ভ্রমণ, বাতাস, মুমিন ও কাফেরের অবস্থা, ছয় দিনে পৃথিবী সৃষ্টি, মুমিনের পুরস্কার, নবিদের জীবন উম্মতের আদর্শ, দুনিয়ার মায়া ত্যাগ ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা রয়েছে।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক