পৃথিবীতে ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে সংখ্যালঘুদের আবাসস্থল, ধর্মীয় উপাসনালয়, তাদের আয়ের অন্যতম উৎসস্থল তথা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, এমনকি অগ্নিসংযোগ ইতিহাসে নতুন ঘটনা নয়। বর্তমান আধুনিক সভ্যতার যুগে এ সমস্ত বর্বর ঘটনা অনেকের বিবেককে নাড়া না দিলেও শান্তির ধর্ম ইসলামে এগুলো অত্যন্ত ঘৃণ্য ও হত্যার চেয়েও জঘন্য কাজ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ইসলাম এ সমস্ত কর্মকাণ্ড মোটেও সমর্থন করে না। ইসলামের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
নবুয়াত লাভের পরের ২৩ বছরে মুহাম্মাদ (সা.) ২৭টি যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। ১৯টি বড় বড় যুদ্ধ আর ৮টি ছোট যুদ্ধ এবং অধিকাংশ যুদ্ধই ছিল প্রতিরক্ষামূলক। অথচ যুদ্ধ জয়ের পর তিনি সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার তো দূরের কথা, তাদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া)
ইসলাম সবাইকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ ও নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার দিয়েছে। অর্থাৎ দেশের সব নাগরিক স্বাধীনভাবে নিজের ধর্ম পালন করতে পারবে। এতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার অনুমতি ইসলাম দেয় না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমার দ্বীন তোমাদের জন্য, আর আমার দ্বীন আমার জন্য।’ (সুরা কাফিরুন, আয়াত: ৬)। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার ব্যাপারেও কারও ওপর বলপ্রয়োগ বা জোর-জবরদস্তি করার সুযোগ নেই। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘ধর্মের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৬)। হিজরত করার পর একটি সম্প্রীতি ও শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মহানবি (সা.) মদিনায় বসবাসরত ইহুদি, পৌত্তলিক, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ গোত্র সকল লোকের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এমনকি সেখানে মদিনা সনদের মাধ্যমে সবাইকে নিয়ে একটি অহিংস জাতি গঠন করেন।
ইসলাম মানুষকে সহনশীল হতে শেখায়, ইসলাম মানুষকে মানবিক হতে শেখায়। যার অনন্য উদাহরণ উহুদ যুদ্ধে মুহাম্মাদ (সা.)-এর চাচা হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করেন ওয়াহশি ইবনে হারব। পরবর্তী সময়ে ওয়াহশি যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আশ্রয়ের জন্য আসেন, তখন তিনি ওয়াহশিকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে আরাফাতের ময়দানে লক্ষাধিক সাহাবির উপস্থিতিতে বিদায় হজের ভাষণে মহানবি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও জন্য তার অপর ভাইয়ের কোনো কিছু গ্রহণ বৈধ নয়; যতক্ষণ না সে নিজে সন্তুষ্টচিত্তে তা প্রদান না করে। আর তোমরা কখনো দুর্বলের প্রতি অত্যাচার করবে না। কখনো একে অন্যের ওপর জুলুম করবে না।’ বস্তুত সকল প্রকার নাগরিকের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে কোরআন-সুন্নাহ তথা ইসলামি নীতি ও আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: আইনবিদ ও শিক্ষক, যশোর ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ (জেইএসসি) যশোর সেনানিবাস, যশোর