শিক্ষকতার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং করতেন হাফেজ মুমিনুল ইসলাম। অনলাইনে গেজেট আইটেমের শপও ছিল এক সময়। করোনাকালে কওমি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠা করে প্রায় ৩০ হাজার আলেম ব্যবসায়ী তৈরিতে বেশ ভূমিকা রেখেছেন। উদ্যোক্তাদের ব্যবসা বৃদ্ধি ও উন্নয়নে গড়ে তুলেছেন ডিজিটাল মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান সোশ্যাল গিক। সোশ্যাল গিক একাডেমিও করতে চান।
শুরুর গল্প: বিদ্যালয় থেকে ফিরে প্রায়ই বাসায় কম্পিউটার নিয়ে বসতেন মুমিনুল ইসলাম। নিজেই চালু করতেন। কিবোর্ড চাপতেন। ভিডিও দেখতেন, অডিও শুনতেন। কম্পিউটারের প্রতি আগ্রহ ছেলেবেলা থেকেই। সেই আগ্রহে ২০১৮ সালে কোডিং শেখার কোর্সে ভর্তি হন মুমিনুল। ছয় মাস কোডিং আর ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শেখেন। কিন্তু মনে ধরছিল না। মন পড়েছিল শিক্ষকতায়। মুগদার এক মাদরাসায় শুরুও করলেন খণ্ডকালীন শিক্ষকতা। পকেট খরচ আসত কোনোরকম। কিছু দিন পর এক মাদরাসায় আবাসিক শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হন। বেশ ভালো করলেন। সুনাম ছড়িয়ে পড়ল মাদরাসায়। বিভাগীয় প্রধান হন। সাত বছর এভাবে পার হলো। শিক্ষকতার পাশাপাশি শুরু করেন লোকাল মার্কেটে ফ্রিল্যান্সিং। দেখলেন, শিক্ষকদের অখণ্ড অবসর আছে। এ সময়টা কাজে লাগাতে পারলে জীবন বদলাবে তাদের। ডিজিটাল মার্কেটিং শিখলেন। এর মধ্যে কোভিড-১৯ এলো। মাদরাসা বন্ধ হলো। শিক্ষকদের মধ্যে হাহাকার পড়ল। নিজের জমানো টাকায় মুমিনুল কমেক্স নামে অনলাইনে মোবাইল এবং কম্পিউটারের গেজেট আইটেম বিক্রি শুরু করলেন।
পণ করেছিলেন...: মানুষের সঙ্গে চলতে গিয়ে মুমিনুল দেখলেন, সামাজিকভাবে হুজুরদের খুব একটা পাত্তা দেয় না মানুষ। অবহেলা করে। তার কম্পিউটার চালানো দেখে এক আত্মীয় বলেছিলেন, ‘তুমি যে কম্পিউটার চালাও, কম্পিউটার বানান করতে জানো?’ মাদারাসা ছাত্রের প্রতি এই হেয় মনোভাব কষ্ট দিয়েছিল মুমিনুলকে। ২০১৭ সালে স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের এক্সপোতে যান চীন-মৈত্রীতে। কম্পিউটার চালিয়ে দেখছিলেন সেখানে। এক রিপ্রেজেন্টিটিভ বললেন, ‘হুজুর আপনি টেপাটিপি কইরেন না, এমনি দেখেন।’ মুমিনুল বললেন, ‘তখন পণ করেছি, নিজে কিছু একটা করব। টেক দুনিয়ায় নিজেকে প্রমাণ করে দেখাব।’
৩০ হাজার আলেম উদ্যোক্তা তৈরির কারিগর: কোভিড ১৯-এ আলেমদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারটি তীব্রভাবে নাড়া দিল মুমিনুলকে। সাংবাদিক ও বর্তমান কওমি উদ্যোক্তার ফাউন্ডার রোকন রাইয়ানের সঙ্গে কথা বললেন। ২০২০ সালের জুনের ২ তারিখে ফেসবুকে খুললেন ‘কওমি উদ্যোক্তা’ গ্রুপ। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার আলেম উদ্যোক্তা তৈরি করেছে কওমি উদ্যোক্তা।
সোশ্যাল গিক: অনলাইনে ব্যবসা করতে গিয়ে মুমিনুল দেখলেন, ডিজিটাল মার্কেটিং একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারই বটে। এখানে তারও আগ্রহ আছে বেশ। ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন। শেখার পাশাপাশি প্র্যাকটিসও করলেন। আনন্দ পেয়ে বসেছিল তাকে। কেউ কাজ চাইলে আগ্রহ নিয়ে করে দেন। কারও ব্যবসায় পরামর্শদাতা হন। এভাবে মুমিনুলের কিছু নির্ধারিত গ্রাহক জুটে গেল। ২০২১ সালে ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সি সোশ্যাল গিক প্রতিষ্ঠা করেন।
সঠিক সেবাই লক্ষ্য: উদ্যোক্তাদের ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্ট, মার্কেটিং, কনসালটেনসি, ওয়েবসাইট তৈরি, কনটেন্ট মেইকিং ও বিভিন্ন সমাধান বিষয়ে কাজ করে সোশ্যাল গিক। গত তিন বছরে ৪ হাজারের বেশি উদ্যোক্তাকে সার্ভিস দিয়েছে। সোশ্যাল গিকের হাত ধরে বহু উদ্যোক্তা শূন্য থেকে বনেছেন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী।
২ হাজারের বেশি উদ্যোক্তাকে কোর্স ও ওয়ার্কশপ করিয়েছে সোশ্যাল গিক। মুমিনুল বললেন, ‘এসএমই উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন অনেক দিন থেকেই। তাদের ব্যবসা বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছি। উদ্যোক্তা তৈরি করছি। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আস্থার নাম সোশ্যাল গিক। এখানে আমানতদারি বা বিশ্বস্ততার সঙ্গে কাজ করা হয়। প্রতারিত হওয়ার সুযোগ নেই। কারও বিশ্বাস ভাঙতে চাই না আমরা।’
স্বপ্ন: ‘উদ্যোক্তারা যেন ঝরে না পড়ে, সে জন্য তাদেরকে একটা ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। ট্রেনিং করাতে চাই। দক্ষতা বাড়াতে কাজ করতে চাই। উদ্যোক্তাদের জন্য সোশ্যাল গিক একাডেমি করতে চাই। উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ পেতে পাশে থাকবে সোশ্যাল গিক। কর্মসংস্থান তৈরি ও কর্মসংস্থানের জায়গা রেখে যেতে চাই।’ বললেন মুমিনুল।
একজন মুমিনুল: মুমিনুল ইসলামের বাড়ি বরিশালের ঝালকাঠি, জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। পড়াশোনার শুরু মুগদাপাড়া কাজী জাফর আহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ে। ক্লাস ফাইভের পর মুগদায় এক মাদরাসায় ভর্তি হন। কোরআন মুখস্থ শেষ করেন তেজগাঁও রেলওয়ে নুরানি মাদরাসায়। ২০১৬ সালে দাখিল (এসএসসি সমমান) পরীক্ষা দেন।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক