ঢাকা ৮ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া ম্যাচে কার জয়ের সম্ভাবনা কত, জানাল সুপারকম্পিউটার ৩৩ ম্যাচেই ১০০ গোল! হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে বিয়েলসার ক্ষোভ ইরানের রক্ষণদুর্গে আটকে গেল বেলজিয়াম গোল বাতিল ইরানের, গোলশূন্য প্রথমার্ধ বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোলের রেকর্ড পেলের কীর্তিতে ভাগ বসালেন ইয়ামাল জন্মবার্ষিকীতে স্মরণানুষ্ঠান: সুফিয়া কামালের ব্যক্তিত্ব সবাইকে আলোকিত করে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার শঙ্কা সৌদিকে উড়িয়ে দিল স্পেন যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টায় প্রথম দফার বৈঠক শেষ, মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান ডোকুর ‘বিশ্বকাপ ছাড়ার’ সিদ্ধান্তে সমালোচনার ঝড় মালয়েশিয়ায় কারাবন্দি বাংলাদেশিদের মুক্তিতে উদ্যোগের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর প্রথমার্ধে সৌদি আরবের জালে ৩ গোল স্পেনের তীব্র গরমের পর স্বস্তির বৃষ্টি প্রথম গোলেই ইতিহাস গড়লেন ইয়ামাল সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেনের দাফন সম্পন্ন সিংগাইরে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু সুরের মূর্ছনায় বিশ্ব সংগীত দিবস: ঢাকার দুই প্রান্তে সুরের বিভা কুড়িগ্রামে এক বাঘা আইড় ৮৫০০০ অজু করার সময় বজ্রপাতে প্রাণ গেল ৩ মাদরাসাছাত্রের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলায় দণ্ডিত ৫৯ জন: আইনমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ‘অসত্য’ বক্তব্য, উত্তপ্ত সংসদ স্পেনের শুরুর একাদশে ইয়ামাল সুফিয়া কামাল ও আবু হেনা মোস্তফা কামালের স্মরণে জবিতে দুই দিনব্যাপী সেমিনার শুরু মানিকগঞ্জে ঝোপে মিলল স্কুলছাত্রীর ঝুলন্ত খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ মালয়েশিয়ায় তারেক রহমান, বাণিজ্য–বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশা দিনাজপুরে কোল্ডস্টোরেজে আলু সংরক্ষণ ফি ৫ টাকা নির্ধারণের দাবিতে মানববন্ধন চট্টগ্রামে গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু, তদন্তে পুলিশ শরীয়তপুরে শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদরাসা শিক্ষক আটক

ওয়াজ-মাহফিল: ক্যারিয়ার নাকি দ্বীন প্রচারের মাধ্যম?

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:০০ এএম
আপডেট: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ১০:৩৭ এএম
ওয়াজ-মাহফিল: ক্যারিয়ার নাকি দ্বীন প্রচারের মাধ্যম?
বাঁ থেকে মুফতি ওসমান গনি সালেহী, মুফতি রেজাউল করিম আবরার, মুফতি সাইফুল্লাহ হাবিবি ও হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমাদ। ছবি: সংগৃহীত

দ্বীনের প্রচার-প্রসার নবিওয়ালা কাজ। পৃথিবীর সব নবি-রাসুল এটি করেছেন। সবিশেষ এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মুহাম্মাদ (সা.)-এর উম্মতদের। ইসলাম ধর্মের প্রচার-প্রসার, মানুষকে ইসলামমুখী করা এবং ইসলামি বিধি-বিধান জানানোর অন্যতম আয়োজন ওয়াজ-মাহফিল। এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হয়। সওয়াব হয়। কিন্তু অনেক বক্তা এই ওয়াজকে দ্বীনের প্রচার-প্রসার ও আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম না বানিয়ে ক্যারিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আয়োজকরাও ভিন্ন উদ্দেশ্যে আয়োজন করছেন। ফলে মানুষের তেমন উপকার হচ্ছে না; বরং এ নিয়ে হচ্ছে নানামুখী সমালোচনা। একজন বক্তা ওয়াজ-মাহফিলকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেবেন নাকি দ্বীনি প্রচার-প্রসারের মাধ্যম বানাবেন—এ সম্পর্কে বর্তমান সময়ের আলোচিত চারজন বক্তার মতামত তুলে ধরা হলো— 

মনগড়া কথা বলা বক্তাদের লাগাম টেনে ধরতে হবে 
মুফতি ওসমান গনি সালেহী
খতিব, টাউন হল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মোহাম্মদপুর

ওয়াজ-মাহফিলের প্রচলন শুরু হয় ওমর (রা.)-এর শাসনকালে। তিনিই অনুমতি দেন ওয়াজের। তবে তার এবং উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে কোরআনের বাইরে গিয়ে ওয়াজ করার অনুমতি ছিল না। কোরআনের গল্প, উদাহরণ, উপদেশ—এই ছিল বক্তৃতার বিষয়। উমাইয়াদের শাসনামলে ওয়াজ সংস্কৃতিতে বিরাট এক পরিবর্তন আসে। উমাইয়া শাসকরা ওয়াজকে ব্যবহার করতে শুরু করেন নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার এবং রাষ্ট্রীয় হুকুমত অক্ষুণ্ন রাখতে। তখন শাসকদের রীতিনীতি এবং বিধি-নিষেধের খপ্পরে পড়ে যায় ওয়াজ-মাহফিল। সেই থেকে শুরু ওয়াজের ভিন্ন এক যাত্রা। তার পর ওয়াজে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী লক্ষ্য জড়িত হয়। 
অনেকে ওয়াজ-মাহফিলকে জাতির কল্যাণ, দ্বীন প্রচার এবং সংশোধনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করলেও; কেউ কেউ আবার গ্রহণ করেছে ক্যারিয়ার গঠন ও নিছক টাকা কামানোর মাধ্যম হিসেবে। যারা ক্যারিয়ার গঠনের জন্য ওয়াজ-মাহফিলকে বেছে নিয়েছে, তারা কোরআন-হাদিসের আলোচনার চেয়ে মনগড়া কথা বেশি বলেন। হাসি-তামাশা-কৌতুক করেন মঞ্চে বসে। যেহেতু অনেক বক্তার লক্ষ্যই থাকে ক্যারিয়ার গঠন ও অর্থ উপার্জন, তাই মানুষকে যেভাবে খুশি করা যায়, সেভাবেই কথা বলেন তারা। অনেক সময় উদ্ভাবন করেন নতুন নতুন ইবাদত। তৈরি করেন গল্প। তাই তাদের ওপর দ্বীনি নজরদারির পরামর্শ দিয়েছেন কেউ কেউ। আয়োজকদের উচিত, এসব বক্তাকে এড়িয়ে চলা। শ্রোতাদের কর্তব্য হলো, বক্তা মনগড়া কথা বললে সচেতনতার সঙ্গে প্রতিবাদ করা। থামিয়ে দেওয়া। 
সুর এবং ইনিয়ে-বিনিয়ে বলা গল্প মানুষকে শুধু গানের মতো আনন্দিতই করে। আখেরাতের জন্য অন্তরকে তৈরি করতে পারে না। মনগড়া ওয়াজ থেকে শ্রোতারা জীবন বদলের বার্তা নিয়ে যেতে পারেন না। জীবনকে সঠিক পথে পরিচালনার পাথেয় খুঁজে পান না। যারা ওয়াজ-মাহফিলে শরিয়তবিরোধী কথাবার্তা বলেন, তাদের লাগান টেনে ধরা প্রয়োজন। ইম্বাউল গুমর গ্রন্থে আল্লামা ইবনে হাজার (রহ.) লিখেছেন, ‘নাজমুদ্দিন তুম্বুজি দরিদ্র ফকিহদের নিয়োগ দিয়েছিলেন, তারা যেন দোকানদারকে সুরা ফাতেহা এবং নামাজের ফরজগুলো শেখায়। তবে ইনিয়ে-বিনিয়ে গল্প-কেচ্ছা বলে ওয়াজ করা ছিল তাদের জন্য নিষিদ্ধ।’  

ওয়াজ-মাহফিল ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার কারণে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে
মুফতি রেজাউল করিম আবরার
প্রধান মুফতি, জামিয়া মাহমুদিয়া, যাত্রাবাড়ী

পৃথিবীতে প্রথমে দ্বীনি দাওয়াত শুরু করেছেন নবি-রাসুলগণ। দ্বীনি দাওয়াতের বিষয়টি ইসলামের সূচনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এটি নতুন বিষয় নয়। মানুষের কাছে পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসের বাণী পৌঁছানোর জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে বার্তা দিয়েই গেছেন। দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, ‘তোমরা যারা উপস্থিত রয়েছো, তারা অনুপস্থিতদের কাছে আমার কথা পৌঁছে দাও।’ পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির (কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে, অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহকে বিশ্বাস করবে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)
আমরা সাড়ে চৌদ্দশ বছরের ইতিহাসে দেখি, ইসলামি ফিকাহবিদ, হাদিসবিদ প্রত্যেকে মানুষকে দ্বীনের পথে ডেকেছেন। আল্লাহর পথে দাওয়াত দিয়েছেন। ওয়াজ-নসিহত করেছেন। তাদের কেউ এই ওয়াজ-নসিহত পেশা হিসেবে নেননি। ওয়াজ-নসিহত তাদের ক্যারিয়ার ছিল, এমন দৃষ্টান্তও নেই। আমাদের নিকটকালের আকাবির-আসলাফ ওয়াজ-নসিহত করেছেন, তারা কেউ এটা পেশা বা ক্যারিয়ার হিসেবে নেননি। কেউ নিয়েছেন, এটা আমার জানা নেই। অনেক আকাবির বেশ সমৃদ্ধিশালী খুতুবাত আমাদের কাছে আছে। তারা এটাকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেননি।    
ওয়াজ-মাহফিল ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার বিষয় নয়। ওয়াজ-মাহফিলকেন্দ্রিক এখন যে নানা আলোচনা-সমালোচনা, মানুষ নানাভাবে কটুকথা বলছে, এটা মূলত হয়েছে ওয়াজ-মাহফিলকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার কারণে। ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার কারণে বিশৃঙ্খলাও তৈরি হচ্ছে। আমার মতে, এটি ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। এটি দাওয়াতি কাজ। নবিওয়ালা কাজ। এটি দ্বীনের প্রচার হিসেবে নিতে হবে। এটি দ্বীনের প্রচার হিসেবে নিতে পারলে মানুষের কল্যাণ হবে। যিনি ওয়াজ-মাহফিল করবেন, তার মধ্যে পরিপূর্ণভাবে ইখলাস (একনিষ্ঠতা), ধৈর্য ও সহনশীলতা, দৃঢ়তা থাকতে হবে। সত্যবাদী ও  সদাচারী হতে হবে। নিজের মধ্যে আমল ও ক্ষমার গুণ থাকতে হবে। 

আখেরাতের ক্যারিয়ার গঠনের মাধ্যম হতে পারে ওয়াজ
মুফতি সাইফুল্লাহ হাবিবি
শিক্ষক, জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া, লালবাগ

ওয়াজ-মাহফিল দ্বীনি প্রচারের অন্যতম মাধ্যম। সমস্ত নবি-রাসুল মানুষের মাঝে ধর্মের প্রচার করতেন এবং তাদের ওয়াজ-নসিহত শোনাতেন। এটি নবিদের কাজ। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদের বানিয়েছিলাম নেতা, তারা আমার নির্দেশে মানুষকে সঠিক পথ দেখাত। তাদের প্রতি ওহি বা প্রত্যাদেশ করেছিলাম সৎকাজ করার জন্য, নিয়মিত নামাজ প্রতিষ্ঠা করার ও জাকাত প্রদানের জন্য, তারা আমারই ইবাদত করত।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৭৩) 
নবি মুহাম্মাদ (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে রাসুল, তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার করো, যদি না করো তা হলে তুমি তাঁর বার্তা পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করলে না। মানুষের ক্ষতি থেকে আল্লাহই তোমাকে রক্ষা করবেন, আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে কখনো সৎপথ প্রদর্শন করবেন না।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৬৭)
উল্লিখিত দুই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, ওয়াজ-মাহফিল সাধারণ কোনো দায়িত্ব নয়; বরং নবির উত্তরাধিকার হিসেবে আলেমদের ওপর এটি গুরুদায়িত্ব। এই মহান দায়িত্ব ওলামাদের ক্যারিয়ার হতে পারে না। ক্যারিয়ার গঠনের জন্য মানুষকে আল্লাহতায়ালা পৃথিবীতে অনেক উপকরণ দিয়েছেন। কাজের ক্ষেত্র ও ধরন ব্যাপক করেছেন।
ওয়াজ-মাহফিল এবং ক্যারিয়ার গঠন—এটা দুই মেরুর বিষয়। একটি অপরটির সম্পূর্ণ বিপরীত। কোনো আলেম যেন ধর্ম প্রচারকে নিজের ক্যারিয়ার গঠন বা দুনিয়া উপার্জনের মাধ্যম বানাতে না পারেন, এ জন্য আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের একাধিক জায়গায় তাঁর বান্দাদের সতর্ক করেছেন। যেমন সুরা বাকারার ৪১ নম্বর আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমার আয়াতের বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করো না এবং তোমরা আমাকেই ভয় করো।’ 
ওয়াজ-মাহফিল দ্বীনি প্রচারের শক্তিশালী মাধ্যম। আলেমরা নবিদের উত্তরাধিকার হিসেবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দ্বীনের প্রচার-প্রসার করে যাবেন। কোনো অবস্থাতেই ক্যারিয়ার গঠনের মাধ্যম বানানো যাবে না। আখেরাতের ক্যারিয়ার গঠনের মাধ্যম হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। 

বক্তার মাঝে অর্থের ব্যাপক চাহিদা থাকা শোভনীয় নয়
হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমাদ 
প্রিন্সিপাল, বাইতুল হিকমাহ একাডেমি, গাজীপুর

ওয়াজ-মাহফিলকে কোনোভাবেই ক্যারিয়ার মনে করা উচিত নয়। ওয়াজ দ্বীনের প্রচার; এটি মূলনীতি। এই মূলনীতির বাইরে যাওয়ার কারণে আজ ওয়াজ-মাহফিলে সমস্যা হচ্ছে। আয়োজকরা মনে করেন, ওয়াজ কালেকশনের মাধ্যম। বক্তারা মনে করেন, ওয়াজ অর্থ উপার্জন বা ক্যারিয়ার গঠনের মাধ্যম। এ কারণে এখানে বিচ্যুতি হচ্ছে। 
আমরা ক্যারিয়ার, টাকা ইত্যাদি চাই—নাকি দ্বীনের প্রচার, এটা প্রথমে ঠিক করতে হবে। ক্যারিয়ার হলে সেখানে ক্যামেরার সমাহার ও লৌকিকতা প্রদর্শনের সব আয়োজন থাকবে। দ্বীন প্রচারের চিন্তা থাকলে কোন বিষয়ে আলোচনা করলে মানুষের উপকার হবে, ইমান-আমল ভালো হবে, সেটি চিন্তায় থাকবে। আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কণ্ঠ পৃথিবীর সেরা।’ আল্লাহর এই কথাই তো একজন বক্তার সন্তুষ্টির জন্য যথেষ্ট। তা হলে আমি এর বাইরে কেন অন্যান্য প্রতিদান প্রত্যাশা করব। 
বক্তার কাজ হবে দ্বীনের প্রচার; কিন্তু দ্বীনের প্রচার করে অর্থ উপার্জন নয়। আমি মনে করি, প্রত্যেক দায়ীর বিকল্প অর্থনীতির উৎস থাকা প্রয়োজন। ফলে তারা ওয়াজের ওপর নির্ভরশীল হবে না। 
ইদানীং অনেক বক্তার মাঝে অর্থের ব্যাপক চাহিদা পরিলক্ষিত হচ্ছে, এটি কিছুতেই শোভনীয় নয়। বেশি করে টাকা চেয়ে নেওয়া জায়েজ নাকি নাজায়েজ, সেই বিতর্কে আমি যাচ্ছি না। 
আমার প্রশ্ন হলো, মাহফিল করে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া কতটা শোভনীয়। কোনো নবি-রাসুল টাকার বিনিময়ে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন, এমন নজির নেই। বিশাল অঙ্কের টাকা চাওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, এটা থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। 
ওয়াজ-মাহফিল দ্বীন প্রচারের বড় মাধ্যম। একজন বক্তার জন্য বিষয় নির্ধারণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এলাকা ও সমাজের অবস্থা বুঝে বিষয় নির্ধারণ করতে হবে। সমাজের সমস্যা, সংকট, অন্যায় ও অপরাধ নিয়ে কোরআন-হাদিসের আলোকে গঠনমূলক কথা বলতে হবে। ইসলাম শুধু মুসলমানদের নামাজ-রোজার মতো ইবাদতই শেখায় না; লেনদেন, সুন্দর আচরণ, আখলাক শিখিয়ে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে তাদের সোনার মানুষ হিসেবে গড়তে চায়। ওয়াজের বিষয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ দিকেও খেয়াল রাখা উচিত। মাইক আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া আমানত। এই আমানত রক্ষা করতে হবে।

আধ্যাত্মিক ধনী হওয়ার সহজ সমীকরণ

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
আধ্যাত্মিক ধনী হওয়ার সহজ সমীকরণ
ছবি: সংগৃহীত

ভাবুন তো, মাত্র এক মিনিটে যদি আপনার ব্যাংক ব্যালান্সে এক হাজার ডলার জমা হয়, তবে কেমন লাগবে? দুনিয়ার বুকে এমন কোনো বৈধ ব্যবসা নেই যা আপনাকে মাত্র ৬০ সেকেন্ডে এত বড় মুনাফা দিতে পারে। অথচ আখেরাতের বাজারে প্রতিদিন মাত্র এক মিনিটে এক হাজার নেকি অর্জন করা এবং একই সঙ্গে এক হাজার গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়া সম্ভব! রাসুল (সা.) আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এমন কিছু অবিশ্বাস্য আধ্যাত্মিক সমীকরণ শিখিয়েছেন, যা আধুনিক মানুষকে এক নিমেষেই পরকালের শ্রেষ্ঠ ধনীতে পরিণত করতে পারে।

আমরা অনেকেই মনে করি, অনেক বড় ইবাদত বা কঠিন পরিশ্রম ছাড়া বড় সওয়াব পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) এই ধারণাটি সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন।
হযরত সা’দ ইবনে আবু অক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি বললেন, তোমাদের কোনো ব্যক্তি প্রত্যহ এক হাজার নেকি অর্জন করতে অপারগ হবে কি?  উপস্থিত একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীভাবে এক হাজার নেকি অর্জন করবে?’ তিনি বললেন, একশ’বার তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ) পড়বে। ফলে তার জন্য এক হাজার নেকি লেখা হবে এবং এক হাজার গুনাহ মিটিয়ে দেওয়া হবে। (মুসলিম, ২৬৯৮; তিরমিজি, ৩৪৬৩)

নতুন দৃষ্টিকোণ: মুহাদ্দিসগণের সুক্ষ্ম ভাষ্য ও বর্ণনার পাঠভেদ (যেমন- শু’বাহ ও ইয়াহয়্যা আলক্বাত্তানের বর্ণনা) অনুযায়ী, এখানে ‘অথবা’ নয়, বরং ‘এবং’ শব্দটির ব্যবহারই অগ্রগণ্য। অর্থাৎ, মাত্র ১০০ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ বললে ১০০০ নেকি পাওয়ার পাশাপাশি একই সঙ্গে ১০০০ গুনাহও খাতা থেকে মুছে যায়।
বিজ্ঞান বলে মানুষের শরীরে শত শত হাড়ের জোড় বা জয়েন্ট রয়েছে। ইসলাম এই প্রতিটি সুস্থ জয়েন্টের জন্য প্রতিদিন সকালে একটি ‘সদকা’ বা ট্যাক্স ধার্য করেছে। কিন্তু সেই ট্যাক্স পরিশোধের উপায়টি কত চমৎকার!

হযরত আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের প্রত্যেকের প্রতিটি (হাড়ের) জোড়ের পক্ষ থেকে প্রতিদিন সদকা দেওয়া আবশ্যক। প্রতিটি ‘সুবহানাল্লাহ’ সদকা, ‘আলহামদু লিল্লাহ’ সদকা, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সদকা এবং ‘আল্লাহু আকবার’ বলাও সদকা। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করাও সদকা। আর এসব কিছুর পরিবর্তে চাশতের (পূর্বাহ্নের) দুই রাকাআত নামাজ পড়াই যথেষ্ট। (মুসলিম, ৭২০; সুনানে আবু দাউদ, ১২৮৫)

মহাবিশ্বের পরম সত্তা আল্লাহতায়ালা বান্দার সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন, তার পুরো নিয়ন্ত্রণ কিন্তু বান্দার নিজের চিন্তাভাবনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা বলেন: আমি আমার বান্দার ধারণার পাশে থাকি (সে যেমন ধারণা করে, আমি তেমনই করি)। সে যখন আমাকে মনে মনে স্মরণ করে, আমি তাকে আমার মনে স্মরণ করি। আর সে যদি কোনো সভায় আমাকে স্মরণ করে, তবে আমি তাকে তাদের চেয়েও উত্তম (ফেরেশতাদের) সভায় স্মরণ করি। (বুখারি, ৭৪০৫; মুসলিম, ২৬৭৫)

মুখের কোণে একটু ‘সুবহানাল্লাহ’র গুঞ্জন আর দিনের শুরুতে দুই রাকাআত চাশতের নামাজ–এই সামান্য অভ্যাসগুলোই আমাদের পুরো দিনটিকে আল্লাহর সুরক্ষায় মুড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা যখন নির্জনে বা জনসম্মুখে আল্লাহকে ডাকি, তখন স্বয়ং স্রষ্টা আমাদের নাম নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন। 

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক 

কোরআন সুন্নাহ মাল্টিমিডিয়ার তিন হাফেজের সৌদি আরব যাত্রা

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০২:২৩ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০২:২৯ পিএম
কোরআন সুন্নাহ মাল্টিমিডিয়ার তিন হাফেজের সৌদি আরব যাত্রা
ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র কোরআনের আলোয় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে সৌদি আরব যাচ্ছেন কোরআন সুন্নাহ (কিউএস) মাল্টিমিডিয়ার তিন মেধাবী হাফেজে কোরআন। সৌদি আরব আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতা-২০২৬-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণের গৌরবময় সুযোগ অর্জন করেছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিশ্বমঞ্চে এই তিন হাফেজের অংশগ্রহণ দেশের জন্য এক অনন্য গৌরব ও মর্যাদার মুহূর্ত বয়ে আনবে।

আন্তর্জাতিক এই আসরে সুযোগ পাওয়ার আগে এই তিন হাফেজ দেশের শীর্ষস্থানীয় তিনটি জাতীয় হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। তারা কিউএস মাল্টিমিডিয়া আয়োজিত— আরটিভির (Rtv) 'আলোকিত কোরআন', চ্যানেল ২৪-এর (Channel 24) 'সময়ের সেরা হাফেজ' এবং জিটিভির (Gtv) 'কুরআনের ছোঁয়া' প্রতিযোগিতায় যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জন করে দেশব্যাপী কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। জাতীয় পর্যায়ের সেই গৌরবময় বিজয়ই এবার তাদের বিশ্বমঞ্চের টিকিট এনে দিয়েছে।

AvjvwKZ KviAvb (AviwUwf)Õi 2019-Gi P¨vw¤úqb| †kL gvngy`yj nvmvb AvkÖvwd

 

KziAv‡bi †Qvuqv (wRwUwf)Õi 2021-Gi P¨vw¤úqb| nv‡dR byiæwÏb RvKvwiqv

 

mg‡qi †miv nv‡dR (P¨v‡bj 24)Õi 2026-Gi 3q ¯’vb AR©bKvwibx| iv‡eZv web‡Z igRvb

 

এই অসামান্য অর্জনে কোরআন সুন্নাহ মাল্টিমিডিয়ার চেয়ারম্যান হাফেজ মাওলানা লুৎফর রহমান উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তিনি তিন হাফেজের সাফল্য কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে বলেন, এই তিন হাফেজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের দেশের সম্মান ও মর্যাদাকে বিশ্ব দরবারে আরও উজ্জ্বল করবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা তাদের এই যাত্রাকে সফল করুন, কোরআনের খেদমতে কবুল করুন এবং বাংলাদেশের জন্য আরও সম্মান ও গৌরব বয়ে আনার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

কিউএস মাল্টিমিডিয়া কর্তৃপক্ষ জানায়, জাতীয় গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করতে এই তিন কৃতি হাফেজ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। দেশের মানুষের ভালোবাসা ও দোয়া সঙ্গে নিয়ে তারা সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক 

মা-বাবাকে অবহেলা করো না, জাহান্নাম নেমে আসবে পৃথিবীতে!

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১০:১৩ এএম
মা-বাবাকে অবহেলা করো না, জাহান্নাম নেমে আসবে পৃথিবীতে!
ছবি: সংগৃহীত

খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামল। ইয়েমেন থেকে প্রতিবার হজযাত্রী বা সাহায্যকারী দল মদিনায় এলে উমর (রা.) ভিড়ের ভেতর একজন মানুষকে খুঁজতেন। নাম তার উওয়াইস আল-কারনি। অপরিচিত, গরিব, সাধারণ এক রাখাল। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জীবনে একবারও দেখতে পাননি–কারণ ইয়েমেনে তার এক অসুস্থ বৃদ্ধা মা ছিলেন, যাকে ছেড়ে তিনি হিজরত করতে পারেননি। মায়ের সেবাই ছিল তার সবচেয়ে বড় ইবাদত।

অথচ এই অপরিচিত মানুষটি সম্পর্কেই রাসুলুল্লাহ (সা.) আগেই বলে গিয়েছিলেন–ইয়েমেন থেকে উওয়াইস নামে এক ব্যক্তি আসবে, যে তার মায়ের প্রতি অত্যন্ত অনুগত; সে যদি আল্লাহর নামে কসম করে, আল্লাহ তার কসম পূর্ণ করে দেন। নবিজি (সা.) বলেছিলেন, সম্ভব হলে তার কাছে নিজেদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া চেয়ে নিও। সেই নির্দেশ অনুযায়ী, মুসলিম জাহানের খলিফা উমর (রা.) নিজে এই অখ্যাত যুবকের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, আমার জন্য আল্লাহর কাছে মাগফিরাত চেয়ো। (মুসলিম, ২৫৪২)

মানুষের জীবনে মায়ের অবদান অপরিসীম, অপরিশোধ্য। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছি; তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সয়ে গর্ভে ধারণ করেছে, আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। (নির্দেশ এই যে) তুমি আমার প্রতি ও তোমার মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।’ (সুরা লুকমান, ১৪)
লক্ষ করুন, আল্লাহ এখানে নিজের শুকরিয়ার পাশেই মা-বাবার শুকরিয়াকে যুক্ত করেছেন এবং মা সন্তানকে কষ্ট সয়ে গর্ভে ধারণ করেছে, কষ্ট সয়েই জন্ম দিয়েছে। এই কষ্টের কারণেই মায়ের অধিকার বাবার চেয়েও বহুগুণ বেশি।

একবার এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার উত্তম সঙ্গ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি বলল, ‘তারপর কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ আবার জিজ্ঞেস করলে আবারও বললেন, ‘তোমার মা।’ চতুর্থবার বললেন, ‘এরপর তোমার বাবা।’ (বুখারি, ৫৯৭১; মুসলিম, ২৫৪৮)। তিনবার ‘মা’ আর একবার ‘বাবা’–এ যেন স্রষ্টার নির্ধারিত মর্যাদার নিক্তি।

মাকে অবহেলা করার পরিণাম খুবই ভয়াবহ। যে সন্তান এই নিয়ামতকে অবহেলা করে, তার পরিণতি ভয়াবহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনবার বললেন, ‘তার নাক ধুলায় মলিন হোক! তার নাক ধুলায় মলিন হোক! তার নাক ধুলায় মলিন হোক!’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে সে, হে আল্লাহর রাসুল?’ তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা অথবা তাদের একজনকে বার্ধক্যে পেল, অথচ (তাদের সেবা করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’ (মুসলিম, ২৫৫১)

বৃদ্ধ মা যখন সবচেয়ে অসহায়, ঠিক তখনই যদি সন্তান মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে খোলা জান্নাতের দরজাও তার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। পিতা-মাতার অবাধ্যতাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) শিরকের পরই সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহের মধ্যে গণ্য করেছেন (বুখারি)। আর সবচেয়ে ভীতিকর বার্তা এই যে, এর শাস্তি কেবল আখিরাতে নয়–দুনিয়াতেই নেমে আসে। 
আবু বাকরা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সব গুনাহের শাস্তি আল্লাহ যতটা ইচ্ছা কিয়ামত পর্যন্ত পিছিয়ে দেন, কিন্তু পিতা-মাতার অবাধ্যতার শাস্তি তিনি বান্দার জন্য মৃত্যুর আগে, এ দুনিয়াতেই ত্বরান্বিত করে দেন।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, ৪/১৫৬)

লেখিকা: আলেমা ও গৃহিণী

 

২১ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৭:০০ এএম
২১ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি
জুন, ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচির ছবি

প্রতিদিন সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। নামাজ (সালাত) ইসলাজুনর পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি এবং ইসলাজুনর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, (হে আল্লাহর রাসুল!) আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় আমল কোনটি? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘নামাজ (বুখারি ও মুসলিম)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সেভাবে নামাজ আদায় করো, যেভাবে আমাকে নামাজ আদায় করতে দেখেছ।’ (বুখারি, ৬৩১)

সঠিকভাবে নামাজ আদায় করতে হলে, নামাজের সময় জানতে হবে।

 

আজ ২১ জুন ২০২৬, রবিবার। ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো— 

জোহর

১২.০৩ মিনিট

আসর

৪.৩৯ মিনিট

 

মাগরিব

৬.৫১ মিনিট

এশা

৮.০৮ মিনিট

 

ফজর (২২ জুন)

.৪৪ মিনিট

 

 বিভাগীয় শহরের জন্য উল্লিখিত সময়ের সঙ্গে যেসব বিভাগে সময় যোগ-বিয়োগকরতে হবে।

বিয়োগ

চট্টগ্রাম: ৫ মিনিট

সিলেট: ৬ মিনিট

যোগ

খুলনা: ৩ মিনিট

রাজশাহী: ৭ মিনিট

রংপুর: ৮ মিনিট

বরিশাল: ১ মিনিট

 

সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তীব্র তাপপ্রবাহে করণীয়

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৫:০০ পিএম
তীব্র তাপপ্রবাহে করণীয়
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের আকাশ এখন আগুনঝরা। বিভিন্ন জেলার ওপর দিয়ে বইছে তাপপ্রবাহ; কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছুঁইছুঁই। রাস্তায় বের হওয়া দিনমজুর, রিকশাচালক, কৃষক ও খেটে খাওয়া মানুষ এই তাপপ্রবাহে সবচেয়ে কষ্টে আছেন। এমন সময়ে একজন মুমিনের কর্তব্য কেবল গরমে হাঁসফাঁস করা নয়; বরং ঈমান, সবর ও সতর্কতা মিলিয়ে নিরাপদভাবে জীবনযাপনের চেষ্টা করা উচিত।

ইসলাম তাপকে নিছক প্রাকৃতিক বিড়ম্বনা হিসেবে দেখে না, দেখে এক গভীর স্মারক হিসেবে। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘বলো, জাহান্নামের আগুন এর চেয়েও কঠিন উত্তপ্ত, যদি তারা বুঝত!’ (সুরা তাওবা, ৮১)। দুনিয়ার সামান্য রোদের এই অসহনীয় তাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়; আখিরাতের কঠিন উত্তাপের কথা। তাই গরম যেন আমাদের গুনাহ থেকে বিরত থাকার এবং বেশি বেশি ইস্তিগফারের তাগিদ দেয়।

আবার পানির অপরিহার্যতা স্মরণ করিয়ে আল্লাহ এরশাদ করেছেন, ‘আমি পানি থেকেই প্রতিটি জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া, ৩০)। গরমে শরীরের পানিশূন্যতাই সবচেয়ে বড় বিপদ, তাই পানির এই নিয়ামতের কদর করা ঈমানি দায়িত্ব। পানাহারে আল্লাহর নির্দেশ হলো সংযম, তিনি এরশাদ করেছেন, ‘খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।’ (সুরা আরাফ, ৩১)।

তীব্র গরমে নামাজ নিয়েও রাসুলুল্লাহ (সা.) দিয়েছেন স্বস্তির নির্দেশনা। তিনি বলেছেন, ‘গরম যখন প্রচণ্ড হয়, তখন (জোহরের) নামাজ ঠাণ্ডার সময়ে আদায় করো; কেননা প্রচণ্ড গরম জাহান্নামের উত্তাপের নিশ্বাস থেকে।’ (বুখারি, ৫৩৩-৫৩৪; মুসলিম, ৬১৫)। অর্থাৎ দুপুরের তীব্র রোদে কষ্ট করে নয়, একটু দেরিতে; যখন তাপ কমে আসে, তখন জোহর পড়ার অনুমতি দিয়েছেন তিনি। এ যেন গরমকালে মুসল্লির জন্য রহমতস্বরূপ ব্যবস্থা।


তাপপ্রবাহে নিরাপদ থাকতে সুন্নাহ ও বিজ্ঞান মিলিয়ে পরামর্শগুলো মেনে চলা যায়–

প্রথমত, পর্যাপ্ত পানি পান করুন। তৃষ্ণা পাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে নিয়মিত পানি, ডাবের পানি বা খাবার-স্যালাইন পান করুন। অতিরিক্ত ঘামে শরীর থেকে লবণ বেরিয়ে যায়, তাই স্যালাইন বিশেষ উপকারী। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সবচেয়ে প্রিয় পানীয় ছিল মিষ্টি ও ঠাণ্ডা পানীয় (তিরমিজি, ১৮৯৫)।

তীব্র গরমে ডাবের পানি, লেবু-পানি বা ঠাণ্ডা পানি যে শরীর ও মনকে স্বস্তি দেয়, নবিজি (সা.)-এর এই পছন্দে তারই ইঙ্গিত আছে। আর পানি পানের পদ্ধতিও তিনি শিখিয়েছেন–এক নিশ্বাসে ঢকঢক করে নয়, বরং কয়েক নিশ্বাসে ধীরে ধীরে পান করতেন (মুসলিম, ২০২৮)। গরমে হঠাৎ অতিরিক্ত ঠাণ্ডা পানি একসঙ্গে গলায় ঢালার চেয়ে এ পদ্ধতি অনেক বেশি নিরাপদ।

দ্বিতীয়ত, রোদ এড়িয়ে চলুন। বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৩-৪টা পর্যন্ত সূর্য সবচেয়ে প্রখর থাকে। এ সময় খুব প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়াই ভালো; বের হলে ছাতা, টুপি বা ভেজা কাপড় ব্যবহার করুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) দীর্ঘক্ষণ এমনভাবে বসতে নিষেধ করেছেন, যাতে শরীরের একাংশ রোদে আর একাংশ ছায়ায় থাকে; তিনি একে শয়তানের বসার স্থান বলেছেন (আবু দাউদ, ৪৭৮৮)। আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, এর একটি হিকমত হলো রোদের তাপে কষ্ট পাওয়া এড়ানো। অর্থাৎ দুপুরের প্রখর রোদকে নবিজি (সা.) নিজেই এড়িয়ে চলার শিক্ষা দিয়েছেন।

তৃতীয়ত, হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরুন। ইসলাম পর্দা ও শালীনতা বজায় রেখে আরামদায়ক পোশাকের অনুমতি দেয়। সুতির, হালকা রঙের ঢিলেঢালা কাপড় তাপ শোষণ কম করে এবং বাতাস চলাচলে সাহায্য করে। আনাস ও উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সবচেয়ে প্রিয় পোশাক ছিল ‘কামিস’ (লম্বা, ঢিলেঢালা জামা) (আবু দাউদ, ৪০২৫; তিরমিজি, ১৭৬২) 
উষ্ণ আবহাওয়ায় তার পরিধেয় ছিল মূলত ঢিলেঢালা ও আবৃত পোশাক, যা শরীরকে রোদ থেকে রক্ষা করত আর বাতাস চলাচলেও বাধা দিত না। 

চতুর্থত, হালকা খাবার খান। ভারী, অতিরিক্ত মসলাযুক্ত ও বেশি ভাজাপোড়া খাবার গরমে শরীরের ওপর চাপ বাড়ায়। মৌসুমি ফল, শসা, লেবু-পানি শরীরকে ঠাণ্ডা রাখে।
মিকদাম ইবনে মাদিকারিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আদম-সন্তান পেটের চেয়ে খারাপ কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখার মতো কয়েক লোকমাই তার জন্য যথেষ্ট। তবু যদি বেশি খেতেই হয়, তাহলে এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ নিশ্বাসের জন্য রাখুক।’ (তিরমিজি, ২৩৮০; ইবনে মাজাহ, ৩৩৪৯) । ভারী ও অতিরিক্ত খাবার গরমে হজমে চাপ ফেলে শরীরকে আরও ক্লান্ত করে–এই পরিমিতির সুন্নাহই তখন সবচেয়ে উপকারী।

পঞ্চমত, হিটস্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন। মাথা ঘোরা, প্রচণ্ড দুর্বলতা, ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া, বমিভাব বা অজ্ঞান হওয়া–এসব দেখা দিলে দ্রুত ছায়াযুক্ত শীতল স্থানে নিয়ে শরীরে পানি দিন এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জ্বর জাহান্নামের উত্তাপ থেকে, তাই তা পানি দিয়ে ঠাণ্ডা করো।’ (বুখারি, ৩২৬৩; সহিহ মুসলিম, ২২০৯) শরীর অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে গেলে পানি দিয়ে শীতল করার এই নির্দেশনা সরাসরি হিটস্ট্রোক মোকাবিলার সঙ্গে মিলে যায়–আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও মাথা ঘোরা, প্রচণ্ড দুর্বলতা বা অজ্ঞানভাব দেখা দিলে দ্রুত শরীর ঠাণ্ডা করার পরামর্শ দেয়।

তীব্র গরমে শুধু নিজে বাঁচলেই হবে না, অন্যকে বাঁচানোও ঈমানের দাবি। সাহাবি সাদ ইবনু উবাদা (রা.) যখন তার প্রয়াত মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করতে চাইলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন কোন সদকা সর্বোত্তম। তিনি উত্তর দিলেন, ‘পানি পান করানো।’ (ইবনে মাজাহ, ৩৬৮৪; আবু দাউদ, ১৬৭৯) 
এরপর সাদ (রা.) মদিনায় একটি কূপ খনন করে দিয়েছিলেন। আজকের প্রেক্ষাপটে রাস্তার পাশে তৃষ্ণার্ত পথিক, রিকশাচালক বা শ্রমিকদের জন্য একটু ঠাণ্ডা পানি বা স্যালাইনের ব্যবস্থা করা–এ এক মহৎ সদকা।

এমনকি অবলা প্রাণীর তৃষ্ণা মেটানোও আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। নবিজি (সা.) সেই ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে তৃষ্ণার্ত এক কুকুরকে কূপ থেকে পানি তুলে পান করিয়েছিল, আর তাতেই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিটি জীবন্ত প্রাণের সেবায় সওয়াব রয়েছে।’ (বুখারি, ২৩৬৩; মুসলিম, ২২৪৪)। তাই বাড়ির ছাদে বা উঠানে পাখি ও প্রাণীর জন্য এক পাত্র পানি রেখে দেওয়াও এক নীরব ইবাদত। এই তাপপ্রবাহ আমাদের জন্য দ্বিমুখী পরীক্ষা–সবরের পরীক্ষা এবং প্রজ্ঞার পরীক্ষা। গরমকে গালি না দিয়ে বরং একে আখিরাতের স্মারক হিসেবে নিয়ে বেশি বেশি ইস্তিগফার করি, সুন্নাহ ও বিজ্ঞানের নির্দেশনা মেনে নিজেকে নিরাপদ রাখি, আর তৃষ্ণার্ত মানুষ ও প্রাণীর পাশে দাঁড়াই। 

লেখক: খতিব, বঙ্গভবন জামে মসজিদ