দ্বীনের প্রচার-প্রসার নবিওয়ালা কাজ। পৃথিবীর সব নবি-রাসুল এটি করেছেন। সবিশেষ এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মুহাম্মাদ (সা.)-এর উম্মতদের। ইসলাম ধর্মের প্রচার-প্রসার, মানুষকে ইসলামমুখী করা এবং ইসলামি বিধি-বিধান জানানোর অন্যতম আয়োজন ওয়াজ-মাহফিল। এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হয়। সওয়াব হয়। কিন্তু অনেক বক্তা এই ওয়াজকে দ্বীনের প্রচার-প্রসার ও আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম না বানিয়ে ক্যারিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আয়োজকরাও ভিন্ন উদ্দেশ্যে আয়োজন করছেন। ফলে মানুষের তেমন উপকার হচ্ছে না; বরং এ নিয়ে হচ্ছে নানামুখী সমালোচনা। একজন বক্তা ওয়াজ-মাহফিলকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেবেন নাকি দ্বীনি প্রচার-প্রসারের মাধ্যম বানাবেন—এ সম্পর্কে বর্তমান সময়ের আলোচিত চারজন বক্তার মতামত তুলে ধরা হলো—
মনগড়া কথা বলা বক্তাদের লাগাম টেনে ধরতে হবে
—মুফতি ওসমান গনি সালেহী
খতিব, টাউন হল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মোহাম্মদপুর
ওয়াজ-মাহফিলের প্রচলন শুরু হয় ওমর (রা.)-এর শাসনকালে। তিনিই অনুমতি দেন ওয়াজের। তবে তার এবং উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে কোরআনের বাইরে গিয়ে ওয়াজ করার অনুমতি ছিল না। কোরআনের গল্প, উদাহরণ, উপদেশ—এই ছিল বক্তৃতার বিষয়। উমাইয়াদের শাসনামলে ওয়াজ সংস্কৃতিতে বিরাট এক পরিবর্তন আসে। উমাইয়া শাসকরা ওয়াজকে ব্যবহার করতে শুরু করেন নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার এবং রাষ্ট্রীয় হুকুমত অক্ষুণ্ন রাখতে। তখন শাসকদের রীতিনীতি এবং বিধি-নিষেধের খপ্পরে পড়ে যায় ওয়াজ-মাহফিল। সেই থেকে শুরু ওয়াজের ভিন্ন এক যাত্রা। তার পর ওয়াজে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী লক্ষ্য জড়িত হয়।
অনেকে ওয়াজ-মাহফিলকে জাতির কল্যাণ, দ্বীন প্রচার এবং সংশোধনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করলেও; কেউ কেউ আবার গ্রহণ করেছে ক্যারিয়ার গঠন ও নিছক টাকা কামানোর মাধ্যম হিসেবে। যারা ক্যারিয়ার গঠনের জন্য ওয়াজ-মাহফিলকে বেছে নিয়েছে, তারা কোরআন-হাদিসের আলোচনার চেয়ে মনগড়া কথা বেশি বলেন। হাসি-তামাশা-কৌতুক করেন মঞ্চে বসে। যেহেতু অনেক বক্তার লক্ষ্যই থাকে ক্যারিয়ার গঠন ও অর্থ উপার্জন, তাই মানুষকে যেভাবে খুশি করা যায়, সেভাবেই কথা বলেন তারা। অনেক সময় উদ্ভাবন করেন নতুন নতুন ইবাদত। তৈরি করেন গল্প। তাই তাদের ওপর দ্বীনি নজরদারির পরামর্শ দিয়েছেন কেউ কেউ। আয়োজকদের উচিত, এসব বক্তাকে এড়িয়ে চলা। শ্রোতাদের কর্তব্য হলো, বক্তা মনগড়া কথা বললে সচেতনতার সঙ্গে প্রতিবাদ করা। থামিয়ে দেওয়া।
সুর এবং ইনিয়ে-বিনিয়ে বলা গল্প মানুষকে শুধু গানের মতো আনন্দিতই করে। আখেরাতের জন্য অন্তরকে তৈরি করতে পারে না। মনগড়া ওয়াজ থেকে শ্রোতারা জীবন বদলের বার্তা নিয়ে যেতে পারেন না। জীবনকে সঠিক পথে পরিচালনার পাথেয় খুঁজে পান না। যারা ওয়াজ-মাহফিলে শরিয়তবিরোধী কথাবার্তা বলেন, তাদের লাগান টেনে ধরা প্রয়োজন। ইম্বাউল গুমর গ্রন্থে আল্লামা ইবনে হাজার (রহ.) লিখেছেন, ‘নাজমুদ্দিন তুম্বুজি দরিদ্র ফকিহদের নিয়োগ দিয়েছিলেন, তারা যেন দোকানদারকে সুরা ফাতেহা এবং নামাজের ফরজগুলো শেখায়। তবে ইনিয়ে-বিনিয়ে গল্প-কেচ্ছা বলে ওয়াজ করা ছিল তাদের জন্য নিষিদ্ধ।’
ওয়াজ-মাহফিল ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার কারণে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে
—মুফতি রেজাউল করিম আবরার
প্রধান মুফতি, জামিয়া মাহমুদিয়া, যাত্রাবাড়ী
পৃথিবীতে প্রথমে দ্বীনি দাওয়াত শুরু করেছেন নবি-রাসুলগণ। দ্বীনি দাওয়াতের বিষয়টি ইসলামের সূচনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এটি নতুন বিষয় নয়। মানুষের কাছে পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসের বাণী পৌঁছানোর জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে বার্তা দিয়েই গেছেন। দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, ‘তোমরা যারা উপস্থিত রয়েছো, তারা অনুপস্থিতদের কাছে আমার কথা পৌঁছে দাও।’ পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির (কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে, অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহকে বিশ্বাস করবে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)
আমরা সাড়ে চৌদ্দশ বছরের ইতিহাসে দেখি, ইসলামি ফিকাহবিদ, হাদিসবিদ প্রত্যেকে মানুষকে দ্বীনের পথে ডেকেছেন। আল্লাহর পথে দাওয়াত দিয়েছেন। ওয়াজ-নসিহত করেছেন। তাদের কেউ এই ওয়াজ-নসিহত পেশা হিসেবে নেননি। ওয়াজ-নসিহত তাদের ক্যারিয়ার ছিল, এমন দৃষ্টান্তও নেই। আমাদের নিকটকালের আকাবির-আসলাফ ওয়াজ-নসিহত করেছেন, তারা কেউ এটা পেশা বা ক্যারিয়ার হিসেবে নেননি। কেউ নিয়েছেন, এটা আমার জানা নেই। অনেক আকাবির বেশ সমৃদ্ধিশালী খুতুবাত আমাদের কাছে আছে। তারা এটাকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেননি।
ওয়াজ-মাহফিল ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার বিষয় নয়। ওয়াজ-মাহফিলকেন্দ্রিক এখন যে নানা আলোচনা-সমালোচনা, মানুষ নানাভাবে কটুকথা বলছে, এটা মূলত হয়েছে ওয়াজ-মাহফিলকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার কারণে। ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার কারণে বিশৃঙ্খলাও তৈরি হচ্ছে। আমার মতে, এটি ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। এটি দাওয়াতি কাজ। নবিওয়ালা কাজ। এটি দ্বীনের প্রচার হিসেবে নিতে হবে। এটি দ্বীনের প্রচার হিসেবে নিতে পারলে মানুষের কল্যাণ হবে। যিনি ওয়াজ-মাহফিল করবেন, তার মধ্যে পরিপূর্ণভাবে ইখলাস (একনিষ্ঠতা), ধৈর্য ও সহনশীলতা, দৃঢ়তা থাকতে হবে। সত্যবাদী ও সদাচারী হতে হবে। নিজের মধ্যে আমল ও ক্ষমার গুণ থাকতে হবে।
আখেরাতের ক্যারিয়ার গঠনের মাধ্যম হতে পারে ওয়াজ
—মুফতি সাইফুল্লাহ হাবিবি
শিক্ষক, জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া, লালবাগ
ওয়াজ-মাহফিল দ্বীনি প্রচারের অন্যতম মাধ্যম। সমস্ত নবি-রাসুল মানুষের মাঝে ধর্মের প্রচার করতেন এবং তাদের ওয়াজ-নসিহত শোনাতেন। এটি নবিদের কাজ। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদের বানিয়েছিলাম নেতা, তারা আমার নির্দেশে মানুষকে সঠিক পথ দেখাত। তাদের প্রতি ওহি বা প্রত্যাদেশ করেছিলাম সৎকাজ করার জন্য, নিয়মিত নামাজ প্রতিষ্ঠা করার ও জাকাত প্রদানের জন্য, তারা আমারই ইবাদত করত।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৭৩)
নবি মুহাম্মাদ (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে রাসুল, তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার করো, যদি না করো তা হলে তুমি তাঁর বার্তা পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করলে না। মানুষের ক্ষতি থেকে আল্লাহই তোমাকে রক্ষা করবেন, আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে কখনো সৎপথ প্রদর্শন করবেন না।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৬৭)
উল্লিখিত দুই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, ওয়াজ-মাহফিল সাধারণ কোনো দায়িত্ব নয়; বরং নবির উত্তরাধিকার হিসেবে আলেমদের ওপর এটি গুরুদায়িত্ব। এই মহান দায়িত্ব ওলামাদের ক্যারিয়ার হতে পারে না। ক্যারিয়ার গঠনের জন্য মানুষকে আল্লাহতায়ালা পৃথিবীতে অনেক উপকরণ দিয়েছেন। কাজের ক্ষেত্র ও ধরন ব্যাপক করেছেন।
ওয়াজ-মাহফিল এবং ক্যারিয়ার গঠন—এটা দুই মেরুর বিষয়। একটি অপরটির সম্পূর্ণ বিপরীত। কোনো আলেম যেন ধর্ম প্রচারকে নিজের ক্যারিয়ার গঠন বা দুনিয়া উপার্জনের মাধ্যম বানাতে না পারেন, এ জন্য আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের একাধিক জায়গায় তাঁর বান্দাদের সতর্ক করেছেন। যেমন সুরা বাকারার ৪১ নম্বর আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমার আয়াতের বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করো না এবং তোমরা আমাকেই ভয় করো।’
ওয়াজ-মাহফিল দ্বীনি প্রচারের শক্তিশালী মাধ্যম। আলেমরা নবিদের উত্তরাধিকার হিসেবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দ্বীনের প্রচার-প্রসার করে যাবেন। কোনো অবস্থাতেই ক্যারিয়ার গঠনের মাধ্যম বানানো যাবে না। আখেরাতের ক্যারিয়ার গঠনের মাধ্যম হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
বক্তার মাঝে অর্থের ব্যাপক চাহিদা থাকা শোভনীয় নয়
—হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমাদ
প্রিন্সিপাল, বাইতুল হিকমাহ একাডেমি, গাজীপুর
ওয়াজ-মাহফিলকে কোনোভাবেই ক্যারিয়ার মনে করা উচিত নয়। ওয়াজ দ্বীনের প্রচার; এটি মূলনীতি। এই মূলনীতির বাইরে যাওয়ার কারণে আজ ওয়াজ-মাহফিলে সমস্যা হচ্ছে। আয়োজকরা মনে করেন, ওয়াজ কালেকশনের মাধ্যম। বক্তারা মনে করেন, ওয়াজ অর্থ উপার্জন বা ক্যারিয়ার গঠনের মাধ্যম। এ কারণে এখানে বিচ্যুতি হচ্ছে।
আমরা ক্যারিয়ার, টাকা ইত্যাদি চাই—নাকি দ্বীনের প্রচার, এটা প্রথমে ঠিক করতে হবে। ক্যারিয়ার হলে সেখানে ক্যামেরার সমাহার ও লৌকিকতা প্রদর্শনের সব আয়োজন থাকবে। দ্বীন প্রচারের চিন্তা থাকলে কোন বিষয়ে আলোচনা করলে মানুষের উপকার হবে, ইমান-আমল ভালো হবে, সেটি চিন্তায় থাকবে। আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কণ্ঠ পৃথিবীর সেরা।’ আল্লাহর এই কথাই তো একজন বক্তার সন্তুষ্টির জন্য যথেষ্ট। তা হলে আমি এর বাইরে কেন অন্যান্য প্রতিদান প্রত্যাশা করব।
বক্তার কাজ হবে দ্বীনের প্রচার; কিন্তু দ্বীনের প্রচার করে অর্থ উপার্জন নয়। আমি মনে করি, প্রত্যেক দায়ীর বিকল্প অর্থনীতির উৎস থাকা প্রয়োজন। ফলে তারা ওয়াজের ওপর নির্ভরশীল হবে না।
ইদানীং অনেক বক্তার মাঝে অর্থের ব্যাপক চাহিদা পরিলক্ষিত হচ্ছে, এটি কিছুতেই শোভনীয় নয়। বেশি করে টাকা চেয়ে নেওয়া জায়েজ নাকি নাজায়েজ, সেই বিতর্কে আমি যাচ্ছি না।
আমার প্রশ্ন হলো, মাহফিল করে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া কতটা শোভনীয়। কোনো নবি-রাসুল টাকার বিনিময়ে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন, এমন নজির নেই। বিশাল অঙ্কের টাকা চাওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, এটা থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ওয়াজ-মাহফিল দ্বীন প্রচারের বড় মাধ্যম। একজন বক্তার জন্য বিষয় নির্ধারণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এলাকা ও সমাজের অবস্থা বুঝে বিষয় নির্ধারণ করতে হবে। সমাজের সমস্যা, সংকট, অন্যায় ও অপরাধ নিয়ে কোরআন-হাদিসের আলোকে গঠনমূলক কথা বলতে হবে। ইসলাম শুধু মুসলমানদের নামাজ-রোজার মতো ইবাদতই শেখায় না; লেনদেন, সুন্দর আচরণ, আখলাক শিখিয়ে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে তাদের সোনার মানুষ হিসেবে গড়তে চায়। ওয়াজের বিষয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ দিকেও খেয়াল রাখা উচিত। মাইক আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া আমানত। এই আমানত রক্ষা করতে হবে।