নতুন বছরে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। মুমিনের জীবন-ভাবনা নতুন বছরের আগমনকে ভিন্ন দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করতে শেখায়। পৃথিবীর জীবন মূলত পরকালের প্রস্তুতির জন্য। মহান আল্লাহর নির্দেশমতো জীবন পরিচালনা করাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। জীবন কখন ফুরিয়ে যাবে—আল্লাহই ভালো জানেন। কাজেই পরিকল্পনামাফিক জীবনকে কাজে লাগাতে নতুন বছর হোক নতুন করে পথচলার সূচনা।
নতুন বছরের পরিকল্পনা
নতুন বছরের আগমনে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। সঠিক পরিকল্পনা সফলতার পথ দেখায়। পরিশুদ্ধ নিয়ত কাজের গতি বৃদ্ধি করে। কাজের শুরুতে নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। নতুন বছরকে সামনে রেখে নিয়ত ঠিক করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। ইমানদারের প্রথম পরিকল্পনা হওয়া চাই আমল ও আখলাক নিয়ে। বছরের শুরু থেকেই নামাজ-রোজাসহ ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলো যথার্থভাবে আদায়, কোরআন তেলাওয়াত, ধর্মীয় জ্ঞানার্জন, পরোপকার, দান-সদকা বৃদ্ধির পরিকল্পনা করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সম্বোধন করে আল্লাহ বলেন, ‘এবং কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো, অতঃপর তুমি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহর ওপর ভরসা করবে; যারা ভরসা করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
ইমান নবায়ন
ইমান বাড়ে-কমে। কখনো শূন্য হয়ে যায়। এ জন্য ইমানকে নবায়ন করতে হয়। আল্লাহর স্মরণে ইমান বৃদ্ধি পায়। নতুন বছরকে ইমান নবায়নের সূচনায় পরিণত করা উচিত। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের ইমানকে নবায়ন করো। সাহাবিরা জানতে চাইলেন, কীভাবে ইমান নবায়ন করবো, হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, বেশি বেশি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়তে থাকো।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৮৭১০)
ইমান নবায়নের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অবশ্যই তোমাদের হৃদয়ে ইমান জীর্ণ হয়, যেমন জীর্ণ হয় পুরোনো কাপড়। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো, যাতে তিনি তোমাদের হৃদয়ে তোমাদের ইমান নবায়ন করে দেন।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৫)
আরও পড়ুন: দোয়া মাসুরা কখন পড়তে হয়?
গুনাহ থেকে তওবা
অতীতের মন্দ কাজের জন্য বিশেষভাবে অনুতপ্ত হওয়াকে তওবা বলে। বিশুদ্ধ তওবা হলো—১. কৃত গুনাহের জন্য অনুশোচনা করা। ২. আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা। ৩. ভবিষ্যতে এসব গুনাহ না করার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো—বিশুদ্ধ তওবা; সম্ভবত তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কাজগুলো মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৮)
আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা
নতুন বছরের আগমনে আল্লাহর কাছে ইহ-পরকালীন সুখ, শান্তি, সফলতা এবং কল্যাণ কামনা করতে হবে। আল্লাহই বান্দার সুখ, শান্তি, সফলতা এবং কল্যাণ দেন। কোরআনে আছে, ‘আমি কি তাঁর (আল্লাহ) পরিবর্তে অন্যদের উপাস্যরূপে গ্রহণ করব? করুণাময় যদি আমাকে কষ্টে নিপতিত করতে চান, তবে তাদের সুপারিশ আমার কোনোই কাজে আসবে না এবং তারা আমাকে রক্ষাও করতে পারবে না।’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ২৩)
জীবনের হিসাব
আল্লাহতায়ালা মানুষকে সুনির্দিষ্ট একটি সময়কাল দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান। এই সময়কালের কোনো হেরফের বা কম-বেশি হয় না। যার জন্য যতটুকু সময় নির্ধারিত, ততটুকু ফুরিয়ে গেলেই জীবনাবসান হয়ে যায়। মৃত্যুর ডাক এসে যায়। নতুন বছরে দাঁড়িয়ে বিগত বছরের পর্যালোচনা করা খুবই যৌক্তিক বিষয়। অতীতের ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে নতুন বছরে নির্ভুল এবং পাপমুক্ত জীবন কাটানোর জন্য প্রত্যয়ী হওয়া উচিত। পরকালে আল্লাহর সামনে হিসাব-নিকাশের মুখোমুখি হওয়ার আগে পৃথিবীতেই জীবনের হিসাব-নিকাশ করে নেওয়া মুমিনের ইমানি দায়িত্ব। নতুন বছরে উমর (রা.) বলতেন, ‘তোমরা তোমাদের নিজেদের হিসাব করে নাও, তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯)
আল্লাহর নিদর্শন থেকে শিক্ষা
সূর্য ও চন্দ্র মহান আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টি ও অন্যতম নিদর্শন। বিশ্ব ব্যবস্থাপনা সূর্য-চন্দ্রের গতি ও কিরণ-রশ্মির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সূর্য-চন্দ্রের গতি ও নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণব্যবস্থা একটি বিশেষ হিসাব ও পরিমাপ অনুযায়ী চলছে। এর মাধ্যমেই রাত-দিনের পার্থক্য, ঋতুর পরিবর্তন এবং মাস-বছর নির্ধারিত হয়। সূর্যের গতি থেকে সৌরবর্ষ এবং চন্দ্রের গতি থেকে চন্দ্রবর্ষ হিসাব করা হয়। সে হিসেবেই রোজা, হজ ইত্যাদি সম্পাদিত হয়। এসব নিদর্শন থেকে শিক্ষা লাভ করে আল্লাহমুখী হওয়াই ইমানের দাবি। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং এর গন্তব্য নির্দিষ্ট করেছেন; যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পারো। আল্লাহ এসব নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এসব নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৫)
বিজাতীয় সংস্কৃতি ও অশ্লীলতা পরিহার
নতুন বছরকে আনুষ্ঠানিক স্বাগত জানানো বা বিগত বছরকে বিদায় জানানোর সঙ্গে ইসলামের ইবাদত-বন্দেগি, রীতি-নীতি বা সভ্যতা-সংস্কৃতির কোনো সম্পর্ক নেই। ‘থার্টিফার্স্ট নাইট’ পালন বা এ-জাতীয় আচার-অনুষ্ঠান বিজাতীয় সংস্কৃতির অংশ—যা মুসলমানদের জন্য অবশ্যই পরিত্যাজ্য। ‘থার্টিফার্স্ট নাইট’ পালনে নানাবিধ অশ্লীলতা, নগ্নতা, মদপান, তরুণ-তরুণীর যৌন উন্মদনাসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংবাদ পাওয়া যায়; যেগুলো ইসলামে গুরুতর অপরাধ। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎ কর্ম ও সীমা লঙ্ঘন; তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৯০)। নতুন আরেকটি বছরের আগমন জীবনকে মৃত্যুর নিকটবর্তী করছে। জীবনের সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই জীবনকে মূল্যায়ন করার ইমানবান্ধব কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করাই হোক নতুন বছরের আহ্বান।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়