আরবি বর্ষপঞ্জির দশম মাস শাওয়াল। এ মাসে মুসলিম উম্মাহর আনন্দের ঈদুল ফিতর রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) কীভাবে ঈদ পালন করতেন, সে বিষয়ে হাদিসের আলোকে বিবরণ তুলে ধরা হলো-
প্রথম বিষয় হচ্ছে, আনন্দের এ দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.) গরিব, দুঃখী ও অসহায় মানুষের কথা ভুলে যাননি। ঈদের আনন্দ ও খুশি সবাই মিলে সমভাবে উপভোগ করার উদ্দেশ্যে তিনি এদিনে সদকাতুল ফিতরের বিধান প্রবর্তন করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন, যেন রোজা পালনকারী অহেতুক কথা ও অশ্লীল কাজ থেকে পবিত্রতা লাভ করে এবং দরিদ্র মানুষ যেন খাদ্য লাভ করে।’ (আবু দাউদ: হাদিস নম্বর-১৬০৯; ইবনে মাজাহ: হাদিস নম্বর-১৮২৭)
ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক গোলাম, স্বাধীন, পুরুষ, নারী, প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক মুসলমানের ওপর রাসুলুল্লাহ (সা.) খেজুর কিংবা জব- এক সা (৩ কেজি ৩০০ গ্রাম) পরিমাণ সদকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন এবং ঈদের নামাজে বের হওয়ার আগে তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।’ (বুখারি: হাদিস নম্বর-১৫০৩)
কোন খাদ্য দ্বারা কতটুকু সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে, তা এ হাদিস দ্বারা স্পষ্টভাবে জানা যায়। তবে গ্রহীতার অবস্থা বিবেচনা করে খাদ্য না দিয়ে খাদ্যের মূল্য দিয়েও সদকাতুল ফিতর আদায় করা যেতে পারে। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘(দানের ক্ষেত্রে) দাতার কাছে যা সর্বোৎকৃষ্ট এবং যার মূল্যমান সবচেয়ে বেশি (তা অধিক গ্রহণযোগ্য)।’ (বুখারি-৩/১৮৮; মুসলিম-১/৬৯।)
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদগাহে যাওয়ার আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।’ (বুখারি: হাদিস নম্বর-১৫০৯।)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যে ঈদের নামাজের আগে তা (সদকাতুল ফিতর) আদায় করল, তা কবুলকৃত সদকা হিসেবে গণ্য হলো। আর যে ঈদের নামাজের আগে তা (সদকাতুল ফিতর) আদায় করল না, তা সাধারণ সদকা হিসেবে গণ্য হলো।’ (আবু দাউদ: হাদিস নম্বর-১৬০৯; ইবনে মাজাহ: হাদিস নম্বর-১৮২৭।)
সুতরাং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খাঁটি অনুসারী হিসেবে আর্ত-মানবতার সেবার বিষয়টি মাথায় রেখে ঈদের দিনে সর্বপ্রথম সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। তবে রমজানের শেষ ১০ দিনের যেকোনো দিনও সদকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে।
এদিনের দ্বিতীয় আমল হচ্ছে, ঈদগাহে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) গুরুত্বসহকারে দুই ঈদের নামাজ আদায় করতেন। তবে এ নামাজের জন্য আজান দিতেন না। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজের জন্য আজান দিতেন না।’ (মুসলিম: হাদিস নম্বর-৮৮৭।)
ঈদগাহে ঈদের নামাজ ছাড়া অন্য কোনো নামাজ না পড়া। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বেলাল (রা.)-কে নিয়ে ঈদগাহে গেলেন। তার পর ঈদের দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। তিনি (রাসুলুল্লাহ সা.) ঈদগাহে ঈদের নামাজের আগে ও পরে আর কোনো নামাজ আদায় করেননি।’ (মুসলিম: হাদিস নম্বর-৮৮৪।)
আবু হুরায়রা (রা.)-এর সঙ্গী আবু আয়েশা (রহ.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘সাঈদ ইবনুল আস (রা.) একবার আবু মুসা আশয়ারি এবং হুজাইফা বিন ইয়ামেন (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের নামাজে কীভাবে তাকবির বলতেন? আবু মুসা আশয়ারি (রা.) বললেন, তিনি জানাজার নামাজের তাকবিরের মতো প্রতি রাকাতে চার তাকবির বলতেন। (অর্থাৎ প্রথম রাকাতে তাকবিরে তাহরিমাসহ অতিরিক্ত তিন তাকবির এবং দ্বিতীয় রাকাতে অতিরিক্ত তিন তাকবির ও রুকুর তাকবির)। এটা শুনে হুজায়ফা বিন ইয়ামেন (রা.) বললেন, আবু মুসা আশয়ারি (রা.) সত্য বলেছেন।’ (আবু দাউদ: হাদিস নম্বর-১১৫৩, ১১৫৫; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নম্বর-১৯৭৩৪)। ঈদের নামাজের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ হাদিসে অতিরিক্ত ৬ তাকবির, ৯ তাকবির এবং ১২ তাকবিরের বর্ণনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নামাজের মতো যেকোনো একটি মাজহাবের মতামত অনুসরণ করে ঈদের নামাজ আদায় করতে হবে।
হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিন বিশেষ ডোরাকাটা পোশাক পরতেন। জাফর ইবনে মুহাম্মাদ তার পিতা থেকে, তার পিতা তার দাদা থেকে বর্ণনা করে বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি ঈদে ডোরাকাটা পোশাক পরিধান করতেন।’ (বাইহাকি: হাদিস নম্বর-৬৩৬৩)। তবে পুরুষরা নারীদের মতো এবং নারীরা পুরুষের মতো পোশাক পরিধান করতে নিষেধ করেছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যে পুরুষ নারীর মতো এবং যে নারী পুরুষের মতো পোশাক পরে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের উভয়কে অভিসম্পাত করেছেন।’ (আবু দাউদ: হাদিস নম্বর-৪০৯৮)
ঈদুল ফিতরের দিনকে আনন্দ-ফুর্তির দিন হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং এসব দিনে শরিয়তের সীমারেখায় বৈধ আনন্দ-ফুর্তি ও বিনোদন করার অনুমতি দিয়েছেন।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার ঘরে এলেন, তখন আমার কাছে দুটি মেয়ে বুআস যুদ্ধসংক্রান্ত কবিতা আবৃত্তি করছিল। তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন এবং চেহারা অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখলেন। এ সময় আবু বকর (রা.) এলেন, তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, শয়তানি বাদ্যযন্ত্র (দফ) বাজানো হচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, তাদের ছেড়ে দাও। তারপর তিনি যখন অন্যদিকে ফিরলেন, তখন আমি তাদের ইঙ্গিত করলাম এবং তারা বের হয়ে গেল।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আবু বকর! প্রত্যেক জাতির আনন্দের দিন রয়েছে। আর আজ আমাদের আনন্দের দিন। (বুখারি: হাদিস নম্বর-৯৪৯।)
আয়েশা (রা.) থেকে আরও বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন আবিসিনিয়ার কিছু লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে (আয়েশার কক্ষের পাশে) খেলাধুলা করছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে ডেকে বললেন, আয়েশা! তুমি কী দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি আমাকে তাঁর পেছনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি আমার গাল তাঁর গালের ওপর রাখলাম। তিনি তাদের উৎসাহ দিয়ে বললেন, হে বনি আরফেদা! তোমরা শক্ত করে ধরো। এরপর আমি যখন ক্লান্ত হয়ে গেলাম, তখন তিনি বললেন, তোমার দেখা হয়েছে তো? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, তাহলে এবার যাও।’ (বুখারি: হাদিস নম্বর-৯৫০।)
আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় আগমন করে দেখলেন ইহুদিরা দুটি দিন খেলাধুলা ও আনন্দ-ফুর্তি করে। তখন তিনি বললেন, আল্লাহতায়ালা তোমাদের জন্য (খেলাধুলা ও আনন্দ-ফুর্তি করার জন্য) এর চেয়েও উত্তম দুটি দিন নির্ধারণ করেছেন, তা হলো- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন। (নাসায়ি: হাদিস নম্বর-১৫৫৭।)
এ ছাড়া ঈদের দিন ও রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বেশ কিছু আমল করতেন।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ইসলাম, খবরের কাগজ