মিথ্যা অপবাদে আজ আমাদের সমাজ রোগাক্রান্ত। সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তারের পর এই চিত্র মহামারির আকার ধারণ করেছে। রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক—কেউই বাদ যাচ্ছেন না একদল নোংরা মস্তিষ্কের মানুষের চিন্তা থেকে আসা এই অপবাদের হাত থেকে। মুমিনদের উচিত যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো খবর থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তা হলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো কওমকে আক্রমণ করে বসবে। ফলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত ৬)
ইসলামি আইনশাস্ত্রে মান-সম্মান রক্ষা করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা শরিয়তের পঞ্চ মৌলিক উদ্দেশ্যের (মাকাসিদ আল-শরিয়াহ) অন্যতম হিসেবে ‘হিফজ আল-ইর্দ’ বা ‘সম্মান সংরক্ষণ’ নামে পরিচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে মুসলিমদের রক্ত, সম্পদ ও ইজ্জত-আব্রুকে মক্কা ও আরাফার দিনের মতোই সম্মানিত ও সংরক্ষিত ঘোষণা করেছেন। এটি স্পষ্ট করে যে, শারীরিক বা আর্থিক ক্ষতির মতোই সম্মানহানি ইসলামের দৃষ্টিতে চরম গুরুতর অপরাধ।
ইসলামি সমাজে জিহ্বার মাধ্যমে সংঘটিত পাপগুলো কঠোরভাবে শ্রেণিবদ্ধ। এর মধ্যে গিবত (পরনিন্দা), বুহতান (সাধারণ মিথ্যা অপবাদ) এবং আইনগতভাবে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হলো কাযফ। কাযফ হলো সতী-সাধ্বী বা সচ্চরিত্র ব্যক্তির প্রতি ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা। এটি বুহতানের চেয়েও মারাত্মক এবং সর্বসম্মতভাবে একটি কবিরা গুনাহ বা মহাপাপ হিসেবে গণ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) কাযফকে সাতটি ধ্বংসকারী কাজের (সাবউল মুবিক্বাত) মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
ইহকালীন শাস্তি: কাযফের অপরাধ একই সঙ্গে আল্লাহর হক এবং বান্দার হক উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। সমাজের পবিত্রতা ও ব্যক্তির সম্মান রক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে, কোরআনুল কারিমে এই অপরাধের জন্য ইহকালীন শাস্তির তিনটি সুনির্দিষ্ট বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর যারা সচ্চরিত্রা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তার পর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করো এবং তোমরা কখনই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক।’ (সুরা নুর, আয়াত ৪) এই আয়াতে বর্ণিত তিনটি ইহকালীন শাস্তি হলো: ১—৮০টি বেত্রাঘাত (শারীরিক শাস্তি), ২—সাক্ষ্য চিরদিনের জন্য অগ্রহণযোগ্যতা (স্থায়ী আইনি দণ্ড) এবং ৩—ফাসেক বা সত্যত্যাগী হিসেবে ঘোষণা (নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দণ্ড)। এই কঠোর ব্যবস্থা সমাজে বিনা প্রমাণে বা সন্দেহের বশে অভিযোগ উত্থাপনের পথ রুদ্ধ করে দেয়।
কাযফের শাস্তি প্রয়োগের জন্য অপবাদ আরোপিত ব্যক্তিকে অবশ্যই জ্ঞানসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক, মুক্ত এবং সচ্চরিত্র ‘মুহসান’ হতে হবে। অপবাদকারীকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি পেতে হলে ব্যভিচারের সত্যতা প্রমাণের জন্য চারজন চাক্ষুষ সাক্ষী আদালতে উপস্থিত করতে হবে। এই চারজন সাক্ষীর মধ্যে সামান্যতম অসঙ্গতি থাকলেই সাক্ষীরা নিজেরাই কাযফের শাস্তি লাভ করবেন।
সুরা নুর-এর ৫ নম্বর আয়াতে কাযফকারীকে তওবার মাধ্যমে ক্ষমালাভের সুযোগ দিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কিন্তু যারা এর পর তওবা করে এবং নিজেদের কার্য সংশোধন করে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
কাযফের শারীরিক শাস্তি (আশিটি বেত্রাঘাত) তওবার মাধ্যমে মওকুফ হয় না, এই বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে। কারণ এটি বান্দার অধিকার (সম্মানহানি) এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার প্রতীক।
পরকালীন শাস্তি: কাযফকারীকে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা সতী-সাধ্বী, সরলমনা ও ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।’ (সুরা নুর, আয়াত ২৩)
এ ছাড়াও, গুজব রটনা প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা অপবাদের মূল হোতাদের জন্য মহাশাস্তির ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘তাদের প্রত্যেকের জন্য আছে প্রতিফল- যতটুকু পাপ সে করেছে। আর এ ব্যাপারে যে নেতৃত্ব দিয়েছে তার জন্য আছে মহাশাস্তি।’ (সুরা নুর, আয়াত ১১)
আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার বিস্তৃতি যারা কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি দুনিয়া ও আখেরাতে।’ (সুরা নুর, আয়াত ১৯)।
ব্যভিচারের অপবাদ ছাড়াও, যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে সাধারণ মিথ্যা অপবাদ বা অন্য কোনোভাবে কষ্ট দেয়, আল্লাহতায়ালা তাদের সম্পর্কে বলেন: ‘তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহযাব, আয়াত ৫৮)। এই কঠোর বিধানসমূহ স্পষ্ট করে, মিথ্যা অপবাদ বা কাযফ ইসলামি সমাজে এক জঘন্যতম অপরাধ।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক