ইসলামকে বলা হয় জ্ঞানচর্চার ধর্ম। মানুষ অন্যান্য সৃষ্টি থেকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে রয়েছে তার জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেচনাবোধের বিচারে। ইসলাম মানুষের এই জ্ঞানকে শানিত করার জন্য, জ্ঞানের প্রদীপালোকে আলোকিত হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ পথনির্দেশ করেছে। পবিত্র কোরআনের প্রথম নাজিল করা আয়াত এসেছে পড়ার নির্দেশ নিয়ে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি (সবকিছু) সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক: ১) এখান থেকেই অনুমিত হয় ইসলামে জ্ঞানচর্চার অবস্থান অনেক মর্যাদাময়। জ্ঞান অর্জনকে ইসলাম ফরজও ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ফরজ।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৪)
শুধু কিছু ফিকহি বিধান জানাকে ইসলাম ফরজ করেনি। ইসলাম সব ধরনের উপকারী জ্ঞানের চর্চাকে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। আর জ্ঞানচর্চার জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার। যুগ যুগ ধরে সব উন্নত সভ্যতায় লাইব্রেরির অবস্থান অনেক ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে। কোনো বিজ্ঞজন এটাকে অস্বীকার করবেন না। ইসলামি স্বর্ণযুগে বাগদাদে অবস্থিত বায়তুল হিকমাহর কথাও আমরা বিবেচনা করতে পারি।
মুসলিমদের জন্য মসজিদ হলো জ্ঞানচর্চার সূতিকাগার। সমাজের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মুসলিম সমাজব্যবস্থায় মসজিদকেন্দ্রিক পরিচালিত হয়ে থাকে। মহানবি (সা.) ছিলেন মসজিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মদিনায় হিজরত করে মসজিদে নববি প্রতিষ্ঠা করে এখান থেকেই সব কার্যা পরিচালনা করতেন। জ্ঞানচর্চায়ও মসজিদের ভূমিকা অপরিসীম। বিভিন্ন মুসলিম সভ্যতায়ও আমরা এর নিদর্শন পেয়ে থাকি। আর বাংলাদেশে এর গুরুত্ব আরও বেশি।
বাংলাদেশে মসজিদভিত্তিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা: বিশ্বের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ উন্নত কোনো রাষ্ট্র নয়। জ্ঞান, বিজ্ঞানের প্রতি অবহেলা এই জাতিকে পিছিয়ে রেখেছে। নব্বই শতাংশের অধিক মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র হওয়ার পরও দেশের যাবতীয় ক্ষমতায়ন সেকুলারপন্থি। এর অন্যতম কারণ মুসলিমদের সঠিক জ্ঞানের অভাব। এজন্য মুসলিমদের মধ্যে এত বিভাজন ও অনৈক্য। নারীদের কথা বিবেচনা করলে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলের নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে ৬৪ জেলায় মসজিদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ। এর মধ্যে কিছু বড় বড় মসজিদে লাইব্রেরি কার্যক্রম রয়েছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ ছাড়া রয়েছে সঠিক পরিচালনার অভাব। এত অধিকসংখ্যক মসজিদ থেকে যদি জাতি সঠিক জ্ঞানের সন্ধান পায়, তবে এই ঘাটতি কিছুটা লাঘব হবে। জাতি হিসেবে আমরাও শির উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।
লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগ: বাংলাদেশে মসজিদভিত্তিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষত সচেতন ও বিজ্ঞ জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি মসজিদের পাশের কিছু মানুষকে একত্রিত হয়ে করণীয় কিছু বিষয় ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো।
সঠিক নিয়ত: কাজের আগে সঠিক নিয়ত থাকা আবশ্যক। কাজের আগে উপযুক্ত ও কার্যকর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ঠিক করা এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করা আসল কাজের অর্ধেক। এটা না হলে কাজ হয়ে গেলেও তা একসময় ঝিমিয়ে পড়বে বা সঠিক ফলাফল দেবে না। আর মুসলিম হিসেবে আমাদের কাজের প্রতিদান তো নিয়ত হিসেবেই পেয়ে থাকব। রাসুল (সা.) তো বলেছেন, ‘বান্দার সব কাজই তার নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১) এজন্য আগেই সঠিক নিয়ত ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
মসজিদ কমিটি এবং মুসল্লিদের সঙ্গে পরামর্শ: সচেতন জনগণ যদি মসজিদ কমিটি থেকে উঠে আসে, তাহলে অবশ্যই কাজ বেশি সহজ হবে। কিন্তু তা না হলে মসজিদ কমিটি এবং মুসল্লিদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করতে হবে। তাদের এর উপকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করাতে হবে। আশা করা যায় সঠিকভাবে উপস্থাপন ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে পজিটিভ সাড়া আসবে।
একটি গঠনতন্ত্র প্রস্তুত করা: এবার পরামর্শক্রমে একটি লাইব্রেরি পরিচালনার গঠনতন্ত্র এবং একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করতে হবে। এটি লাইব্রেরিকে প্রাতিষ্ঠানিকতা দেবে। লাইব্রেরির অধীনে করা সব কাজ গোছালোভাবে অন্যদের সামনে তুলে ধরা যাবে।
লাইব্রেরি গঠন ও পরিচালনা: প্রাথমিক কাজ শেষ হলেই এবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসবে। সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তা পরিচালনা করতে হবে। নিম্নে তারও কিছু প্রস্তাবনা বা ধাপ তুলে ধরছি।
ফান্ড কালেকশন: কাজের শুরুতে ফান্ডের দিকে মনোযোগ দিতেই হবে। তা কীভাবে সংগ্রহ করতে হবে তা ঠিক করে নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা মুসল্লিদের থেকে চাঁদা, মসজিদ ফান্ড থেকে গ্রহণ, সমাজের ধনী মানুষদের থেকে গ্রহণ ইত্যাদি করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন সংস্থা থাকে যারা এগুলোতে ফান্ডিং করে থাকে, তাদের কাছে অ্যাপ্লাই করা। এর মধ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনও রয়েছে। এভাবে করেই প্রাথমিক ফান্ড গঠন করা যাবে। সতর্কতা হলো, সমাজের গরিবদের কাছে বা রাস্তা আটকিয়ে এই চাঁদা কালেকশন থেকে বিরত থাকতে হবে। এটা শুরুতেই লাইব্রেরির ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট করবে।
বই সংগ্রহ: ফান্ড কালেকশনের পরে বই সংগ্রহের পালা। অবশ্য বই রাখা এবং পড়ার জন্য জায়গা নির্দিষ্ট করে নিতে হবে। এবার কোন ধরনের বা কোন ক্যাটাগরির বই সংগ্রহ করতে হবে তা স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিভিন্ন হতে পারে। তবুও কোরআন, হাদিস, সিরাত, আধুনিক ফিকহ, ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি, আত্মোন্নয়নমূলক, বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, শিশুতোষ ইত্যাদি ক্যাটাগরির বই রাখা যাবে।
কার্যকর প্রচারণা: এবার প্রচারণা বা দাওয়াতি কাজ আঞ্জাম দিতে হবে। অনলাইন, স্থানীয় গণমাধ্যম, মসজিদের খুতবা, স্থানীয় বাজার, বিভিন্ন জায়গায় চিঠি প্রদান, পোস্টারিং ইত্যাদির মাধ্যমে প্রচারণা করতে হবে। সঠিকভাবে প্রচারণা করতে পারলে পাঠক, দাতা উভয়ই বাড়বে।
আরামদায়ক পড়ার স্থান: বই পড়ার জন্য উপযুক্ত জায়গারও প্রয়োজন হয়। তবে এটা সাধ্যের অনুগত। মসজিদ আঙিনায় আলাদা জায়গার ব্যবস্থা হলে তো ভালোই হয়। সেখানে চেয়ার, টেবিলেরও ব্যবস্থা করা যাবে। তবে এটা না হলে মসজিদ ফ্লোরেই যথেষ্ট।
বই বিতরণের ব্যবস্থা: অনেকের জন্য মসজিদে বসে পড়ার সময় বা সুযোগ না হতে পারে। তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে বই বাসায় নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। লাইব্রেরির গঠনতন্ত্রে সদস্য হওয়ার নিয়মও রাখা যেতে পারে। তাহলে সদস্যদের মধ্যে বই বিতরণ বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে।
যথাসময়ে বই ফেরত: এই ব্যবস্থাতে কিছু কড়াকড়ি জরুরি। বই নিয়ে ফেরত না দেওয়া বা দিতে গড়িমসি করা অনেক মানুষের স্বভাব। যদি বই সময়মতো ফেরত না আসে, তবে লাইব্রেরি বন্ধও হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে গঠনতন্ত্রে একটা নিয়ম রাখা যেতে পারে যে, বই ফেরত দিতে দেরি হলে ৫ কিংবা ১০ টাকা লাইব্রেরি ফান্ডে জরিমানাস্বরূপ দিতে হবে।
লাইব্রেরি কেন্দ্রিক আরও সৃজনশীল উদ্যোগ: লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার পর এর অধীনে আরও এমন কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে যাতে মানুষ বেশি বেশি লাইব্রেকেন্দ্রীক হয়। যেমন- নির্ধারিত বই পাঠ প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা। এটা শিশু-কিশোর, যুবক, নারী, বয়স্ক সব ক্যাটাগরিতে আলাদাভাবে আয়োজন করা যায়। এর মাধ্যমে খুব ভালো সাড়া পড়বে। এ ছাড়া নির্ধারিত বইয়ের ওপর মাসিক আলোচনা চক্র করা যেতে পারে।
সামগ্রিক উন্নতি, অগ্রগতির জন্য জাতিকে বইমুখী করার বিকল্প নেই। আর এজন্য মসজিদভিত্তিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগ হতে পারে সমাজ পরিবর্তন বা সংস্কারের হাতিয়ার।
লেখক: শিক্ষার্থী,
আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া