প্রকৃতির নানা দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হিসেবে গণ্য করা হয় ভূমিকম্পকে। কারণ, অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের (যেমন—ঘূর্ণিঝড়, বন্যা) পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও ভূমিকম্প আসে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে। মুহূর্তের মধ্যে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়ে যায় এই নীরব ঘাতক। ব্যাপক প্রাণহানি ও জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি এ কারণেই হয় যে, এর কোনো আগাম প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয় না। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক ঘটনাটি কেবল ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য এক কঠোর সতর্কবার্তা।
পবিত্র কোরআনে ভূমিকম্প বোঝাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, ১. যিলযাল এর অর্থ হলো—একটি বস্তুর নড়াচড়ায় আরেকটি বস্তু নড়ে ওঠা (ভূমিকম্পের সাধারণ ঝাঁকুনি)। ২. দাক্কা এর অর্থ হলো—প্রচণ্ড শব্দ বা আওয়াজের কারণে কোনো কিছু নড়ে ওঠা বা ঝাঁকুনি খাওয়া (মহাপ্রলয়ের তীব্রতা)। আল্লাহতায়ালা মানুষকে সতর্ক করে পবিত্র কোরআনে প্রশ্ন করেছেন, ‘জনপদের অধিবাসীরা কি এতই নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আমার আজাব (নিঝুম) রাত তাদের কাছে আসবে না, তারা (গভীর) ঘুমে (বিভোর হয়ে) থাকবে!’ (সুরা আরাফ, ৯৭)
ইসলামি শিক্ষা মতে, বর্তমান সময়ে যেসব ভূমিকম্প হচ্ছে, তা মূলত মানুষের পাপ ও অপরাধের ফল। আল্লাহ্ তাআলা বান্দাকে সতর্ক করার জন্য এই নিদর্শনগুলো পাঠান। কোরআনে পরিষ্কার বলা হয়েছে, ‘যে বিপদ-আপদই তোমাদের ওপর আসুক না কেন, তা হচ্ছে তোমাদের নিজেদের হাতের কামাই। আর আল্লাহ তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা শুরা, ৩০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ভূমিকম্প বৃদ্ধির কারণ উল্লেখ করে গেছেন, যা আজকের সমাজের প্রতিচ্ছবি-
অনৈতিকতার সয়লাব: নবিজি (সা.) বলেছেন, যখন সমাজে গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের প্রকাশ ঘটবে এবং মদপানের সয়লাব হবে, তখন এই উম্মত ভূমিকম্প, ভূমিধস ও পাথর বর্ষণের মুখোমুখি হবে। (তিরমিজি, ২২১২)
নৈতিক স্খলন: অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বিস্তারিত কারণ উল্লেখ করেছেন। যখন অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জিত হবে, আমানত আত্মসাৎ করা হবে, জাকাতকে জরিমানা মনে করা হবে, ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া বিদ্যা অর্জন করা হবে, এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাড়বে (যেমন—পুরুষের স্ত্রীর বাধ্যগত হয়ে মায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা, বন্ধুকে কাছে টেনে পিতাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া), তখন যেন মানুষ 'রক্তিম ঝড়ের, ভূকম্পনের, ভূমিধসের... এবং সুতো ছেঁড়া দানার ন্যায় একটির পর একটি নিদর্শনগুলোর' অপেক্ষা করে। (তিরমিজি, ১৪৪৭)
ভূমিকম্পকে কিয়ামতের অন্যতম আলামত হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিয়ামত যত নিকটবর্তী হবে, ভূমিকম্পের পরিমাণ ততই বাড়তে থাকবে।
মহাপ্রলয়ের দিনে এর ভয়াবহতা কেমন হবে, সে সম্পর্কে আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন, ‘হে মানব জাতি, তোমরা ভয় করো তোমাদের রবকে। নিশ্চয়ই কেয়ামত দিবসের ভূকম্পন হবে মারাত্মক ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, স্তন্যপায়ী মা তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানের কথা ভুলে যাবে আর সব গর্ভবতীর গর্ভপাত হয়ে যাবে...।’ (সুরা হজ, ১-২)
যেহেতু ভূমিকম্প আল্লাহর পক্ষ থেকে এক সতর্কবার্তা, তাই এমন দুর্ঘটনার সময় মুমিনের করণীয় হলো: ১. দ্রুত মহান আল্লাহর কাছে নিজেদের পাপের জন্য তাওবা করা এবং ক্ষমা চাওয়া। ২. বেশি বেশি আল্লাহু আকবার, সুবহানাল্লাহ ও অন্যান্য জিকির করা। ৩. আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা ও আশ্রয় চাওয়া। ৪.অগ্নিকাণ্ড বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আল্লাহু আকবার বলা সুন্নাহ। আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণার মাধ্যমে আগুনের (বা শয়তানের) প্রতাপ কমে যায়।
ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের জীবন ও জগতের ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহর হাতে। তাই এই সতর্কবার্তাকে আমলে নিয়ে আমাদের উচিত নিজেদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন থেকে পাপ ও অন্যায় দূর করা এবং আল্লাহর দিকে দ্রুত প্রত্যাবর্তন করা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক