জীবনের প্রতিটি মোড়ে আমরা কিছু না কিছুর জন্য অপেক্ষা করি। কেউ করে কাঙ্ক্ষিত মানুষটার জন্য, পরীক্ষার ফলাফল, কেউ সাফল্যের, কেউ আবার কোনো অজানা শুভক্ষণের। অপেক্ষার ভেতরেই মানুষ বড় হয়, ধৈর্যের মূলগুলো শক্ত হয়। যেমন-একটি বীজকে অঙ্কুরিত হতে সময় লাগে, তেমনি মানুষের ইচ্ছা, স্বপ্ন আর দোয়াও পরিপূর্ণ হয় উত্তম সময়ে। আমাদের পরিকল্পনার বাইরে আমাদেরকে ঘিরে আমাদের রবের পরিকল্পনা থাকে। তার ভেতর উপলব্ধি আসে, অবশ্যই আমার রবের পরিকল্পনাই সর্বোত্তম পরিকল্পনা।
মানুষের কাজ হলো প্রচেষ্টা চালানো এবং দোয়া করা, আর ফলাফলের জন্য শান্ত মনে অপেক্ষা করা। আল্লাহতায়ালা আমাদের সেই প্রচেষ্টার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করেন। ইমাম গাজালি বলেছেন—‘ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করা ঈমানের অর্ধেক।’ কারণ যে অপেক্ষা করে, সে ভরসা করে। আর যে ভরসা করে, সে ব্যর্থ হয় না।
নবিদের জীবনে ইন্তেজার উদাহরণ: আমরা দেখি, আল্লাহর প্রিয় নবিরা কীভাবে ইন্তেজার করেছেন। ইউসুফ (আ.) ছোটবেলায় ভাইদের দ্বারা কূপে ফেলা হলেন, তারপর দাসত্ব, জেল— এই দীর্ঘ সময় তিনি অপেক্ষা করলেন আল্লাহর সাহায্যের জন্য। অবশেষে তিনি মিসরের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ইয়াকুব (আ.) প্রিয় সন্তান ইউসুফকে হারিয়ে দীর্ঘ বছর কাঁদতে কাঁদতে চোখ হারিয়েছেন কিন্তু আশা হারাননি। বললেন, ‘আমি আমার দুঃখ ও কষ্ট আল্লাহর কাছেই প্রকাশ করছি।’ (সুরা ইউসুফ: ৮৬) মারইয়াম (আ.) সমাজের কঠিন দৃষ্টির সামনে তিনি ছিলেন একা, কিন্তু আল্লাহ তার পাশে ছিলেন। তার নীরবতা ছিল ধৈর্যের ভাষা। আসিয়া (ফিরআউনের স্ত্রী): কাফেরের মতো কঠিন এক স্বামী, তার অত্যাচার। তার পরও তিনি জান্নাতের এক প্রাসাদ চাইলেন ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করে।
নারীদের জন্য ইন্তেজার শিক্ষা: বর্তমান সমাজে মুসলিম নারীর জন্য ইন্তেজার একটি বড় পরীক্ষা। বিয়ে, সন্তান, জীবনের নিরাপত্তা, স্বামীর ভালোবাসা কিংবা সমাজের স্বীকৃতি—এসব চাওয়ার মাঝে যখন দেরি হয়, তখন একজন মুমিন নারী বুঝে নেয়, আল্লাহ দেরি করতে পারেন, কিন্তু ভুল করেন না। বর্তমান সমাজ আমাদের দ্রুত ফল চায়। অথচ দ্রুত পাওয়ার চেয়ে যে সম্পর্ক ধীরে ধীরে গড়ে, তা গভীর হয়। যে সফলতা ধৈর্য নিয়ে আসে, তা স্থায়ী হয়। আর যে সুখ অপেক্ষার পর পাওয়া যায়, তার স্বাদ সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়।
খাদিজা (রা.) নবুওতের বহু আগে পর্যন্ত নবিজি (সা.)-কে জানতেন না, কিন্তু একদিন তিনি হয়ে গেলেন ‘উম্মুল মুমিনীন’। ফাতিমা (রা.) কঠিন জীবনেও ধৈর্য হারাননি; জানতেন, এই দুনিয়ার সব কিছু ক্ষণস্থায়ী, অপেক্ষার জায়গা, চিরসুখের নয়। আল্লাহতায়ালা মাঝে মাঝে বান্দার পরীক্ষা নেয়, আমাদের মনোভাব, সহনশীলতা আর ধৈর্যের এবং উত্তম সময়েই সেটার প্রতিফলন ঘটান। কখনো হাসি, কখনো কান্না, কখনো প্রাপ্তি- আবার কখনো শূন্যতা। এই উত্থান-পতনের মাঝেই আল্লাহ আমাদের শিক্ষা দেন ‘ইন্তেজার’ ধৈর্যপূর্ণ অপেক্ষার শিক্ষা। বিশ্বাস রেখে সঠিক পথে অবিচল থাকা, যতক্ষণ না আল্লাহর ফয়সালা আসে। এই অপেক্ষা শুধু সময় পার করার বিষয় নয়, সময় যত দীর্ঘ হয় ফলাফল হয় অধিকতর উত্তম।
ইন্তেজার ও তাকওয়া: ইন্তেজার মানেই আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ ভরসা করে অপেক্ষা করা। যখন আমরা আমাদের দোয়ার উত্তর পাই না, তখন বুঝতে হবে—বরং আল্লাহ তাকে সঠিক মুহূর্তে সঠিক জায়গায় পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুত করছেন। অনেক সময় দেরিই মানুষের জন্য রহমত হয়ে দেখা দেয়। আমরা যা চাই, তার চেয়েও ভালো কিছু হয়তো আল্লাহ আমাদের জন্য রেখে দিয়েছেন- যা আমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সবর করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আনফাল, ৪৬)।
ইন্তেজার আমাদের শেখায়—আশা হারাতে নেই। আল্লাহ কখনোই তাঁর বান্দাকে নিরাশ করেন না। ইন্তেজার করতে জানা মানে নিজেকে সময় দেওয়া, জীবনকে সময় দেওয়া, আল্লাহকে সময় দেওয়া। যে ইন্তেজার করে—সে হেরে যায় না। কারণ অপেক্ষার প্রতিটি দিন তাকে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে প্রাপ্তি শুধু পুরস্কার নয়—বরং পরিপূর্ণতা পেয়ে আসে।
লেখক: শিক্ষার্থী
আনন্দমোহন কলেজ, ময়মনসিংহ