মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো সময়। সময় রহস্যের অতলে লুকিয়ে আছে মুমিনের ভাঙ্গা-গড়ার অনেক ইতিহাস, মুহূর্তের জন্যও সে থেমে থাকে না। কারও জন্যই তার অপেক্ষা নেই। শুধু রবের রহমের যথাযথ কদর করে চলে। একমাত্র সময়ের সদ্ব্যবহারেই সংক্ষিপ্ত এই জীবনে চিরস্মরণীয় এবং আখেরাতের জীবনে অনন্য পাথেয় হাতে পারে। জগতে এমন কোনো মনীষী খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি বড় হয়েছেন অথচ সময়ের সদ্ব্যবহার করেননি। ইয়াহইয়া ইবনে হুবায়রা বলেন, যা কিছু সংরক্ষণে তুমি সচেষ্ট হতে পার, তার মধ্যে সময় হচ্ছে সবচেয়ে মূল্যবান। অথচ দেখছি তা-ই সবচেয়ে সহজে তোমার কাছে বরবাদ হচ্ছে।
বস্তুত সময় হলো আল্লাহ প্রদত্ত অন্যতম মৌলিক নিয়ামত। এজন্যই আল্লাহতায়ালা সময়ের শপথ করে বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত ও ত্রুটিযুক্ত হলো মানুষ, সময়ের মধ্যে কোনো খুঁত বা ত্রুটি নেই। হাদিসের ভাষা তো আরও স্পষ্ট ও উজ্জ্বল।
অনন্য হাদিসগ্রন্থ বুখারিতে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে বহু মানুষ প্রতারিত- সুস্থতা ও অবকাশ। সুতরাং যে এ নিয়ামতকে কাজে লাগাতে পারে, তা তার জন্য মঙ্গলজনক ও কল্যাণকর হবে। পক্ষান্তরে যে সময় হাতছাড়া হয়ে যাবে, তার আর কিছুতেই নাগাল পাওয়া যাবে না।
কেউ সময়ের ব্যাপারে উদাসীন থাকলেও সময় তার জন্য থেমে থাকবে না। আর এটাই তো স্বাভাবিক যে, গতকালটিকে তুমি কিছুতেই আজকের দিনে ফিরে পাবে না! ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন, দীর্ঘদিন আমি সুফী- সাধকদের সংস্পর্শে থেকেছি। এ সময় তাদের থেকে শুধু দুটি বিষয়ই অর্জন করতে পেরেছি। সময় হলো তরবারি; তুমি তাকে না কাটলে সেই তোমাকে কেটে ফেলবে। তুমি যদি সময়কে সত্য ও ন্যায় কাজে ব্যস্ত না রাখো, তা হলে সে তোমাকে অসৎ ও অন্যায় কাজে লিপ্ত করবে। (সময়ের মূল্য বুঝতেন যাঁরা; পৃষ্ঠা ৩৪)
তাই আমাদের পূর্বসূরিগণ সময় সংরক্ষণে অত্যন্ত আগ্রহী বরং মরণপণ চেষ্টায় রত ছিলেন। এক্ষেত্রে আলেম আবেদের মাঝে কোনো পার্থক্য ছিল না। প্রতিটি ঘণ্টা ও মিনিট সংরক্ষণে তারা প্রতিযোগিতামূলক কাজ করে যেতেন- যেন একটি মুহূর্তও অনর্থক হাতছাড়া না হয়ে যায়। প্রসিদ্ধ সাহাবি হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমার সবচেয়ে বেশি পরিতাপ হয় এমন দিনের জন্য, যে দিনের সূর্য ডুবে গেল। আমার দুনিয়ার হায়াত কমে গেল। অথচ সেদিন আমার নেক আমল বৃদ্ধি পেল না।
সময়ের যথার্থ মূল্যায়নই মানবজীবনে সাফল্য অর্জনের সোপান। কাজের পরিমাণ বিবেচনা করে সময়কে ভাগ করে নিলে যথাসময়ে কাজটি সহজেই সম্পাদন করা যায়। সময়ের কাজ সময়ে না করে ফেলে রাখলে পরবর্তী সময়ে তা আর হয়ে ওঠে না। তাই পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল ব্যবহার ছাড়া সময়ের বরকত পাওয়া কখনো সম্ভব নয়। কেননা আল্লাহতায়ালা মানুষকে যা কিছু দান করেছেন, তার মাঝে সবচেয়ে দামি হলো সময়। তাই কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্ক ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় সময়কে অবহেলায় অনর্থক কাজে নষ্ট করা, অনিয়ন্ত্রিত ও নিষ্ফল জীবনযাপন করা।