স্বাধীনতার ৫৩ বছরে এই দেশে নারীর ক্ষমতায়ন ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়েছে। শিক্ষা, চাকরি বা উদ্যোক্তা হিসেবে তাদের অবস্থান হয়েছে সংহত। ফলে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পুরুষের সমান না হলেও এগিয়েছে অনেকখানি। আন্দোলন-সংগ্রামেও তাদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। সেই ভূমিকার ফল সাম্প্রতিক সময়ে আন্দোলনে আমরা দেখেছি।
হাইকোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে গত জুলাই মাসের গোড়ার দিকে প্রথমে শুরু হয় কোটাবিরোধী আন্দোলন। এরপর ধীরে ধীরে সে আন্দোলন সরকার পতনের এক দফায় এসে ঠেকে। এ ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যে গত ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে যেতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসন ইতি টানার জন্য হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। তখন একটি বিষয় ছিল আলাদাভাবে নজর কাড়ার মতো। সেটি হচ্ছে, আন্দোলনে বিপুলসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ। অসংখ্য নারী রাস্তায় নেমে পুরুষদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শেখ হাসিনাবিরোধী স্লোগান দিয়েছেন। এর আগে বাংলাদেশের আন্দোলনগুলোতে এত নারীর অংশগ্রহণ দেখা যায়নি।
আন্দোলনে নারীদের এই অংশগ্রহণের বিষয়টিকে সংবাদমাধ্যমে অভূতপূর্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন অনেক বিশ্লেষক। যারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের একজন ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা ফারজানা লিও। তিনি একজন পেশাদার বডি বিল্ডার। তিনি নিজে কাজীপাড়া ও শ্যাওড়াপাড়া এলাকায় রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন ও স্লোগান দিয়েছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ফারজানা লিও স্লোগান দিচ্ছেন- ‘এই মুহূর্তে দরকার, সেনাবাহিনীর সরকার’। তিনি মনে করেন, এই আন্দোলনের সঙ্গে নারীরা যদি একাত্ম না হতেন তাহলে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হতো না। নারীরা যখন ব্যাপক সংখ্যায় শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলনে জড়িয়ে যান তখন তাদের পক্ষে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না।
ফারজানা লিও কখনোই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন না। নিরাপত্তা বাহিনী যেভাবে বিক্ষোভকারী ছাত্রদের গুলি করে মেরেছে সেটি দেখে বেশ মর্মাহত হয়েছিলেন তিনি। এই বিষয়টি তাকে রাস্তায় টেনে এনেছে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করেছি যে রাস্তায় গিয়ে আন্দোলন করাটা আমার নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের ছেলেদের রক্ষা করতে হবে। এটা আমি ভেবেছিলাম।’
তিনি বলেন, ‘বহু নারী রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছে। আবার অনেকে বাড়িতে থেকেও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জুগিয়েছে। সন্তান যখন তার মায়ের দিক থেকে সাপোর্ট পায়, তখন কোনো কিছুই তাকে আটকাতে পারে না।’
জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এ আন্দোলনে সাড়ে ৬০০ মানুষ নিহত হয়েছে বলে জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, নিহতের সংখ্যা ৮০০-এর বেশি। মোট কতজন নিহত হয়েছেন তা এখনো অজানা। নিহতদের মধ্যে বিক্ষোভকারী ছাত্র, রাজনৈতিক দলের কর্মী, পথচারী, সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। অনেকে ঘরের ভেতরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন, যাদের মধ্যে শিশুরাও আছে।
ঢাকার পূর্বাচলে বসবাস করে ১৬ বয়সী রিদিমা। পড়াশোনা করে ঢাকার একটি সুপরিচিত ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। রিদিমার ভাইও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্র। সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা থাকবে কি না, সেটি নিয়ে তাদের কোনো ভাবনা ছিল না। কিন্তু পুলিশের গুলিতে যখন শিক্ষার্থীরা নিহত হচ্ছিলেন, রিদিমা ও তার ভাইও বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিল। এই বিক্ষোভে সন্তানদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন তাদের মা-বাবাও।
রাস্তায় গুলি খাওয়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও কেন তারা সপরিবারে বিক্ষোভে গিয়েছিলেন?
রিদিমার মা সায়মা আহমেদ বলেন, ‘মাতৃত্বটা আমাদের এগিয়ে নিয়ে গেছে। সন্তান যারই হোক না কেন, প্রত্যেকটা মা মনে করেন প্রতিটা সন্তানই তার সন্তান।’ সায়মা আহমেদ পেশায় একজন স্থপতি। তিনি আরও বলেন, ‘যখন আমরা দেখলাম যে ভয় পেয়ে তো লাভ নেই, আমাদের বাচ্চাদের তো আমরা বাঁচাতে পারছি না। তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিল। তারপরেও তাদের নির্যাতন করা হচ্ছে, মেরে ফেলা হচ্ছে নির্বিচারে। তখন তো আমাদের আর ভয় পেয়ে কোনো লাভ নেই। আমরা ঘরে থেকে কী করব।’
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক বুলবুল সিদ্দিকী বলেন, বহু নারী মিছিল কিংবা বিক্ষোভের সামনের সারিতে ছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল মিছিলে অংশ নেওয়া তাদের সহপাঠী কিংবা ভাইদের রক্ষা করা। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এখানে একটা ধারণা আছে, মিছিলে মেয়েরা সামনের সারিতে থাকলে তাদের ওপর পুলিশ হয়তো সেভাবে চড়াও হবে না। কিন্তু এই ধারণা এবার কাজে লাগেনি। নারীরাও আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু তারপরও তারা রাস্তা ছেড়ে যাননি।’
বুলবুল সিদ্দিকী বলেন, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ষাটের দশকে বিভিন্ন আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল। এ ছাড়া নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও নারীদের অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভিন্ন। শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ অতীতের সবকিছু ছাপিয়ে গেছে বলে মনে করেন সিদ্দিকী।
এই আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ করার আরেকটি কারণ আছে। সেটি হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন স্তব্ধ করার জন্য আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ নারীদের ওপর আক্রমণ করেছে। লাঠি দিয়ে ছাত্রীদের পেটানোর এসব ছবি যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে, তখন মানুষ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর এক মাস অতিবাহিত হলো। দেশের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। ৫ আগস্টের পরে রাজধানী ঢাকা এবং দেশের অন্য শহরগুলোতে শিক্ষার্থীরা নতুন বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছেন। দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকার মাধ্যমে নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরছেন শিক্ষার্থীরা। এসব গ্রাফিতির মাধ্যমে গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, বৈষম্যহীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার কথা বলা হচ্ছে।
ঢাকার মিরপুরে দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সালওয়া সারা। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি চাই আমাদের তরুণদের মতামতের গুরুত্ব দেবে সরকার। আমি একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চাই।’
আরেকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তানজিনা আফরিন বলেন, ‘আমি চাই জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের যাতে ভূমিকা থাকে। আমি যাকে ইচ্ছে ভোট দিতে পারব। এটাই আমার চাওয়া।’
এ আন্দোলনে আমরা নারী শিক্ষার্থী ছাড়াও মা, চাকরিজীবী, উদ্যোক্তাদেরও দেখেছি। নারী সাংবাদিকদের দেখেছি। সবার একটিই চাওয়া ছিল- যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। নারীরা সন্তান কোলে নিয়ে মিছিলে আসতে দেখেছি আমরা। তাদের চরম দুঃসময়ে সহায়তার হাত বাড়াতে দেখেছি, আহত হতে দেখেছি, শুশ্রূষা করতে দেখেছি। দেখেছি সন্তান কোলে মায়েদের পতাকা হাতে উল্লাস। এ এক অভাবনীয় দৃশ্য। এই আন্দোলন আমাদের জানিয়ে দিল, পুরুষের হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়াই যেন এ প্রজন্মের নারী এবং তাদের মায়েদের চাওয়া। তারা দেখিয়ে দিলেন, অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সুযোগ করে দিলে লক্ষ্য সহজে অর্জিত হয়। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির বন্ধন একসময় এসে মিলে যায় এক সুতোয়।