ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশের কূটনীতিতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উন্নয়নে যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা। ইতোমধ্যে ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ঢাকা চায়, কোনো একটি দল বা একজন ব্যক্তির সঙ্গে ভারত সম্পর্ক রাখবে না, দুই দেশের সম্পর্ক হবে ‘জনগণকেন্দ্রিক’। এটি এমন হতে হবে যে, মানুষও যেন মনে করে সম্পর্কটা ভালো। এদিকে বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে পাকিস্তানের।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই চীন নতুন সরকারকে সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া পশ্চিমাদের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক হৃদ্যতাপূর্ণ বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। নতুন সরকার রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
এ অবস্থায় ব্রাসেলসভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বাংলাদেশ ও মায়ানমারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক টমাস কেয়ান সম্প্রতি এ প্রসঙ্গে এক নিবন্ধে বলেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল মূলত নিজ সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার একটি হাতিয়ার। ভারতের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে শেখ হাসিনাকে নিয়ে চীনের হতাশা বাড়ছিল। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি নিজ অঞ্চলেও সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দিতে পারে ঢাকা।’
এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ করায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে যে ৫৭ বাংলাদেশিকে সাজা দেওয়া হয়েছিল, তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি সম্মান দেখিয়ে গত মঙ্গলবার তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
ঢাকা-দিল্লি টানাপড়েন
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংবাদিকদের বলেন, ভারতের সম্পর্ক ছিল মূলত একটি দল বা একজন ব্যক্তির সঙ্গে, বাংলাদেশের সঙ্গে নয়। দুই দেশের সম্পর্ক জনগণকেন্দ্রিক করতে হবে।
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ প্রসঙ্গে ভারতীয়রাও মুখ খুলতে শুরু করেছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ভারতের একজন সিনিয়র সাংবাদিক ফরাসি গণমাধ্যম ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরকে বলেন, ভারত বাংলাদেশের ওপর যত বিনিয়োগ করেছে তার চেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে শেখ হাসিনার ওপর। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নে বাধা নরেন্দ্র মোদির রাজনীতি।
গত ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা সাক্ষাৎ করতে গেলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাফ জানিয়ে দেন, ভারতে বসে যদি শেখ হাসিনা বিবৃতি দিতে থাকেন তাহলে সেটা ঢাকা-দিল্লি সুসম্পর্কে সহায়ক হবে না। হাইকমিশনার এই বার্তা দিল্লিতে পাঠাবেন বলে জানান।
তার পর যদিও শেখ হাসিনা বিবৃতি দেওয়া বন্ধ রেখেছেন কিন্তু না জানিয়ে বাঁধ খুলে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে বন্যা হওয়ায় সম্পর্কে আবার টানাপড়েন তৈরি হয়।
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর দেশটির গণমাধ্যম অব্যাহতভাবে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ‘সংবাদ’ প্রচার করে আসছিল। এসব সংবাদের প্রায় সবগুলোই ভুয়া বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসির ফ্যাক্ট চেকিংয়ে ধরা পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু যে ভারতের গণমাধ্যম এমন কল্পনাপ্রসূত সংবাদ প্রচার করছে তা নয়, শাসক দল বিজেপিও এমনটাই করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা হয়েছে। এগুলোকে ভারতের গণমাধ্যম ও ক্ষমতাসীনদের এক ধরনের প্রোপাগান্ডা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে ফোনালাপের প্রসঙ্গ তুলে মোদি এক্সে আরেকটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানেও তিনি দাবি করেছেন বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে বাইডেনের সঙ্গে তার কথা হয়েছে।
এ অবস্থায় ভারতীয় টিভি চ্যানেল নিউজ নাইনকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘বাবরি মসজিদের মতো কিছু বাংলাদেশে ঘটেনি। ভারতে যেমন বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছে, সেখানেও মুসলিমরা নিরাপদ নয়। আমাদের সৌভাগ্য যে বাংলাদেশে এ রকম কিছু ঘটেনি। আপনার প্রশ্নের জবাবে আমি বলব, আপনি ভারতের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ঘটনার প্রভাব লক্ষ্য করতে পারবেন, সেখানে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো সংগঠিত হয়। তবে আমাদের দেশে এর নজির নেই।’
যুক্তরাষ্ট্র-জাতিসংঘসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপড়েন লক্ষ্য করা গেলেও নবগঠিত অন্তর্বর্তী সরকারকে সার্বিকভাবে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো। এসব দেশ শেখ হাসিনার সরকারের আমলে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশকে নানাভাবে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এসব দেশ ও সংস্থা।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় গুলিতে নিহতদের তদন্তে সহযোগিতা করছে জাতিসংঘ। তাদের একটি দল কিছুদিন ঢাকায় অবস্থানও করেছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ৬৫০ জন নিহত হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে তারা।
চীনের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন মাত্রা
গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ভারত সফর করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার পর বেইজিং যান তিনি। তখন অবস্থা এমন হয়েছিল ভারত না বললে মনে হচ্ছিল শেখ হাসিনা চীনে যাবেন না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তখন অবস্থা আসলে তেমনই দাঁড়িয়েছিল। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর নিয়ে দিল্লির আপত্তি নেই।
এ অবস্থায় শেখ হাসিনা বেইজিং সফরে গিয়ে তেমন কোনো সহযোগিতা পাননি। ২০ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ প্রস্তাব দেওয়ার বিপরীতে মিলেছিল শুধু প্রতিশ্রুতি। উপরন্তু বেইজিং সফর সংক্ষিপ্ত করে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল। এর কারণ ছিল বহুবিধ। তার মধ্যে একটি হলো নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার পর চীনকে তিস্তা প্রকল্পের কাজ না দিয়ে দিল্লিকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত।
এমন পটভূমিতে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ছুটে গিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। এ ছাড়া অতি দ্রুত চীন জানায়, তারা নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চায়। ভারতের পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণে সৃষ্ট বন্যার কারণে প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে ২০ হাজার ডলারও দিয়েছে দেশটি।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, এ অবস্থায় নতুন করে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আশাবাদী হচ্ছে বেইজিং। শেখ হাসিনার আমলে এই প্রকল্পে বেইজিংয়ের সম্পৃক্ত হওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন প্রকল্পটি চীনকে দিয়ে বাস্তবায়নের কথা বললেও শেখ হাসিনা ৭ জানুয়ারির নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার পর ভারতকে দিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আমিরাতে সাজাপ্রাপ্ত সেই ৫৭ বাংলাদেশি পেলেন ক্ষমা
কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ করায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে যে ৫৭ বাংলাদেশিকে সাজা দেওয়া হয়েছিল, তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। এই বাংলাদেশিদের কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এ জন্য আরব-আমিরাতের প্রেসিডেন্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
গত জুলাইয়ে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে বাংলাদেশ যখন বিক্ষোভে উত্তাল, সে সময় তাতে সংহতি জানিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস্তায় বিক্ষোভে নেমেছিলেন বাংলাদেশিরা। ২০ জুলাই দুবাই, শারজাহ ও আজমানের বিভিন্ন এলাকার সড়কে বিক্ষোভের সময় ৫৭ বাংলাদেশিকে আটক করে আমিরাতের পুলিশ। দুই দিন পর দাঙ্গা, যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং সম্পদ বিনষ্টের অভিযোগে তাদের মধ্যে তিনজনকে যাবজ্জীবন, একজনকে ১১ বছর এবং বাকি ৫৩ জনকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেন স্থানীয় আদালত। এর পর বাংলাদেশিদের জন্য ভিসাসুবিধা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করার ঘোষণা দেয় আমিরাত সরকার। পরে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতায় তারা মুক্তি পেলেন।
সম্পর্কোন্নয়নে পাকিস্তানের আগ্রহ
শেখ হাসিনার আমলে অতিমাত্রায় নয়াদিল্লির দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে ঢাকার সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক ছিল তলানিতে। কিন্তু শেখ হাসিনার পতনের পর পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের আগ্রহ দেখাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একাধিকবার এমন আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে সম্প্রতি বলেন, ‘শেখ মুজিব তার কর্মের ফল ইতোমধ্যে পেয়েছেন।’ তার এই বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগ গণমাধ্যমে পাঠানো একটি প্রতিবাদে এর নিন্দা জানিয়েছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করে ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার আহমদ মারুফ জানান, সম্প্রতি পাকিস্তান নতুন ভিসানীতি করেছে। সেখানে বাংলাদেশসহ ১২৬টি দেশের নাগরিকরা ভিসা ফি ছাড়াই পাকিস্তান যেতে পারবেন। এ ছাড়া ঢাকা-ইসলামাবাদ সরাসরি ফ্লাইট চালু করতে চায় পাকিস্তান।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আমলে নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক
শেখ হাসিনার আমলে রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বাংলাদেশ সেভাবে আমলে নেয়নি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এ ক্ষেত্রে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি মাথায় রাখবে।
এ প্রসঙ্গে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রসঙ্গ টেনে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘স্যাংশন থাকার পরও রাশিয়াকে যতটুকু সহায়তা করা যায়, তা করতে রাজি আছে বাংলাদেশ।’
তৌহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রদূতকে বলেছি, যেহেতু রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আছে, আমাদের যে অবস্থান আমরা তো যুদ্ধ করতে যাব না কারও সঙ্গে, কাজেই আমাদের যেটা করতে হবে, সেটা হলো যেটুকু সহায়তা করতে পারি, সেটুকু আমরা করব। তবে আমাদের নিরাপদ পথে চলতে হবে, আমরা এটা করতে পারি।’