ক্রমবর্ধমান বিপুল আন্তর্জাতিক ঋণ, উচ্চ সুদহার, ঋণ গ্রহণের কঠোর শর্তাবলি, প্রকল্পের ব্যয়ের ঊর্ধ্বমুখী সংশোধন এবং অন্যান্য কারণে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ কাঠামো অনুযায়ী বাংলাদেশ বর্তমানে একটি মাঝারি ঋণ বহনক্ষমতার দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। নিকট ও মধ্যমেয়াদি ভবিষ্যতের নিরিখে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ঋণ ব্যবস্থাপনা সমধিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।…
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিযুক্ত (PPG) ঋণের স্থিতি বর্তমানে ৭৯ মার্কিন বিলিয়ন ডলার (সেপ্টেম্বর, ২০২৩)। যা সমপর্যায়ের অন্যান্য উন্নয়নশীল অর্থনীতির তুলনায় খুব বেশি নয়। বৈদেশিক ঋণ বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ১৭ শতাংশের সমান। যদি দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিষেবার দায়ভার বৃদ্ধির প্রবণতাগুলো বিবেচনা করা হয়, তাহলে বৈদেশিক ঋণের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে গভীর মনোযোগের দাবি রাখে।
প্রকৃতপক্ষে, বিগত বছরগুলোতে বৈদেশিক ঋণ পরিষেবা এবং ঋণ বহনক্ষমতার বিষয়গুলো বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বহুপক্ষীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকটি প্রতিবেদনে এ উৎকণ্ঠা উঠে এসেছে। জাতিসংঘের ২০২৩ সালের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল ‘এ ওয়ার্ল্ড ইন ডেবট ডিফল্ট’, বিশ্বব্যাংকের ‘আন্তর্জাতিক ঋণ রিপোর্ট’ এবং ২০২৩ সালের আইএমএফ রিপোর্টে দেশগুলো ঋণসংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। উপরোক্ত প্রকাশনাগুলো থেকে উদ্ভূত মূল বার্তা হলো, অনেক নিম্নআয়ের দেশ কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ, দেশীয় অর্থনীতিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিরূপ প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণে ঋণসংকটের মুখোমুখি হতে পারে এবং বিপজ্জনক মধ্যআয়ের ফাঁদে পড়তে পারে। লেনদেনের ভারসাম্য পরিস্থিতি এবং এই দেশগুলোর বিদেশি ঋণ যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে ভবিষ্যতে বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। উদ্ভূত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ, সার্বভৌম ঋণ পরিষেবা এবং দেশের ঋণ বহনক্ষমতার বিষয়ে তাই বাংলাদেশকে আরও কৌশলী হতে হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পিপিজি ঋণ ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে ৪৪.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৭০.৮ বিলিয়ন হয়েছে অর্থাৎ চার বছরে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে সুদের অর্থ প্রদান ০.৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ১.৩১ বিলিয়ন হয়েছে অর্থাৎ প্রায় ১৬৮.০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে আসল প্রায় ৪৮.০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থবছর ২০২৩-২৪-এর প্রথম ৯ মাসে দেশের ঋণ পরিষেবা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৪৯ শতাংশ বেড়েছে। সুদের অর্থ প্রদান ১১৭.০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আসল বৃদ্ধি পেয়েছে ২২ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বর্তমান নিম্ন স্তরের পরিপ্রেক্ষিতে পণ্য ও পরিষেবার রপ্তানি থেকে আয় বৃদ্ধিতে মন্থরতা, ঋণের উচ্চ খরচ এবং অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য উল্লেখযোগ্য বড় বেশ কয়েকটি বিদেশি ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হতে চলেছে। সব মিলিয়ে এসব বিষয়ে আরও সতর্কতার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
উদ্বেগের কারণ যেসব বিষয়
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান পরিষেবার অন্যতম একটি মূল কারণ দেশের মধ্যম আয়ের উত্তরণ। বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে বাংলাদেশ ২০১৫ সালে নিম্নআয়ের দেশ (এলআইসি) থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে (এলএমআইসি) উন্নীত হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ আর বিশ্বব্যাংকের নিম্ন সুদের IDA-টাইপ ঋণের জন্য বিবেচিত হবে না (প্রায় ০.৭ শতাংশ বার্ষিক সুদে, ১০ বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড এবং কর প্রদানের সময়কাল ৪০ বছর পর্যন্ত)। ফলে, বাংলাদেশ আইডিএ দেশ থেকে গ্যাপ অর্থাৎ একটি মিশ্র দেশ হিসেবে গণ্য হবে। ফলে ঋণ নেওয়ার শর্তগুলো আরও দিন দিন কঠোর হচ্ছে। দেশটি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের তুলনামূলকভাবে উচ্চ সুদের IBRD কান্ট্রি ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হবে। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কারণে বহুপক্ষীয় এবং দ্বিপক্ষীয় উভয় উৎস থেকে উচ্চসুদে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। এটি সাম্প্রতিক সময়ের উপরোক্ত ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধের দায়ভারের একটি প্রধান কারণ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পোর্টফোলিও এবং ঋণের শর্তাবলিতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। রেয়াতযোগ্য থেকে অ-রেয়াত, প্রধানত বহুপক্ষীয় থেকে দ্বিপক্ষীয় ঋণের প্রাধান্য এবং সহজ শর্তে ঋণ থেকে কঠোর শর্তের ঋণের আধিক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পোর্টফোলিওতে স্বল্পসুদের আইডিএ ঋণের পরিমাণ ৩৮.0 শতাংশ থেকে ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে। যেখানে ভারত, চীন এবং রাশিয়ার মতো দ্বিপক্ষীয় উৎস থেকে ব্যয়বহুল ঋণের অংশ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া বহুপক্ষীয় সংস্থার ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গ্রেস পিরিয়ডের সময়ে শুধু ঋণের ওপর সুদ দিতে হবে। পরবর্তীতে সুদ এবং আসল উভয়ের জন্য অর্থ প্রদান করতে হবে। উল্লেখ্য, কিছু বড় ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ইতোমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে বা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শেষ হবে। প্রকৃতপক্ষে, বিগত বছরগুলোয় চালু করা কয়েকটি বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে (যেমন- রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প; যা ২০১৬ সালে চালু করা হয়েছে, রাশিয়ার ১১.৩ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নে, যার গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর ও ম্যাচুরিটি সময়কাল ২০ বছর এবং ২০১৮ সালে শুরু করা পদ্মা সেতু প্রকল্পের রেল সংযোগ, চীনের ২.৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে, যার ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ড এবং ১৫ বছর মেয়াদসহ) গ্রেস পিরিয়ড উদ্ভূত চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দেয়।
উল্লিখিত দুটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে বার্ষিক সুদের হার যথাক্রমে LIBOR+১.৭৫ শতাংশ, এবং ২ শতাংশ (0.২৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জসহ)। LIBOR/SOFR সুদের হার বিগত সময়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, কোভিড সময়কাল, এবং তার পরবর্তীতে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে এ হার বেশ কয়েক গুণ বেড়েছে, তাই সুদাসলের পরিমাণও সমান তালে বেড়েছে। নমনীয় LIBOR/SOFR শর্তে ধার্যকৃত ঋণের পরিষেবা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া স্থানীয় মুদ্রায় আয় হয় এমন বৈদেশিক-অর্থায়নকৃত প্রকল্পগুলোর জন্য ঋণ পরিষেবা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এটি বেশির ভাগ অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে (যেমন- পরিবহন এবং বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্প) বেশিভাবে প্রযোজ্য। এর কারণ গত কয়েক বছরে টাকার মূল্যমানের উল্লেখযোগ্য অবনমন হয়েছে, প্রায় ৩০ শতাংশ। যখন এই ঋণগুলো নেওয়া হয়েছিল তখন এ ধরনের টাকার মূল্যমানের অবনমনের কোনো পূর্বাভাস ছিল না।
সময় এবং ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রায়শই ঘটে থাকে, এটা সুবিদিত। এর অর্থ হলো, প্রকল্পের ব্যয় প্রাথমিকভাবে যা পরিকল্পনা করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। এর ফলে প্রকল্পগুলোর আয়ের অভ্যন্তরীণ, অর্থনৈতিক এবং আর্থিক রিটার্নের হার সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনসমূহে প্রাক্কলিত অনুমানের চেয়ে অনেক কম হয়ে থাকে। এটি প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা হ্রাস করে এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিষেবার জন্য সমস্যা তৈরি করে।
এভাবে, ক্রমবর্ধমান বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক ঋণ, উচ্চ সুদের হার, ঋণ গ্রহণের কঠোর শর্তাবলি, প্রকল্পের ব্যয়ের ঊর্ধ্বমুখী সংশোধনসহ কয়েকটি কারণ বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।
এটা সত্য যে, বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ, যা নভেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে, তার সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের প্রাপ্যতা ও শর্তের সরাসরি কোনো প্রভাব নেই। বৈদেশিক ঋণের শর্তাবলি নির্ভর করে মাথাপিছু জিএনআইয়ের ওপর। এলডিসি গ্রাজুয়েশনের কারণে রপ্তানি খাত সে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশের ঋণ বহনক্ষমতা পরিমাপ করার ক্ষেত্রে তা বিবেচনায় নিতে হবে। এ ছাড়া, বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধির নিমিত্তে সহায়তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা, এলডিসি জলবায়ু তহবিলের অ্যাক্সেস, এসব মনে রাখতে হবে। বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে এগুলোর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব থাকবে, কারণ বাংলাদেশকে তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বৈদেশিক ঋণ থেকে বৈদেশিক উন্নয়ন ব্যয় বহন করতে হয়।
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ কাঠামো অনুযায়ী বাংলাদেশ বর্তমানে একটি মাঝারি ঋণ বহনক্ষমতার দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। নিকট ও মধ্যমেয়াদি ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উল্লিখিত নিয়মসমূহ বিবেচনায় রাখতে হবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সুপারিশমালা
বিদ্যমান অবস্থার অবনমন রোধে এবং দুর্বল দেশের ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্তির আশঙ্কা এড়ানোর জন্য বাংলাদেশকে সচেষ্ট হতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সার্বভৌম ঋণ ব্যবস্থাপনার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে এবং নিম্নলিখিত বিবেচনাসমূহের নিরিখে তা নির্ধারণ করতে হবে:
(১) বাংলাদেশের উচিত নতুন উৎস থেকে ঋণের সুযোগ অন্বেষণ করা এবং তার ঋণ পোর্টফোলিওকে পুনর্বিন্যাস ও বিস্তৃত করা (যেমন- AIIB, এবং NDB থেকে বাংলাদেশ যার সদস্য) যেখান থেকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের জন্য ঋণ নিয়েছে)। সুদের হার এবং ঋণের শর্তাবলি সতর্কতার সঙ্গে সুদ পরীক্ষা করা উচিত। বিশেষত, ঋণ প্রসূত দায়বদ্ধতা এবং ঋণ পরিষেবার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের প্রভাবগুলো অভিঘাত মূল্যায়ন করতে হবে। স্থির নাকি নমনীয় তা সতর্কতার সঙ্গে যাছাইবাছাই করতে হবে।
২) ঋণ গ্রহণের শর্তাবলি এবং বিনিয়োগের গুণমান উভয়ই সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ঋণদাতা নির্বাচন প্রক্রিয়া অবশ্যই কঠোর হতে হবে। কোন ধরনের প্রকল্পের জন্য কোন ধরনের ঋণের দরকার, কোন শর্তে এবং কোন উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হবে সে বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রকল্প নির্বাচন, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং উপযুক্ত সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সম্পাদিত পর্যালোচনার ভিত্তিতে করা উচিত। প্রত্যাশিত আয় অবশ্যই নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে করা উচিত। প্রকল্পগুলো যথাসময়ে সম্পন্ন করা, জবাবদিহি প্রয়োগ করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।
(৩) অ-রেয়াতি ধরনের ঋণের আলোচনা সতর্কতা এবং যত্নসহকারে করা আবশ্যক। উল্লেখ্য, পরিকল্পনা কমিশনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ঋণের শর্তাদি মূল্যায়নের জন্য একটি সূত্র ব্যবহার করে যা প্রনিধানযোগ; ২৫ শতাংশ থ্রেশহোল্ডের বেশি ঋণকে অ-রেয়াতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দর কষাকষির সময় অ-রেয়াতি ঋণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
(৪) বাংলাদেশকে সক্রিয়ভাবে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন লক্ষ্যভিত্তিক তহবিল থেকে সমর্থন পাওয়ার সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হবে, যেমন- কোপ-২৮-এ ঘোষিত ক্ষতি এবং ক্ষতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের তহবিল। অন্যান্য তহবিল যেমন- আইএমেফের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই সুবিধা যা বিভিন্ন প্রকৃতির হতে পারে।
(৫) শিক্ষা সফর, অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, নগদ বিতরণ ইত্যাদি উপাদানে আছে সেসব ঋণকে সাবধানে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
(৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত মুদ্রার অবমূল্যায়নের জন্য তার ক্রলিং পেগ মোডালিটি কীভাবে কার্যকর করা হবে তা বলা। বিলম্ব অর্থ আরও অবমূল্যায়নের প্রত্যাশায় বিদেশে আয় রাখতে উৎসাহিত করবে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রতিকূল প্রভাব পড়বে।
(৭) সার্বভৌম গ্যারান্টি দিয়ে আন্ডাররাইট করা বিভিন্ন সরকারি সংস্থার গৃহীত ঋণসমূহ সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
(৮) বাজেট সমর্থনের সহযোগী ঋণ যখন ব্যয় করার ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেয়, সরকারকে অবশ্যই সেগুলো কীভাবে ব্যয় করা হয়, সে সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। এই ধরনের তহবিল ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
(৯) একক উৎস সংগ্রহের মতো শর্তযুক্ত ঋণসমূহ অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব মূল্যায়ন করার জন্য সঠিকভাবে যাচাই করা উচিত। কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী পণ্যগুলো স্থানীয়ভাবে কম দামে পাওয়া যায় কিনা দেখতে হবে। অর্থের জন্য ভালো মূল্য নির্ধারণ নিশ্চিত করা উচিত।
(১০) বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য মানবসম্পদ, দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং দেশের ঋণ বহনক্ষমতা ইত্যাদির মূল্যায়নের জন্য এখন এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সক্ষমতা পরিপ্রেক্ষিতে আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
(১১) এটা ইতিবাচক যে, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ইআরডি বাংলাদেশের ঋণের অবস্থা এবং ঋণ পরিষেবা-সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্তর ওপর পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন তৈরি করে আসছে, যার মধ্যে বৈদেশিক ঋণ-সংক্রান্ত তথ্যও রয়েছে। প্রকল্পের প্রতিবেদনের মান নিশ্চিতকরণ, প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণের পরিমাণ এবং মধ্যমেয়াদি ঋণ বহন করার ক্ষমতা আরও উন্নত করা সম্ভব।
লেখক: সম্মানীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)