অবহেলা আর অব্যবস্থাপনায় জৌলুস হারিয়েছে ১১৪ বছরের পুরোনো কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরি। এই প্রতিষ্ঠানটি শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে হলেও পাঠক বা শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরিমুখী হতে দেখা যায় না। কিছুদিন আগে জরাজীর্ণ ভবনটিকে কিছুটা সংস্কার করা হয়েছে। করা হয়েছে রং। বসার চেয়ার-টেবিল, বইয়ের আলমারি সবকিছুই ঠিকঠাক করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার কারণেই মূলত বইপাগল মানুষগুলো পাবলিক লাইব্রেরিবিমুখ হয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পরিচালনা পরিষদে অযোগ্য লোকদের বসানো, পাঠকদের সুবিধার ব্যবস্থা না করা, ব্যবসায়ী মনোভাবে প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তির ব্যবহার করাসহ বিভিন্ন কারণে অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে আছে কুষ্টিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা এই গ্রন্থাগারটি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরির যুগ্ম সম্পাদক সেলিম আহাম্মেদ বলেন, ‘আধুনিক যুগে ঘরে বসেই স্মার্টফোনে সবকিছু পাওয়া যায়। তাই ঘর থেকে বের হয়ে মানুষ আর লাইব্রেরিমুখী হতে চান না। তা ছাড়া মানুষের বইয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়াও লাইব্রেরিমুখী না হওয়ার একটা কারণ। আমরা সব ধরনের সুযোগ রেখেছি, শিক্ষার্থীরা ইচ্ছে করলে এখানে এসে প্রাইভেটও পড়ে যেতে পারবেন। তাতে কোনো বাধা নেই।’
কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরিসূত্রে জানা যায়, ১৯১০ সালে ভারতের নদীয়া জেলার অন্তর্গত কুষ্টিয়া মহকুমার তৎকালীন প্রশাসক কৃষ্ণদয়াল প্রামাণিকের উৎসাহ পেয়ে গৌরীশঙ্কর আগরওয়াল নামের একজন ব্যক্তি একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার জন্য কুষ্টিয়া শহরের নবাব সিরাজউদ্দৌলা রোডে (এনএস রোড) ১০ কাঠা জমি দান করেন। এর পর বাড়াদী এলাকার জমিদার হরিশচন্দ্র রায় গ্রন্থাগারের জন্য এই ভবনটি নির্মাণ করে দেন। ভারত উপমহাদেশ বিভক্তির কারণে গ্রন্থাগারের অনেক পৃষ্ঠপোষক ভারতে চলে যান। ফলে গ্রন্থাগারটি প্রায় অচল হয়ে যায়। মাঝে বিভিন্ন সংকটের কারণে ১৯৪৭-১৯৫২ সাল পর্যন্ত গ্রন্থাগারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও গ্রন্থাগারটির যথেষ্ট ক্ষতি হয়।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিশিষ্ট লালন গবেষক ড. আবুল আহসান চৌধুরী ১৯৭২ সাল থেকে গ্রন্থাগারটির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময় ৩৯ শতক জমিতে স্থাপিত পাবলিক লাইব্রেরিটি কুষ্টিয়ার মানুষের প্রাণকেন্দ্র ছিল। যত সভা-সমাবেশ, অনুষ্ঠান এখানেই হতো। জেলা শহরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের বৈঠক হতো এই প্রতিষ্ঠানের আঙিনায়। সেই সঙ্গে সব সময় পাঠক এবং শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর থাকত পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণ। এমনকি লাইব্রেরিটির শোভা বাড়ানোর জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল আধুনিক মানের একটি পানির ঝরনা। সেটিও এখন আর নেই। পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে সভা-সমাবেশের কাজে ভাড়া দেওয়ার জন্য ঝরনাটি ভেঙে ফেলা হয়।
স্থানীয়রা জানান, বছর দুয়েক আগেও এটি একটি ডাস্টবিনের মতো ছিল। আশপাশের ময়লা ফেলা হতো এখানে। ভবনের অবস্থাও ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের পেছনে ছিল মাদকাসক্তদের আড্ডা। কিন্তু এখন পরিবেশের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ভবনটি সংস্কার করে রং করা হয়েছে। পরিষ্কার করা হয়েছে আঙিনা। কিন্তু পাঠকদের আকৃষ্ট করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুজন নারী এবং একজন পুরুষ বসে লাইব্রেরিতে পত্রিকা পড়ছেন। বৃদ্ধ কেয়ারটেকার কাম পাহারাদার বাইরে বসে আছেন। লাইব্রেরির সদস্যসচিব গোলাম মোস্তফার কক্ষ তালাবদ্ধ। এ ছাড়া নেই কোনো কর্মকর্তা। কেয়ারটেকার জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি অনেক দিন থেকেই এখানে চাকরি করি। এক সময় এখানে অনেক মানুষ বই পড়তে আসত। কিন্তু এখন সারা দিনে মাত্র ৪/৫ জনের বেশি আসে না। মানুষ এখন আর বই পড়তে চায় না। যারা আসেন, তারা শুধু পত্রিকা পড়ার জন্যই আসেন।’
কিছুক্ষণ পর সেখানে আসেন সহকারী লাইব্রেরিয়ান কাওয়ার হোসেন। তিনি প্রায় ৫২ বছর ধরে কাজ করছেন। কাওসার হোসেন বলেন, ‘৮০-৮৫ সালের আগে এ লাইব্রেরি বইপ্রেমীদের আনাগোনায় মুখর থাকত। আমাদেরও খুব ব্যস্ত থাকতে হতো। কিন্তু এখন তো পাঠক নেই বললেই চলে।’ কেন এই অবস্থা- এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান তিনি।
লাইব্রেরিতে বর্তমানে জাতীয় দৈনিক ৮টি ও স্থানীয় ২টি পত্রিকা নেওয়া হয়। তবে এখানে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের কোনো ব্যবস্থা নেই। পাঠকদের হাজিরার একটি বই আছে, সেটির অবস্থাও নাজুক। গত কয়েক দিনে ৫-৭ জনের বেশি উপস্থিতির স্বাক্ষর নেই।
এ সময় লাইব্রেরিতে কথা হয় কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বাঁশগ্রাম ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সাজেদুল ইসলাম এবং নদী বাঁচাও আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ও সমাজকর্মী খলিলুর রহমান মজুর সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পরিচালনা পরিষদের নেতৃত্ব নির্ধারণ করে অযোগ্য লোকদের বসানো হয় এখানে। নতুন সদস্য তৈরি করার ক্ষেত্রে চরম অনীহা আছে। আর যারা আজীবন সদস্য হতে চান, তাদেরকে গুনতে হয় মোটা অংকের টাকা। যার কারণে ইচ্ছে থাকলেও যোগ্য লোক এখানে আসতে চান না। বর্তমানে যিনি আছেন তিনি একজন ব্যবসায়ী এবং নিয়মিত লাইব্রেরিতে আসেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি এখানকার সদস্য নই। যে দৈন্যদশা এখানকার, তাতে সদস্য হওয়ার ইচ্ছে চলে গেছে। এটি একটি সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান হওয়া দরকার। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক সব ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সদস্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরিচালনা পরিষদের নেতাদের নির্বাচন- সবই হওয়া দরকার স্বচ্ছতার সঙ্গে। কিন্তু এখানে তার ব্যত্যয় ঘটছে। এগুলো থেকে উত্তরণ না ঘটলে এই প্রতিষ্ঠানটির ভবন ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরির সদস্যসচিব গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমি দায়িত্ব পেয়েছি এক বছরও হয়নি। সেখানকার পরিবেশ খারাপ হওয়ায় দায়িত্ব পাওয়ার আগে আমি নিজেও ভয়ে সেখানে যেতাম না। দায়িত্ব নিয়েই আমি ভবন এবং মাঠের সংস্কার করিয়েছি, বসার ব্যবস্থা করেছি। যেখানে একটি ফ্যান ছিল, আমি ১২টি ফ্যান লাগিয়েছি। কিন্তু এখনো অনেক কাজ বাকি। এতকিছুর পরও আমি পাঠক আনতে পারছি না, এটা আমার ব্যর্থতা। আপনারা পরামর্শ দেন, কী করলে কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরি তার পুরোনো জৌলুস ফিরে পাবে, আমি সেই কাজ করব। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যবই রাখার ব্যবস্থা করব। আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই।’