গেরিলা যোদ্ধারা সামাজিক সংস্কার সাধন করেন। অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা হাতে অস্ত্র তুলে নেন। তারা সমাজকে বদলে দেন। তাদের এই যুদ্ধ নির্যাতক শাসকদের বিরুদ্ধে। শোষকদের বিরুদ্ধে। কথাগুলো বলেছিলেন মহান বিপ্লবী কিউবা বিপ্লবের মহানায়ক চে গুয়েভারা। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারাও প্রথাগত সম্মুখযুদ্ধের পরিবর্তে গেরিলা যুদ্ধকেই বেছে নিয়েছিলেন। আরেক মহান বিপ্লবী, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মাও জে ডং-এর ‘প্রতিরোধ যুদ্ধে’র তত্ত্ব ও ভাবনার সূত্রেও একে ব্যাখ্যা করা যায়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধেরও একটা তাত্ত্বিক পটভূমি ছিল। খুব সহজেই আমরা স্বাধীনতা অর্জন করিনি। এই লেখাটি তারই বিবরণ হিসেবে পড়া যেতে পারে।
স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে আমাদের আন্দোলন এবং সংগ্রাম ছিল রাজনৈতিক অবদমনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক বয়ান’ (ডিসকোর্স) তৈরি করে জনমত গড়ে তোলা হয়। এই কাজটি করেছিলেন বাংলাদেশের লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী সমাজ আর তাতে রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অংশগ্রহণ করেছিল প্রধানত ছাত্রসমাজ এবং পরে সমগ্র জনগোষ্ঠী; বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ।
দ্বিতীয় ধাপে, ১৯৭১ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পরও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বিষয়টি যখন পাকিস্তানি শাসকরা অগ্রাহ্য করেন, তখনই বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধ ছাড়া মুক্তির কোনো বিকল্প নেই বলে বুঝতে পারেন। ২৬ মার্চের মধ্যরাতে তাদের তরুণ অংশ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কৌশল হিসেবে বেছে নেয় গেরিলা যুদ্ধের পথ।
আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি তখন পাকিস্তানি সেনাদের দখলে। পাকিস্তানিদের বাঙালি নিধনের ‘পোড়ামাটি নীতি’র কারণে বাঙালিদের গেরিলা যুদ্ধের পথ বেছে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। কেননা, প্রথাগত সামরিক যুদ্ধ করার মতো অবস্থায় তখন তারা ছিল না। প্রথম দিকে মুক্তিযোদ্ধারা দেশি অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, পরে বহনযোগ্য আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার তারা করেছেন। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পরাক্রমশালী পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষ গেরিলা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
কিন্তু পাকিস্তানি শাসক ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘটিত এই যুদ্ধ বা সংগ্রাম আকস্মিক ছিল না। বাংলাদেশের মানুষের ছিল দীর্ঘকালের শাসক ও শোষকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার ঐতিহ্য। এ দেশের কৃষকসমাজ কখনো ব্রিটিশ, কখনো স্থানীয় অত্যাচারী জমিদার-জোতদার-ভূস্বামীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। আমরা সেই সংগ্রামকে শাসকদের বিরুদ্ধে নিম্নবর্গের মানুষদের লড়াই বলতে পারি। ১৯৭১ সালে যখন ইয়াহিয়া খান বুঝিয়ে দিলেন যে, পাকিস্তানিদের শাসন শোষণ অব্যাহত থাকবে, তখনই বাঙালিরা গেরিলা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
গেরিলা যুদ্ধের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আধুনিক হালকা ও ভারী অস্ত্রশস্ত্রে প্রশিক্ষিত দক্ষ সৈনিকদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ হাতের কাছে যে হালকা ধরনের অস্ত্র থাকে, তাই হাতে তুলে নেয়। বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে এভাবে অস্ত্র হাতে নিয়ে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। গেরিলা যুদ্ধ সংঘটিত হয় মূলত কমান্ডো অপারেশনের মাধ্যমে। ‘হিট অ্যান্ড রান’, অর্থাৎ আঘাত করো এবং নিজেকে বাঁচিয়ে সরে আসো; এই হচ্ছে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল।
১৯৭১ সালে এই গেরিলা যুদ্ধের পাশাপাশি রাজনৈতিক বয়ান বা ডিসকোর্স নির্মাণের ভেতর দিয়েও আমরা পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক দখলদার শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। এটা শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে। ‘বৈষম্যের তত্ত্ব’ ছিল সেই আন্দোলনের ভিত্তি। পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের প্রাপ্য অধিকার দিচ্ছে না, অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করছে, আমরা সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ছি, আমাদের সঙ্গে তাদের কোনো ভৌগোলিক নৈকট্য নেই, সাংস্কৃতিক ঐক্য নেই- এই ডিসকোর্সই বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতা যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল। নিজেদের স্বার্থরক্ষায় তারা একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধ করেছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধকে সর্বাত্মকভাবে সমর্থন জানিয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম তাই স্বাভাবিকভাবেই ছিল জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী গেরিলা যুদ্ধের সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের মানুষ এই অনুপ্রেরণাতেই গেরিলা অপারেশনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ করেছে।
একজন বিশেষজ্ঞ মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা কৌশলের ছয় ধরনের বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেয়েছেন। এগুলো হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষ্যবস্তুকে আক্রমণ করে যাওয়া; দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধকে সীমাবদ্ধ রাখা; বিভিন্ন গেরিলা গোষ্ঠীর স্বাধীনভাবে অথবা নিয়মিতভাবে অপারেশন করে যাওয়া; কৌশলগত প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ; কৌশলগত আক্রমণের মধ্য দিয়ে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া এবং শত্রুর দুর্বল লক্ষ্যবস্তুর ওপর আক্রমণ করা। এজন্য আক্রমণের যে দিকগুলো মুক্তিযোদ্ধারা বেছে নিয়েছিলেন সেসব হলো অ্যামবুশ করা, অব্যাহতভাবে আক্রমণ পরিচালনা, হয়রানি, ঘেরাও ও নাশকতা ইত্যাদি চালিয়ে যাওয়া।
মুক্তিযুদ্ধারা একই সঙ্গে যেমন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে গেছেন, তেমনি দেশের ভেতরে মানুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রও প্রস্তুত করেছেন। তারা বাংলাদেশের মানুষকে এমন ধারণা দিতে চেয়েছেন যে, পাকিস্তানি সেনারা যতই আধুনিক সামরিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকুক, তারা অজেয় নয়। তাদের পরাজিত করা সম্ভব। পরাজিত আমরা করবই। জনমানুষকে এভাবেই তারা উজ্জীবিত রেখেছেন এবং দিনের পর দিন যুদ্ধ করে গেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সাধারণ মানুষের জনসমর্থনও ছিল এই গেরিলা যুদ্ধের মূল শক্তি। বাংলাদেশের মানুষ সেদিন নানাভাবে গেরিলা যোদ্ধাদের সমর্থন দিয়ে গেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গেরিলা যুদ্ধের ১০টি নীতি রয়েছে। এগুলো হলো- জয়ী হওয়ার মানসিক লক্ষ্যকে সমুন্নত রাখা, আক্রমণাত্মক ভূমিকায় থাকা, গোপনীয়তা রক্ষা করা, সতর্কতার সঙ্গে স্থান বদল, পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, গতিশীলতা, শত্রুকে বিভ্রান্ত করা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং নিজেদের মনোবল উজ্জীবিত রাখা। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলের যুদ্ধের এসব কৌশল ব্যবহার করেছেন। উল্লেখ্য, এই ধরনের গেরিলা পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে পরিচিত নেতা হলেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মাও জে ডং।
অর্থাৎ খুব সহজে নয়, খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন এবং পাকিস্তানিদের মনোবল ভেঙে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে ভারত প্রথাগত যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ করেছে ঠিকিই, কিন্তু মূল যুদ্ধটা করেছেন আমাদের অকুতভয় মুক্তিযোদ্ধারা ৯ মাস ধরে এবং সেই যুদ্ধ ছিল গেরিলা যুদ্ধ। স্বাধীনতার যুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হয়েছেন। সাধারণ মানুষ পাকিস্তানিদের নির্মমতার শিকার হয়েছেন। আজ এই স্বাধীনতা দিবসে তাদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি টুপিখোলা কুর্নিশ।
লেখক: কবি ও সাহিত্যিক