ঢাকা ৮ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
জয়ের খোঁজে জর্ডান-আলজেরিয়া ফিলাডেলফিয়ায় ফ্রান্স ও ইরাকের অসম লড়াই ২২ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি আরেকটি ঐতিহাসিক রাতের অপেক্ষায় কুরাসাও আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া ম্যাচে কার জয়ের সম্ভাবনা কত, জানাল সুপারকম্পিউটার ৩৩ ম্যাচেই ১০০ গোল! হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে বিয়েলসার ক্ষোভ ইরানের রক্ষণদুর্গে আটকে গেল বেলজিয়াম গোল বাতিল ইরানের, গোলশূন্য প্রথমার্ধ বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোলের রেকর্ড পেলের কীর্তিতে ভাগ বসালেন ইয়ামাল জন্মবার্ষিকীতে স্মরণানুষ্ঠান: সুফিয়া কামালের ব্যক্তিত্ব সবাইকে আলোকিত করে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার শঙ্কা সৌদিকে উড়িয়ে দিল স্পেন যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টায় প্রথম দফার বৈঠক শেষ, মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান ডোকুর ‘বিশ্বকাপ ছাড়ার’ সিদ্ধান্তে সমালোচনার ঝড় মালয়েশিয়ায় কারাবন্দি বাংলাদেশিদের মুক্তিতে উদ্যোগের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর প্রথমার্ধে সৌদি আরবের জালে ৩ গোল স্পেনের তীব্র গরমের পর স্বস্তির বৃষ্টি প্রথম গোলেই ইতিহাস গড়লেন ইয়ামাল সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেনের দাফন সম্পন্ন সিংগাইরে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু সুরের মূর্ছনায় বিশ্ব সংগীত দিবস: ঢাকার দুই প্রান্তে সুরের বিভা কুড়িগ্রামে এক বাঘা আইড় ৮৫০০০ অজু করার সময় বজ্রপাতে প্রাণ গেল ৩ মাদরাসাছাত্রের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলায় দণ্ডিত ৫৯ জন: আইনমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ‘অসত্য’ বক্তব্য, উত্তপ্ত সংসদ স্পেনের শুরুর একাদশে ইয়ামাল সুফিয়া কামাল ও আবু হেনা মোস্তফা কামালের স্মরণে জবিতে দুই দিনব্যাপী সেমিনার শুরু মানিকগঞ্জে ঝোপে মিলল স্কুলছাত্রীর ঝুলন্ত খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ

ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৫, ০১:২৮ পিএম
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার

খ্যাতনামা সাহিত্য সমালোচক ও গ্রন্থাগারিক লরেন্স ক্লার্ক পাওয়েল (১৯০৬-২০০১) মন্তব্য করেছিলেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব ছাড়া মহত্ত্বের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেনি। এটি যখন আর ঘটবে না তখন আমাদের সভ্যতারও অবসান ঘটবে।’ বাস্তবিকই, জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সফলতা-ব্যর্থতা অনেকাংশে নির্ভর করে এর গ্রন্থাগারটি কতটা সমৃদ্ধ ও সক্রিয় তার ওপর। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বৃহত্তম ও প্রাচীনতম কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারটি সংগ্রহের বিবেচনায় দেশের বৃহত্তম। ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা যেদিন শুরু হয়, গ্রন্থাগারের দ্বারোদ্ঘাটনও ঘটে সেদিনই। সময়ের পরিক্রমায় এটি কেবল দেশের সর্ববৃহৎ গ্রন্থাগারই নয়, নতুন প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনশীল সেবার সমন্বয়ে এ দেশে গ্রন্থাগার আন্দোলন ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ যোগাযোগের (scholarly communication) ক্ষেত্রে অগ্রপথিক হিসেবেও কাজ করছে। গত এক শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে গ্রন্থাগার পরিসরে ঘটেছে নানা পালাবদল। গ্রন্থাগারের কাজ কী হওয়া উচিত সে ভাবনাতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। এ পালাবদলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে পাঠকের দ্রুত পরিবর্তমান তথ্যচাহিদা পূরণ করা একটি দুরূহ কাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার তার সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নতুন কর্মকৌশল ও প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সেবাদানের নবতর পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে এসব পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করে চলেছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার: উন্মেষপর্ব ও ক্রমবিকাশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বর্তমান ভবনের একটি অংশে। পরে এটি কার্জন হল এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। দেশভাগের পর গ্রন্থাগারের সংগ্রহ ও ব্যবহারকারী দুটোরই ব্যাপক বৃদ্ধির কারণে গ্রন্থাগারটিকে নতুন একটি স্থানে স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এ দেশের স্থাপত্যবিদ্যার পুরোধা ব্যক্তিত্ব মাজহারুল ইসলামের নকশায় গ্রন্থাগারের নতুন ভবনের কাজ শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র ও কেন্দ্রীয় মসজিদের মধ্যবর্তী স্থানে। নবনির্মিত ভবনটির দ্বার উন্মোচন করা হয় ১৯৬৪-এর ১৫ ডিসেম্বর। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার তিনটি পৃথক ভবনে বিন্যস্ত: প্রশাসনিক ভবন, মূল গ্রন্থাগার ভবন ও বিজ্ঞান গ্রন্থাগার ভবন। সায়েন্স এনেক্স এলাকায় অবস্থিত বিজ্ঞান গ্রন্থাগার ভবনের যাত্রা শুরু ১৯৮২-এর মার্চে। প্রশাসনিক ভবনের মোট আয়তন ২৯, ৭২৪ বর্গফুট, মূল গ্রন্থাগার ভবন ৭১,১০৬ বর্গফুট আর বিজ্ঞান গ্রন্থাগার ভবন ৪০,০০০ বর্গফুট। মূল গ্রন্থাগার ভবনে এককালীন মোট ৭৪০ জন ও বিজ্ঞান গ্রন্থাগার ভবনে ৪২০ জনের বসার ব্যবস্থা রয়েছে।

১৯২১ সালে ১৮,০০০ পুস্তক নিয়ে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, যার অধিকাংশই ঢাকা কলেজ ও ভূতপূর্ব ঢাকা ল কলেজ-এর সংগ্রহ থেকে প্রাপ্ত। শুরু থেকেই গ্রন্থাগারে বিভিন্ন বিষয়ে একটি সুষম সংগ্রহ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরই গড়ে তোলা হয় বাংলা ও সংস্কৃত পাণ্ডুলিপির সমৃদ্ধ একটি সংগ্রহ। এ উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠিত হয় যাতে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন খ্যাতনামা প্রত্নতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবেত্তা, মুদ্রাবিজ্ঞানী, লিপিবিশারদ, প্রাচীন হস্তলিপিবিশারদ ও পুঁথি সংগ্রাহক এবং ঢাকা জাদুঘরের কিউরেটর ডক্টর নলিনীকান্ত ভট্টশালী। বস্তুত, তার উদ্যোগেই গ্রন্থাগারে বাংলা ও সংস্কৃত বিষয়ে একটি সমৃদ্ধ সংগ্রহ গড়ে ওঠে। এ সংগ্রহ তত্ত্বাবধানের জন্য ১৯২৫ সালে একজন কর্মীও নিয়োগ করা হয়। পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের বিস্তারিত সূচি তৈরি হয় এবং অচিরেই বিশ্ববিদ্যালয় ও এর বাইরে থেকে অনেক গবেষক এ সংগ্রহের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৯২৬ সালে কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটিতে দীর্ঘদিন কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বাবু মথুরামোহন মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের পাণ্ডুলিপি শাখা তত্ত্বাবধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। শুরুর দিকে গ্রন্থাগার কর্মীর অপর্যাপ্ততা গ্রন্থাগারের একটি বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয় যেজন্য গ্রন্থাগার কর্মীদের ছুটির দিনেও কাজ করতে হতো। তবে কর্মীস্বল্পতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের সেবাদানে গ্রন্থাগার কর্মীরা ছিলেন আন্তরিক। আগ্রহোদ্দীপক একটি তথ্য হচ্ছে, গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর কেবল দরিদ্র শিক্ষার্থীদের গ্রন্থাগার সেবাদানের জন্য একটি বিভাগ খোলা হয়েছিল যেটি অবশ্য পরে আর ক্রিয়াশীল থাকেনি। 

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই উপহার হিসেবে প্রাপ্ত সামগ্রী গ্রন্থাগার সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করেছে, গ্রন্থাগারের সূচনালগ্নে অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে সৃষ্ট সীমাবদ্ধতাকে যা কিছুটা হলেও প্রশমিত করেছিল। যেসব সমাজহিতৈষী ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি এ গ্রন্থাগারে বই উপহার দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ময়মনসিংহের কৃষ্ণদাস আচার্য চৌধূরী, পণ্ডিত যশোদাকান্ত চক্রবর্তী, খান বাহাদুর কাজিমুদ্দিন সিদ্দিকী, স্যার যদুনাথ সরকার, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী ও পরবর্তীকালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রথম ভারতীয় অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত ড. প্রসন্ন কুমার রায়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহের একাংশও এ গ্রন্থাগারে দান করা হয় ১৯৩৩ সালে। আন্তর্জাতিক নানা সংস্থা ও বিদেশি সরকারের কাছ থেকেও বই ও অন্যান্য সামগ্রী অনুদান হিসেবে গ্রহণ করা হয়। লন্ডনস্থ ইন্ডিয়া অফিস, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি ব্যুরো অব ব্রিটিশ এম্পায়ারসহ নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্রন্থাগারে পুস্তক ও অন্যান্য সামগ্রী অনুদান হিসেবে প্রদান করে। ১৯৬০-এর দশকের সূচনালগ্নেই প্রায় ২০ হাজার পাণ্ডুলিপিসমৃদ্ধ এ গ্রন্থাগারের সংগ্রহটি দেশের সর্ববৃহৎ পাণ্ডুলিপি সংগ্রহে পরিণত হয় যার ৯০ শতাংশই ছিল আরবি, উর্দু ও ফার্সি পাণ্ডুলিপি। ১৯৫৭ সালে গ্রন্থাগার থেকে একটি বুলেটিন প্রকাশিত হতে থাকে। এ ছাড়া সাউথইস্ট এশিয়া ট্রিটি অর্গাইনাইজেশন (SEATO) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে গ্রন্থাগারে রক্ষিত আরবি, উর্দু ও অন্যান্য বিদেশি ভাষার পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের একটি বর্ণনামূলক সূচিও প্রকাশিত হয়। ১৯৫০-এর দশকে গ্রন্থাগার সংগ্রহের পরিমাণ এক লাখের কোঠা পার হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত আগে গ্রন্থাগারের সংগ্রহে ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার পুস্তক ও গ্রন্থাগার সামগ্রী। স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের পরবর্তী সময়ে গ্রন্থাগারের আধুনিকায়ন ও সংগ্রহের বৈচিত্র্য ও ব্যাপকতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে এটি দেশের বৃহত্তম ও সমৃদ্ধতম গ্রন্থাগার হিসেবে সুদৃঢ় একটি অবস্থানে পৌঁছে যায়।

গ্রন্থাগার সংগ্রহের সম্প্রসারণ ও ক্রমবৈচিত্র্য

সংগ্রহের ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য উভয় বিচারেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার অনন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী, প্রায় ২ হাজার শিক্ষক এবং গবেষকদের নানামুখী প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রহ করা হচ্ছে মুদ্রিত ও ইলেকট্রনিক উভয় ধরনের পাঠসামগ্রী। পাঠকচাহিদার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা এ সংগ্রহ বিষয় বৈচিত্র্যে ও আঙ্গিকের বহুমাত্রিকতায় কেবল বাংলাদেশ নয়, এতদঞ্চলের সবচেয়ে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার সংগ্রহগুলোর একটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে আছে দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ দুষ্প্রাপ্য সামগ্রীর সংগ্রহ, যার সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। এর মধ্যে এমন অনেক পুস্তক ও সাময়িকী আছে যেগুলো দুই থেকে আড়াই শ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে এবং ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরুর দিন থেকে এখন পর্যন্ত গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। সতেরো শতকে প্রকাশিত পুস্তকও বিশেষ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে গ্রন্থাগারে। দুষ্প্রাপ্য এসব গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে Robert Loveday কর্তৃক ফরাসি থেকে ইংরেজিত অনুদিত ÔCleopetraÕ (১৬৮৭), Warren Hastings-এর লেখা A Narrative of the Late Transactions at Benares (১৭৮২), Dacca Muslins and Cotton-Silk Manufacturers at Glasgow and Paisley (১৭৯৩) Buchanan’s Journey through Chittagong and Tiperah (১৭৯৮), James Boarden-এর লেখা Memoirs of the life of John Philip Kemble (১৮২৫) ইত্যাদি। গ্রন্থাগারের সমৃদ্ধ পাণ্ডুলিপি সংগ্রহটি এ দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য স্মারক। গ্রন্থাগারে মোট সংগৃহীত পাণ্ডুলিপির সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে ১৪৩৯ সালে গাছের বাকলে লেখা ‘সারদাতিলক’, ১৭০০ সালে মুদ্রিত ও স্বর্ণ দ্বারা অলঙ্কৃত ‘দিওয়ান-ই-হাফিজ’, শাহ মুহাম্মদ সগীর রচিত কাব্য ইউসুফ-জুলেখা (পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতের সময়কাল ১৭৩২), ১৭ ও ১৮ শতকের বেশ কিছু চুক্তিপত্র, কলাপাতায় লেখা চিঠিপত্র ইত্যাদি। সর্বশেষ হিসাবে গ্রন্থাগারটিতে মোট ৭ লাখ বই ও বাউন্ড ভলিউম এবং ৫ হাজার মাইক্রোফিল্ম রয়েছে। বিশেষ সংগ্রহের মধ্যে আছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংগ্রহ, জাতিসংঘ বিষয়ক সংগ্রহ, আমেরিকান স্টাডিজ কর্নার, কোরিয়া কর্নার ইত্যাদি। 

গ্রন্থাগার প্রশাসন ও কর্মী

প্রথম দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে কোনো পেশাদার গ্রন্থাগারিক ছিলেন না। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও ঢাকা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ফ্রান্সিস চার্লস টার্নার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক, যিনি একই সঙ্গে শহীদুল্লাহ হল (তৎকালীন লিটন হল, পরে ঢাকা হল)-এর প্রাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্বপালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক পদে যোগদানের আগেই আধুনিক গ্রন্থাগারিকতা সম্বন্ধে হাতে-কলমে জ্ঞানার্জনের জন্য অধ্যাপক টার্নারকে যুক্তরাজ্যে প্রেরণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক হিসেবে তার মেয়াদকাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। ১৯২২ সালে তার স্থলাভিষিক্ত হন ফখরুদ্দিন আহমেদ। বিভিন্ন সময় অনেক খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ গ্রন্থাগার উপদেষ্টা ও গ্রন্থাগারিকের দায়িত্বপালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারও কোনো এক সময় গ্রন্থাগারিক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ ভারত ভাগ হওয়ার সময় ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এ এইচ তালুকদার। ১৯৪৮-এর জানুয়ারিতে গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগ লাভ করেন আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের রিডার ড. এ হক। ১৯৫৬ সালে যুক্তরাজ্যে দুই বছরব্যাপী একটি প্রশিক্ষণ কোর্স শেষে দেশে আসার পর প্রখ্যাত গ্রন্থাগার বিজ্ঞানী মুহম্মদ সিদ্দিক খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক হিসেবে যোগদান করেন, যিনি এম এস খান নামেই সুপরিচিত ছিলেন। ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গ্রন্থাগার বিজ্ঞান’ বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে এম এস খানই হন প্রথম বিভাগীয় প্রধান। এ বিভাগের প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশে গ্রন্থাগার বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারেই কেবল নয়, গ্রন্থাগার আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এক নবযুগের সূচনা করে। এ বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী পেশাদার গ্রন্থাগারিকরা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে আধুনিক গ্রন্থাগারিকতার গোড়াপত্তন করেন। ২০০৯ সাল থেকে অদ্যাবধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক গ্রন্থাগারিক (ভারপ্রাপ্ত) পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সুষ্ঠু কর্মপরিচালনার লক্ষ্যে গ্রন্থাগারটি বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত। এসব বিভাগ হচ্ছে: পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, প্রশাসন, কারিগরি প্রক্রিয়াকরণ, পাঠক সেবা, সামগী সংগ্রহ বা অ্যাকুইজিশন, রিপ্রোগ্রাফি, হিসাব বিভাগ, সাময়িকী এবং পাণ্ডুলিপি। সামগ্রিকভাবে গ্রন্থাগারের দায়িত্বে আছেন গ্রন্থাগারিক। পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্বে আছেন গ্রন্থাগারিক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন)। এ ছাড়া প্রতিটি বিভাগেরই দায়িত্বে আছেন একজন করে উপগ্রন্থাগারিক। একইভাবে বিজ্ঞান গ্রন্থাগারেরও দায়িত্বে আছেন একজন উপগ্রন্থাগারিক। জনবলের দিক দিয়ে গ্রন্থাগারের বৃহত্তম বিভাগ পাঠক সেবা বিভাগ, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের রিসোর্স সেন্টার ও সংবাদপত্র উপবিভাগ যার অন্তর্ভুক্ত। গ্রন্থাগার ও বিজ্ঞান গ্রন্থাগার মিলিয়ে পাঠক সেবায় নিয়োজিত আছেন মোট ৮৭ জন কর্মকর্তা ও কর্মী। জনবলের দিক দিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম বিভাগ প্রক্রিয়াকরণ শাখা, যাতে নিয়োজিত আছেন ২৫ জন কর্মী। বর্তমানে গ্রন্থাগারে উপগ্রন্থাগারিক, উপপরিচালক, প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা ও প্রধান দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কর্মকর্তাসহ এ পর্যায়ের কর্মকর্তার সংখ্যা মোট ৩১ জন। সহকারী গ্রন্থাগারিক, জ্যেষ্ঠ কারিগরি কর্মকর্তা, সিনিয়র হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পর্যায়ের কর্মকর্তা মোট ৩২ জন। আর জুনিয়র গ্রন্থাগারিক, সেকশন অফিসার, কারিগরি কর্মকর্তা ও গবেষণা কর্মকর্তা পর্যায়ের কর্মকর্তার সংখ্যা ২৪ জন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘসময় ধরে এটি কর্মীস্বল্পতায়, বিশেষত প্রশিক্ষিত কর্মীর স্বল্পতায় ভুগেছে, যা গ্রন্থাগারের সুষ্ঠু কার্যসম্পাদনের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করেছে। সময়ের পরিক্রমায় গ্রন্থাগারে নতুন পদ সৃষ্টি ও কর্মীনিয়োগ হয়েছে। ফলে গ্রন্থাগারের কর্মকাণ্ডের পরিধি বেড়েছে এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ সম্ভব হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা গ্রন্থাগারে নিয়োগ লাভ করেছেন যার ফলে সুপ্রশিক্ষিত কর্মীর অভাব অনেকটাই লাঘব হয়েছে। বর্তমানে (২০২০-২১) গ্রন্থাগারে মোট কর্মীসংখ্যা প্রায় ২০০, যাদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা ৮৮ জন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মী ৪৩ জন ও চতুর্থ শ্রেণির ৬৭ জন। 

গ্রন্থাগার সেবা

সময়ের প্রভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের সেবার পরিসরই কেবল বাড়েনি, এতে যুক্ত হয়েছে বহুমাত্রিকতা। যুগের চাহিদা বিবেচনায় বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। গত এক দশকে তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে প্রথাগত সেবা থেকে প্রযুক্তিভিত্তিক সেবায় স্থানান্তরের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণেও প্রযুক্তিভিত্তিক সেবার প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে বহুগুণে বেড়েছে। বর্তমানে যেসব সেবা দেওয়া হচ্ছে সেগুলো হচ্ছে: ক) পাঠক সেবা, খ) রিপ্রোগ্রাফি সেবা, গ) সার্কুলেশন সেবা, ঘ) ইনস্টিটিউশনাল রিপোজিটরি সেবা, ঙ) অনলাইন জার্নাল সেবা, চ) ডিজিটাইশেন (ই-আর্কাইভস) সেবা, ছ) আইটি সেবা (রিমোট অ্যাকসেস ও ডাটা সেন্টার), জ) রেফারেন্স সেবা, ঝ) দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্রছাত্রীদের জন্য রিসোর্স সেন্টার সেবা, ঞ) সংবাদপত্র সেবা, ট) প্লেজিয়ারিজম চেকিং সফটওয়্যার (Turnitin) সেবা। 

যেকোনো গ্রন্থাগারেই পাঠক সেবায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারেও পাঠক সেবায় নিযুক্ত আছেন সর্বোচ্চসংখ্যক কর্মী। চলমান ডিজিটাইজেশন কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে গ্রন্থাগারের ডিজিটাল ও অনলাইন সেবার পরিসর ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুষ্প্রাপ্য সামগ্রী, সংবাদপত্র, গবেষণাকর্ম ইত্যাদি নিয়মিতভাবে ডিজিটাইজেশন করা হচ্ছে, যা যুক্ত হচ্ছে গ্রন্থাগারের ই-আর্কাইভসে। দৈনিক আজাদ (১৯৩৬-১৯৯২), দৈনিক ইত্তেফাক (১৯৭৪-১৯৯৮), দৈনিক সংবাদ (১৯৮৪-১৯৯৫), দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (১৯৭১-১৯৯৪), অমৃতবাজার পত্রিকা (১৯০৫-১৯৫০), টাইমস অব ইন্ডিয়া (১৯৬১-১৯৮১)-সহ মূলধারার বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার সমৃদ্ধ সংগ্রহ গবেষকদের তথ্যসহায়তা জুগিয়ে চলেছে। গ্রন্থাগারের অন্যতম সেবা অনলাইন জার্নাল সেবা, যার আওতায় গ্রন্থাগারের শিক্ষকবৃন্দ ছাড়াও এমফিল ও পিএইচডি গবেষকবৃন্দ প্রায় ২২ হাজার জার্নাল অনলাইনে পাঠ করতে পারেন। উল্লেখ্য, ২০১৩-১৪ সেশন থেকে গ্রন্থাগারে মুদ্রিত সাময়িকী ক্রয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কেবল অনলাইন সাময়িকীর সাবস্ক্রিপশন চালু আছে। গ্রন্থাগার কর্তৃক প্রদত্ত Turnitin সফটওয়্যারের সেবা গবেষণায় চিন্তাচৌর্য তথা প্লেজিয়ারিজম প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া বহিস্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুরোধের ভিত্তিতে বিশেষায়িত সেবা/অতিথি ব্যবহারকারী সেবাও প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রন্থাগার ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচির আয়োজন করা হয় যাতে কেবল গ্রন্থাগারের পাঠসামগ্রী ও সেবা ব্যবহারই নয়, তথ্য অনুসন্ধান ও ব্যবহার সম্পর্কিত নানা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট, গবেষণা কেন্দ্র ইত্যাদির পক্ষ থেকে গ্রন্থাগার ও তথ্য বিষয়ক অন্যান্য সেবাও চাহিদা অনুযায়ী প্রদান করা হয়। 

গ্রন্থাগার স্বয়ংক্রিয়করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের ওয়েব সাইটটি গ্রন্থাগারের নানাবিধ সেবা ব্যবহারের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দু বা ÔhubÕ হিসেবে কাজ করে। গ্রন্থাগারের অনলাইন ক্যাটালগও ওয়েব সাইটটির সঙ্গে যুক্ত আছে, ফলে পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে যে কেউ ওয়েব সাইটের মাধ্যমে গ্রন্থাগার ক্যাটালগ অনুসন্ধান করতে পারেন। গ্রন্থাগারে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগসহ নানাবিধ প্রযুক্তি উপকরণের ব্যবহার বেশ আগে থেকেই শুরু হলেও একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার আওতায় স্বয়ংক্রিয় গ্রন্থাগার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একুশ শতকের গোড়াতেই সমন্বিত গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়করণের পরিকল্পনা করা হয়। এ উদ্দেশ্যে ২০০৮ সালে গ্রাফিক্যাল লাইব্রেরি অটোমেশন সিস্টেম (GLAS) নামে একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে শুরু হলেও সফটওয়্যারটির বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে বছরখানেকের মধ্যেই এটির ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন-হাউস সফটওয়্যার হিসেবে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষকদের মাধ্যমে DULIS (Dhaka University Library Integrated Software)  সফটওয়্যার উন্নয়নের কাজ হাতে নেওয়া হয়। এরপর ২০১৩ সালে শুরু হয় ওপেন সোর্সভিত্তিক গ্রন্থাগার স্বয়ংক্রিয়করণ সফটওয়্যার কোহা (Koha)-র ব্যবহার। কোহা একটি ওপেন সোর্স সমন্বিত গ্রন্থাগার সফটওয়্যার, যেটি নিউজিল্যান্ডের কাটিপো কমিউনিকেশনস-কর্তৃক তৈরি। এ সফটওয়্যারটির রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত রয়েছে কোহা ডেভেলপারদের একটি অনলাইন কমিউনিটি যারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে আছে। বর্তমানে DULIS সফটওয়্যারের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয়করণ সেবা দেওয়ার প্রয়াস চলমান আছে। DULIS সফটওয়্যারটি মূলত সার্কুলেশন, বার কোডিং ও ব্যবহারীদের আইডি কার্য মুদ্রণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, অন্যদিকে ক্যাটালগ অনুসন্ধানের কাজটি সম্পন্ন করা হচ্ছে কোহার মাধ্যমে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের বিভিন্ন গবেষণাকর্ম রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০১৩ সালে একটি ইনস্টিটিউশনাল রিপোজিটরি (repository.library.du.ac.bd) তৈরি করা হয়েছে যার ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে ডিস্পেস ((DSpace) সফটওয়্যারের মাধ্যমে। উল্লেখ্য, ডিস্পেস একটি ওপেন সোর্স সফটওয়্যার যেটি তৈরি করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ও এইচপি ল্যাবস-এর যৌথ উদ্যোগে। এ রিপোজিটরিতে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ প্রতিবেদন এবং মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডির গবেষণা অভিসন্দর্ভ ছাড়াও শিক্ষকদের গবেষণাকর্মও সংরক্ষিত হচ্ছে। 

উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। সেবা, সংগ্রহ ও সামর্থ্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধির মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারকে পরিপূর্ণভাবে একুশ শতকের উপযোগী একটি গ্রন্থাগার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নিরলস প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও নিয়মিত জরিপ পরিচালনা, সেবাদানের উদ্ভাবনী কৌশল নিয়ে চিন্তাভাবনা ও কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রযুক্তি সতত পরিবর্তনশীল এবং বর্তমান বাস্তবতায় তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবার বিকল্প নেই। কোভিড-১৯-এর কারণে সৃষ্ট মহামারি পরিস্থিতি তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারকে আরও অনিবার্য করে তুলেছে। এ কারণে তথ্যসেবার উদীয়মান নানা প্রযুক্তিতে গ্রন্থাগার কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রন্থাগারের তহবিল বৃদ্ধি ও প্রাপ্ত তহবিলের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের পাশাপাশি গ্রন্থাগারের অবকাঠামোগত সক্ষমতাকেও ক্রমাগত বৃদ্ধি করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম পীঠস্থান। গত এক শতাব্দীর অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় নতুন নতুন অর্জনকে সঙ্গী করে এ গ্রন্থাগার এগিয়ে যাবে, এটিই সবার কাম্য।

লেখক: অধ্যাপক, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভালোবাসা বটমূলে

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২২ পিএম
ভালোবাসা বটমূলে
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

ভোর ৫টায় মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতেই শমীকের ঘুম ভেঙে গেল। ডানপাশে টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে দেখে স্ক্রিনে তার বন্ধু চন্দন রায়ের নাম।
‘কীরে শমীক, ঘুম ভেঙেছে? আজ পয়লা বৈশাখ, মনে আছে তো?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে। আমি ৬টার আগেই বটমূলে পৌঁছাতে চাই। তুই সময়মতো রমনা পার্কের প্রধান গেটে গিয়ে অপেক্ষা করবি, আমরা একসঙ্গে ভেতরে যাব।’
‘ঠিক আছে দোস্ত, আজ সারা দিন আমরা একসঙ্গে কাটাব। বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখব, গান শুনব। তার পর যাব চারুকলায়, মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখব, ওদের সঙ্গে হাঁটব।’
‘তার পর আমরা যাব ধানমন্ডি লেকের পাড়ে, ওখানে নববর্ষের অনেক অনুষ্ঠান হয়। খাওয়াদাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থাও থাকে। আজ দুপুরের খাওয়া ওখানেই হবে।’
‘সবই ঠিক আছে, সবই হবে। কিন্তু তোর গার্লফ্রেন্ড চৈতি আজকের দিনে আমাদের সঙ্গে থাকবে না, এটা ভাবতেও আমার খারাপ লাগছে। আগে প্রতিটি পয়লা বৈশাখে আমরা তিনজন একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম, কত আনন্দ করতাম। হঠাৎ তোদের কী হলো? তোরা আড়ি দিলি কেন?’
‘আমি তো আড়ি দিইনি, ওই দিয়েছে। মেয়েটা বড় সেনসিটিভ, ওর আঁকা পেইন্টিং নিয়ে ঠাট্টা করে কিছু একটা বলতেই ও রেগে গেল, কথা বন্ধ করে দিল। তিন মাস হয়ে গেল আমাকে ফোন করে না, ফোন ধরে না। দেখা হলে কথাও বলে না।’
‘ঠিক আছে, আজ যদি চৈতিকে বটমূলে পাই, আমি কথা বলব ওর সঙ্গে। আড়ি ভাঙিয়ে তোদের ভাব করিয়ে দেব। চিন্তা করিস না। এখন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে যা। ৬টার মধ্যেই বটমূলে পৌঁছতে হবে।’ 

২.
শমীক মাহমুদ ও চন্দন রায় দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র। তৃতীয় বর্ষ অনার্সে ওরা পড়ছে। শমীক থাকে শহীদুল্লাহ হলে, জগন্নাথ হলে থাকে চন্দন। ওরা এইচএসসি পাস করেছে একই সঙ্গে ঢাকা কলেজ থেকে। সেখানে হোস্টেলে থেকেছে একই রুমে। শুরু থেকেই ওদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব। শমীক কবিতা লেখে স্কুলজীবন থেকেই। এখন তার কবিতা প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়। কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বন্ধু চন্দন কবিতা না লিখলেও শমীককে কাব্যচর্চায় উৎসাহ দেয়। 
শমীক ও চন্দন দুজনেই চিত্রশিল্পের অনুরাগী। চারুকলা ইনস্টিটিউটে কোনো প্রদর্শনী থাকলে ওরা যাবেই। এ কারণেই চারুকলায় তাদের যাতায়াত ছিল। এমনি এক চিত্র প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে ওদের পরিচয় হয়ে গেল ফাইন আর্টস বিভাগের ছাত্রী চৈতি রহমানের সঙ্গে। চারুকলা চিত্রশিল্প নিয়ে কথা বলতে বলতে ওদের সম্পর্ক, আরও ঘনিষ্ঠ হলো। শমীক কবিতা লেখে জেনে চৈতি খুশি হলো। সেও কবিতা পছন্দ করে, মাঝেমধ্যে লিখেও ফেলে। 
ওদের প্রায়ই দেখা যায় টিএসসি অথবা মধুর রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে, চা খাচ্ছে। কখনো ওরা বেইলি রোডের কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসে। শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানেও যায়, নাটক দেখে। এভাবে দিন গড়িয়ে যায়, ওদের লেখাপড়াও এগিয়ে চলে। 
চন্দন একদিন বুঝতে পারে শমীক ও চৈতির সম্পর্কটা বন্ধুত্বের পর্যায় ছেড়ে আরও কিছুটা এগিয়ে গেছে। চৈতির প্রতি চন্দনের দুর্বলতা ছিল ঠিকই, কিন্তু সে বাস্তববাদী। বাস্তবকেই মেনে নেয় চন্দন। নিজেকে সে গুটিয়ে নিতে থাকে ওদের কাছ থেকে। মনে মনে বলে, ‘সত্য যে বড়ই কঠিন/ সে কখনো করে না বঞ্চনা/ তাই কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’ 
কিন্তু শমীকের কাছে ধরা পড়ে যায় চন্দন। শমীক তাকে সরাসরি প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে তোর? তুই আমাদের কাছ থেকে দূরে থাকিস কেন?’
‘দূরে কোথায়, তোদের কাছেই তো থাকি। আমাকে ডাকলেই পাওয়া যায়।’
‘তা পাওয়া যায়, কিন্তু ডাকতে হবে কেন? আমরা তিনজন একসঙ্গে ছিলাম, এক সঙ্গেই থাকতে চাই। কিন্তু তুই একটু দূরে সরে গেছিস। কেন বুঝতে পারছি না। তাই জানতে চেয়েছি কী হয়েছে।’
এবার চন্দন হেসে ফেলে। শমীকের পিঠে হাত রেখে বলে, ‘কিছুই হয়নি দোস্ত, সব ঠিক আছে। আমি তোকে খুব ভালোবাসি, সব সময় তোর ভালোটাই আমি চাই। তাই তোর পথ থেকে একটু সরে দাঁড়ালাম। তোরা দুজন এগিয়ে যা। আমি তোদের পাশে না হলেও ঠিক পেছনে আছি।’ 
‘না, আমি তোকে আমার পাশেই চাই। আমরা তিনজন আগের মতোই একসঙ্গে থাকব, একসঙ্গে ঘুরে বেড়াব। একজনকে পাওয়ার জন্য তোকে আমি হারাতে চাই না চন্দন।’
‘বোকার মতো কথা বলছিস শমীক। আমি তো হারিয়ে যাচ্ছি না। তোদের সঙ্গেই থাকব। আমি শুধু তোদের দুজনকে স্থায়ীভাবে এক করে দিতে চাই। তোর আর চৈতির জুটিটা চমৎকার হবে। একজন কবি, আরেকজন শিল্পী, তোদের দুজনেরই কাজ অনেক সুন্দর হবে, সৃষ্টিশীলতা অনেক বাড়বে।’

৩.
সেদিন বাংলা নববর্ষ-পয়লা বৈশাখ। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল। ভোর ৬টার মধ্যেই শমীক পৌঁছে যায় রমনা পার্কের প্রধান গেটে। গিয়ে দেখে চন্দন আগেই এসেছে সেখানে।
‘শুভ নববর্ষ শমীক। তোকে অনেক ধন্যবাদ, সময়মতো এসেছিস। হালকা নীল রঙের পাঞ্জাবি পরেছিস, তোকে খুব মানিয়েছে।’
‘শুভ নববর্ষ চন্দন। হ্যাঁ, এই পাঞ্জাবিটা আমার খুব পছন্দের। গত বছর নববর্ষে চৈতি উপহার দিয়েছিল। একবার ভাবলাম এটা আর পরব না। তার পরেই মনটা কেমন হয়ে গেল। এটাই পরে ফেললাম।’
‘খুব ভালো করেছিস। তোকে এই পাঞ্জাবি পরা দেখলে চৈতির মনটাও নরম হয়ে যাবে। তোদের মান-অভিমানের মীমাংসা আজই করে ফেলব। চল বটমূলের দিকে যাই। দেখি চৈতি এসেছে কি না।’
ওরা দুজন মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে থাকে। তখন ঘড়িতে সোয়া ৬টা। নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ এসে গেছে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে। নবীন-প্রবীণ সব বয়সী মানুষ আসছেন রমনায়, অনেক দম্পতির সঙ্গে তাদের শিশু সন্তানও আছে। 
রমনার প্রাঙ্গণে জনতার ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। বেশির ভাগ পুরুষের পরনে পাঞ্জাবি-সাদা অথবা রঙিন। মেয়েরা প্রায় সবাই লালপাড় সাদা শাড়ি পরেছে। চুলে কানের পাশে অথবা খোঁপায় ফুল গুঁজেছে অনেকেই। অল্পবয়সী মেয়েরা ফুলের রিং মাথায় দিয়ে হাসি-উল্লাসে মেতেছে। তরুণ-তরুণীদের জটলা এখানে-ওখানে। সকালের নরম রোদ আর স্নিগ্ধ বাতাস, আনন্দ-মুখর মানুষের সমাবেশ আর বর্ষবরণের গান, রমনার প্রাঙ্গণকে নতুন রূপে সাজিয়েছে। 
‘এটাই বাঙালির বর্ষবরণ। এক সময় পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন হতো শুধু গ্রামাঞ্চলে, এখন এটা এসে গেছে শহরে, নগরে। ঢাকা মহানগরীতে নববর্ষের অনুষ্ঠান বেশি হয়। তাই না শমীক?’
‘ঠিকই বলেছিস চন্দন। পাকিস্তানি শাসনামলে ওরা বলত পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ উদ্‌যাপন এ দেশের সংস্কৃতি নয়, ওটা ভারতীয় সংস্কৃতি। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঘোষণা করলেন, পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন করতে দেওয়া হবে না। ফলটা কী হলো? বাঙালিরা খেপে গিয়ে আরও বেশি করে নববর্ষ উদ্‌যাপন করতে থাকে। রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান শুরু হয় ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। প্রতি পয়লা বৈশাখে ছায়ানটের অনুষ্ঠান এখনো চলছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু একবার বন্ধ ছিল।’
চন্দন লক্ষ করে শমীক যখন কথা বলছে, তার চোখ এদিকে-ওদিকে কাকে যেন খুঁজছে। বোঝা গেল শমীকের চোখ খুঁজছে চৈতিকে। চন্দন চুপ করে থাকে, কিছু বলার তো নেই। যে করেই হোক আজ চৈতিকে খুঁজে বের করতেই হবে। 
হঠাৎ চন্দনের সামনে এসে দাঁড়ায় ওদের সহপাঠী অপর্ণা বড়ুয়া। অপর্ণা হেসে বলে, ‘শুভ নববর্ষ। তা তোমরা দুজন কেন, আরেকজন কোথায়?’
‘কার কথা বলছ অপর্ণা?’ শমীক জানতে চায়।
‘ন্যাকা। কিছুই বোঝ না? চৈতি কোথায়? তোমাদের সঙ্গে নেই কেন?’
‘চৈতি এখনো আসেনি, আসবে।’
‘আসবে বলছ কেন? ও তো এসে গেছে। বটমূলে অনুষ্ঠানের ডানদিকে দাঁড়িয়ে গান শুনছে। লালপাড়, সাদা শাড়ি, কপালে লালটিপ, ওকে কী সুন্দরই না লাগছে। বেচারা একা দাঁড়িয়ে আছে। তোমরা ওর কাছে যাও।’
চন্দন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। শমীকের হাত ধরে বলে, ‘চলো দোস্ত বটমূলে যাই। চৈতি তোর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।’
‘তুই যা। ওকে আমার কাছে আসতে বল।’
‘ঢং করিস না তো। ওটা মেয়েদের মানায়, পুরুষদের নয়। চল আমার সঙ্গে।’ 
শমীকের হাত ধরে চন্দন এগিয়ে যায় বটমূলের দিকে। তখন সকাল ৮টা বাজতে কিছু সময় বাকি। বহু মানুষ বিশাল বটগাছের ছায়ায় বসে গান শুনছে-বর্ষবরণের গান। বটমূলে নিচ থেকে ওপরে, সারি সারি কাঠের বেঞ্চ দিয়ে তৈরি বিরাট মঞ্চে বসে ছায়ানটের শিল্পীরা গান গাইছে। শিল্পীদের মধ্যে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, সবাই আছে। এরা সবাই ছায়ানটের শিক্ষার্থী। একই রঙের পোশাক পরেছে। 
বটমূলে মঞ্চের ঠিক বিপরীত দিকে এসে দাঁড়ায় শমীক ও চন্দন। ওদের সামনেই বিপুল সংখ্যক শ্রোতা মাঠে বসে গান উপভোগ করছে। মাঠের একপাশে উঁচু প্লাটফর্মে বিটিভির ক্যামেরা দিয়ে অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার চলছে। 
চন্দনের চোখ হঠাৎ গেল ডানদিকে। সে দেখে চৈতি দাঁড়িয়ে আছে আরও অনেক মানুষের সঙ্গে। তাকিয়ে আছে এই দিকে। লালপাড় সাদা শাড়িতে ওকে অপূর্ব লাগছে। 
‘শমীক, ওই দ্যাখ তোর চৈতি, এদিকেই তাকিয়ে আছে। যা ওর কাছে।’
শমীক যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই বিকট শব্দে একটা বিস্ফোরণ। একটি শক্তিশালী বোমা ফেটেছে বসে থাকা শ্রোতাদের মাঝখানে। ধোঁয়া, বারুদের গন্ধ, আহত মানুষের আর্তনাদ। শিল্পীদের গান থেমে গেছে। মানুষের হুড়োহুড়ি, সবাই ছুটে যাচ্ছে যে যেদিকে পারে। পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী, সবাই যাচ্ছে আহতদের উদ্ধার করতে। 
কিছুক্ষণ পরেই আর একটি বোমা ফাটল একই জায়গায়। শমীক যখন কোনোদিকে যাবে ভাবছে, ঠিক তখনই তাকে কেউ জড়িয়ে ধরল সামনের দিক থেকে। শমীক দেখে একজন নারী তাকে জড়িয়ে ধরেছে। তার চুলের গন্ধ আর দেহের স্পর্শে শমীক বুঝতে পারে এ তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয়বান্ধবী চৈতি। ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। শমীক ওকে শক্ত করে ধরে রাখে। 
‘ভয় নেই চৈতি। আমি তো আছি তোমার সঙ্গে। চলো আমরা এখান থেকে অন্যদিকে যাই।’

নববর্ষের উৎসব: উৎস থেকে নিরন্তর

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
নববর্ষের উৎসব: উৎস থেকে নিরন্তর
ছবি: খবরের কাগজ

বাঙালির উৎসবের আয়োজনে সামর্থ্যের চেয়ে অতিশয়োক্তি থাকে বৈকি। জাতি হিসেবে এ ধারা আমাদের উৎসবমুখর বললে বাড়িয়ে বলা হবে না বোধকরি।

উৎসব মানেই আনন্দ, হইহুল্লোর, খাওয়াদাওয়া, বেড়ানো- কত কী। বাঙালির জীবনে ঈদ, পূজা ও বাংলা নববর্ষ বড় উৎসব। ঈদ ও পূজা ধর্মীয় উৎসব হলেও বাংলা নববর্ষ সব ধর্মের মানুষ উদ্‌যাপন করে এ জন্য এ উৎসব সর্বজনীন। একসময় গ্রাম বাংলায় নববর্ষকে ঘিরে গ্রামের মেলা, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, ঘুড়ি ওড়ানোসহ নানা আয়োজনে নববর্ষকে কেন্দ্র করে আনন্দের ধুম পড়ে যেত। স্মৃতির খাতার পাতা উল্টিয়ে আজও উঁকি দেয় ছোটবেলার গ্রামের মেলার কাঁচাগোল্লা, গরমজিলিপি, খাজা, মাটির পুতুল, ঘোড়াসহ হরেক রকম জিনিস। নাগরদোলার দোল যেন আজও মনে দোলা দেয়। নববর্ষের মেলার মাটির খেলনা ছোটবেলায় যজ্ঞের ধন মনে হতো। সময় বদলে নববর্ষের উৎসব ভিন্ন আঙ্গিকে রূপ নিয়েছে। সরকার বাংলা নববর্ষে সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি একটি উৎসব ভাতা প্রদান করায় বাংলা নববর্ষের আয়োজনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। 

প্রতি বর্ষের সমাপ্তে বাংলা নববর্ষ হাজির হচ্ছে বৃহৎ পরিসরে বাঙালির জীবনে। বাংলা নববর্ষ দিনদিন পরিসর বৃদ্ধি করে রং ছড়াচ্ছে। মানুষের গায়ের জামা থেকে শুরু করে মঙ্গল শোভাযাত্রার পাপেটের রং ও বৈচিত্র্যে ভরপুর। উৎসবের আমেজে বাঙালি নববর্ষে সাজায় নিজেকে নতুন কাপড়ের মোড়কে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে বাঙালিয়ানাকে ধারণ করে আমরা জীবনের চলার পথের নতুন আনন্দ খুঁজে পাই। যদিও সারা বছরে নববর্ষের বাঙালিয়ানার রক্ষক আমরা থাকি না। তবু নববর্ষ জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে এক সর্বজনীন উৎসব। বাঙালির মহামিলনের একটি উপলক্ষ। 

বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস পাঠ মত-মতান্তরে ভরপুর। বাংলা নববর্ষের প্রচলন- এমনকি ছায়ানটের নববর্ষের উদ্‌যাপনের সূচনার ইতিহাস নিয়েও মত-মতান্তর রয়েছে। কবে, কোথায়, কে বা কারা করেছিলেন এরূপ প্রশ্ন ছুড়লে বাংলা নববর্ষের উৎপত্তির ইতিহাস তর্কের বেড়াজালে জড়িয়ে যায়। আর যারা এসব বিষয় নিয়ে চর্চা করেন তারা সমাধানে পৌঁছনোর চেয়ে নিজের শক্ত বা নরম-যুক্তি যাই হোক না কেন- সেই অবস্থানেই থিতু হয়ে থাকতে চান। বাংলা নববর্ষের প্রবর্তনের ইতিহাসে অনেকের নাম এলেও সবচেয়ে আলোচিত ও প্রচলিত নামটি হচ্ছে মুঘল সম্রাট জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবরের। মুঘলরা মুসলিম হিসেবে রাজ্য শাসন অনুসরণ করত হিজরি সন অনুযায়ী। হিজরি সন চান্দ্র সন। সমস্যা হচ্ছে হিজরি সন সৌরবর্ষের চেয়ে ১০-১১ দিন ছোট। ফলে গাণিতিক হিসেবে তিন বছর অন্তর সৌর সনের চেয়ে হিজরি সন এক মাস এগিয়ে আসে, এভাবে আকবরের সিংহাসন আরহণের সময় ১৫৫৬ খ্রি. থেকে শুরু করে মোট ২৯ বছর রাজত্বকালে প্রচলিত শতাব্দের সঙ্গে হিজরি সনের সময় তারতম্য ঘটেছিল ৯ মাসের।

আরেকটি বড় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল খাজনা আদায় নিয়ে। কারণ মুঘলরা হিজরি সনের অনুসারী হয়ে রাজ্য পরিচালনা করলেও হিজরি সনের মাসগুলো মৌসুম ঋতুকেন্দ্রিক ছিল না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ফসল কাটার সময় নির্দিষ্ট করে খজনা আদায়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের অর্থনীতি ছিল কৃষিভিত্তিক। তখনকার জনজীবন মূলত কৃষির আবহে চলত। কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ে সুবিধার জন্য আকবর তারিখ-ই-ইলাহি সন বলে নতুন সন চালু করেছিলেন। মূলত আকবরের আদেশে দরবারের সেরা পণ্ডিত জ্যোতিষ শাস্ত্রবিদ আমির ফাতেহ উল্লাহ্ সিরাজি বাংলা সনের উদ্ভাবন করেন। ফাতেহ উল্লাহ সিরাজি আকবরের সিংহাসনে আরোহণের তারিখ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৫৫৬ খ্রি.-কে ভিত্তি ধরে সন গণনা শুরু করেন। সেই থেকে বাংলা সনের পথচলা। একটি বিষয় বলে রাখা উচিত আকবরের প্রচলিত সর্বজনীন নতুন ধর্ম ‘দ্বিন-ই-ইলাহি’ ও তারিখ-ই-ইলাহির সময়কাল অভিন্ন। কালের আবর্তে দীন-ই-ইলাহি পথ চলতে না পারলেও আকবরের নির্দেশে ফতেহ উল্লাহ্ সিরাজি প্রবর্তিত বাংলা সনকে কার্যকর করেছিলেন আকবরের সজ্ঞা ও প্রজ্ঞায় ঋদ্ধ অর্থ উপদেষ্টা টোডরমল। তিনি ১৫৮৫ খ্রি. ১০ মার্চ ইলাহি সনের কার্যকরণ ঘটান। এ সময় থেকে বাংলায় খাজনা আদায়ে বাংলা সন গণনা করা হয়। উল্লেখ্য, বাংলা সন প্রবর্তনের আগে হিসাব সমন্বয়ের কাজটি জটিল ছিল। কারণ উপমহাদেশে শতাব্দসহ হিসাব ছিল সৌর বর্ষ। কিন্তু হিন্দু-মুসলিম বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি চন্দ্র মাসের হিসাবে মান্য করা হতো। সৌরবর্ষ যেহেতু হিসাবের নিক্তিতে তিন বছর অন্তর এক মাস এগিয়ে যেত তাই হিসাবের সুবিধার্থে প্রতি তিন বছর অন্তর প্রাচীন আরবি রীতির মতো এক মাস নামমন্ত্র হিসাবে সংযোগ করে বাদ দেওয়া হতো। গোঁজামিলের এ পদ্ধতির নাম ছিল ‘সাবনমিতি’। 

চন্দ্রমাস ও সৌরবর্ষের ব্যবহারের প্রাচীন রীতির একটি সমন্বয় ও সরলীকরণের মানসেই আকবর বাংলা সনের প্রচলন করেছিলেন। সৌরবর্ষ ও চন্দ্রবর্ষের সমন্বয়ে বাংলা সন ও মাসে সৌর ও চন্দ্রের রেশ বয়ে যায়। যেমন বিশাখা নক্ষত্রের আদলে নাম বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠা নক্ষত্রের আদলে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া নক্ষত্রের আদলে আষাঢ়, শ্রবণা নক্ষত্রের আদলে শ্রাবণ, ভাদ্রপদা নক্ষত্রের নামের আদলে ভাদ্র, অশ্বিনী নক্ষত্রের আদলে আশ্বিন, কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে কার্তিক, আমন থেকে অগ্রহায়ণ, পুষ্য নক্ষত্র থেকে পৌষ, মঘা নক্ষত্রের আদলে মাঘ, ফাগুনী নক্ষত্র থেকে ফাগুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র।

ওপরের বর্ণনা তো গেল আকবর অখ্যান। কিন্তু বাংলা সনের ব্যুৎপত্তির উৎসে আকবরের নাম ছাড়া তো আরও কিছু নাম, স্থান ও সময়ের সংযোগ রয়েছে। বাংলা সনের হিসাবের সূত্রপাতে আকবরের পাশে পেরেক ঠুকে নাম আছে- রাজা শশাঙ্ক তিব্বতের রাজা রিস্প্রভ-সন, বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্, মুর্শিদ কুলি খাঁসহ আরও অনেকের নাম। তবে বাংলা সন প্রবর্তক হিসেবে মহামতি আকবরের পাল্লাই ভারী। আকবর ছিলেন সুন্নি মুসলিম। তার জাতিসত্তার ঐতিহ্য ছিল তুর্কি আতর মাখা। জাতিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে মুঘলরা ছিল ইন্দো-পারসিক। শাসক হিসেবে আকবর বিচক্ষণ ছিলেন। তার আমলেই মুঘল রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয়েছিল। তিনি সৌর ও চন্দ্রবর্ষের সমন্বয় করে প্রজাদের ফসল তোলার সময় বর্ষের গণনা শুরু করেছিলেন সুদূরপ্রসারী ধ্যান ও ধারণা থেকে। তিনি দিব্যদৃষ্টিতে বুঝেছিলেন প্রজাদের আর্থিক সচ্ছলতার সময় খাজনা আদায় সুবিধাজনক। আকবরের বাংলা সনে প্রজাদের খাজনা নবায়নের পাশাপাশি বাংলায় বাংলা সনের শুরুতে ব্যবসায়ীদের হালখাতা প্রচলন ধীরে ধীরে রেওয়াজে পরিণত হয়। তবে বাঙালি সমাজে নববর্ষকে নাগরিক মোড়কে নানা রঙে উৎসবের ডামাডোলে গ্রহণের রেওয়াজ সাম্প্রতিক। বাঙালির জীবনের বিশেষত ঢাকার নাগরিক সমাজে নববর্ষ বরণের প্রসঙ্গ এলেই প্রভাতে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ সংগীতের কথা আসে। ছায়ানটের বর্ষবরণে শুরুর সময়ে ১৯৬৪, ১৯৬৫, ১৯৬৭ সালের দাবি আছে। তবে ড. সন্জিদা খাতুনের লেখার তথ্য হলো, ‘১৯৬৭ সালের ১৫ এপ্রিল শনিবার ছিল পয়লা বৈশাখ। অবজারভার ১৪ তারিখের কাগজে নতুন বছরকে আবাহন করেছে- welcome pahela Baishakh শিরোনামে। সে বছর দেশের নানা অঞ্চল থেকে বর্ষবরণের খবর আসে ঢাকায়। প্রত্যুষে ছায়ানটের অনুষ্ঠান, এ বছরেই প্রথম রমনার বটমূলে। 

অবজারভার পত্রিকা পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনের ছবি ছাপে। এতে দেখা যায় হার্মোনিয়ামে আছে শাহীন আক্তার, তানপুরা বাজিয়ে গান গাইছেন মাহমুদুর রহমান মাহমুদ (বেনু)। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৬৭ সালের নববর্ষে শহিদ মিনার থেকে প্রভাতফেরি শুরু করেছিল।’

পয়লা বৈশাখে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎসবের আয়োজন নগরের গণ্ডি পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে নববর্ষে যে বাঙালিয়ানা পরিচয়ে প্রকাশিত- আমরা সারা বছর সেই ভাবনা ও চর্চা থেকে দূরে থাকি। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রার মঙ্গল কামনায় মানুষের ঢল আমাকেও তাড়িত করে। কিন্তু প্রতিদিন আটপৌঢ়ে বাঙালি জীবনচর্চার মেলবন্ধন থেকে আমাদের সরে যাওয়া কাঙ্ক্ষিত নয়। মাঝে মাঝে সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনে সরকার কিছু নির্দেশনাও জারি করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই দূরে থাকে। আমরা বাংলা দিন তারিখ এমনকি অনেক সময় মাসের নামও মনে রাখি না। 

শুধুই নববর্ষে বাঙালির হাজার বছরের লৌকিক আচারকে প্রতীকীরূপে ধারণ ও পালন করা নববর্ষের তাৎপর্য হতে পারে না। নববর্ষের নানা রঙের সঙ্গে মিশে আছে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। ধর্ম ও সংস্কৃতিভেদে আমাদের জাতিগত ইতিহাসের পথ পরিক্রমণের সমন্বয়সূত্র। নববর্ষের নব আভায় আমাদের প্রাচীন ইতিহাসের শিকড়ের অনুসন্ধান প্রয়োজন।

বাংলা নববর্ষের উৎসবের পরিবর্তনে আমাদের গ্রামবাংলার নববর্ষের মেলাগুলোর রূপান্তর সবচেয়ে বেশি। গ্রাম্য নববর্ষের মেলায় কিছুদিন আগেও বাতাসা, কদমা, চিনির সাজ, জিলাপি, তিলের খাজা, গজা, ঝুরি, ইত্যাদি ছিল অন্যতম উপকরণ। এ ছাড়া গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় সব উপকরণ যেমন- চাষের লাঙল, জোঁয়াল, মই, ডালা, ঢেঁকি, চালুন, কুলা, শীতলপাটি ইত্যাদি পাওয়া যেত। এখন গ্রাম্য মেলায় শহরের জিনিসপত্র বেশি দেখা যায়। লোকজ বাংলার গ্রাম্য মেলার উপকরণগুলো আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

গ্রাম্য মেলাগুলোর চিরায়ত রূপ পরিবর্তন বৈশাখী নববর্ষের রূপের সঙ্গে বড়ই অপরিচিত। বাঙালির বর্ষবরণের অসাম্প্রদায়িক চেতনার খবর ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। এখন শুধু চর্চা ও চেতনায় প্রয়োজন বাঙালিয়ানা ধারণ ও লালন করার বছরব্যাপী প্রত্যয়ের। তবেই আমাদের পথচলায় প্রকাশ পাবে নববর্ষের বাঙালির জাতিসত্তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের।

নববর্ষের উৎসবের শেকড়ের সন্ধান যেমন ছিল একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির নবায়ন ও নিরন্তর যাত্রার উপলক্ষ ছিল আজ নববর্ষের উৎসবের মোড়কি রূপ আরও ঝকমকে হয়েছে- কিন্তু কমেছে ভূমিজ সংস্কৃতির কর্ষণের উত্তাপ। তাই আজও মনোজমিনে হারিয়ে খুঁজি শৈশবের নববর্ষের ‘মদনার মার’ মেলার কাঁচাগোল্লা ও মাটির খেলনা।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

বাংলাদেশ অপূর্ব ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের প্রকৃতির রূপ-রসের বদল ঘটে। হাজার বছর ধরে চক্রাকারে এ বদল ঘটে আসছে। কীভাবে এবং কেমন করে এ বদল ঘটে- তার স্বরূপটি ধরা আছে আমাদের হাজার বছরের সাহিত্য ও সংগীতে। বাংলা সাহিত্যের পাঠক মাত্রই তা জানেন। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতির চালচিত্র ছিটাফোঁটা থাকলেও মধ্যযুগের সাহিত্যে বিধৃত হয়েছে। কালকেতু উপাখ্যানে ফুল্লরার বারোমাস্যায় সব ঋতুরই বিবরণ আছে। বৈষ্ণব-পদাবলিতে ঋতুবদলের সঙ্গে প্রকৃতির রূপের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। রাধার প্রেমানুভূতির নানামাত্রিক প্রকাশও অনেকটা ঋতুসাপেক্ষ। বাংলা আধুনিক সাহিত্যে মানব জীবনের অনুষঙ্গে এ দেশের ঋতু ও প্রকৃতির উপস্থিতি কোনো কোনো সাহিত্যিক অবিস্মরণীয় করে রেখেছেন; এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জসীম উদদীন, বন্দে আলী মিয়া প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। এমনকি তিরিশোত্তর আধুনিক কবিদের মুখ্যজন জীবনানন্দ দাশ হেমন্ত ঋতুকে বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী করে গেছেন।

রবীন্দ্রনাথ তার নানাবিধ সৃজনকর্মে- বিশেষত কাব্য, নাটক, ছোটগল্প, সংগীত, চিঠিপত্র ইত্যাদি রচনায় বাংলার ঋতুভিত্তিক প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্য চিত্রিত রেখেছেন। তিনি গীতবিতানের গানগুলোর বিষয়ভিত্তিক যে বিন্যাস করেছেন তাতে প্রকৃতি পর্যায়ের ২৮৩টি গান আছে। এ ছাড়া গীতবিতানের প্রেম ও প্রকৃতি পর্যায়ের গান এবং  গীতিনাট্যের কিছু গানেও প্রকৃতির প্রসঙ্গ লক্ষণীয়। 

রবীন্দ্রনাথ রচিত, আমাদের বাল্যকালে স্কুলপাঠ্য, সেই অবিস্মরণীয় (সহজপাঠ, প্রথম ভাগ, প্রকাশকাল: বৈশাখ ১৩৩৭) কবিতা ‘আমাদের ছোট নদী’। এর প্রথম দুটি পঙ্‌ক্তি বাঙালি-পড়ুয়া মাত্রই স্মরণ করতে পারেন: ‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে,/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’ কবিতাটির দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিতেই ‘বৈশাখ’ মাসের উল্লেখ আছে। এ কবিতায় বৈশাখের প্রকৃতি-পরিবেশ কবি পঙ্‌ক্তিবদ্ধ করেছেন। বৈশাখের রুক্ষতা, দাবদাহ, প্রায় জলশূন্য হাঁটুজলের নদী এবং এরকম অনুষঙ্গে যে জঙ্গম মানবজীবন তারই চালচিত্র রয়েছে রচনাটিতে। বাঙালি কিশোর-কিশোরীর চিরকালীন দুরন্ত ছেলেবেলার চিত্র পাই বৈশাখের হাঁটুজলের নদীর বিবরণে: ‘তীরে তীরে ছেলেমেয়ে নাহিবার কালে/ গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।/ সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে/ আঁচলে ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।’

বাংলা নববর্ষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা ‘নববর্ষে’। কবিতাটি চিত্রা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত। এর রচনাকাল পয়লা বৈশাখ ১৩০১। প্রত্যক্ষভাবে বৈশাখের কথা উল্লেখ না করলেও মূলত বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে (বৈশাখের প্রথম দিন) কবির উপলব্ধি কী তা অভিব্যক্ত হয়েছে এভাবে: ‘আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন/ করিলাম নত।/ বন্ধু হও, শত্রু হও,/ যেখানে যে কেহ রও,/ ক্ষমা করো আজিকার মতো/ পুরাতন বর্ষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।’ কিন্তু নববর্ষের শুভলগ্নটি কবির কাছে আনন্দবেদনা মিশ্রিত: ‘এসো এসো নতুন দিবস/ ভরিলাম পুণ্য অশ্রুজলে/ আজিকার মঙ্গলকলস।’ 

রবীন্দ্রনাথের কল্পনা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘বৈশাখ’ শিরোনামের কবিতাটি বেশ জনপ্রিয়। রচনাকাল ১৩০৬। বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান এ কবিতাপাঠ ছাড়া যেন সম্পন্ন হয় না। বাংলা মাসগুলোর মধ্যে বৈশাখ মাসের যে স্বতন্ত্রতা রয়েছে তা এ কবিতা পাঠে সুস্পষ্ট হয়। বৈশাখ দিয়ে বাংলা নববর্ষের সূচনা। এ মাসটির বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।/ ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,/ তপ্তঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল/ কারে দাও ডাক/ হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।’ বৈশাখ যে রুদ্র কালবৈশাখী নিয়ে আসে তার ভয়ংকর রুদ্ররূপ রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেন: ‘কী ভীষ্ম অদৃশ্য নৃত্যে মাতি উঠে মধ্যাহ্ন-আকাশে/ নিঃশব্দ প্রখর/ ছায়ামূর্তি তব অনুচর!’ কেবল তো ঝড়ঝঞ্ঝা নয়, বৈশাখের তীব্র দাবদাহও রয়েছে। কবি বৈশাখের মধ্যে প্রবল শক্তির উন্মত্ততাও প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাকে আবাহন করছেন: ‘দুঃখ সুখ আশা ও নৈরাশ/ তোমার ফুৎকারক্ষুব্ধ ধুলা-সম উড়ুক গগনে...।’ বৈশাখের শুধু শক্তিমত্ততা প্রত্যক্ষণ নয়, কবির প্রত্যাশা: ‘হে বৈরাগী করো শান্তি পাঠ/ উদার উদাস কণ্ঠ যাক ছুটে দক্ষিণে ও বামে,/... পূর্ণ করি মাঠ।/ হে বৈরাগী করো শান্তি পাঠ।’

বৈশাখ কেবল ‘ভৈরব’ ও ‘রুদ্র’ রূপের জন্য কবির কাছে আগ্রহের মাস নয়। এ মাসেই তার জন্মের শুভক্ষণ। তাই পঁচিশে বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন কবিতা লিখেছেন তেমনি অবিস্মরণীয় গানও রচনা করেন। কবিতাটি পূরবী কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘পঁচিশে বৈশাখ’ (রচনা ২৫ বৈশাখ ১৩২৯)। জন্মদিন নিয়ে কবির উচ্ছ্বাস-আনন্দ এবং কৌতূহল: ‘রাত্রি হল ভোর।/ আজি মোর/ জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,/ প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি/ হাতে করে আনি/ দ্বারে আসি দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।’  কবি উপলব্ধি করেন তার জন্ম দিবসটি ‘নানা বেশে ফিরে আসে ধরণীর পরে’। তাই দিবসটির একটিমাত্র তাৎপর্য নয়। প্রতি বছর ফিরে আসা ‘পঁচিশে বৈশাখ’ চির এক নতুনকে নিয়ে এসে কবির জন্মদিনকে ভিন্নতর তাৎপর্য দেয়। তিনি লক্ষ করেন: ‘এই দিন এলো আজ প্রাতে/ যে অনন্ত সমুদ্রের শঙ্খ নিয়ে হাতে,/ তাহার নির্ঘোষ বাজে/ ঘন ঘন মোর বক্ষোমাঝে।/ জন্ম-মরণের দিগ্বলয়-চক্ররেখা জীবনেরে দিয়েছিল ঘের,/ সে আজি মিলাল।’ জন্ম-মৃত্যুর অনিবার্যতা জীবনকে রুদ্ধ করেছিল- তা নতুন জন্মদিনের কাছে পরাভূত হলো। আর তখন নতুন এক পঁচিশে বৈশাখ ‘শুভ্র আলো/ কালের বাঁশরি হতে উচ্ছ্বসি যেন রে/ শূন্য দিল ভরে।’ প্রতিবার পঁচিশে বৈশাখ কবির কাছে ফিরে এসে কেবল তার শূন্যতা দূর করে তা নয়, পূর্ণতাও দান করে ‘শুভ্র আলো’ দিয়ে। জন্মদিনে কবির উপলব্ধি: ‘আলোকের অসীম সঙ্গীতে/ চিত্ত মোর ঝংকারিছে সুরে সুরে রণিত তন্ত্রীতে।’

বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশকিছু গানও রচনা করেছেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটি হলো: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো।’ বৈশাখকে আবাহন করে এ গান রচনা করেন ২০ ফাল্গুন ১৩৩৩ শান্তিনিকেতনে। মূলত শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই কবি ঋতুভিত্তিক আনুষ্ঠানিক-সংগীত রচনা শুরু করেন। সারা বছরজুড়ে শান্তিনিকেতনে ঋতুভিত্তিক উৎসবের সূচনা হয়। এর মধ্যে নববর্ষবরণ, বর্ষামঙ্গল, পৌষ মেলা ও উৎসব, শারদোৎসব এবং বসন্ত উৎসব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বৃক্ষরোপণ ও হলকর্ষণ উৎসব এবং কবির জন্মদিন উপলক্ষে পঁচিশে বৈশাখ উদ্‌যাপনও ছিল। ঋতু-অনুষ্ঠানের জন্যই রবীন্দ্রনাথ বৈশাখ নিয়ে কিছু গান রচনা করেন। ‘এসো হে বৈশাখ’ গানে বৈশাখকে মঙ্গলসূচক বার্তা নিয়ে আসার আহ্বান কবির: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো/ তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।’ বৈশাখের যে রুদ্রতা, রুক্ষতা এবং শক্তির উগ্রতা- তার মধ্যেও কবি কল্যাণ লক্ষ করেন: ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জ্বরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ বৈশাখ প্রলয়ের শাঁখ বাজিয়ে জীবনের ‘মায়ার কুজ্ঝটিজাল’কে ছিন্ন করবে- তবেই তো আসবে জীবনে নতুন ও শুভ বার্তা।

বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের আরও কয়েকটি গান যেমন: ‘ওই বুঝি কালবৈশাখী’, ‘বৈশাখ হে মৌনী তাপস কোন অতলের বাণী’, ‘নমো নমো হে বৈরাগী’, ‘হৃদয় আমার, ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে’, ‘বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া আসে মৃদুমন্দ’, ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে’ ইত্যাদি। এ ছাড়া বৈশাখ বা গ্রীষ্ম ঋতুর বিশেষত্ব নিয়ে কিছু গান রচিত হয়েছে; এতে বৈশাখের প্রখরতা, শুষ্কতা, ‘দুঃসহ তাপ বহ্নি’, ‘রুদ্রবাণী’ ইত্যাদি প্রকাশ পেয়েছে। ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে’ গানটিতে কবি নিজেকে ‘বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন’-এর সঙ্গে উপমায়িত করেন। এরকম আরেকটি গান: ‘প্রখর তপনতাপে, আকাশ তৃষায় কাঁপে, বায়ু করে হাহাকার।’ প্রকৃতির মধ্যে আকাশের তৃষ্ণা, বায়ুর হাহাকার ইত্যাদি বিদ্যমান। কিন্তু এই তৃষ্ণা ও হাহাকার কবির নিজেরই- তা তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে তবেই উপলব্ধি করতে পারেন।

রবীন্দ্রনাথ যেমনটি নিজের জন্মদিন ‘পঁচিশে বৈশাখ’ উপলক্ষে কবিতা রচনা করেন, তেমনই নিজের জন্মদিনের গানও লিখেছেন। বিখ্যাত গানটি: ‘হে নূতন,/ দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।’ কবির মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ২৩ বৈশাখ ১৩৪৮-এ গানটি রচিত। তার জীবদ্দশায় শেষ জন্মদিনে গানটি গাওয়া হয়। দেশ-বিদেশে উদ্‌যাপিত রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন এ গান ছাড়া সম্পূর্ণতা পায় না। এ গানের অবিস্মরণীয় ভাবৈশ্বর্য লক্ষণীয়। নিজের জন্মদিনের প্রসঙ্গ গানটিতে উল্লেখ থাকলেও তা রচনাকৌশলের কারণে ব্যক্তি প্রসঙ্গ ছাপিয়ে নৈর্ব্যক্তিক হয়ে উঠেছে: ‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়/ ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।... চির নূতনেরে দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।’ এ গানে প্রতিটি মানবশিশুর জন্মকে স্বাগত জানানো হয়েছে। এভাবে সসীম জীবনের মধ্যে অসীমের প্রকাশঘটান কবি। নিজের জন্মদিনের শুভক্ষণের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ প্রতিটি মানবশিশুর জন্মের চির নতুনত্ব খুঁজে পেয়েছেন। 

রবীন্দ্রনাথ বাংলার ষড়ঋতু ও বারো মাসের অনুষঙ্গ নিয়ে কিছু না কিছু লিখেছেন। সঙ্গত কারণেই বৈশাখ নিয়েও কবির সবিশেষ কৌতূহল ছিল। মানবচরিত্র এবং মানস গঠনে প্রকৃতি-প্রতিবেশ ও পরিবেশের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশ ও পরিবেশের যে পরিবর্তন ঘটে তার প্রভাব কোনো সংবেদনশীল মানুষ এড়িয়ে যেতে পারে না। রবীন্দ্রনাথও তা এড়াতে পারেননি। আমরা তার বিবিধ রচনায় প্রতিবেশ-পরিবেশের অনুষঙ্গে নানা তাৎপর্যে ঋতুকথন লক্ষ করি। তেমনি ‘বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন’ অথবা ‘বৈশাখ হে মৌন তাপস’ এমন শিল্পিত করে বৈশাখ-বন্দনা আমাদের প্রকৃতির আরও নৈকট্যে নিয়ে যায়।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

ফিরে আসে বৈশাখ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৪ এএম
আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৩ পিএম
ফিরে আসে বৈশাখ
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

‘হ্যালো পুকি, তোমাকে তো সেই লাগতেছে। পুরাই মাথা নষ্ট! ঘটনা কী?’ বলে রিমেল লাফ দিয়ে উঠল।
আজ পযলা বৈশাখ। চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা বের হবে। রিমেল, নাইরা, নাহিয়ান, রুনটি, বিনি দাঁড়িয়ে আছে চারুকলার গেটে। তারা এই শোভাযাত্রা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ করবে।
মাথায় বেলিফুলের কুঁড়ির গাজরা একপাশে সরিয়ে নাইরা বলল, ‘নো ক্যাপ! ভুলভাল বলবে না। আমি ফ্লেক্স করতেছি না। অতিরিক্ত কিছুই করিনি। এইটা বৈশাখের ট্রাডিশনাল সাজ।’
বিনি কনুই দিয়ে রিমেলকে ধাক্কা দিয়ে নাইরাকে বলল, ‘বেসড। কুল ড্রিপ! কোত্থেকে কিনেছ এটা?’
বিনির কথার উত্তর দিতে না দিয়ে রিমেল নাইরার চারপাশে এক পাক ঘুরে এসে বলল, ‘তোমার গ্লো-আপে আমি মুগ্ধ! যত যাই বলো, তুমি হইতেছ গোট।’
হাতের ভিডিও ক্যামেরার লম্বা স্টিট এগিয়ে রিমেলকে গোঁতা দিয়ে নাইরা বলল, ‘পুরাই স্কিবিডি। কী সব বোকাবোকা কথা বলতেছিস!’
রিমেলের কাঁধে চাপড় দিয়ে নাহিয়ান বলল, ‘এইটা কী করলা, ব্রাহ! ব্যাপার বুঝতেছি না। তুই আজ নাইরার জন্য এত সিম্পিং দিতেছিস! নাইরা তো তোরে পাত্তাই দেয় না!’
বলে নাইরার দিকে ঘুরে বলল, ‘ইফ ইউ নো, ইউ নো, তোকে সাস লাগতেছে।’
নাইরা মনে হলো নাহিয়ানের কথায় খানিক লজ্জা পেয়েছে। চোখ সরিয়ে বলল, ‘সর সর। ওপাশে সরে দাঁড়া। শোভাযাত্রা আসতেছে।’
চারুকলা থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে। বাংলা সংস্কৃতির পরিচয় নিয়ে নানা প্রতীকী ফেস্টুন, সঙ্গে বিভিন্ন রঙের মুখোশ আর প্রাণীর প্রতিকৃতি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ আনন্দ করতে করতে এগিয়ে আসছে। ঢোল বাঁশি করতাল বাজিয়ে কেউ গান গাইছে, কেউ নাচছে। এ এক অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য!
ছোট্ট ভিডিও ক্যামেরা ওপরে তুলে নাইরা বলল, ‘হ্যাপি পয়লা বৈশাখ ফ্রম ঢাকা।’
নাইরার বয়স বাইশ বছর। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিডিয়া স্টাডিজের স্টুডেন্ট। কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে বেশ নাম করেছে। বিশেষ করে বাংলা সংস্কৃতি, ঋতু, উৎসব নিয়ে তার রিল, শর্ট ভিডিও, লাইভ সবকিছুতে এক ধরনের কাব্যিক সততা আছে। বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে সে আবেগের আন্তরিকতা আর অকৃত্রিমতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। যা গ্লোবাল ইয়াং অডিয়েন্সের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।
ক্যামেরা ঘুরিয়ে নাইরা বিশাল শোভাযাত্রার বাঘের মুখোশ, রঙিন পেঁচা, মাছ, সূর্য, মুখে আলপনা আঁকা তরুণ-তরুণীদের দেখাতে দেখাতে বলল, ‘টুডে উই ডোন্ট জাস্ট সেলিব্রেট এ নিউইয়ার। উই ট্রাই টু রিমেম্বার হু উই আর।’
লাইভ শেষ হয়েছে। নাইরাকে বিস্মিত করে দিয়ে ঘণ্টাখানেকের ভেতর লাইভ ভাইরাল হয়ে গেল। লাইভ ভাইরাল হওয়ার বিশেষ কারণ আছে। লিও নাকামুরা লাইভে যুক্ত হয়ে মন্তব্য করেছে। লিও নাকামুরা হচ্ছে বিশ্বে আলোচিত তরুণ লেখক-সংগীতশিল্পী। বয়স সাতাশ বছর। তার মা জাপানি আর বাবা ব্রাজিলিয়ান। সে বড় হয়েছে লন্ডনে। লিও-র লেখা উপন্যাস আর ইন্ডি মিউজিক তরুণ প্রজন্মের কাছে নিঃসঙ্গতা আর কিছু না বলা প্রেমের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
নাইরার লাইভে মন্তব্য করে লিও লিখেছে, ‘হাউ ডু ইউ রিমেম্বার হু ইউ আর, ইফ দ্য ওয়ার্ল্ড কিপস টার্নিং ইউ ইনটু কনটেন্ট?’
অনেকখানি সময় নিয়ে নাইরা তাকিয়ে ছিল স্ক্রিনের দিকে। তার কাছে মনে হলো পুরো পৃথিবী যেন থমকে গেছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। দীর্ঘ নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে সে গহিন কুয়ায় নেমে যাচ্ছে। কেউ একজন তার একান্ত ভেতর থেকে কথাগুলো বলে উঠেছে। নাইরা উত্তরে লিখল, ‘মেবি বাই ফাইন্ডিং ওয়ান পারসন হু সিজ ইউ বিহাইন্ড দ্য স্ক্রিন।’
সেই শুরু। নাইরাকে অবাক করে দিয়ে লিও ইনবক্সে লিখল, ‘তোমাদের নববর্ষের শোভাযাত্রা নিয়ে তোমার কাছ থেকে আরও কিছু জানতে চাই।’
যতটুকু লিখবে ভেবেছিল নাইরা তার কিছুই সে লিখতে পারছে না। লিখতে গিয়ে তার হাত কাঁপছে। সে যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না বিশ্বখ্যাত একজন মানুষ লিও নাকামুরা তার সঙ্গে চ্যাট করছে। এটা লিও-র ভেরিফায়েড পেজ। তাছাড়া এর ভেতর সে দুবার ভিডিও কলে এসেছে নাইরার সঙ্গে কথা বলতে।

নাইরা তাকে লিখল, ‘আমাদের দেশ একসময় স্বৈরশাসকের কবলে আটকে ছিল। তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ স্বৈরশাসন হটানোর অঙ্গীকার নিয়ে আর শান্তির বিজয় প্রত্যাশায় চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বৈশাখের শোভাযাত্রা শুরু করে।’
লিও বলল, ‘তুমি শোভাযাত্রার কালারফুল দিক নিয়ে বলো। এই যে নানা ধরনের মুখোশ, সাজসজ্জা।’
নাইরা বুঝতে পারল লিও খুব সচেতনভাবে শোভাযাত্রার পলিটিক্যাল ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে চাইছে। নাইরা লিখল, ‘আমাদের বর্ষবরণের শোভাযাত্রায় ট্যাপা পুতুল, নকশি পাখি, হাতি, বাঘ, কুমির, লক্ষ্মী পেঁচা, ঘোড়াসহ অনেক ধরনের মুখোশ থাকে। এগুলো সবই অপশক্তির বিনাশ আর শুভকামনার প্রতীক।’

লিও লিখল, ‘অপশক্তির বিনাশ মানে তো অপদেবতা থেকে মুক্ত থাকা!’
নাইরা খুব স্পষ্টভাবে বলল, ‘আমাদের নববর্ষের শোভাযাত্রা হচ্ছে অগণতান্ত্রিক শক্তির বিনাশের প্রতিজ্ঞা।’
লিও খানিক থমকে গেছে। সে কথা ঘুরিয়ে বলল, ‘বাংলাদেশ অনেক সুন্দর শুনেছি। সবচেয়ে সুন্দর বাংলাদেশের মানুষ। তারা নরম মনের। নরম মাটি দিয়ে বানানো।’
নাইরার হাসি পাচ্ছে। কিশোর বয়সে প্রেমে পড়লে ছেলেরা যেভাবে প্রেমিকাকে ইমপ্রেস করতে চায়, লিও সেরকম কথা বলছে। নাইরা বলল, ‘তুমি বাংলাদেশে এসো। মুগ্ধ হয়ে যাবে। চারপাশে কেবল সবুজ। তাকালে চোখে আরাম লাগে। সবকিছু ন্যাচারাল। আর্টিফিশিয়াল কিছু নেই।’
লিও বলল, ‘যাব নিশ্চয়। তবে কি জানো, আমার কাছে পৃথিবীর সব শহর একইরকম লাগে। এয়ারপোর্ট, হোটেল, স্টেজ, ইন্টারভিউ। একটা দেশের সকাল, আরেকটা দেশের রাতের সঙ্গে মিশে যায়।’
নাইরা সতর্কভাবে লিও-র কথা বোঝার চেষ্টা করছে। দেশ নিয়ে কোনো কথা বলার সময় নাইরা বিশেষ সতর্ক থাকে। সে কখনো চায় না ভুলভাবে বাংলাদেশ কোথাও উপস্থাপিত হোক। নাইরা বলল, ‘তবে এখানে প্রতিদিনের সকাল কখনো একরকম হয় না। প্রত্যেকটা দিন, প্রত্যেক বছর আমাদের কাছে নতুন কোনো সম্ভাবনা নিয়ে আসে।’
তার পর নদীর ঢেউয়ের মতো কথার পিঠে কথা ভেসে আসতে থাকল। দেশ থেকে শহর। শহর থেকে ঘর। ঘর থেকে একে একে নিজেদের কথার ভেতরের কথা চলে এল। সেই সময় লিও লেখক মনের কল্পনা মিশিয়ে নাইরাকে বড় এক ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। লিও লিখেছে, ‘নাইরা, তোমাকে ঠিক কতটা পছন্দ করি জানো? বসন্তের এক সকালে চেরিফুলের বাগান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখন তোমাকে দেখলাম। মনে হলো, আমার বুকের ভেতর একটা ছোট ঘড়ি ছিল, যা এতকাল বন্ধ হয়ে পড়ে ছিল- আচমকা তোমার হাসির শব্দে সেই ঘড়ি আবার টিকটিক করে চলতে শুরু করেছে।
তুমি যখন আমার হাত ধরলে, তখন মনে হলো আমার চারপাশের বিশৃঙ্খল পৃথিবীটা অমনি ভীষণ শান্ত আর পরিপাটি হয়ে গেল। আমি হিমালয় জয়ের কথা বলছি না। আমি বলছি সেই সহজ আনন্দের কথা- যখন আমরা পাশাপাশি বসে কফি খাই আর কোনো কথা না বলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারি।
ভালোবাসার সংজ্ঞা আবিষ্কার করেছি। আমার কাছে ভালোবাসা মানে হলো তোমার গভীর দুই চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারা, আমি ঘরে ফিরে এসেছি। তুমি আছ বলেই সকালের রোদ এত মিষ্টি লাগে, আর রাতের আকাশ এত বেশি রহস্যময় মনে হয়। তোমাকে ভালোবাসা মানে কোনো বড় উৎসব নয়, বরং প্রতিদিন একটু একটু করে তোমার মাঝে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া।’
নাইরার মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে আসছে। তার গলার ভেতর কিছু আটকে গেছে। সেখানে ব্যথা করছে। ঝুম ভালোবাসার স্পর্শে ভেসে যেতে যেতে নাইরা থমকে দাঁড়াল। এখন অনেক কাজ। লিও এক ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের জন্য সিরিজ লিখছে। সেখানে সে দক্ষিণ-এশিয়ার উৎসব আর তরুণদের প্রেমকে মুখ্য করে এনেছে। নাইরার কাজ হচ্ছে বাংলার সংস্কৃতি, উৎসব, লোককথা মিলিয়ে ভিডিও ক্লিপস পাঠানো।
খুবই এক্সাইটেড নাইরা। তার মনে হচ্ছে বাংলা সংস্কৃতিকে সে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিচ্ছে ভীষণ যত্ন করে।
নাহিয়ান এসেছে। তাকেও ভীষণ অস্থির দেখাচ্ছে। সে খানিক রাগি গলায় বলল, ‘তুই কি জানিস নেট দুনিয়ায় তোকে কীভাবে পচানো হচ্ছে! লিও একজন গ্লোবাল সেলিব্রেটি। তার সঙ্গে তুই পেঁচিয়েছিস!’
নাইরা কিছু জানে না। লিও তাকে কিছু বলেনি। কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। নাহিয়ান বলল, ‘তোর ছবি দিয়ে লিখেছে, লিও’স নিউ গার্ল? হু ইজ দ্য বেঙ্গলি ক্রিয়েটর? ইজ শি ক্লাউট চেজিং? তুই কি সত্যি তোর সস্তা পাবলিসিটি পেতে এটা করছিস?’
নাহিয়ানের কথা পাত্তা দিল না নাইরা। জরুরি কাজ সব গুছিয়ে সময়মতো লিওকে পাঠিয়েছে। লিও বলল, ‘দেখো নাইরা, গ্লোবাল অডিয়েন্স বৈশাখের পলিটিক্যাল হিস্ট্রি, অসাম্প্রদায়িকতা বলো বা ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াই, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ঠিক খাবে না। এগুলো বাদ দিয়ে ভিডিও বানাও।’
পুরোপুরি হতবাক হয়ে গেছে নাইরা। সে বলল, ‘নববর্ষের শোভাযাত্রা কোনো খাবার নয় যে পাবলিক খাবে। তাছাড়া নববর্ষের শোভাযাত্রা থাকবে, তাতে প্রতীকী প্রতিবাদ থাকবে না, রবীন্দ্রসংগীত থাকবে না, ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার থাকবে না, লাল-সাদার ইতিহাস থাকবে না। শোভাযাত্রা দেখানো হবে শুধু বৈশাখের কালারফুল এক্সোটিক ফেস্টিভ্যাল বানিয়ে- তা সম্ভব নয়। আমি সেটা করব না। তুমি বুঝতে পারছ, এটা শুধু আমাদের উৎসব নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস!’
লিও লিখল, ‘বুঝতে পারছি। কিন্তু এটাকে যদি সহজ না করি কেউ দেখবে না।’
নাইরা বুঝতে পারল সে ভুল মানুষকে পছন্দ করেছে। লিও-র সঙ্গে সব রকমের যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। অনেকদিন পর লিও-র এক ম্যাসেজের রিপ্লাই দিয়েছে নাইরা। লিও লিখেছে, ‘কখনো কখনো টিকে থাকতে সত্যকে বদলে ফেলতে হয়।’ 
নাইরা লিখল, ‘যে মানুষ সত্য বদলে টিকে থাকে, সে আর মানুষ থাকে না।’

সেদিন থেকে তাদের আর কখনো যোগাযোগ হয়নি।
অনেকদিন বাদে লিও ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল, ‘তুমি বলেছিলে আমাদের একে অপরকে মনে রাখা উচিত। কথা দিচ্ছি, তোমাকে কখনো ভুলে যাব না। এমনকি পুরো পৃথিবী যদি আমাদের ভুলে যায়, তবুও তোমার হাত ধরে থাকব। নিজের খেয়াল রেখো। তোমার জন্য আমার ভালোবাসা সবসময় একইরকম থাকবে।’
নাইরা সে ম্যাসেজের কোনো উত্তর দেয়নি।
পরের বৈশাখের শোভাযাত্রায় নাইরা লাইভ করল না। সে বসে আছে চারুকলার পুকুরপাড়ে। তার মন প্রচণ্ড ভার হয়ে আছে। আজ কেন তার এত বেশি খারাপ লাগছে বুঝতে পারছে না। 
লিও বাংলাদেশে এসেছে। এই খবর নাইরা জানে না। লিও ঠিক নাইরাকে খুঁজে বের করেছে। চারুকলার পুকুরপাড়ে লিও-র সামনে নাইরা দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কথা বলতে পারছে না। তার সব কথা যেন গলার ভেতর আটকে গেছে।
লিও বলল, ‘ভেবেছিলাম ভালোবাসা মানে তোমাকে না হারানো। পরে বুঝেছি ভালোবাসা মানে তোমার সেই ভাবনাগুলোকে হারিয়ে যেতে না দেওয়া, যা তোমাকে ‘তুমি’ করে গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাস আর সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের কথা দিয়েই নতুন সিরিজ লিখেছি। সেটা স্ট্রিমিং হবে।’
কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়েছে নাইরার ভেতর। কী বলবে বুঝতে পারছে না। তার সব এলোমেলো বোধ হচ্ছে। অস্পষ্ট গলায় বলল, ‘তুমি এসেছ!’
লিও বলল, ‘সব কাহিনি হাটে তোলার জন্য নয়, যে বিক্রি করব। কিছু ঘটনা কেবল সত্যভাবে বলার জন্য টিকে থাকে। বাংলাদেশের নববর্ষের শোভাযাত্রার মতো।’
বাতাস ছেড়েছে। তুমুল বাতাসে নাইরার লালপাড়ের সাদা শাড়ির আঁচল উড়ছে। সেই আঁচল ধরবে বলে লিও শিশুর মতো লাফিয়ে যাচ্ছে। বাতাসে শীতলভাব। কোথাও আকাশভাঙা বৃষ্টি নেমেছে।

শোভাযাত্রা

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৩ এএম
শোভাযাত্রা

ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়, বৃক্ষের রঙ বদলায়
শোভাযাত্রার নাম বদলায় 
জীবন বদলায় না। অন্ধকারে পেঁচা ও বাঁদুরেরা 
ঢের বেশি উৎপাত করে। 
 
শোভাযাত্রার নাম কী হবে- মঙ্গল না আনন্দ, না বৈশাখী
এই অহেতুক বিতর্কে মাতেন
সংস্কৃতির স্বঘোষিত মহাজনেরা। কিন্তু তারা জানেন না 
সেদিন অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে হাতের তুলিকে হাতিয়ার করেছিলেন কারা। 
কারা কলম ও সংগীতকে বানিয়েছিলেন অব্যর্থ মারণাস্ত্র। 
আর রমনার বটমূলে বর্ষবরণের আয়োজন কাদের হাতে
খুনের দরিয়া হয়েছিল? 
যুগে যুগে মানুষ যখন স্বৈরশাসক আর 
অন্ধকারের জীবদের ভয়ে নির্বাক ও নিশ্চল থাকে
তখন মাটির হাতি-ঘোড়া, শালিখ-ময়না সদর্পে মিছিলে হাঁটে
কথা বলে, বজ্রমুষ্ঠিতে কাঁপিয়ে তোলে আকাশ।
 
ক্ষমতার রঙ বদলায়, ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায় 
জীবন বদলায় না।