খ্যাতনামা সাহিত্য সমালোচক ও গ্রন্থাগারিক লরেন্স ক্লার্ক পাওয়েল (১৯০৬-২০০১) মন্তব্য করেছিলেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব ছাড়া মহত্ত্বের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেনি। এটি যখন আর ঘটবে না তখন আমাদের সভ্যতারও অবসান ঘটবে।’ বাস্তবিকই, জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সফলতা-ব্যর্থতা অনেকাংশে নির্ভর করে এর গ্রন্থাগারটি কতটা সমৃদ্ধ ও সক্রিয় তার ওপর। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বৃহত্তম ও প্রাচীনতম কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারটি সংগ্রহের বিবেচনায় দেশের বৃহত্তম। ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা যেদিন শুরু হয়, গ্রন্থাগারের দ্বারোদ্ঘাটনও ঘটে সেদিনই। সময়ের পরিক্রমায় এটি কেবল দেশের সর্ববৃহৎ গ্রন্থাগারই নয়, নতুন প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনশীল সেবার সমন্বয়ে এ দেশে গ্রন্থাগার আন্দোলন ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ যোগাযোগের (scholarly communication) ক্ষেত্রে অগ্রপথিক হিসেবেও কাজ করছে। গত এক শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে গ্রন্থাগার পরিসরে ঘটেছে নানা পালাবদল। গ্রন্থাগারের কাজ কী হওয়া উচিত সে ভাবনাতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। এ পালাবদলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে পাঠকের দ্রুত পরিবর্তমান তথ্যচাহিদা পূরণ করা একটি দুরূহ কাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার তার সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নতুন কর্মকৌশল ও প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সেবাদানের নবতর পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে এসব পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করে চলেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার: উন্মেষপর্ব ও ক্রমবিকাশ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বর্তমান ভবনের একটি অংশে। পরে এটি কার্জন হল এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। দেশভাগের পর গ্রন্থাগারের সংগ্রহ ও ব্যবহারকারী দুটোরই ব্যাপক বৃদ্ধির কারণে গ্রন্থাগারটিকে নতুন একটি স্থানে স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এ দেশের স্থাপত্যবিদ্যার পুরোধা ব্যক্তিত্ব মাজহারুল ইসলামের নকশায় গ্রন্থাগারের নতুন ভবনের কাজ শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র ও কেন্দ্রীয় মসজিদের মধ্যবর্তী স্থানে। নবনির্মিত ভবনটির দ্বার উন্মোচন করা হয় ১৯৬৪-এর ১৫ ডিসেম্বর। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার তিনটি পৃথক ভবনে বিন্যস্ত: প্রশাসনিক ভবন, মূল গ্রন্থাগার ভবন ও বিজ্ঞান গ্রন্থাগার ভবন। সায়েন্স এনেক্স এলাকায় অবস্থিত বিজ্ঞান গ্রন্থাগার ভবনের যাত্রা শুরু ১৯৮২-এর মার্চে। প্রশাসনিক ভবনের মোট আয়তন ২৯, ৭২৪ বর্গফুট, মূল গ্রন্থাগার ভবন ৭১,১০৬ বর্গফুট আর বিজ্ঞান গ্রন্থাগার ভবন ৪০,০০০ বর্গফুট। মূল গ্রন্থাগার ভবনে এককালীন মোট ৭৪০ জন ও বিজ্ঞান গ্রন্থাগার ভবনে ৪২০ জনের বসার ব্যবস্থা রয়েছে।
১৯২১ সালে ১৮,০০০ পুস্তক নিয়ে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, যার অধিকাংশই ঢাকা কলেজ ও ভূতপূর্ব ঢাকা ল কলেজ-এর সংগ্রহ থেকে প্রাপ্ত। শুরু থেকেই গ্রন্থাগারে বিভিন্ন বিষয়ে একটি সুষম সংগ্রহ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরই গড়ে তোলা হয় বাংলা ও সংস্কৃত পাণ্ডুলিপির সমৃদ্ধ একটি সংগ্রহ। এ উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠিত হয় যাতে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন খ্যাতনামা প্রত্নতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবেত্তা, মুদ্রাবিজ্ঞানী, লিপিবিশারদ, প্রাচীন হস্তলিপিবিশারদ ও পুঁথি সংগ্রাহক এবং ঢাকা জাদুঘরের কিউরেটর ডক্টর নলিনীকান্ত ভট্টশালী। বস্তুত, তার উদ্যোগেই গ্রন্থাগারে বাংলা ও সংস্কৃত বিষয়ে একটি সমৃদ্ধ সংগ্রহ গড়ে ওঠে। এ সংগ্রহ তত্ত্বাবধানের জন্য ১৯২৫ সালে একজন কর্মীও নিয়োগ করা হয়। পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের বিস্তারিত সূচি তৈরি হয় এবং অচিরেই বিশ্ববিদ্যালয় ও এর বাইরে থেকে অনেক গবেষক এ সংগ্রহের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৯২৬ সালে কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটিতে দীর্ঘদিন কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বাবু মথুরামোহন মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের পাণ্ডুলিপি শাখা তত্ত্বাবধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। শুরুর দিকে গ্রন্থাগার কর্মীর অপর্যাপ্ততা গ্রন্থাগারের একটি বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয় যেজন্য গ্রন্থাগার কর্মীদের ছুটির দিনেও কাজ করতে হতো। তবে কর্মীস্বল্পতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের সেবাদানে গ্রন্থাগার কর্মীরা ছিলেন আন্তরিক। আগ্রহোদ্দীপক একটি তথ্য হচ্ছে, গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর কেবল দরিদ্র শিক্ষার্থীদের গ্রন্থাগার সেবাদানের জন্য একটি বিভাগ খোলা হয়েছিল যেটি অবশ্য পরে আর ক্রিয়াশীল থাকেনি।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই উপহার হিসেবে প্রাপ্ত সামগ্রী গ্রন্থাগার সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করেছে, গ্রন্থাগারের সূচনালগ্নে অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে সৃষ্ট সীমাবদ্ধতাকে যা কিছুটা হলেও প্রশমিত করেছিল। যেসব সমাজহিতৈষী ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি এ গ্রন্থাগারে বই উপহার দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ময়মনসিংহের কৃষ্ণদাস আচার্য চৌধূরী, পণ্ডিত যশোদাকান্ত চক্রবর্তী, খান বাহাদুর কাজিমুদ্দিন সিদ্দিকী, স্যার যদুনাথ সরকার, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী ও পরবর্তীকালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রথম ভারতীয় অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত ড. প্রসন্ন কুমার রায়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহের একাংশও এ গ্রন্থাগারে দান করা হয় ১৯৩৩ সালে। আন্তর্জাতিক নানা সংস্থা ও বিদেশি সরকারের কাছ থেকেও বই ও অন্যান্য সামগ্রী অনুদান হিসেবে গ্রহণ করা হয়। লন্ডনস্থ ইন্ডিয়া অফিস, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি ব্যুরো অব ব্রিটিশ এম্পায়ারসহ নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্রন্থাগারে পুস্তক ও অন্যান্য সামগ্রী অনুদান হিসেবে প্রদান করে। ১৯৬০-এর দশকের সূচনালগ্নেই প্রায় ২০ হাজার পাণ্ডুলিপিসমৃদ্ধ এ গ্রন্থাগারের সংগ্রহটি দেশের সর্ববৃহৎ পাণ্ডুলিপি সংগ্রহে পরিণত হয় যার ৯০ শতাংশই ছিল আরবি, উর্দু ও ফার্সি পাণ্ডুলিপি। ১৯৫৭ সালে গ্রন্থাগার থেকে একটি বুলেটিন প্রকাশিত হতে থাকে। এ ছাড়া সাউথইস্ট এশিয়া ট্রিটি অর্গাইনাইজেশন (SEATO) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে গ্রন্থাগারে রক্ষিত আরবি, উর্দু ও অন্যান্য বিদেশি ভাষার পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের একটি বর্ণনামূলক সূচিও প্রকাশিত হয়। ১৯৫০-এর দশকে গ্রন্থাগার সংগ্রহের পরিমাণ এক লাখের কোঠা পার হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত আগে গ্রন্থাগারের সংগ্রহে ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার পুস্তক ও গ্রন্থাগার সামগ্রী। স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের পরবর্তী সময়ে গ্রন্থাগারের আধুনিকায়ন ও সংগ্রহের বৈচিত্র্য ও ব্যাপকতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে এটি দেশের বৃহত্তম ও সমৃদ্ধতম গ্রন্থাগার হিসেবে সুদৃঢ় একটি অবস্থানে পৌঁছে যায়।
গ্রন্থাগার সংগ্রহের সম্প্রসারণ ও ক্রমবৈচিত্র্য
সংগ্রহের ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য উভয় বিচারেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার অনন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী, প্রায় ২ হাজার শিক্ষক এবং গবেষকদের নানামুখী প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রহ করা হচ্ছে মুদ্রিত ও ইলেকট্রনিক উভয় ধরনের পাঠসামগ্রী। পাঠকচাহিদার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা এ সংগ্রহ বিষয় বৈচিত্র্যে ও আঙ্গিকের বহুমাত্রিকতায় কেবল বাংলাদেশ নয়, এতদঞ্চলের সবচেয়ে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার সংগ্রহগুলোর একটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে আছে দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ দুষ্প্রাপ্য সামগ্রীর সংগ্রহ, যার সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। এর মধ্যে এমন অনেক পুস্তক ও সাময়িকী আছে যেগুলো দুই থেকে আড়াই শ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে এবং ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরুর দিন থেকে এখন পর্যন্ত গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। সতেরো শতকে প্রকাশিত পুস্তকও বিশেষ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে গ্রন্থাগারে। দুষ্প্রাপ্য এসব গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে Robert Loveday কর্তৃক ফরাসি থেকে ইংরেজিত অনুদিত ÔCleopetraÕ (১৬৮৭), Warren Hastings-এর লেখা A Narrative of the Late Transactions at Benares (১৭৮২), Dacca Muslins and Cotton-Silk Manufacturers at Glasgow and Paisley (১৭৯৩) Buchanan’s Journey through Chittagong and Tiperah (১৭৯৮), James Boarden-এর লেখা Memoirs of the life of John Philip Kemble (১৮২৫) ইত্যাদি। গ্রন্থাগারের সমৃদ্ধ পাণ্ডুলিপি সংগ্রহটি এ দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য স্মারক। গ্রন্থাগারে মোট সংগৃহীত পাণ্ডুলিপির সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে ১৪৩৯ সালে গাছের বাকলে লেখা ‘সারদাতিলক’, ১৭০০ সালে মুদ্রিত ও স্বর্ণ দ্বারা অলঙ্কৃত ‘দিওয়ান-ই-হাফিজ’, শাহ মুহাম্মদ সগীর রচিত কাব্য ইউসুফ-জুলেখা (পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতের সময়কাল ১৭৩২), ১৭ ও ১৮ শতকের বেশ কিছু চুক্তিপত্র, কলাপাতায় লেখা চিঠিপত্র ইত্যাদি। সর্বশেষ হিসাবে গ্রন্থাগারটিতে মোট ৭ লাখ বই ও বাউন্ড ভলিউম এবং ৫ হাজার মাইক্রোফিল্ম রয়েছে। বিশেষ সংগ্রহের মধ্যে আছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংগ্রহ, জাতিসংঘ বিষয়ক সংগ্রহ, আমেরিকান স্টাডিজ কর্নার, কোরিয়া কর্নার ইত্যাদি।
গ্রন্থাগার প্রশাসন ও কর্মী
প্রথম দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে কোনো পেশাদার গ্রন্থাগারিক ছিলেন না। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও ঢাকা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ফ্রান্সিস চার্লস টার্নার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক, যিনি একই সঙ্গে শহীদুল্লাহ হল (তৎকালীন লিটন হল, পরে ঢাকা হল)-এর প্রাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্বপালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক পদে যোগদানের আগেই আধুনিক গ্রন্থাগারিকতা সম্বন্ধে হাতে-কলমে জ্ঞানার্জনের জন্য অধ্যাপক টার্নারকে যুক্তরাজ্যে প্রেরণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক হিসেবে তার মেয়াদকাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। ১৯২২ সালে তার স্থলাভিষিক্ত হন ফখরুদ্দিন আহমেদ। বিভিন্ন সময় অনেক খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ গ্রন্থাগার উপদেষ্টা ও গ্রন্থাগারিকের দায়িত্বপালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারও কোনো এক সময় গ্রন্থাগারিক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ ভারত ভাগ হওয়ার সময় ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এ এইচ তালুকদার। ১৯৪৮-এর জানুয়ারিতে গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগ লাভ করেন আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের রিডার ড. এ হক। ১৯৫৬ সালে যুক্তরাজ্যে দুই বছরব্যাপী একটি প্রশিক্ষণ কোর্স শেষে দেশে আসার পর প্রখ্যাত গ্রন্থাগার বিজ্ঞানী মুহম্মদ সিদ্দিক খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক হিসেবে যোগদান করেন, যিনি এম এস খান নামেই সুপরিচিত ছিলেন। ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গ্রন্থাগার বিজ্ঞান’ বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে এম এস খানই হন প্রথম বিভাগীয় প্রধান। এ বিভাগের প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশে গ্রন্থাগার বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারেই কেবল নয়, গ্রন্থাগার আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এক নবযুগের সূচনা করে। এ বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী পেশাদার গ্রন্থাগারিকরা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে আধুনিক গ্রন্থাগারিকতার গোড়াপত্তন করেন। ২০০৯ সাল থেকে অদ্যাবধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক গ্রন্থাগারিক (ভারপ্রাপ্ত) পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
সুষ্ঠু কর্মপরিচালনার লক্ষ্যে গ্রন্থাগারটি বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত। এসব বিভাগ হচ্ছে: পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, প্রশাসন, কারিগরি প্রক্রিয়াকরণ, পাঠক সেবা, সামগী সংগ্রহ বা অ্যাকুইজিশন, রিপ্রোগ্রাফি, হিসাব বিভাগ, সাময়িকী এবং পাণ্ডুলিপি। সামগ্রিকভাবে গ্রন্থাগারের দায়িত্বে আছেন গ্রন্থাগারিক। পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্বে আছেন গ্রন্থাগারিক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন)। এ ছাড়া প্রতিটি বিভাগেরই দায়িত্বে আছেন একজন করে উপগ্রন্থাগারিক। একইভাবে বিজ্ঞান গ্রন্থাগারেরও দায়িত্বে আছেন একজন উপগ্রন্থাগারিক। জনবলের দিক দিয়ে গ্রন্থাগারের বৃহত্তম বিভাগ পাঠক সেবা বিভাগ, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের রিসোর্স সেন্টার ও সংবাদপত্র উপবিভাগ যার অন্তর্ভুক্ত। গ্রন্থাগার ও বিজ্ঞান গ্রন্থাগার মিলিয়ে পাঠক সেবায় নিয়োজিত আছেন মোট ৮৭ জন কর্মকর্তা ও কর্মী। জনবলের দিক দিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম বিভাগ প্রক্রিয়াকরণ শাখা, যাতে নিয়োজিত আছেন ২৫ জন কর্মী। বর্তমানে গ্রন্থাগারে উপগ্রন্থাগারিক, উপপরিচালক, প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা ও প্রধান দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কর্মকর্তাসহ এ পর্যায়ের কর্মকর্তার সংখ্যা মোট ৩১ জন। সহকারী গ্রন্থাগারিক, জ্যেষ্ঠ কারিগরি কর্মকর্তা, সিনিয়র হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পর্যায়ের কর্মকর্তা মোট ৩২ জন। আর জুনিয়র গ্রন্থাগারিক, সেকশন অফিসার, কারিগরি কর্মকর্তা ও গবেষণা কর্মকর্তা পর্যায়ের কর্মকর্তার সংখ্যা ২৪ জন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘসময় ধরে এটি কর্মীস্বল্পতায়, বিশেষত প্রশিক্ষিত কর্মীর স্বল্পতায় ভুগেছে, যা গ্রন্থাগারের সুষ্ঠু কার্যসম্পাদনের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করেছে। সময়ের পরিক্রমায় গ্রন্থাগারে নতুন পদ সৃষ্টি ও কর্মীনিয়োগ হয়েছে। ফলে গ্রন্থাগারের কর্মকাণ্ডের পরিধি বেড়েছে এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ সম্ভব হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা গ্রন্থাগারে নিয়োগ লাভ করেছেন যার ফলে সুপ্রশিক্ষিত কর্মীর অভাব অনেকটাই লাঘব হয়েছে। বর্তমানে (২০২০-২১) গ্রন্থাগারে মোট কর্মীসংখ্যা প্রায় ২০০, যাদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা ৮৮ জন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মী ৪৩ জন ও চতুর্থ শ্রেণির ৬৭ জন।
গ্রন্থাগার সেবা
সময়ের প্রভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের সেবার পরিসরই কেবল বাড়েনি, এতে যুক্ত হয়েছে বহুমাত্রিকতা। যুগের চাহিদা বিবেচনায় বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। গত এক দশকে তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে প্রথাগত সেবা থেকে প্রযুক্তিভিত্তিক সেবায় স্থানান্তরের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণেও প্রযুক্তিভিত্তিক সেবার প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে বহুগুণে বেড়েছে। বর্তমানে যেসব সেবা দেওয়া হচ্ছে সেগুলো হচ্ছে: ক) পাঠক সেবা, খ) রিপ্রোগ্রাফি সেবা, গ) সার্কুলেশন সেবা, ঘ) ইনস্টিটিউশনাল রিপোজিটরি সেবা, ঙ) অনলাইন জার্নাল সেবা, চ) ডিজিটাইশেন (ই-আর্কাইভস) সেবা, ছ) আইটি সেবা (রিমোট অ্যাকসেস ও ডাটা সেন্টার), জ) রেফারেন্স সেবা, ঝ) দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্রছাত্রীদের জন্য রিসোর্স সেন্টার সেবা, ঞ) সংবাদপত্র সেবা, ট) প্লেজিয়ারিজম চেকিং সফটওয়্যার (Turnitin) সেবা।
যেকোনো গ্রন্থাগারেই পাঠক সেবায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারেও পাঠক সেবায় নিযুক্ত আছেন সর্বোচ্চসংখ্যক কর্মী। চলমান ডিজিটাইজেশন কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে গ্রন্থাগারের ডিজিটাল ও অনলাইন সেবার পরিসর ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুষ্প্রাপ্য সামগ্রী, সংবাদপত্র, গবেষণাকর্ম ইত্যাদি নিয়মিতভাবে ডিজিটাইজেশন করা হচ্ছে, যা যুক্ত হচ্ছে গ্রন্থাগারের ই-আর্কাইভসে। দৈনিক আজাদ (১৯৩৬-১৯৯২), দৈনিক ইত্তেফাক (১৯৭৪-১৯৯৮), দৈনিক সংবাদ (১৯৮৪-১৯৯৫), দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (১৯৭১-১৯৯৪), অমৃতবাজার পত্রিকা (১৯০৫-১৯৫০), টাইমস অব ইন্ডিয়া (১৯৬১-১৯৮১)-সহ মূলধারার বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার সমৃদ্ধ সংগ্রহ গবেষকদের তথ্যসহায়তা জুগিয়ে চলেছে। গ্রন্থাগারের অন্যতম সেবা অনলাইন জার্নাল সেবা, যার আওতায় গ্রন্থাগারের শিক্ষকবৃন্দ ছাড়াও এমফিল ও পিএইচডি গবেষকবৃন্দ প্রায় ২২ হাজার জার্নাল অনলাইনে পাঠ করতে পারেন। উল্লেখ্য, ২০১৩-১৪ সেশন থেকে গ্রন্থাগারে মুদ্রিত সাময়িকী ক্রয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কেবল অনলাইন সাময়িকীর সাবস্ক্রিপশন চালু আছে। গ্রন্থাগার কর্তৃক প্রদত্ত Turnitin সফটওয়্যারের সেবা গবেষণায় চিন্তাচৌর্য তথা প্লেজিয়ারিজম প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া বহিস্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুরোধের ভিত্তিতে বিশেষায়িত সেবা/অতিথি ব্যবহারকারী সেবাও প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রন্থাগার ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচির আয়োজন করা হয় যাতে কেবল গ্রন্থাগারের পাঠসামগ্রী ও সেবা ব্যবহারই নয়, তথ্য অনুসন্ধান ও ব্যবহার সম্পর্কিত নানা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট, গবেষণা কেন্দ্র ইত্যাদির পক্ষ থেকে গ্রন্থাগার ও তথ্য বিষয়ক অন্যান্য সেবাও চাহিদা অনুযায়ী প্রদান করা হয়।
গ্রন্থাগার স্বয়ংক্রিয়করণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের ওয়েব সাইটটি গ্রন্থাগারের নানাবিধ সেবা ব্যবহারের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দু বা ÔhubÕ হিসেবে কাজ করে। গ্রন্থাগারের অনলাইন ক্যাটালগও ওয়েব সাইটটির সঙ্গে যুক্ত আছে, ফলে পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে যে কেউ ওয়েব সাইটের মাধ্যমে গ্রন্থাগার ক্যাটালগ অনুসন্ধান করতে পারেন। গ্রন্থাগারে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগসহ নানাবিধ প্রযুক্তি উপকরণের ব্যবহার বেশ আগে থেকেই শুরু হলেও একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার আওতায় স্বয়ংক্রিয় গ্রন্থাগার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একুশ শতকের গোড়াতেই সমন্বিত গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়করণের পরিকল্পনা করা হয়। এ উদ্দেশ্যে ২০০৮ সালে গ্রাফিক্যাল লাইব্রেরি অটোমেশন সিস্টেম (GLAS) নামে একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে শুরু হলেও সফটওয়্যারটির বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে বছরখানেকের মধ্যেই এটির ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন-হাউস সফটওয়্যার হিসেবে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষকদের মাধ্যমে DULIS (Dhaka University Library Integrated Software) সফটওয়্যার উন্নয়নের কাজ হাতে নেওয়া হয়। এরপর ২০১৩ সালে শুরু হয় ওপেন সোর্সভিত্তিক গ্রন্থাগার স্বয়ংক্রিয়করণ সফটওয়্যার কোহা (Koha)-র ব্যবহার। কোহা একটি ওপেন সোর্স সমন্বিত গ্রন্থাগার সফটওয়্যার, যেটি নিউজিল্যান্ডের কাটিপো কমিউনিকেশনস-কর্তৃক তৈরি। এ সফটওয়্যারটির রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত রয়েছে কোহা ডেভেলপারদের একটি অনলাইন কমিউনিটি যারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে আছে। বর্তমানে DULIS সফটওয়্যারের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয়করণ সেবা দেওয়ার প্রয়াস চলমান আছে। DULIS সফটওয়্যারটি মূলত সার্কুলেশন, বার কোডিং ও ব্যবহারীদের আইডি কার্য মুদ্রণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, অন্যদিকে ক্যাটালগ অনুসন্ধানের কাজটি সম্পন্ন করা হচ্ছে কোহার মাধ্যমে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের বিভিন্ন গবেষণাকর্ম রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০১৩ সালে একটি ইনস্টিটিউশনাল রিপোজিটরি (repository.library.du.ac.bd) তৈরি করা হয়েছে যার ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে ডিস্পেস ((DSpace) সফটওয়্যারের মাধ্যমে। উল্লেখ্য, ডিস্পেস একটি ওপেন সোর্স সফটওয়্যার যেটি তৈরি করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ও এইচপি ল্যাবস-এর যৌথ উদ্যোগে। এ রিপোজিটরিতে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ প্রতিবেদন এবং মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডির গবেষণা অভিসন্দর্ভ ছাড়াও শিক্ষকদের গবেষণাকর্মও সংরক্ষিত হচ্ছে।
উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। সেবা, সংগ্রহ ও সামর্থ্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধির মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারকে পরিপূর্ণভাবে একুশ শতকের উপযোগী একটি গ্রন্থাগার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নিরলস প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও নিয়মিত জরিপ পরিচালনা, সেবাদানের উদ্ভাবনী কৌশল নিয়ে চিন্তাভাবনা ও কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রযুক্তি সতত পরিবর্তনশীল এবং বর্তমান বাস্তবতায় তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবার বিকল্প নেই। কোভিড-১৯-এর কারণে সৃষ্ট মহামারি পরিস্থিতি তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারকে আরও অনিবার্য করে তুলেছে। এ কারণে তথ্যসেবার উদীয়মান নানা প্রযুক্তিতে গ্রন্থাগার কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রন্থাগারের তহবিল বৃদ্ধি ও প্রাপ্ত তহবিলের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের পাশাপাশি গ্রন্থাগারের অবকাঠামোগত সক্ষমতাকেও ক্রমাগত বৃদ্ধি করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম পীঠস্থান। গত এক শতাব্দীর অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় নতুন নতুন অর্জনকে সঙ্গী করে এ গ্রন্থাগার এগিয়ে যাবে, এটিই সবার কাম্য।
লেখক: অধ্যাপক, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়