নির্বাচন কোনো জাতির জন্য কোনো কোনো সময়ে গভীর গুরুত্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৪৬-এর গণভোট প্রচণ্ড শক্তিশালী ব্রিটিশ ও সনাতনী সম্প্রদায়ের প্রবল যুক্তিসংগত বাধাকে পরাভূত করে পাকিস্তান সৃষ্টি করে। ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রবল যুক্তিও ১৯৭০-এর নির্বাচন থেকেই জন্মলাভ করে। মিসেস ইন্দিরার সরকার ইয়াহিয়া খানের হারগোড় ভেঙে দেওয়ার সময় বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক চাহিদার জনভিত্তি কতটা গভীর তা ভালো করে যাচাই করে তার পর সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৫-এ একদল করা হলেও ’৭৩-এর প্রায় স্বচ্ছ নির্বাচনই ছিল তার ভিত্তিভূমি। ’৭১-এর ডিসেম্বরে মারাত্মক মার খাবার পরও পাকিস্তানি সশস্ত্রবহিনী ইসলামাবাদের গদিতে বসে পড়েনি, কারণ তারা জানত সেখানে জুলফিকার ভুট্টোর কিছুটা হলেও জনভিত্তি ছিল।
প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, তিনি একটি সেরা নির্বাচন জাতিকে উপহার দেবেন। পরিবেশ উপদেষ্টা এবং আইন উপদেষ্টা বলেছেন, নির্বাচনের তারিখ কোনো শক্তি পরিবর্তন করতে পারবে না। বিএনপি নেতা ড. মঈন খান বলেছেন, জনগণ নির্বাচনের ব্যাপারে অত্যন্ত উৎসাহী। এ কথাটিই আসল। কারণ কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীর চেয়ে জনগণ তথা ভোটারদের শতকরা ৫১ ভাগ দেশের জন্য যা আকাঙ্ক্ষা করেন তার নামই গণতন্ত্র। এই জনগণ মূলত সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার বণ্টন চান। যেমন বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক, যানবাহন, খাদ্য, নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থা।
আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব- তথা ভোটধিকার তারা চানই, এমন প্রমাণ জোরালো নয়। কারণ তাহলে সামরিক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়া ও এরশাদের শাসন জনপ্রিয় হতো না। হ্যাঁ ভোট, না ভোট, কিংবা সামরিক বাহিনীর ট্যাংকের ওপর উঠে রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া গণতন্ত্রে বিশ্বাসের পরিচায়ক নয়। তবে স্বৈরাচারের পতনের পর জনগণ ভোট চাইছেন, কারণ দীর্ঘদিন ভোটাধিকারের দাবি নিয়েই রক্তপাত হয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনে এখনো প্রধান শক্তি বিএনপি বলে মনে করার যুক্তিসংঙ্গত কারণ রয়েছে। কারণ দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও বিস্তৃত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এখন আইনত সমাজ এবং রাজনৈতিক মাঠ থেকে অনুপস্থিত। পরবর্তী বৃহৎ দল যারা অতীতে একাধিকবার দেশের গদিতে বসেছে তারা গত তিনটি মেয়াদে দেশের কেন্দ্রীয় শাসন থেকে অনুপস্থিত ছিল। এ তিনটি মেয়াদে দলটির অসংখ্য কর্মী ক্ষমতাশীল স্বৈরাচারের হাতে নিগৃহীত হওয়ার এবং স্বৈরাচারী সরকারের পতন ও পলায়নের ফলে দেশের এক বৃহৎ জনতার অংশ বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল ও সমবেত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তাদের নেতাদের কথাতেও একথা বেশ স্পষ্ট যে, নির্বাচন হলে এ দলটি কমপক্ষে ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠাতা পেয়ে আগামী সরকার গঠন করবে। ড. মঈন খান, ফখরুল ইসলাম আলমগীর, হাবিবুর রহমান হাবিব, রিজভী, বেগম উম্মে হাবিবা, দুলু ও ড. শায়ন্ত এবং তাদের সর্বজনীন নেতা তারেক রহমান জোর দিয়ে বলছেন যে, আগামীতে তারাই সরকার গঠন করবেন।
জনগণ নির্বাচনের ব্যাপারে অত্যন্ত উৎসাহী। এ কথাটিই আসল। কারণ কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীর চেয়ে জনগণ তথা ভোটারদের শতকরা ৫১ ভাগ দেশের জন্য যা আকাঙ্ক্ষা করেন তার নামই গণতন্ত্র। এই জনগণ মূলত সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার বণ্টন চান। যেমন বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক, যানবাহন, খাদ্য, নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থা।…
আওয়ামী লীগের সমর্থকদের সম্পর্কে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পক্ষ থেকে ৫৪ বছর ধরে বলা হয়েছে যে, এদের ভোট কখনো মিস হবে না। এরা প্রত্যেকেই নিজেদের প্রার্থী না পেলেও প্রধান বিরোধী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বিরোধীদের ভোট দেবেন। কারণ তাদের শত্রুর শত্রু তাদের বন্ধু। এবং আওয়ামী নেতারা এ কথা বরাবরই বলে আসছেন যে, তারা নির্বাচনের দল। তারা বিএনপির মতো কখনো ভোটের রাজনীতি থেকে দূরে থাকেননি। ইতিহাসও তাই বলে। না যাওয়ার কথা দিয়েও দলটি এরশাদের ভোটে হাজির হয়েছিল। তাহলে এখন এ ভোটাররা কোন প্রার্থীকে ভোট দেবেন?
এনসিপি যে স্লোগান দিয়েছিল তা ছিল এই যে- এক সাপের দুই বিষ, নৌকা ও ধানের শীষ। তার মানে এনসিপির প্রার্থীদের আওয়ামী ভোটাররা ভোট দেবেন না। জামায়াতে ইসলামীকেও এখনো পর্যন্ত বিএনপির প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তারা আবার আওয়ামী লীগেরও বিরুদ্ধে। কাজেই আওয়ামী ভোটাররা জায়ামায়তকেও ভোট দেবেন না। জাতীয় পার্টির মূল অংশ তাদের জন্মলগ্ন থেকে কখনো আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং আওয়ামী নীতির কিংবা দলের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে কখনো একটি কটূক্তিও করেনি। তারা ’৭৫-এর একদলীয়করণ, ২০১৮ ও ২০২৩-এর ব্যাপক সন্দেহযুক্ত নির্বাচন এবং ’২৪-এ ওই সরকারের ব্যাপকতর গণনির্যাতনের বিরুদ্ধেও কোনো অবস্থান নেননি। বরং তারা এ নির্বাচনগুলোয় অংশগ্রহণ করে বারবার আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে এসেছেন। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শেখ মুজিবের ভূমিকাকে তারা পরম গৌরবোজ্জ্বল বলে অভিহিত করে এসেছেন। এবং তাদের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আওয়ামী লীগের শত্রু জেনারেল জিয়াউর রহমানকে খুন করে আওয়ামী লীগের প্রতি মৌন সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন এবং দলটিকে নিকট ভবিষ্যতে গদিতে বসানোর পথ করে দিয়েছিলেন। এর সঙ্গে দেশের সব বামপন্থি রাজনৈতিক দল বিএনপির পরিবর্তে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে সমর্থন করেছে। মেজর জলিল ছিলেন এর একমাত্র ব্যতিক্রম। তবে তিনি ছিলেন স্বল্প আয়ুর। আসন্ন নির্বাচনে এসব আওয়ামী সমর্থক ৩০০টি আসনেই প্রার্থী দেওয়ার কাজটি করবেন না। তবে যে কয়টিতে তারা প্রার্থী মনোনিত করবেন আওয়ামী লীগের অত্যন্ত সতর্ক ও সংগঠিত ভোটাররা তাদেরই ভোট দেবেন। এর সঙ্গে একান্ত নাটকীয়ভাবে জামায়াত তার সংস্কার এবং প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচনি ব্যবস্থার দাবি চালু না হওয়ার বাস্তবতা ও হতাশা থেকে ১৯৯৬-এর নির্বাচনের মতো আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপস করলে, এ সমন্বিত জাপা, যোগ বাম, যোগ জামায়াতের সাংসদ সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
ভোটকেন্দ্রের সুস্থ পরিবেশের ফলে একটি পরিহাস রূপে শেখ হাসিনার বলা ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ নীতিটি এবারের ভোটদানে সামগ্রিকভাবে প্রতিফলিত হবে। প্রধান উপদেষ্টাকে বেগম জিয়া ভাই বলে সম্বোধন করেছেন। তা সত্ত্বেও তিনি বিএনপিকে কোনো অনানুষ্ঠানিক সমর্থন দিতে পারবেন বলে মনে হয় না। একই সঙ্গে এনসিপি স্বল্প সময়ে এ দেশের বিশাল এবং বিস্তৃত রাজনৈতিক মঞ্চে এমন কোনো অবস্থান নিতে পারবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। তারা কিছু আসন পাবে, তবে তা অন্য কোনো সমমনা দলের সঙ্গে মোর্চা গঠন করে গদিতে যাওয়ার মতো শক্তিশালী হবে না। কাজেই ধর্মীয় ভাবানুভূতি, গত সরকারের নির্যাতন, বৃহৎ প্রতিবেশীর প্রতি বিরূপভাব- মূলত এ তিন উপাদানকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি এককভাবেই নির্বাচনে জয় লাভ করবে। ভবিষ্যৎই বলতে পারে নয়, এটা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়। তবে বৈষম্য দূর, দুর্নীতি ধ্বংস, ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার কবর রচনার মতো বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন সুদূর পরাহত হয়েই থাকবে। কারণ জনচরিত্র পরিবর্তন হয় না এবং জননেতাকে তা ধারণ করতেই হবে। ব্যক্তিবৈশিষ্ট্যই কোনো নেতাকে ফ্যাসিস্টে পরিণত করে, কোনো পদ্ধতি নয়।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল
[email protected]