সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা সোনামনি। সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে দুই স্বামী নিহত হওয়ার পর শুরু হয় তার একাকী লড়াই। স্বামী হারানোর পর কোনো সহায়তা না পেয়ে জীবিকার তাগিদেই নদীতে নেমে মাছ (চিংড়ির রেণু) ধরতে শুরু করেন সোনামনি। প্রতিটি রেণুর দাম ছিল মাত্র এক টাকা। কোনো দিন ১০টি, কোনো দিন ১৫টি। ভাগ্য ভালো থাকলে ৫০ কিংবা ১০০টি রেণু মিলত।
কিন্তু লবণাক্ত পানির দীর্ঘ সংস্পর্শ তার শরীরকে ভেঙে দেয়। শরীরজুড়ে ঘা দেখা দেয়, ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অংশ কালো হয়ে যেতে থাকে। অসুস্থ শরীর নিয়ে আর নদীতে নামতে পারেননি সোনামনি। পরে নিজের বসতঘরের সামনে মুন্সীগঞ্জ বাজারে ড্রাম পরিষ্কার করে জীবিকা চালাতে শুরু করেন। প্রতি ড্রামে পান ১৫ টাকা। কোনো দিন ৫টি, কোনো দিন ১০টি ড্রামের কাজ জোটে সোনামনির।
এর পাশাপাশি বাজারের একটি হোটেলে প্রতিদিন তরকারি কাটা, মসলা বাটার মতো কাজও করেন তিনি। তবে এসব কাজের জন্য কোনো টাকা পান না সোনামনি। বরং টাকার বদলে তরকারি কাটলে তরকারি, মসলা বাঁটলে মসলা দেওয়া হয় তাকে।
সোনামনির বয়স হয়েছে, শরীরে আগের মতো শক্তি নেই। কিন্তু গাবুরা ইউনিয়নে তার মতো সব বয়সী নারী ও কিশোরী এখনো নোনা পানির সঙ্গেই জীবন কাটাচ্ছেন। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতা, সব কাজেই তাদের লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে হয়। এই পানির কারণে নারীদের প্রজননতন্ত্রে নানা ধরনের ইনফেকশন বা সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখতে গিয়ে নারীরা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন।এই শারীরিক কষ্ট এবং পিরিয়ডের সময়কার সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে এখানকার অনেক নারী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খাচ্ছেন বা ‘সোমাজেক্ট’ নামক ইনজেকশন নিচ্ছেন। লবণাক্ত পানির কারণে জরায়ু ও প্রজনন স্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকি এড়াতে পিল খেয়ে পিরিয়ড অনিয়মিত বা বন্ধ করার চেষ্টা করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণের ইনজেকশন বা পিল সেবনের ফলে নারীদের শরীরের স্বাভাবিক হরমোন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে জরায়ুর সমস্যা কমার বদলে বরং জটিলতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সরেজমিনে দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরাতে গেলে স্থানীয়রা জানান, এই লবণাক্ততার প্রভাবে কিশোরীদের মধ্যে মাসিক অনিয়মিত হওয়া, তীব্র ব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতা বাড়ছে। এসব সমস্যা সামাল দিতে দরিদ্র পরিবারগুলো হিমশিম খাচ্ছে। চক্ষুলজ্জায় ভয়ে বিষয়টি কাউকে জানান না তারা। কেউ কেউ ফার্মেসি থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ ছাড়াই নানা ধরনের চিকিৎসা নেন তারা। আবার অনেকে ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাদের কিশোরী মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দেন। এই কিশোরীরা অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ করছে, যা তাদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বয়ে আনছে। লোকলজ্জার ভয় এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা এই অঞ্চলের নারী ও কিশোরীদের চরম মানসিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই ইউনিয়নের মরিয়ম খাতুন (ছদ্মনাম) এর জ্বলন্ত উদাহরণ। অভাবের তাড়নায় ছোটবেলা থেকেই নোনা পানিতে কাজ করছেন তিনি। নোনা পানির দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণে একপর্যায়ে জরায়ু হারিয়েছেন মরিয়ম। শারীরিক এই ত্রুটির কারণে স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান।
এ বিষয়ে মরিয়ম খাতুন বলেন, যে নোনা পানির কারণে সব হারালাম, পেটের দায়ে আজও সেই পানিতেই নামতে হয়।
একই লড়াই গাবুরার হালিমা খাতুনেরও। ১০ জনের সংসার চালান মাছের পোনা বিক্রির টাকা দিয়ে। হালিমা খাতুন বলেন, ‘প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা নোনা পানিতে জাল টানি। এতে শরীরে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কিন্তু কী করব? এই পানিতে না নামলে চুলা জ্বলে না।’
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট লবণাক্ততা আর উপকূলের নাজুক চিকিৎসা ব্যবস্থা কেড়ে নিচ্ছে নারীদের প্রাণ। গাবুরার পার্শ্বেমারী গ্রামের ফারুক গাজীর পরিবারকে এর চরম মূল্য দিতে হয়েছে। তাদের তৃতীয় সন্তান হুজাইফা রহমানের জন্মের সময় স্ত্রী হালিমা খাতুন মারা যান।
হুজাইফার চাচি শাহিদা খাতুন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের এলাকায় লবণাক্ততা অনেক বেড়ে গেছে। হালিমা অন্তঃসত্ত্বা থাকা অবস্থায়ও এই নোনা পানিতে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রসবের সময় তার গর্ভে পানি ছিল না। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ডাক্তাররা জানান, যেকোনো একজনকে বাঁচানো সম্ভব–হয় মা, না হয় সন্তান। মায়ের অন্তিম ইচ্ছাতেই এই পৃথিবীর মুখ দেখে শিশু হুজাইফা।
গাবুরা ইউনিয়নের এক তরুণী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, উপকূলের এই দুর্গম এলাকায় দুর্যোগ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যায় না। বিয়ের আগে থেকেই সে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খাওয়া শুরু করে। পরে তার বিয়ে হয় এবং বর্তমানে তার একটি সন্তান রয়েছে।
তিনি বলেন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস হলে আমাদের এলাকা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। তাই স্থানীয় ফার্মেসি থেকে বিবাহিতদের মাধ্যমে পিল এনে খেতাম। এখানে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। ক্লিনিকে যেতে নৌকা ভাড়া ও যাতায়াত খরচ মিলিয়ে অনেক সময় পরিবারের আয়ের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে নিজের মতো করে ব্যবস্থা নেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে উপকূলীয় নারীরা প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা নোনা পানিতে রেণু ও কাঁকড়া আহরণের ফলে জরায়ুতে ইনফেকশন, টিউমার ও ক্যানসারের মতো রোগ বাড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় পৌনে ছয় লাখ নারী জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত হন। উপকূলীয় এলাকায় নারীদের বিভিন্ন প্রজনন স্বাস্থ্য জটিলতার প্রভাব পড়ছে জন্মহারেও। দেশে যেখানে মোট প্রজনন হার তুলনামূলক বেশি, সেখানে স্বাস্থ্যকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী জরায়ুজনিত নানা সমস্যার কারণে শ্যামনগর উপজেলার কিছু এলাকায় এই হার নেমে এসেছে মাত্র ০.৮৯ শতাংশে।
বড় কোনো দুর্যোগে গাবুরা যখন মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন গর্ভধারণ এড়াতে নারীদের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে স্থানীয় ফার্মেসি ও গ্রাম্য চিকিৎসকদের কাছ থেকে পাওয়া জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ও সোমাজেক্ট ইনজেকশন।
স্থানীয় ফার্মেসি মালিক আজমুন নাহার কুইনসহ একাধিক ফার্মেসি মালিক ও গ্রাম্য চিকিৎসকরা জানান, দুর্যোগের সময় নোনা পানির প্রভাব বাড়ে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। তখন অনেক নারী বাধ্য হয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল বা ইনজেকশন নেন। আমরা সরাসরি কিশোরীদের কাছে এগুলো বিক্রি না করলেও তারা অনেক সময় বিবাহিত নারীদের মাধ্যমে এগুলো সংগ্রহ করে নেয়। তারা আরও বলেন, অনেক সময় কিশোরীরা অবিবাহিত থাকলেও তারা সেটি লুকায়। পরিবারের পক্ষ হতে ওই কিশোরীকে বিবাহিত দাবি করে অনেকে এই ধরনের চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় ফার্মেসি কিংবা গ্রাম্য চিকিৎসকদের কিছুই করার থাকে না বলে জানান তারা।
গাবুরা ইউনিয়নে তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও উন্নত চিকিৎসার কোনো সুযোগ নেই। জরুরি প্রয়োজনে অন্তঃসত্ত্বা মাকে হাসপাতালে নিতে হলে পাড়ি দিতে হয় উত্তাল নদী ও ভাঙাচোরা রাস্তা। এই ইউনিয়নের ডুমুরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএইচসিপি হেলেনা বিলকিস এ অঞ্চলের নারী স্বাস্থ্যের চিত্র তুলে ধরে বলেন, এখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন রোগী আসেন, যার বড় একটি অংশ কিশোরী ও নারী। জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততার কারণে তাদের মধ্যে জরায়ুর সংক্রমণ, চর্মরোগ ও পুষ্টিহীনতার সমস্যা বাড়ছে। তবে সবচেয়ে বড় সংকট যাতায়াত ব্যবস্থা। প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দিলে মাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রওনা করানো হয়, কিন্তু অনেক সময় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথেই তাদের মৃত্যু হয়। যাতায়াতব্যবস্থা ভালো না হওয়ার কারণে এই এলাকায় মাতৃ-মৃত্যু ও শিশু-মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক।
সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. আ. সালাম বলেন, উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনকে সরাসরি জরায়ু সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, কিন্তু এটি সঠিক নয়। প্রকৃত পক্ষে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে মানুষ চর্মরোগ, হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, অনেক নারী এবং কিশোরী নিজের মতো করে ওষুধ গ্রহণ করছে। তারা সচেতনভাবে চিকিৎসা নিচ্ছে না। এটি মূলত সঠিক চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগের অভাবের কারণে এবং দুর্গম যাতায়াতের কারণে।
আমরা ইতোমধ্যেই গাবুরা ইউনিয়নকে প্রাধান্য দিয়ে ১০ শয্যার হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা করেছি, যাতে নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো যায়। এই হাসপাতালের মাধ্যমে নারী ও শিশুদের জন্য উন্নত চিকিৎসা, জরুরি সেবা এবং নিয়মিত চিকিৎসা পরামর্শ সরবরাহ করা হবে। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুত এটি অনুমোদিত হবে এবং এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি পাবে।