জনবহুল রায়েরবাজার এখন রাজধানীর একটি অবরুদ্ধ জনপদ। ধানমন্ডি ও শংকর হয়ে বেড়িবাঁধমুখী যাতায়াতের অন্যতম পথ ‘হাশেম খান রোড’ এখন পুরোপুরিই অচল। উন্নয়নের নামে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কেটে রাখা হয়েছে বড় বড় গর্ত। যত্রতত্র নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ। যাতায়াত অনুপযোগী রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
স্যুয়ারেজ লাইনের কাজ করতে গিয়ে খুঁড়ে রাখা হয়েছে বড় বড় গর্ত। সড়কের দুই পাশের একাধিক ভবনে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন। যান চলাচল বন্ধ হওয়ায় শিক্ষার্থী, রোগী ও গৃহিণীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। দোকান বন্ধ হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। নির্মাণকাজ কবে শেষ হবে তা নিয়েও নেই কোনো নিশ্চয়তা।
এই অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন, কিছু কর্মকর্তার গাফিলতির কারণে জনদুর্ভোগ হচ্ছে। তাদের বদলি করলে কাজে গতি ফিরবে।
তবে কাজ কবে নাগাদ শেষ হবে তার নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেননি কেউ। বরং এই সড়কের সঙ্গে যুক্ত রায়েরবাজারের সাদেক খান রোড, নাদের খান রোডেরও একই অবস্থা।
স্থানীয়রা বলছেন, কোনো নোটিশ ছাড়াই সড়ক খোঁড়া শুরু হয়েছে। কবে এই কাজ শেষ হবে তাও কেউ নির্দিষ্ট করে জানাচ্ছেন না। রাস্তার মাঝে ১০ ফুটের মতো গভীর করে খুঁড়ে ফেলা হয়েছে। রাস্তা গর্ত করতে গিয়ে আশপাশের বাড়িগুলোতে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কাটতে হয়েছে পানির লাইনও। এই রাস্তা দিয়ে একজন সুস্থ মানুষও হাঁটতে পারেন না, অসুস্থদের অবস্থা চিন্তাও করা যায় না।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়কটি ক্ষতবিক্ষত করে রাখার ফলে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। গভীর গর্তে মানুষ পড়ে আহত হচ্ছেন। নেই কোনো নিরাপত্তা। চোখে পড়েনি সতর্কতামূলক কোনো সাইনবোর্ডও। কোনো বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। দেখার যেন কেউ নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক শিক্ষক আমিনুল হক (৬২) বলেন, এই দেশে দুর্ভোগ সব সাধারণ মানুষের জন্য। যারা মানুষের সেবক, তারা দুর্ভোগে পড়েন না। সাধারণ মানুষের জীবন যেন দুর্ভোগের আরেক নাম। এই দেখেন, বাসা থেকে বের হতে পারি না। নিচে নামলেই গর্ত, ধুলা আর ইটের স্তূপ। দুই দিন আগে পাশের বাড়ির এক বৃদ্ধা পড়ে গিয়ে পা ভেঙে ফেলেছেন। কাজের লোক আসতে চায় না, রিকশা আসার তো উপায়ই নেই।
হাশেম খান রোডে গিয়ে দেখা যায়, সড়কে ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ লাইন বসানোর কাজ চলছে। এ জন্য রাস্তার মাঝে বেশ কিছু গভীর গর্ত খোঁড়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে নেই কোনো নিরাপত্তা ব্যারিকেড বা সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড। পথচারীদের চলাচলের জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। অর্ধসমাপ্ত ড্রেনের পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নির্মাণসামগ্রী ও নোংরা পানি পেরিয়ে প্রতিদিন চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় গৃহবধূ ও মা সালমা আক্তার বলেন, রাস্তার কাজের জন্য বাসার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। এমনিতে এই এলাকায় সব সময় গ্যাসসংকট থাকে, এখন তা আরও বেড়েছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা চাকরিজীবী শফিকুল ইসলাম বলেন, সকাল ৯টার অফিস ধরতে হলে এখন ৭টায় বের হতে হয়। রিকশাও চলে না, হেঁটে ধুলোর মধ্যে চলতে হয়। এক রকম অসুস্থই হয়ে যাচ্ছি। সবচেয়ে অবাক লাগে, কাজ কবে শেষ হবে কেউ জানেন না।
সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে লোকসান গুনছেন ব্যবসায়ীরা। এ জন্য তারা ক্ষোভে ফুঁসছেন। হাশেম খান রোড ঘেঁষে প্রায় হাজারেরও বেশি দোকান রয়েছে। আছে ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও। রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম আর্থিক সংকটে। কেউ কেউ দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন, বাকিরা বলছেন, দৈনিক দোকান খরচই উঠছে না, ব্যবসা নেই বললেই চলে।
লন্ড্রির দোকানের হাসান সরোয়ার বলেন, এই রোডের বেহাল অবস্থা দেখে কাস্টমাররা দোকানে আসেন না। দোকান খরচই উঠছে না, ব্যবসা একদম শেষ।
এদিকে সড়কের কাজের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। রায়েরবাজারের এই এলাকাটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক জোন ৫-এর আওতাভুক্ত। এই জোনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) মো. ছাদেকুর রহমান। এলাকার বেহাল অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘কাজ ধীরগতিতে হচ্ছে এটা খুবই দুঃখজনক। আমি নতুন এসেছি, তাই বিস্তারিত বলতে পারছি না। তবে এ ধরনের একাধিক অভিযোগ এসেছে। এখন মনে হচ্ছে কিছু কর্মকর্তাকে বদলি করা প্রয়োজন। তারা ঠিকভাবে কাজ করছেন না বলে মনে হচ্ছে। আমি দ্রুত কাজ শেষ করার বিষয়টি দেখব।’