এই পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ও মধুর শব্দ ‘মা’। প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব মা দিবস’। সে হিসেবে আজ মা দিবস। কিন্তু বাংলাদেশে এবারের মা দিবস এসেছে এক শোকাবহ বাস্তবতার ভেতর দিয়ে। কারণ হাম ও হামের উপসর্গে একের পর এক শিশুর মৃত্যুতে ভারাক্রান্ত ৩ শতাধিক পরিবার। মৃত শিশুদের পরিবারগুলোর অভিযোগ–সময়মতো টিকা না পাওয়ায় তাদের সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশে সন্তানহারা এসব মায়ের কান্নায় ভারী আজকের মা দিবস।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে ৬ হাজার ৯৭৯ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত হামে ও হামের উপসর্গে মোট ৩৫২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত দুই মাসে এসব পরিবার হারিয়েছে তাদের ভবিষ্যৎ, আর হাসপাতালের করিডরগুলো পরিণত হয়েছে সন্তানহারা মা-বাবা ও স্বজনদের আহাজারির স্থানে। সন্তানকে বাঁচাতে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে চলা, আইসিইউর সামনে রাত জেগে দাঁড়িয়ে থাকা, আর শেষ মুহূর্তে সন্তানের নিথর দেহের পাশে মা-বাবার আর্তনাদে গোটা দেশ বারবারই স্তব্ধ হয়েছে।
সন্তানহারা মায়েদের গল্প
চাঁদপুরের ফারজানা ইসলাম হারিয়েছেন তার ৮ মাস ১৮ দিনের সন্তান ফাইয়াজ হাসান তাজিমকে। দীর্ঘ ১১ বছরের অপেক্ষার পর আইভিএফ পদ্ধতিতে পাওয়া সন্তানকে বাঁচাতে তিনি নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার একাধিক হাসপাতালে (বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতাল, প্রো-অ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আলোক হাসপাতাল, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সুপারম্যাক্স হেলথ কেয়ার) ছুটেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২২ এপ্রিল প্রো-অ্যাকটিভ হাসপাতালের পিআইসিইউতে মারা যায় তাজিম।
শোকার্ত ফারজানা বলেন, ‘আমার ছেলেটা ছিল অনেক সাধনা করে পাওয়া সন্তান। বিয়ের ১১ বছর পর ওকে পেয়েছিলাম। মার্চ থেকে সে অসুস্থ হতে শুরু করে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, তারপর হাম ধরা পড়ে। আমি আর ওর বাবা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটেছি। ওর চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝতাম ও খুব কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু আমি কিছুই করতে পারছিলাম না।’
ফারজানা আরও বলেন, ‘হাসপাতালে এক দিনও ঠিকমতো ঘুমাইনি। পিআইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে শুধু ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকেছি। ওর চোখ দেখেই বুঝতাম কত কষ্ট হচ্ছে। সুপারম্যাক্স হাসপাতালে যখন ক্যানোলার কারণে ওর পা ফুলে শক্ত হয়ে গেল, তখন মনে হচ্ছিল আমার বুকটাই ফেটে যাচ্ছে। অনেক হাসপাতালে বেড পাইনি, কোথাও মা-বাবার পাশে থাকার সুযোগ ছিল না। তারপরও আশা ছাড়িনি। আমার বাবুর হামের প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার তারিখ ছিল ১ মে। কিন্তু তার আগেই ২২ এপ্রিল সে চলে গেল। মৃত্যুর আগের যে হাসির ছবিটা আছে, সেটিই এখন আমার কাছে শেষ স্মৃতি। দুই মাস ধরে এত শিশু মারা যাচ্ছে, কিন্তু কেউ দায় নিচ্ছে না। আমি শুধু ভাবি, আমার ছেলেটা যদি সময়মতো সঠিক চিকিৎসা আর সুরক্ষা পেত, তাহলে হয়তো আজ বেঁচে থাকত।’
রাজধানীর ডা. এম আর খান শিশু হাসপাতালে ২ এপ্রিল মারা যায় ৪ বছর ৩ মাস বয়সী আকিরা হায়দার আরশি। মেয়ের মৃত্যুর পর আহাজারি করে কাঁদতে কাঁদতে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন আরশির মা। এর আগে ১ এপ্রিল দুপুরে পিআইসিইউতে মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা হয় বাবা আল আমিনের। আল আমিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেন, ‘আরশি বলেছিল, বাবা আমাকে বুকে নাও, আমাকে পানি দাও। কিন্তু চিকিৎসকরা কাছে যেতে দেননি।’ পরদিন ২ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুসনদে হামের পাশাপাশি শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ, রক্তে জীবাণুর সংক্রমণ (সেপসিস) এবং জন্মগত হৃদরোগের সম্ভাব্য জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়।
এর আগে আরশিকে বাঁচাতে প্রায় এক মাস রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটেছেন তার মা-বাবা। আরশির স্বজনরা জানিয়েছেন, মেয়ের শেষ সময়ের কষ্ট দেখে তারা বারবার ভেঙে পড়ছিলেন। মেয়ের জামা, খেলনা আর ছোট ছোট স্মৃতি আঁকড়ে এখনো শোক সামলানোর চেষ্টা করছেন তারা। মিরপুর এলাকার বাসিন্দা এই পরিবার এখনো বিশ্বাস করতে পারে না, যে শিশুটি কিছুদিন আগেও বাসায় খেলত, সে আর নেই। বাবা আল আমিনের ভাষায়, ‘বিশ্বাস করতে পারছি না, আমার কলিজাটা আর নেই।’
বগুড়ার শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ এপ্রিল মারা যায় ১০ মাস বয়সী হুমায়রা। হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর দ্রুতই অবস্থার অবনতি ঘটে। হুমায়রার মা বলেন, ‘প্রথমে জ্বর, পরে শরীরে দানা ওঠে। হাসপাতালে নেওয়ার পর শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। কোলে নিয়ে শুধু দোয়া পড়েছি। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।’ মেয়ের মৃত্যুর পর তিনি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েন। হাসপাতালের করিডরে কান্নায় বারবার জ্ঞান হারিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, সময়মতো উন্নত চিকিৎসা পেলে হয়তো তার মেয়েকে বাঁচানো যেত।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় এক বছরের নুর মো. সাফওয়ান। তার মা বলেন, ‘সাধারণ জ্বর ভেবেছিলাম। পরে র্যাশ ওঠে, শ্বাস নিতে পারছিল না। সারা রাত কোলে নিয়ে বসেছিলাম। ছেলেটা শুধু পানি চাইছিল।’ হাসপাতালের চিকিৎসকরা পরে জানান, শিশুটি জটিল হামে আক্রান্ত হয়েছিল। সন্তানের মৃত্যুতে তার মায়ের কান্না এখনো থামেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় (গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) আরও ৯ শিশু মারা গেছে হামে ও হামের উপসর্গে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজারের বেশি শিশু। একই সঙ্গে হামে আক্রান্ত শিশুদের অপুষ্টি, হাসপাতালগুলোতে বেড সংকট, চিকিৎসা বিলম্ব এবং জনবল ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বরিশাল, ঢাকা, খুলনা ও সিলেট–দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই মৃত্যুর ঢেউ এখন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে আনছে।
হাসপাতালের করিডর, আইসিইউর কাচের দেয়াল আর অ্যাম্বুলেন্সের শব্দের ভেতর আজ শোনা যায় শুধু একেকটি মায়ের আহাজারি–‘আমার সন্তানকে বাঁচাতে পারলাম না?’ প্রতিটি শিশুই তার পরিবারের সম্পদ ও স্বপ্ন, দেশের ভবিষ্যৎ। ফলে প্রতিটি শিশুর মৃত্যু দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।