দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট, লবণাক্ততা ও মৃতপ্রায় নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে অবশেষে পদ্মা নদীর ওপর বহুল আলোচিত ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রথম ধাপের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি সংরক্ষণ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে বিশাল এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন, নদীর হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল পরিবর্তন, পলি ব্যবস্থাপনা এবং ভারত-সংশ্লিষ্ট ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। চলতি বছর জুলাই থেকে আগামী ২০৩৩ সালের জুন মেয়াদে প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কাজ বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯ জেলার নদী, কৃষি, মৎস্য, নৌ-চলাচল ও সুপেয় পানির সংকট কমবে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রকল্প সম্পর্কে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্রসংকট তৈরি হয়েছে। নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ তৈরি হবে।
রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইস গেট, নেভিগেশন লক, ফিস পাস এবং রেলসেতু থাকবে। পাশাপাশি ব্যারাজ ও গড়াই অফটেক এলাকায় দুটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী, এই পাঁচটি নদীব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। নদী খনন, রেগুলেটর নির্মাণ, গাইড বাঁধ, অফটেক স্ট্রাকচার ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নও করা হবে পর্যায়ক্রমে। কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, পাবনা, রাজশাহী ও গোপালগঞ্জসহ ১৯ জেলার ১২০টি উপজেলা এই প্রকল্পের সরাসরি সুফল পাবে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে এবং কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগ। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথম ধাপে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রকল্পটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে অর্থায়নের চাপ কমানো যায় এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের (জিওবি) এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
অর্থায়ন ও জমি অধিগ্রহণ বিষয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিন খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ জিওবি অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। আর জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে স্থানীয় জেলা প্রশাসক (ডিসি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, পদ্মার মতো বৃহৎ নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন, নদীভাঙন, উজানে ক্ষয় এবং উজান-ভাটিতে অতিরিক্ত পলি জমা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নিয়মিত হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যাল সমীক্ষা হালনাগাদ করতে হবে। নদীর আচরণ পরিবর্তিত হলে নকশা ও বাস্তবায়ন কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্য একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে, ভারত-সংশ্লিষ্ট পানিবণ্টন বাস্তবতাকে ঘিরে। ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানে পানির প্রবাহ প্রত্যাশামতো না থাকলে ব্যারাজের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন গণমাধ্যমকে বলেন, প্রকল্পটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ও মৃতপ্রায় নদীগুলোতে প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। তবে ব্যারাজের উজানে ক্ষয় ও ভাটিতে পলি জমার মতো পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের নকশা, প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প সফল করা কঠিন হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো হবে না; বরং এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ, নৌ-অর্থনীতি ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্পকে একটি বড় বাজি হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। যদি ভারত থেকে আসা পানির পরিমাণ আশানুরূপ না হয়, তবে এই বিপুল বিনিয়োগ কোনো কাজেই আসবে না। তখন ব্যারাজটি শুধু একটি সুন্দর দৃশ্য হয়ে থাকবে, কিন্তু সেচ বা লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না।
এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, কোনো চুক্তি ছাড়া ব্যারাজ নির্মাণ করা মানে হলো নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া। কারণ বাংলাদেশ একবার এই প্রকল্পে বিপুল টাকা খরচ করে ফেললে, ভারত জানবে যে এই অবকাঠামো সচল রাখতে বাংলাদেশের পানির খুব প্রয়োজন। এতে ভবিষ্যতে পানিবণ্টন চুক্তির আলোচনায় বাংলাদেশ দুর্বল অবস্থানে চলে যেতে পারে।
এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এই প্রকল্পের বিষয়ে মতামত দিয়ে গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, এই প্রকল্প যে বাংলাদেশের উপকারে আসবে, তা কি প্রকল্প প্রস্তুতকারীরা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত করতে পেরেছেন? সে ধরনের সমীক্ষা আছে কি? থাকলে সেটি জনগণের কাছে প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন?
তিনি বলেন, ব্যারাজের উজানে নদীতে পলিপতনের ফলে তলদেশ ভরাট হয়ে যাবে এবং ব্যারাজের প্রস্তাবিত স্থান পাংশা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার নদীর দুই তীরে বন্যা এবং পাড়ভাঙন বৃদ্ধি পাবে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের অভিজ্ঞতা তারই সাক্ষ্য দেয়। ফারাক্কার ফলে সেখানে উজানে বিহারের পাটনা পর্যন্ত গঙ্গার তলদেশ প্রায় ২০ ফুট উঁচু হয়ে গেছে এবং তার ফলে বন্যা এবং পাড়ভাঙন তীব্র হয়েছে। সে কারণে বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের নেতৃত্বে ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেওয়ার দাবিতে সেখানে প্রবল আন্দোলন গড়ে উঠেছে।
পাশাপাশি প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে পদ্মা নদীর শুষ্ক মৌসুমের যতটুকু পানি দক্ষিণ-পশ্চিমে অপসারিত হবে দেশের মধ্যাঞ্চল এবং মেঘনা মোহনার জন্য ঠিক ততটুকু পানিই হ্রাস পাবে। এর ফলে আড়িয়াল খাঁসহ অন্যান্য নদীর প্রবাহ কমে যাবে এবং মেঘনা মোহনা দিয়ে লবণাক্ততা দেশের আরও ভেতরে প্রবেশ করবে।
একই বিষয়ে পরিবেশবাদী সংগঠন বাপা ও বেন মনে করে অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাওয়া একটি হঠকারী পদক্ষেপ হবে। বাপা ও বেন বরং মনে করে যে সরকারের উচিত, আন্তর্জাতিক নদ-নদীর ব্যবহারবিষয়ক জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের চুক্তি স্বাক্ষর এবং র্যাটিফাই (অনুসমর্থন) করে তার ভিত্তিতে ভারতের কাছ থেকে গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহে বাংলাদেশের হিস্যা বৃদ্ধির জন্য জোর প্রচেষ্টা চালানো এবং এই দাবির প্রতিফলন ঘটিয়ে আসন্ন গঙ্গা চুক্তি নবায়ন করা।