পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসা মানবাধিকারকর্মী মাহরাং বালোচকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ২০২৪ সালের একটি বিক্ষোভের সময় এক আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যকে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় তাকে এই সাজা দেওয়া হয়।
তবে মাহরাং বালোচ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের দাবি- এই মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে স্তব্ধ করার একটি কৌশল।
বেলুচিস্তান ইউনিটি কমিটির (বিওয়াইসি) নেতা মাহরাং বালোচ এবং সহকর্মী সিবঘাতুল্লাহর বিরুদ্ধে হত্যা ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, ২০২৪ সালে গোয়াদর বন্দরে অনুষ্ঠিত একটি বিক্ষোভে তারা উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে জনতাকে উসকে দেন। এর ফলে বিক্ষোভকারীরা লাঠি ও পাথর দিয়ে আধাসামরিক বাহিনীর একটি গাড়িতে হামলা চালান। ওই ঘটনায় সৈনিক শাব্বির আহমেদ দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং পরে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
তবে মাহরাং বালোচ ও সিবঘাতুল্লাহ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তারা এবং তাদের আইনজীবীরা বিচার প্রক্রিয়া বর্জন করেছেন।
কোয়েটার সন্ত্রাসবিরোধী আদালত রায়ে বলেন, দুজনই বেলুচিস্তান ইউনিটি কমিটির ‘অবৈধ সমাবেশে’ সক্রিয় ছিলেন এবং ফেডারেল কনস্ট্যাবুলারির সদস্য হত্যার ঘটনায় তাদের অভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল। আদালত তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি নিহত শাব্বির আহমেদের উত্তরাধিকারীদের দুই লাখ পাকিস্তানি রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন মামলায় মাহরাং বালোচ ও সিবঘাতুল্লাহ গত দুই বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন।
রায়ের পর পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশন অবিলম্বে মামলার রায় পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, মৌলিক অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের সঙ্গে রাষ্ট্র চরমপন্থিদের মতো আচরণ করছে, যার ফলে প্রশাসনিক ও বিচারিক সিদ্ধান্ত একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট হচ্ছে।
মাহরাং বালোচের বোন ও আইনজীবী নাদিয়া বালোচ এবং প্রতিরক্ষা দলও রায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি এবং ভিডিও লিংকের মাধ্যমে সাক্ষ্য দেওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের যথাযথভাবে জেরা করার সুযোগও প্রতিপক্ষকে দেওয়া হয়নি।
এদিকে সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ বিচার প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে এটিকে ‘ন্যায়বিচারের প্রহসন’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার অভিযোগ, পুরো বিচার গোপনীয়তার মধ্যে পরিচালিত হয়েছে এবং পাকিস্তান সরকার ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করছে।
অন্যদিকে বেলুচিস্তান সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপক্ষের কাছে ‘অখণ্ডনীয় প্রমাণ’ রয়েছে এবং এই মামলার সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কোনো সম্পর্ক নেই।
২০২৪ সালে বিবিসির ১০০ নারী তালিকায় স্থান পাওয়া মাহরাং বালোচ ২০০৯ সালে তার বাবাকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের পর মানবাধিকার আন্দোলনে যুক্ত হন। দুই বছর পর তার বাবার মরদেহে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায় বলে পরিবারটি দাবি করে।
২০২৩ সালের শেষ দিকে নিখোঁজ স্বজনদের বিচার দাবিতে তিনি শত শত নারীকে নিয়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার পদযাত্রা করে ইসলামাবাদে পৌঁছান। তার সংগঠন বেলুচিস্তানে জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে আসছে।
তবে পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ, সংগঠনটির সঙ্গে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর যোগাযোগ রয়েছে, যা বিওয়াইসি বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। সূত্র: বিবিসি
খাদিজা রুমি/অমিয়/