ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বার্তার জবাবে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ মঙ্গলবার কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন যে, ইউরোপ গুন্ডাদের কাছে নতি স্বীকার করবে না বা ভয় পাবে না। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড বিক্রির প্রস্তাবে ইউরোপ রাজি না হলে বড় অংকের শুল্ক আরোপের যে হুমকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছেন, তার তীব্র সমালোচনা করে ম্যাক্রোঁ এসব কথা বলেন।
অন্যান্য ইউরোপীয় নেতারা আটলান্টিক ওপারের এই বিবাদ যাতে আর না বাড়ে সেজন্য পরিমিত সুর বজায় রাখার চেষ্টা করলেও ম্যাক্রোঁ সরাসরি পাল্টা আক্রমণ করেছেন।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ম্যাক্রোঁ বলেন, ফ্রান্স এবং ইউরোপ নিষ্ক্রিয়ভাবে শক্তিশালীদের আইন মেনে নেবে না। তিনি আরও যোগ করেন যে, তা করা হলে তারা অন্যের অনুগত বা দাসে পরিণত হবে।
পরিবর্তে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব যখন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছে না, তখন ইউরোপ আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব এবং আইনের শাসনের পক্ষে কথা বলে যাবে। প্রয়োজনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাল্টা কঠোর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এর জবাব দিতে পারে।
ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘‘আমরা গুন্ডাদের চেয়ে সম্মানকে বেশি গুরুত্ব দিই এবং নৃশংসতার চেয়ে আইনের শাসনকে বেশি প্রাধান্য দিই।’’ ভাষণের সময় ম্যাক্রোঁ এভিয়েটর সানগ্লাস পরেছিলেন। এলিসি প্রাসাদ জানিয়েছে, চোখের রক্তনালী ফেটে যাওয়ায় চোখ সুরক্ষার জন্য তিনি এটি পরেছেন।
ট্রাম্প ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের ওপর বিশাল শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার এবং ম্যাক্রোঁর পাঠানো ব্যক্তিগত বার্তা জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেওয়ার পর এই ভাষণ দেন তিনি। ট্রাম্পের এমন কর্মকাণ্ডকে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের নজিরবিহীন লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত শনিবার ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, গ্রিনল্যান্ড দখল বা অধিগ্রহণের অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ফ্রান্সসহ বেশ কয়েকজন ইউরোপীয় মিত্রের ওপর দফায় দফায় শুল্ক বাড়ানো হবে। ইইউ-এর প্রধান রাষ্ট্রগুলো ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।
ম্যাক্রোঁ বলেন, ওয়াশিংটনের এই অবিরাম শুল্ক বৃদ্ধি মৌলিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। তিনি আরও বলেন, ‘‘যখন আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন এটি আরও বেশি অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।’’
ইউরোপের পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
গ্রিনল্যান্ড সংকট নিয়ে জরুরি আলোচনার জন্য আগামী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ব্রাসেলসে একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলন ডেকেছেন ইইউ নেতারা। ট্রাম্প গত গ্রীষ্মে ইইউ-এর সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হওয়ার পর ইইউ ৯৩ বিলিয়ন ইউরোর মার্কিন পণ্যের ওপর যে শুল্ক স্থগিত রেখেছিল, তা আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হতে পারে।
ম্যাক্রোঁ ইইউকে তাদের ‘অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট’ (যা অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘ট্রেড বাজুকা’ নামে পরিচিত) ব্যবহারের জন্য চাপ দিচ্ছেন। এটি ব্যবহার করলে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরকারি টেন্ডারে অংশ নেওয়া বা প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের মতো পরিষেবা খাতে বাণিজ্য সীমিত হয়ে যেতে পারে।
ম্যাক্রোঁ বলেন, পরিস্থিতি এতটা খারাপ হওয়াটা একটা ‘পাগলামি’।
সম্পর্কের অবনতি
ন্যাটো সদস্য ডেনমার্কের কাছ থেকে আর্কটিক দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেওয়ার ট্রাম্পের এই জেদ ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটিয়েছে। এটি ইউরোপীয় শিল্পখাত এবং আর্থিক বাজারেও বড় ধাক্কা দিয়েছে।
এছাড়া ট্রাম্পের প্রস্তাবিত নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দিতে ফ্রান্সের অনীহায় ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়েছেন। প্যারিসের আশঙ্কা, এই সংস্থাটি জাতিসংঘের ভূমিকাকে খর্ব করতে পারে।
ম্যাক্রোঁর এই অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প সোমবার রাতে বলেন, ‘‘আমি তার (ম্যাক্রোঁর) ওয়াইন এবং শ্যাম্পেনের ওপর ২০০% শুল্ক আরোপ করব, তখন সে ঠিকই যোগ দেবে; যদিও তার যোগ দেওয়ার কোনো দরকার নেই।’’
ব্যক্তিগত বার্তা প্রকাশ
এর কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বিনিময় করা মেসেজের একটি স্ক্রিনশট প্রকাশ করেন। ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে বার্তাটি সত্য। সেই বার্তায় ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পকে বলেছিলেন, ‘‘আপনি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কী করছেন তা আমি বুঝতে পারছি না।’’
একই সঙ্গে তিনি রাশিয়া এবং অন্যদের আমন্ত্রণ জানিয়ে একটি জি-৭ বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প বা ফরাসি সূত্র মেসেজগুলোর নির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করেনি।
দাভোসে কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা নেই
ম্যাক্রোঁ নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি দাভোসে তার সফর বুধবার পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করবেন না। বুধবারেই ট্রাম্প সেখানে পৌঁছাবেন। ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘‘আমার সূচি পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই।’’ তিনি জানান যে, আগে থেকেই তার সন্ধ্যায় চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
২০১৭ সাল থেকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে থাকা ম্যাক্রোঁ ২০২৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় থেকেই তাদের সম্পর্কে অনেক চড়াই-উতরাই দেখা গেছে—কখনও তারা একে অপরের প্রশংসা করেছেন, আবার কখনও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন।
ফরাসি কর্মকর্তারা ম্যাক্রোঁর সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে বলেন যে, তারা প্রায়ই আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চ্যানেলের বাইরে ফোনে কথা বলেন বা টেক্সট পাঠান। ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, ম্যাক্রোঁ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন বলেই ট্রাম্প তাকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছেন।
ম্যাক্রোঁ শিবিরের আইনপ্রণেতা পিয়েরে-আলেকজান্দ্রে ল্যাংলেড রয়টার্সকে বলেন, ‘‘প্রতিরোধে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণেই ফ্রান্স আজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।’’ সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/