যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তাতে দেশটিতে ১ হাজার ৪০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। একই সঙ্গে তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
এখন যুদ্ধের ১৮ দিন পার হওয়ার পর সহায়তা সংস্থা ও প্রতিবেশী দেশগুলো সম্ভাব্য শরণার্থী সংকট নিয়ে ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ইরানে ইতোমধ্যে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আপাতত সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে যাওয়ার সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও বড় ধরনের জনস্রোতের আশঙ্কায় প্রতিবেশী দেশগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ইরানের প্রতিবেশী সাতটি দেশ হলো আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, ইরাক, পাকিস্তান, তুরস্ক ও তুর্কমেনিস্তান। এর মধ্যে ইরাকের সঙ্গে সবচেয়ে দীর্ঘ সীমান্ত, প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার।
প্রতিটি দেশই নিজস্ব রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও নিরাপত্তা উদ্বেগের মুখে রয়েছে। এদিকে ইরানের ভেতরে পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। দেশটির রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১০ হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৬৫টি স্কুল ও ৩২টি চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে। রাজধানী তেহরান, শিরাজ ও ইসফাহানে আবাসিক এলাকাগুলোও হামলার শিকার হয়েছে।
একই সময়ে আকাশসীমা বন্ধ থাকায় ইরান থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচলও স্থগিত রয়েছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান নাইটিঙ্গেল ইন্টারন্যাশনালের গবেষণাপ্রধান এলদানিজ গুসেইনভ বলেন, এখন পর্যন্ত হামলার বেশির ভাগই তেহরান ও ইরানের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় দেশের অন্যান্য অঞ্চল, বিশেষ করে তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের চাপ বহন করছে।
তিনি বলেন, ‘এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তা হলে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোতে বেশি জমা হবে, যা ভবিষ্যতে সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।’
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি তেহরানের মতো প্রায় ১ কোটি মানুষের শহরে বিদ্যুৎ বা পানির সরবরাহ ভেঙে পড়ে, তা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তখন হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হবে। গুসেইনভ বলেন, ‘অবকাঠামো ধ্বংস হলে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রিত শরণার্থী প্রবাহ তৈরি হয় না, বরং হঠাৎ করে ব্যাপক সংখ্যায় মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।’
ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে শুধু তুরস্ক, ইরাক ও পাকিস্তানেরই বড় শরণার্থী জনগোষ্ঠী সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে।
গবেষক ইমতিয়াজ বালোচ বলেন, সংকট আরও গভীর হলে অনেক ইরানি বিশেষ করে ইরাক ও তুরস্কে আশ্রয় নিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক চাপে পড়তে পারে তুরস্ক। দেশটি ইতোমধ্যে সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বিপুলসংখ্যক শরণার্থী আশ্রয় দিয়েছে। নতুন করে ইরানি শরণার্থী প্রবেশ করলে মানবিক চাপ আরও বাড়বে এবং নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।
ইরানের সঙ্গে তুরস্কের প্রায় ৫৩০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে এবং ইরানি নাগরিকদের জন্য ভিসা ছাড়া প্রবেশের সুযোগ আছে। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৩৬ লাখ সিরীয় শরণার্থী রয়েছে এবং গত এক দশকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অভিবাসনবিরোধী মনোভাবও বেড়েছে।
তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুস্তাফা চিফতচি মার্চের শুরুতে জানান, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সরকার তিনটি বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করেছে। প্রথমটি হলো সীমান্তে পৌঁছানোর আগেই ইরানের ভেতরে অভিবাসন প্রবাহ থামানো। দ্বিতীয়টি সীমান্তে বাফার জোন তৈরি করা। আর তৃতীয়টি শেষ বিকল্প হিসেবে নিয়ন্ত্রিতভাবে শরণার্থীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া।
তুরস্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে ইরান সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। ৩৮০ কিলোমিটার কংক্রিট দেয়াল, ২০৩টি অপটিক্যাল টাওয়ার এবং ৪৩টি পর্যবেক্ষণ পোস্ট স্থাপন করা হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের শরণার্থী ঢল দেখা যায়নি। তুর্কি সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ৩ মার্চের মধ্যে ৫ হাজার ১০ জন তুরস্কে প্রবেশ করেছে এবং ৫ হাজার ৪৯৫ জন দেশ ছেড়ে গেছে।
অন্যদিকে যুদ্ধের প্রভাব অন্যভাবেও পড়েছে তুরস্কে। ৯ মার্চ ন্যাটো জানায়, তারা তুরস্কের আকাশসীমায় একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। এর ধ্বংসাবশেষ গাজিয়ানতেপ এলাকায় পড়ে, যা সিরিয়া সীমান্ত থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে। তবে তুরস্কে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইরান। সূত্র: আল জাজিরা