প্রত্নতত্ত্ববিদরা সাধারণত মেঝে খনন করলে প্রাচীন মাটির টালি অথবা সুন্দর রোমান মোজাইক খুঁজে পান। তবে এক দল গবেষক নেদারল্যান্ডসের আলকমার শহরের ঐতিহাসিক রেড লাইট এলাকায় খননের সময় আবিষ্কৃত হয়েছে এক রহস্যময় হাড়ের মেঝে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এটি শুধু স্থানীয় ইতিহাসের একটি অংশ নয়, বরং আলকমারের প্রাচীন সমাজ ও স্থাপত্যরীতির একটি অনন্য নিদর্শন।
আলকমার শহরের অ্যাকটারডাম এলাকায় অবস্থিত এক ভবনের ভেতরে এই সুনিপুণভাবে সাজানো হাড়গুলো পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রায় ৫০০ বছর আগে ভবন নির্মাণের সময় গরুর হাড় ব্যবহার করা হয়েছে। তবে অ্যাকটারডাম ‘রেড লাইট ডিস্ট্রিক্ট’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার কয়েক শতাব্দী আগে এই হাড়ের মেঝে তৈরি করা হয়েছে।
আলকমার পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, মেঝে তৈরিতে সাধারণত টাইলস ব্যবহার করা হতো, যা খুব ব্যয়বহুল ছিল না। তবে হাড়ের ব্যবহারের কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তারা জানায়, হাড়গুলো বিশেষ কোনো কারণে ব্যবহার করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কোনো কারিগরি পেশার সঙ্গে এর সংযোগ থাকতে পারে। আবার এটি কম খরচে মেঝে তৈরির একটি উপায়ও হতে পারে।
হেরিটেজ সার্ভিস বিভাগের বিশেষজ্ঞরা ১৬০৯ সালে নির্মিত ভবনটির সংস্কার কাজের সময় এই হাড়ের মেঝে আবিষ্কার করেন। এটি নতুন টাইলসের মেঝের নিচে মাটি, বালি ও কাদা মাটির মিশ্রণে তৈরি একটি পাতলা স্তরে আবৃত ছিল।
গবেষকরা ধারণা করছেন, এই হাড়গুলো ভবন তৈরির অনেক আগে মেঝে তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে, যখন অ্যাকটারডাম রেড লাইট ডিস্ট্রিক্ট হিসেবে পরিচিত ছিল না। হাড়ের এমন বিন্যাসের পেছনে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা অর্থনৈতিক কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
হাড়গুলো কখন ব্যবহার করা হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করছেন, এই হাড়গুলো সম্ভবত ১৫০০ শতকে মেঝে তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। আকলমার পৌর কর্তৃপক্ষের প্রত্নতাত্ত্বিক ন্যান্সি ডি জং জানান, ‘আবিষ্কৃত ভবনটি ১৬০৯ সালে নির্মিত হলেও, যেখানে হাড়গুলো পাওয়া গেছে সেই ভিত্তি ও নিচের স্তরটি আরও অনেক পুরনো হতে পারে। পুরনো ভিত্তির ওপর নতুন বাড়ি নির্মাণ করা একটি সাধারণ ঐতিহ্য।’
এই মেঝেতে ব্যবহৃত হাড়গুলো মূলত গরুর পায়ের নিচের অংশ (মেটাকার্পাল এবং মেটাটারসাল)। প্রতিটি হাড় নির্দিষ্ট উচ্চতায় কাটা হয়েছে। তবে টালির পরিবর্তে হাড় ব্যবহারের কারণ এখনো অজানা। সম্ভবত এগুলো প্রয়োজনীয় সংখ্যক টালির অভাবে বা কোনো ফাঁকা স্থান পূরণে ব্যবহার করা হয়েছে।
যদিও হাড় দিয়ে মেঝে তৈরির বিষয়টি অস্বাভাবিক, তবে এটি নেদারল্যান্ডসের নর্থ হল্যান্ড প্রদেশে বিরল নয়। এর আগে হোর্ন, এনখোয়াইজেন ও এডামের মতো শহরে এমন মেঝে পাওয়া গেছে। হোর্ন শহরে মেঝের টাইলসের সঙ্গে খাড়াভাবে হাড় ব্যবহার করা হয়েছে, যা পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে বলে ইঙ্গিত দেয়।
আলকমার প্রায় ১ হাজার বছরের পুরনো শহর। এর নাম প্রথম দশম শতাব্দীর এক নথিতে পাওয়া যায়। নতুন এই আবিষ্কার শহরের ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। প্রত্নতাত্ত্বিক ন্যান্সি ডি জং বলেন, ‘একটি প্রাচীন যুগের অংশ নিজ চোখে দেখা সব সময়ই একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা। এটি আলকমারের ইতিহাসে নতুন তথ্য যোগ করছে।’
আলকমার পৌরসভার হেরিটেজ পরিষদের কাউন্সিলর আনজো ভ্যান ডি ভেন বলেন, ‘এই মেঝে আবিষ্কার অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এমন অনেক লুকানো গল্প আছে, যা আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক দল খুঁজে বের করার অপেক্ষায় রয়েছে।’
রাস্তার দুই পাশে পতিতাপল্লিতে সজ্জিত ৪৯০ ফুটের একটি রাস্তা অ্যাকটারডাম। এটি আলকমারের পুরোনো শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত, যা ঐতিহ্যবাহী পনির বাজারের জন্য পরিচিত। মধ্যযুগে আলকমারে যৌনব্যবসা প্রচলিত থাকলেও, সেই সময়কার রেড লাইট এলাকা ছিল শহরের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত ভ্রাউয়েনস্ট্রাট (ওমেন্স স্ট্রিট)।
খ্রিস্টান চার্চ যৌন কাজকে আপত্তিকর মনে করত। তবে এটি অন্য নারীদের ধর্ষণ ও সতীত্ব থেকে রক্ষা করার জন্য একটি উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ১৯৭৩ সালে অ্যাকটারডামে প্রথম পতিতালয় চালু হয়। সেই সময়েও এই রাস্তা ব্যারেল, টুপি ও দড়ি প্রস্তুতকারকের মতো ঐতিহ্যবাহী কারিগরদের আবাসস্থল ছিল। এটি ছিল অ্যাকটারডামের রেড লাইট এলাকা হিসেবে যাত্রা শুরুর প্রথম পদক্ষেপ। অ্যাকটারডাম পরবর্তীতে পাচার ও ১৯৯৬ সালে দুই যৌনকর্মীর হত্যার মতো ঘটনা এই এলাকার এক অন্ধকার অধ্যায়ও প্রকাশ করে। শতাব্দীর শুরু থেকে পৌর সভার অনুমতি নিয়ে এটি পরিচালিত হচ্ছে।
আলকমারের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও সামাজিক কাঠামো বুঝতে প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য এই মেঝে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকরা আশা করছেন, এটি শহরের অতীত জীবনধারা ও ঐতিহ্য নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করবে। সূত্র: ডেইলি মেইল


