মানবনিউরন ও সিলিকন প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি বিশ্বের প্রথম বায়োলজিক্যাল কম্পিউটার এখন বাজারে এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নভিত্তিক স্টার্টআপ কোর্টিকাল ল্যাবস তৈরি করেছে ‘সিএল১’ নামের এ অভিনব কম্পিউটার, যা ২ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, সিএল১ বিশ্বের প্রথম কোড স্থাপনযোগ্য বায়োলজিক্যাল কম্পিউটার। এটি দেখতে ছোট একটি বাক্সের মতো হলেও ভেতরে রয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। যেখানে পুষ্টিকর তরলে মানবনিউরন বা স্নায়ুকোষ রাখা হয়েছে। এ নিউরনগুলো সিলিকন চিপের ওপর বেড়ে উঠছে এবং চিপের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠানো ও গ্রহণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট আচরণ শেখানো হচ্ছে কোষগুলোকে।
এর আগে একই প্রযুক্তির সাহায্যে কোর্টিকাল ল্যাবস ‘ডিশব্রেইন’ নামের একটি প্রোটোটাইপ দিয়ে ভিডিও গেম ‘পং’ খেলতে শিখিয়েছে। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এসেছে সিএল১।
কোর্টিকাল ল্যাবসের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ব্রেট কাগান বলেন, ‘কম্পিউটারটির পারফিউশন সার্কিট কোষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে। এতে বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য ফিল্টার, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, গ্যাস মিশ্রণ ও তরল চলাচলের জন্য পাম্প রয়েছে।’
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, এই সিস্টেম মাত্র কয়েক ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করে এবং নিউরনগুলোকে ছয় মাস পর্যন্ত কার্যক্ষম রাখে। বিজ্ঞানীরা আশা করেছেন, নিউরনকেন্দ্রিক এ প্রযুক্তি মস্তিষ্কজনিত রোগের ওষুধ আবিষ্কার ও রোগের কার্যকারণ বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কোর্টিকাল ল্যাবসের বিজ্ঞানীরা এখনো এমন একটি সিস্টেম তৈরির জন্য কাজ করছেন, যা মানবমস্তিষ্কের বিভিন্ন ধরনের কার্যাবলিকে সম্ভাব্য সর্বনিম্ন সংখ্যক কোষ ব্যবহার করে নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করতে পারে। তবে সিএল১-এর মতো সরঞ্জাম গবেষকদের মস্তিষ্কের রোগগুলোর চিকিৎসাপদ্ধতি উন্নয়নে সাহায্য করতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে সিস্টেমটি কীভাবে শেখে এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
কাগান আরও বলেন, ‘স্নায়ু ও মানসিক রোগের জন্য ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রবেশ করা বেশির ভাগ ওষুধ ব্যর্থ হয়। কারণ মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সূক্ষ্মতা রয়েছে। তবে এ সরঞ্জামগুলোর মাধ্যমে পরীক্ষা করার সময় সেই সূক্ষ্মতাগুলো পর্যবেক্ষণ করা যায়।’
সিএল১-এর মতো ‘সিন্থেটিক বায়োলজিক্যাল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম জৈবিক বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি তৈরির বিষয়ে নৈতিক দিক নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। কারণ এতে জীবিত মানব কোষ ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও ডিশব্রেইন এবং সিএল১ মানবমস্তিষ্কের তুলনায় কম জটিল। তবে এ প্রযুক্তি চেতনা ও ভবিষ্যতের কৃত্রিম জৈবিক বুদ্ধিমত্তার কষ্টের অভিজ্ঞতার সম্ভাবনা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার মারডক চিলড্রেনস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের স্টেম সেল গবেষক সিলভিয়া ভেলাস্কো বলেন, ‘এখনই এনিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ নেই। বরং এমন একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি ব্যবহার না করাটা হতে পারে বড় এক অপচয়। তবে এর ব্যবহারে ভবিষ্যতের নৈতিক প্রশ্নগুলো আগে থেকেই বিবেচনায় নেওয়া উচিত।’
প্রতিটি সিএল১ কম্পিউটারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপকভাবে পাওয়া যাবে। যেহেতু এটি ব্যবহারে নির্দিষ্ট ল্যাব সুবিধার প্রয়োজন হয়, তাই যারা সরাসরি ব্যবহার করতে পারবেন না, তাদের জন্য ক্লাউড-ভিত্তিক সেবা চালু করবে কোর্টিকাল ল্যাবস।


