সংস্কৃত ‘মাতৃ’ শব্দের সঙ্গে ইংরেজি ‘মাদার’ (mother), ‘ভ্রাতৃ’ শব্দের সঙ্গে ‘ব্রাদার’ (brother) বা ‘দ্বি’-এর সঙ্গে ‘টু’ (two)-এর মিল কি শুধু কাকতালীয়? কিংবা জার্মান ‘হুন্ড’ (Hund) শব্দের সঙ্গে ইংরেজি ‘হাউন্ড’ (hound)-এর সাদৃশ্য? এমন প্রশ্নের উত্তরে ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, না। এই সাদৃশ্যের পেছনে রয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক যোগসূত্র, যা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় প্রায় ৮ হাজার বছর আগের এক বিলুপ্ত ভাষায়।
বিজ্ঞানীরা এই প্রাচীন ও বিলুপ্ত ভাষাটির নাম দিয়েছেন ‘প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয়’ বা সংক্ষেপে ‘পিআইই’। ধারণা করা হয়, প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার বছর আগে ইউরেশিয়ার কোনো এক অঞ্চলে এই ভাষার প্রচলন ছিল। লিখনপদ্ধতি আবিষ্কারের বহু আগের সেই যুগে এর শব্দগুলো কখনো লেখা হয়নি, এমনকি এর কোনো নির্দিষ্ট নামও ছিল না। তবে ভাষাবিজ্ঞানীরা আধুনিক বিভিন্ন ভাষার তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর গঠন ও শব্দভান্ডার পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন।
অবশ্য দুটি ভিন্ন ভাষার শব্দ দেখতে এক রকম হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় এক ভাষা অন্য ভাষা থেকে শব্দ ধার করে। যেমন ইনুকটিটুট ভাষার ‘ইগলু’ (বাড়ি) শব্দটি ইংরেজিতে ‘igloo’ হিসেবে প্রবেশ করেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে কোনো কারণ ছাড়াই দুটি ভিন্ন ভাষার শব্দে মিল দেখা যায়, যেমন থাই ভাষার ‘ফাই’ (ไฟ) শব্দের অর্থ আগুন, যা ইংরেজি ‘ফায়ার’ (fire)-এর মতো শোনালেও এদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে বাংলা, হিন্দি, সংস্কৃত, ইংরেজি, গ্রিক, ফার্সি বা লাতিনের মতো ভাষার মূল শব্দগুলোর মধ্যে যে মিল রয়েছে, তা ধার করা বা কাকতালীয় নয়। এই ভাষাগুলোকে বলা হয় ‘আত্মীয় ভাষা’, যার অর্থ, এসব ভাষা একটি অভিন্ন পূর্বপুরুষ ভাষা থেকে কালের বিবর্তনে উদ্ভূত হয়েছে।
একই উৎসের সন্ধান
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর এই পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টি প্রথম সামনে আসে রেনেসাঁস ও ঔপনিবেশিক যুগে। ভারতে কর্মরত উইলিয়াম জোন্সের মতো ইউরোপীয় পণ্ডিতরা ইউরোপীয় ভাষাগুলোর মধ্যকার সাদৃশ্য সম্পর্কে জানতেন। তবে তারা সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে লাতিন, গ্রিক ও জার্মান ভাষার পদ্ধতিগত মিল খুঁজে পেয়ে বিস্মিত হন।
তারা লক্ষ করেন, সংস্কৃত ‘মাতৃ’, ‘ভ্রাতৃ’ ও ‘দুহিতৃ’ শব্দগুলোর সঙ্গে যথাক্রমে লাতিন ‘মাতের’ (māter), জার্মান ‘ব্রুডার’ (Bruder) ও ইংরেজি ‘ডটার’ (daughter)-এর অবিশ্বাস্য মিল রয়েছে। যেহেতু এই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রাচীনকালে সরাসরি যোগাযোগের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ ছিল না, তাই এই মিলকে নিছক ধার করা শব্দ বলে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এর পদ্ধতিগত সাদৃশ্য। সংস্কৃত শব্দের শুরুর ‘ভ’ ধ্বনিটি জার্মান ভাষায় ‘ব’ (b) ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যা ‘ভ্রাতৃ’ ও ‘ব্রাদার’ উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অন্যদিকে সংস্কৃতের ‘প’ ধ্বনিটি জার্মানিক ভাষায় ‘ফ’ (f) ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়েছে। এই ধরনের নিয়মাবদ্ধ পরিবর্তন প্রমাণ করে, ভাষাগুলো একটি অভিন্ন উৎস থেকে জন্ম নিয়ে ভিন্ন পথে বিকশিত হয়েছে।
ভাষার এক বিশাল পরিবার
১৯ শতকের ভাষাবিজ্ঞানীরা এই পর্যবেক্ষণগুলোকে আরও সুসংহত করেন। ভাষাগুলোর পরিবর্তনকে বিপরীত প্রকৌশলের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে সেই হারানো আদি ভাষাটির শব্দভাণ্ডার পুনর্গঠন করেন। জীববিজ্ঞানের মতোই ভাষার একটি ‘পরিবার’ বা ‘বংশবৃক্ষ’ তৈরি করা হয়। এর মূলে রয়েছে প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় (পিআইই) ভাষা।
এই বিশাল ভাষা পরিবারের প্রধান শাখাগুলো হলো-
ইন্দো-আর্য: বাংলা, হিন্দি, সংস্কৃত, উর্দু, মারাঠি ইত্যাদি।
ইরানি: ফারসি, কুর্দি, পশতু।
জার্মানিক: ইংরেজি, জার্মান, ডাচ, সুইডিশ।
ইতালিক: লাতিন এবং লাতিন থেকে উদ্ভূত স্প্যানিশ, ফরাসি, ইতালীয়, পর্তুগিজ।
হেলেনিক: গ্রিক।
বাল্টো-স্লাভিক: রুশ, পোলিশ, চেক, লিথুয়ানীয়।
কেল্টিক: ওয়েলশ, আইরিশ।
তবে মনে রাখতে হবে, ভারত বা ইউরোপের সব ভাষা এই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়। ভারতের দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর তামিল ও তেলেগু এবং ইউরোপের ফিনিশ, হাঙ্গেরীয়, বাস্ক ও জর্জীয় ভাষা সম্পূর্ণ ভিন্ন উৎস থেকে এসেছে।
কেমন ছিল সেই প্রাচীন সভ্যতা?
পুনর্গঠিত পিআইই শব্দভান্ডারের মাধ্যমে সেই ভাষাভাষীদের জীবনযাত্রা সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। যেমন- ‘রাজা’ (*rēg-), ‘দুর্গ’ (*pelə-) ইত্যাদি শব্দ থেকে বোঝা যায়, তাদের সমাজব্যবস্থা ছিল স্তরবিন্যস্ত ও সম্ভবত যুদ্ধভিত্তিক। তারা শস্যচাষ (*agro-), পশুপালন (*gwou), চাকাযুক্ত যানবাহন (*wogh-no), ধাতু (*ajes-; তামা বা ব্রোঞ্জ) ও ব্যবসা-বাণিজ্যের (*wes-no) সঙ্গে পরিচিত ছিল। ‘দেবতা’ (*deiw-os) বা ‘প্রার্থনা’ (*meldh) জাতীয় শব্দ তাদের ধর্মীয় আচারের ইঙ্গিত দেয়।
এই প্রমাণের ভিত্তিতে অনেক গবেষক মনে করেন, এই সভ্যতা কৃষ্ণসাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের মধ্যবর্তী স্তেপ অঞ্চলে (আজকের ইউক্রেন ও দক্ষিণ রাশিয়া) গড়ে উঠেছিল। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা বলছে, এর উৎস হতে পারে আনাতোলিয়া বা বর্তমান তুরস্কে। কৃষির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই ভাষা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
কথ্য ভাষা জীবাশ্মের মতো টিকে থাকে না, তাই হাজার হাজার বছর আগে সেই মানুষেরা বিলীন হয়েছেন। তবে তাদের রেখে যাওয়া ভাষার কাঠামো আজও আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে, যা মানবসভ্যতার প্রাগৈতিহাসিক যাত্রার এক আবছা কিন্তু মনোমুগ্ধকর চিত্র তুলে ধরে। সূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট


