প্রকৃতির বিশাল রাজ্যে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা সব সময় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মেলে না। আমরা সাধারণত লোমশ বিড়ালছানা কিংবা মায়াবী চোখের কুকুরছানা দেখলে মুগ্ধ হই। তাদের আদর করতে ইচ্ছা করে, দেখলে মনে হয় কোলে তুলে নেই। তবে বনের গহিনে, সমুদ্রের অতলে কিংবা মাটির নিচে এমন অনেক প্রাণী রয়েছে, যাদের চেহারা আমাদের প্রচলিত সৌন্দর্যের সংজ্ঞায় ঠিক পড়ে না। অনেক ক্ষেত্রে এদের আমরা ‘কুৎসিত’ বা ‘মন্দ’ বলে আখ্যায়িত করি। তবে এই অদ্ভুত দর্শনের প্রাণীগুলোর প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা।
বিবর্তনের ধারায় মানুষ হিসেবে আমাদের মস্তিষ্কে কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যকে ‘সুন্দর’ বা ‘আকর্ষণীয়’ হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘বেবি স্কিমা’। বড় চোখ, ছোট নাক, গোলাকার মুখ–এসব বৈশিষ্ট্য আমাদের মনে সহজাতভাবে মায়া ও আদরের অনুভূতি জাগায়। মূলত আমাদের নিজেদের শিশুদের যত্ন নেওয়ার জন্য বিবর্তনের মাধ্যমে এই মানসিকতা তৈরি হয়েছে। এই মানসিকতা বন্যপ্রাণীদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রভাবিত করে।
যেসব প্রাণীকে আমরা তথাকথিত ‘কুৎসিত’ বলি, তাদের প্রতি আমাদের সেই সহজাত মায়া কাজ করে না। ফলে প্রকৃতিতে থেকেও তারা অনেকটা অবহেলিত। সুন্দর প্রাণীদের সংরক্ষণে মানুষ যতটা আগ্রহী হয়, এই অদ্ভুত দর্শনের প্রাণীদের ক্ষেত্রে ততটা হয় না। অথচ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় এদের ভূমিকা অপরিসীম। এদের অনেকের রয়েছে এমন সব সক্ষমতা, যা বিস্ময়কর।
বিশ্বের এমন কিছু বিচিত্র ও অদ্ভুত দর্শনের প্রাণী নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন। মানুষের চোখে এরা হয়তো কুৎসিত, তবে প্রকৃতির চোখে এরা একেকটি মাস্টারপিস। চলুন জেনে নেওয়া যাক এমন কিছু প্রাণী সম্পর্কে।
আই-আই (Aye-aye)
মাদাগাস্কারের গহিন অরণ্যে দেখা মেলে এই অদ্ভুত প্রাণীটির। প্রাইমেট গোত্রের এই প্রাণীটি নিশাচর। এর চেহারার দিকে তাকালে প্রথমে নজরে আসবে এর বড় বড় কমলা রঙের চোখ, ইঁদুরের মতো দাঁত ও কালো-সাদা লোমশ শরীর। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য এর হাতের আঙুল। বিশেষ করে এর মাঝখানের আঙুলটি অস্বাভাবিক লম্বা।
আই-আইয়ের এই অদ্ভুত চেহারার পেছনে রয়েছে টিকে থাকার এক দারুণ কৌশল। এরা মূলত গাছের কোটরে লুকিয়ে থাকা পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে। এদের লম্বা আঙুল দিয়ে এরা গাছের কাণ্ডে টোকা দেয়। প্রতি সেকেন্ডে প্রায় আটবার টোকা দিয়ে এরা প্রতিধ্বনি শোনার চেষ্টা করে, যাকে বলা হয় ‘ইকোলোকেশন’। অনেকটা রাডারের মতো কাজ করে এই পদ্ধতি। গাছের ভেতরে কোথায় ফাঁপা জায়গা আছে বা কোথায় পোকা লুকিয়ে আছে, তা শব্দ শুনে বুঝে ফেলে আই-আই। এরপর সেই লম্বা আঙুল দিয়ে পোকা বের করে আনে।
প্রবোসিস মাঙ্কি (Proboscis monkey)
বানর প্রজাতির মধ্যে প্রবোসিস মাঙ্কির চেহারা সবচেয়ে আলাদা। এর প্রধান কারণ এদের বিশাল আকৃতির নাক। একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ প্রবোসিস বানরের নাক লম্বায় প্রায় ১৭ সেন্টিমিটার বা ৭ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। এর গায়ের রং বেশ চমৎকার। মাথায় লালচে লোম, শরীরে হালকা বাদামি আভা ও হাত-পা ধূসর রঙের হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে এদের দেখে মনে হয় যেন কোনো দামি কোট পরে আছে।
বোর্নিও দ্বীপে পাওয়া এই বানরগুলো দারুণ সাঁতারু। এদের পায়ে হাঁসের মতো লিপ্তপাদ থাকায় এরা অনায়াসে পানিতে সাঁতার কাটতে পারে। এমনকি কুমিরের হাত থেকে বাঁচতেও এরা পানিতে ডুব দিতে পটু। তবে খাবার টেবিলে এরা খুব একটা ভদ্র নয়। এদের পাকস্থলী বিশেষ প্রকোষ্ঠযুক্ত হওয়ায় খাবার হজমের সময় প্রচুর গ্যাস তৈরি হয়, ফলে এরা নিয়মিত ঢেকুর তোলে।
ন্যাকেড মোল র্যাট (Naked mole rat)
নাম শুনে বোঝা যায়, এই ইঁদুরজাতীয় প্রাণীটির শরীরে কোনো লোম নেই। কুঁচকানো গোলাপি চামড়া আর মুখের সামনে বেরিয়ে থাকা বিশাল হলুদ দাঁত, সব মিলিয়ে একে ‘কিউট’ বলা কঠিন। তবে চেহারায় কুৎসিত হলেও ন্যাকড মোল র্যাট বিজ্ঞানের জগতে এক বিস্ময়।
মাটির নিচে বসবাসকারী এই ছোট প্রাণীটি অন্যান্য ইঁদুরের তুলনায় অবিশ্বাস্যভাবে দীর্ঘজীবী। এদের ক্যানসার হওয়ার হার প্রায় শূন্যের কোঠায়। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, এদের শরীরে বয়সের ছাপ পড়ে না। জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত এরা সুস্থ থাকে। মাটির নিচে অক্সিজেনের অভাব ও প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এরা নিজেদের বিপাক হার কমিয়ে ফেলতে পারে। এমনকি এদের পানি পান করারও প্রয়োজন হয় না। খাবারের মাধ্যমে এরা প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা পেয়ে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ক্যানসার গবেষণায় এই প্রাণীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্লবফিশ (Blobfish)
ব্লবফিশকে প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে কুৎসিত প্রাণী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া এর ছবি দেখে মনে হয় যেন এক দলা মাংসপিণ্ড বা গলে যাওয়া জেলির স্তূপ। তবে এই তকমাটি আসলে কিছুটা অন্যায্য। কারণ, আমরা সাধারণত ব্লবফিশের যে ছবি দেখি, তা ডাঙায় তোলা।
ব্লবফিশ সমুদ্রের অনেক গভীরে বসবাস করে, যেখানে পানির চাপ অনেক বেশি। এই প্রচণ্ড চাপে টিকে থাকার জন্য এদের শরীরে শক্ত হাড় ও পেশি নেই। এদের শরীর অনেকটা জেলির মতো নরম। পানির নিচে এই চাপের মধ্যে এদের চেহারা স্বাভাবিক মাছের মতোই দেখায়। তবে যখন এদের পানি থেকে ওপরে বা ডাঙায় তোলা হয়, তখন বায়ুমণ্ডলের কম চাপে এদের শরীর আকৃতি ধরে রাখতে পারে না ও ধসে পড়ে। অর্থাৎ নিজস্ব পরিবেশে ব্লবফিশ মোটেও কুৎসিত নয়, বরং অভিযোজনের এক অনন্য উদাহরণ।
গবলিন হাঙ্গর (Goblin shark)
সমুদ্রের গভীরতম অংশের ত্রাস বলা যেতে পারে গবলিন হাঙ্গরকে। এদের বলা হয় ‘জীবন্ত ফসিল’। কারণ প্রায় ১২৫ মিলিয়ন বছর ধরে এদের বংশধররা পৃথিবীতে টিকে আছে। এদের চেহারা দেখলে দুঃস্বপ্ন মনে হতে পারে। লম্বা চ্যাপ্টা নাক ও তার নিচে থাকা চোয়াল, সব মিলিয়ে এক ভুতুড়ে অবয়ব।
গবলিন হাঙ্গরের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বৈশিষ্ট্য এদের চোয়াল। শিকার ধরার সময় এদের চোয়ালটি মুখের ভেতর থেকে স্প্রিংয়ের মতো ছিটকে বেরিয়ে আসে। এদের চোয়াল শরীর থেকে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে। মুখের ভেতরে থাকে সারি সারি ধারালো দাঁত। সাধারণত জাপান উপকূলে সমুদ্রের ১০০ থেকে ১৩০০ মিটার গভীরে এদের দেখা যায়।
পার্পল ফ্রগ (Purple frog)
ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় পাওয়া যায় এই অদ্ভুত দর্শন ব্যাঙটিকে। একে ‘পিগ-নোজ ফ্রগ’ও বলা হয়। এর শরীর থলথলে ও গায়ের রং গাঢ় বেগুনি। এর পেছনের অংশটি বেশ বড় ও স্ফীত। দেখে মনে হতে পারে ব্যাঙটি হয়তো অসুস্থ বা স্থূল। তবে এই শারীরিক গঠন একে মাটির নিচে টিকে থাকতে সাহায্য করে।
অন্যান্য ব্যাঙের মতো এরা লাফাতে পটু নয়, বরং এদের শক্তিশালী পা মাটি খোঁড়ার জন্য উপযোগী। জীবনের বেশির ভাগ সময় এরা মাটির নিচেই কাটায়। মাটির নিচে থাকার কারণে এদের দৃষ্টিশক্তি খুব একটা উন্নত নয়, তাই চোখগুলো খুব ছোট। এদের সরু মুখ ও নাক মাটির আর্দ্র পরিবেশে উইপোকা খুঁজে বের করতে সাহায্য করে। বর্ষাকালে প্রজননের জন্য পুরুষ ব্যাঙ মাটির ওপরে আসে।
ওয়ার্থগ (Warthog)
ডিজনি মুভি ‘লায়ন কিং’-এর পুম্বা চরিত্রটির কথা মনে আছে? সেই পুম্বাই হলো বাস্তবে ওয়ার্থগ। আফ্রিকার তৃণভূমিতে এদের দেখা যায়। এদের মুখের দুই পাশে বড় বড় আঁচিলের মতো অংশ থাকে বলে এদের এমন নাম। যদিও দেখতে খুব একটা সুন্দর নয়, তবে এই আঁচিলগুলো মারামারির সময় তাদের চোখ ও মুখকে আঘাত থেকে রক্ষা করে।
এদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা বড় দাঁত বা ‘টাস্ক’ শিকারিদের হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। সিংহ, চিতা ও হায়েনার মতো ভয়ঙ্কর শিকারিদের হাত থেকে বাঁচতে এরা ঘণ্টায় প্রায় ৪৮ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে। যদিও এরা দেখতে হিংস্র মনে হতে পারে, তবে এরা শান্ত স্বভাবের এবং ফলমূল, ঘাস ও পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে।
বল্ড উকারি (Bald uakari)
আমাজনের জঙ্গলে বসবাসকারী এই বানরটির চেহারা দেখলে মনে হবে যেন কেউ এর মুখে লাল রং মেখে দিয়েছে অথবা রোদে পুড়ে এর মুখ লাল হয়ে গেছে। এদের মাথা ন্যাড়া ও মুখমণ্ডল টকটকে লাল রঙের। শরীরের বাকি অংশে থাকে লম্বা ও ঘন লোম।
মানুষের ক্ষেত্রে মুখ লাল হয়ে যাওয়া অসুস্থতা ও লজ্জার লক্ষণ হতে পারে। তবে উকারি বানরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো। এদের মুখ যত বেশি লাল, তারা তত বেশি সুস্থ। সঙ্গিনী নির্বাচনের সময় নারী বানররা উজ্জ্বল লাল মুখের পুরুষদের পছন্দ করে। তবে এরা ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হলে মুখের লাল ভাব কমে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তখন তারা সঙ্গী পাওয়ার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। বর্তমানে বন উজাড়ের কারণে এই প্রজাতিটি অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে।
হ্যামারহেড ব্যাট (Hammerhead bat)
আফ্রিকার সবচেয়ে বড় বাদুড় হলো হ্যামারহেড ব্যাট। এদের বৈজ্ঞানিক নাম ‘Hypsignathus monstrosus’, যা এদের দানবীয় চেহারার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে পুরুষ বাদুড়গুলোর মাথা বিশাল আকৃতির ও অদ্ভুত গঠনের হয়। এদের নাক ও ঠোঁট ফোলা এবং মুখের আকৃতি অনেকটা হাতুড়ির মতো।
পুরুষ বাদুড়রা নারীদের আকৃষ্ট করার জন্য এক ধরনের বিশেষ নিচু স্বরের হর্নের মতো শব্দ করে। এদের মাথার বিশাল চেম্বার বা প্রকোষ্ঠ এই শব্দকে আরও জোরালো করতে সাহায্য করে। যদিও মানুষের চোখে এদের চেহারা ভীতিপ্রদ, কিন্তু নারী বাদুড়দের কাছে এই বৈশিষ্ট্যগুলোই আকর্ষণীয়। এরা মূলত ফলমূল খেয়ে বেঁচে থাকে।
অ্যালিগেটর স্ন্যাপিং টার্টল (Alligator snapping turtle)
আমেরিকার মিঠা পানিতে পাওয়া এই কচ্ছপটিকে দেখলে মনে হবে জুরাসিক পার্কের কোনো ডাইনোসর উঠে এসেছে। এর পিঠের খোলসটি কাঁটাযুক্ত এবং এবড়ো-খেবড়ো। মাথাটি বিশাল এবং ঠোঁট পাখির মতো বাঁকানো ও ধারালো।
এরা শিকার ধরার জন্য এক দারুণ কৌশল ব্যবহার করে। এদের জিহ্বায় লাল রঙের ছোট একটি অংশ থাকে, যা দেখতে হুবহু কেঁচোর মতো। কচ্ছপটি পানির নিচে মুখ হাঁ করে স্থির হয়ে বসে থাকে এবং জিহ্বার ওই অংশটি নাড়াতে থাকে। মাছ সেটাকে কেঁচো ভেবে খেতে এলেই কচ্ছপটি বিদ্যুৎ বেগে তার শক্তিশালী চোয়াল বন্ধ করে দেয়। এদের কামড়ানোর শক্তি এতটা বেশি যে এরা সহজে হাড় গুঁড়ো করে ফেলতে পারে। আবাসস্থল ধ্বংস এবং মাংসের জন্য শিকারের কারণে এরা বর্তমানে হুমকির মুখে। সূত্র: বিবিসি


