পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে গাছ কাটার সংবাদ। কেউ সরকারি গাছ কেটে বিক্রি করছেন; আবার কেউবা নিজের বাড়ি দেখানোর জন্য সড়কের গাছ কাটছেন। তবে এত কিছুর ভিড়ে ব্যতিক্রম রয়েছে।
অনেকেই আছেন যারা নিজ উদ্যোগে সারা জীবন গাছ লাগিয়ে গেছেন। তেমনি দুজন চট্টগ্রামের রীতু পারভীন ও আবু সুফিয়ান দম্পতি। যারা গত এক যুগ ধরে বিভিন্ন জায়গায় গাছ লাগাচ্ছেন। গড়ে তুলেছেন গ্রিন ফিঙ্গারস নামক একটি সংগঠন। যা পরিবেশ নিয়ে কাজ করছে।
বর্তমানে চট্টগ্রামে কাজ করলেও তাদের শুরু ঢাকা থেকে। ২০১২ সালে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিশুদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে গ্রিন ফিঙ্গারস নিয়ে কাজ শুরু করেন তারা। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালে চট্টগ্রামে চলে আসেন। নগরীর সিআরবি ও ডিসি হিল, আউটার রিং রোড়, বায়েজিদ লিংক রোডে গাছ লাগানোর পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুলে গাছ লাগিয়েছেন। বায়েজিদ লিংক রোডে এক দিনে ১ হাজার ৫০০ ফল গাছ লাগিয়েছিলেন। যদিও সেগুলো বাঁচানো যায়নি।
সম্প্রতি তাদের কর্ণফুলী নদীর পাড়ে স্থানীয় জেলে ও স্থানীয়দের গাছ ও পরিবেশ নিয়ে সচেতন করতে দেখা যায়। তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাছ লাগানোর বিষয়ে রীতু পারভীন বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে সফল প্রকল্প পাহাড়তলীর শহিদ ওয়াসিম আকরাম পার্কে, সেখানে এক হাজারেরও বেশি গাছ লাগিয়েছি।
সেখানে আমরা বিরল প্রজাতির গাছ লাগিয়েছি। যেগুলো সহজে পাওয়া যায় না। সেখানে হিজল, নাগলিঙ্গম, তমাল, জারুল, শিমুল, হরিণা, গোদা হরিণা, বুদ্ধ নারকেল গাছ লাগিয়েছি। বর্তমানে সেগুলো বেশ বড় হয়েছে। এ ছাড়াও সিআরবি, ডিসি হিল, বায়েজিদ লিংক রোডে গাছ লাগিয়েছি। তবে গাছ রক্ষায় কোনো সহায়তা পাইনি। সে জন্য আমাদের লাগানো অনেক গাছ মরে গেছে।’
শুধু গাছ লাগানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না তারা। গাছ কাটা ও পরিবেশের বিপর্যয় হতে পারে এমন সব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন জানিয়ে রীতু পারভীন বলেন, ‘সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের বিরুদ্ধে আমরা প্রথম প্রতিবাদ করি। পরে সেটি গণমানুষের আন্দোলনে রূপ নেয়।
এরপর টাইগারপাসে গাছ কেটে যে সিডিএ র্যাম্প করতে চাইলে সেটার বিরুদ্ধেও আমরা আন্দোলন করি। পরে সেই আন্দোলন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা সম্মিলিত পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন প্ল্যাটফর্মেও কাজ করছি। পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে আমরা সম্মিলিতভাবে সব আন্দোলন এই প্ল্যাটফর্ম থেকে শুরু করি। আমরা কর্ণফুলীর বাকলিয়ার চর রক্ষার আন্দোলনেও সামিল হই। সেখানে আমরা অনেক গাছ লাগিয়েছি। গাছ লাগাতে কোনো ধরনের বাধার মুখে পড়িনি। তবে গাছ রক্ষায় কোনো সহযোগিতা পাইনি। সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই সচেতনতা গড়ে ওঠেনি।’
নিজে বাড়িতে বিরল প্রজাতির গাছের চারা সংরক্ষণ করেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে যেসব গাছ পাওয়া দুষ্কর সেসব গাছের বীজ সংরক্ষণ করি। এরপর পছন্দনীয় জায়গায় সেগুলো রোপণ করি। যেখানে সংরক্ষণ করা সহজ হবে সেখানে রোপণ করি।’
রীতু পারভীনের স্বামী আবু সুফিয়ান বলেন, ‘পরিবেশের প্রতি প্রেমটা ছোট থেকেই। আমাদের এক সন্তান আছে। শিশুদের সচেতন করতে বেশ ভালো লাগে। কেন না তাদের এই বয়সে যা শেখানো হবে সেটি তারা সহজে ভুলবে না। গাছ লাগানোর অভ্যাসটা তাদের মধ্যে ছোট থেকে গড়ে তোলা দরকার। আসলে পরিবেশ বাঁচাতে কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতেই হবে। আমরা যখন বুঝলাম এটি নিয়ে কাজ করতে হবে এবং বেশি বেশি লাগানোর বিকল্প নেই। তখনি আসলে নেমে পড়ি। সেই থেকে আর থামিনি। ইচ্ছে আছে বাকি জীবন এ কাজ জারি রাখব।’
সরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা না পেলেও আমাদের এই কাজে ডা. মঞ্জুরুর করিম সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেন। কথা হলে ডা. মঞ্জুরুল করিম বলেন, ২০ বছর ধরে পরিবেশ নিয়ে কাজ করি। তবে ৮ বছর ধরে টানা কাজ করে চলেছি। যারা এসব কাজ করে তাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করি, নিজেও যাই।’
