খুব সকালে রাঙামাটির কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে পাখি দেখতে বের হয়েছি। চারদিকে শুধু পাখির ডাক। কর্ণফুলী নদীর তীর ধরে হেঁটে চিরসবুজ বনের কিছুটা গভীরে চলে এসেছি। বুনো হাতির ভয় আছে। যে কারণে অনেকটাই সাবধানে পথ চলছি। একসময় পাহাড়ের ঢালে একটি অচেনা গাছে অনেক পাখির আনাগোনা দেখলাম। গাছটিতে লাল রঙের ছোট ছোট ফল ধরে আছে। পাকা ফল খাওয়ার জন্য গাছটিতে নানা জাতের পাখি উড়ে আসছে।
পাখি দেখার জন্য গাছটির কাছাকাছি সুবিধাজনক একটি স্থানে বসে পড়লাম। মূলত ফলভুক পাখিরা গাছটিতে আসছে। এক ঘণ্টার মধ্যে হরিয়াল, বুলবুল, শ্বেতনয়ন, ফুলঝুরি, তেলশালিক, কাঠকুড়ালিসহ অনেক প্রজাতির পাখি দেখা হয়ে গেল। ফলভুক পাখি ছাড়াও পোকা শিকারি ও মধুপায়ী পাখির কয়েক প্রজাতিও দেখলাম ফল গাছটির কাছাকাছি অন্য গাছে। এদের মধ্যে তিনটি সিঁদুরে মৌটুসি পাখি রয়েছে। দুটি পুরুষ এবং একটি নারী। এলাকা নিয়ন্ত্রণ এবং নারী পাখিটির মন জয় করার জন্য পুরুষ দুটো ছোটাছুটি করছিল। প্রায় ১০ মিনিট ধরে তাদের এমন ছোটাছুটি ও ডাকাডাকি শুনছিলাম। অন্যদিকে নারী পাখিটি ডালে চুপচাপ বসে আছে। কদাচিৎ সে উড়ে অন্য ডালে গিয়ে বসছে।
সিঁদুরে মৌটুসি বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি। এরা ঘন চিরসবুজ পাহাড়ি বন, পাতাঝরা বন এবং প্যারাবনে বিচরণ করে। বৃহত্তর সিলেট জেলা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে এবং সুন্দরবনে সিঁদুরে মৌটুসিদের অনেকবার দেখেছি। তবে এই পাখি সবচেয়ে কাছে থেকে দেখেছি হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। সিঁদুরে মৌটুসি সচরাচর জোড়ায় থাকে। তবে একাও থাকে।
এরা মূলত ফুলের মধু পান করে এবং ফুল থেকে ফুলে ঘুরে বেড়ায়। লম্বা ও চিকন চঞ্চু দিয়ে ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। মধু ছাড়াও সিঁদুরে মৌটুসি মাকড়সা ও অন্য ছোট পোকা-মাকড় ধরে। বিশেষ করে তাদের ছানাদের খাওয়ানোর জন্য তারা এসব শিকার করে। এসব খাবারে প্রোটিন বেশি থাকে, যে কারণে দ্রুত ছানাদের বৃদ্ধি ঘটে।
সিঁদুরে মৌটুসি গায়ক পাখি। এরা বেশ চঞ্চল। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ পাখি মনভোলানো সুরে গান গায়। গভীর বনে সেই মায়াবী সুরের মূর্ছনা শুনতে অনেক ভালো লাগে। এপ্রিল থেকে জুলাই মাসে বনের ঝোপের ডালে শেওলা ও মাকড়সার জাল দিয়ে তারা ঝুলন্ত বাসা বানায়। বাসার একদিকে প্রবেশপথ রাখে। সে বাসায় দুই থেকে তিনটি ডিম পাড়ে। ১৪-১৫ দিনে ডিম ফোটে ছানা বের হয়। নারী ও পুরুষ পাখি মিলে ছানারে যত্ন নেয়।
সিঁদুরে মৌটুসি পাখির ইংরেজি নাম ক্রিমসন সানবার্ড। এটি সিঙ্গাপুরের জাতীয় পাখি। বাংলাদেশ ছাড়াও এই পাখি ভারত, ভুটান, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপিন্সে দেখা যায়।
লেখক: নিসর্গী ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার