ছয় বছর আগে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আমার বর্তমান কর্মস্থল ময়মনসিংহের মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান (অনার্স) দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গিয়েছিলাম সিলেটের রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টে। খালের মধ্য দিয়ে ছুটে চলছিল নৌকা। দুপাশের বন দেখতে দেখতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। এক জায়গায় নৌকা থামল। নৌকা থেকে ডাঙায় উঠতেই আমার চোখে পড়ল উদ্ভিদটির ঝোপ। বর্ষাকালে এই ঝোপ পানিতে ডুবে থাকে। সেটি ছিল বন গোলাপ গাছের ঝোপ।
বন গোলাপ বা বুনো গোলাপ হলো বাংলাদেশের নিজস্ব গোলাপ। এর স্থানীয় নাম গুজাকাঁটা। এই ফুল বাংলা সাহিত্যে সেঁউতি ফুল নামে পরিচিত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় উল্লেখ আছে এই ফুলের–¬
‘তটের চরণে তটিনী ছুটিছে,
ভ্রমর লুটিছে ফুলের বাসর
সেঁউতি ফুটিছে, বকুল ফুটিছে
ছড়ায়ে ছড়ায়ে সুরভিশ্বাস।’
বুনো গোলাপের বৈজ্ঞানিক নাম Rosa clinophylla, এটি Rosaceae পরিবারের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। বড় গুল্মজাতীয় এই উদ্ভিদ ৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
রাতারগুল ছাড়া বন গোলাপ পাওয়া যায় টাঙ্গুয়ার হাওর, সুনামগঞ্জের লক্ষ্মী বাওড়সহ বৃহত্তর সিলেট জেলার জলাশয়গুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে। এই উদ্ভিদের আদি নিবাস হিমালয়, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।
বুনো গোলাপ পৃথিবীর একমাত্র জলসহিষ্ণু গোলাপগাছ। অত্যন্ত দুর্লভ গাছ এই বন গোলাপ। বর্ষায় এই গাছ পানিতে ডুবে থাকে, তাই এই গাছ খুঁজে পাওয়া কঠিন। শুকনো মৌসুম বলেই সহজে দেখতে পেয়েছি।
অত্যন্ত বিরল জলসহিষ্ণু বন গোলাপগাছ আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র-আশ্বিন– এই চার মাস হাওর-বাঁওড়ের কাদাপানির নিচে থাকে। তখন পাতা বিলীন হয়ে যায়। আর কার্তিক (মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর) মাসে হাওর-বাঁওড়ের পানি একেবারে কমে গেলে আবার নতুন করে গাছে পাতা হয়। বসন্তকালে (মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য এপ্রিল) বন গোলাপের ফুল ফোটে।
ঢোল কলমি, নলখাগড়া, মূর্তা, বরুণ ও কাশফুলগাছের আড়ালে ঝোপের মতো করে বন গোলাপগাছ বেড়ে ওঠে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে চার মাস পানির নিচে ডুবে থাকে ও বলতে গেলে নির্জীব হয়ে যায়। পানি কমে গেলে আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে ও পাতা-ফুলে নিজেকে মেলে ধরে।
বন গোলাপগাছ ও সাধারণ গোলাপগাছের মধ্যে সামান্য পার্থক্য আছে। সাধারণ গোলাপগাছের পাতায় পত্রক থাকে ৫টি। অন্যদিকে বন গোলাপের পাতায় পত্রক থাকে ৭ থেকে ৯টি। পত্রকের আকার আয়তাকার থেকে উপবৃত্তাকার-বল্লমাকার। এর অগ্রভাগ সূক্ষ্ম। এর পাতার কিনারায় করাতের মতো সূক্ষ্ম কাঁটা থাকে। ফুল খাটো করিম্ব বা একক, কখনো কাক্ষিক এবং লম্বা। উপপত্র ছোট, ০.৫-০.৭ সেন্টিমিটার লম্বা, ঝালরসদৃশ, সাধারণত পত্রবৃন্তলগ্ন।
মায়ানমার, ভারত, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর বিস্তৃতি। জোড়কলমে উন্নত গোলাপের মূল ভিত্তি হিসেবে এই গোলাপ ব্যবহৃত হতে পারে। বুনো গোলাপের কাণ্ডে বিভিন্ন উচ্চতায় চোখ কলম জুড়ে দিয়ে সুন্দর সুন্দর গোলাপের ঝাড় বানানো যায় যেগুলোকে স্ট্যান্ডার্ড রোজ বলে। বাগান সাজাতে পেছনে উঁচু, তারপর ক্রমান্বয়ে নিচু মাপের গাছ লাগালে দেখতে মানানসই হয়।
আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে এই উদ্ভিদটি বাংলাদেশে বিপন্ন। দুর্লভ এই গাছের বিলুপ্তি রোধে আমাদের বাগানে ও জলজ উদ্যানেও এর চাষের ব্যবস্থা করতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ
ময়মনসিংহ
