ঢাকা ৫ শ্রাবণ ১৪৩১, শনিবার, ২০ জুলাই ২০২৪

নির্বাচন-প্রক্রিয়া সৎভাবে মানা হচ্ছে না

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৫০ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৫০ পিএম
নির্বাচন-প্রক্রিয়া সৎভাবে মানা হচ্ছে না
সুলতানা কামাল

শুদ্ধাচার পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরবর্তী সময়ে দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত বা প্রমাণিত হওয়ার ঘটনাই সাক্ষ্য দেয় যে, এসব পুরস্কারের জন্য যে নির্বাচন-প্রক্রিয়া রয়েছে, সৎভাবে কিংবা নীতিনিষ্ঠভাবে তা মানা হচ্ছে না। যারা এই প্রক্রিয়ার দায়িত্বে রয়েছেন, হয় তারা নিজ স্বার্থে বা কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হয়ে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এটা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক এবং গর্হিত একটি কাজ। 

রাষ্ট্রের এত সম্মানীয় পুরস্কার দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত এসব ব্যক্তি নিশ্চয়ই সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারাই যখন এ ধরনের অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান, তখন বুঝতে হবে সমাজের নৈতিকতাবোধের কত অধঃপতন ঘটেছে এবং তাদের মাধ্যমে দুর্নীতি কতটা প্রশ্রয় লাভ করেছে। 

কাজেই  এসব পদক দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু প্রক্রিয়াগত ত্রুটি নিয়ে ভাবলে চলবে না,  ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করা প্রভাবশালী, শক্তিধর ব্যক্তিদের নৈতিক মান নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা ব্যতীত এ ধরনের স্খলনের কোনো সুরাহা হবে না। 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও চেয়ারম্যান, টিআইবি

বাজেটে উপকূলীয় অর্থনীতি সুবিবেচনায় আসেনি

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৪, ১০:০৫ এএম
আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৪, ১০:০৫ এএম
বাজেটে উপকূলীয় অর্থনীতি সুবিবেচনায় আসেনি
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

সেটা বোঝা যায় বাজেট বানানো, পেশ ও পাসের সময় রিমাল নামের ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলীয় অর্থনীতিতে এত বড় ছোবল মেরে গেল, সে ব্যাপারে উপেক্ষার অবয়বে ন্যূনতম উদ্বেগ প্রকাশের নাম-নিশানা মেলেনি। বাজেটে কর্মসূচিভিত্তিক বরাদ্দ তো নয়ই। রিমালের জলোচ্ছ্বাসে পুরো সুন্দরবন তলিয়ে গিয়ে সেখানকার প্রাণিসম্পদের ব্যাপক সংহারসাধনের বিপরীতে তাৎক্ষণিক করণীয় কিছুই ছিল না। 

উপকূলীয় অন্যান্য জনপদে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির সুরাহা সুদূর পরাহত প্রতীয়মান। ক্ষতিগ্রস্ত কিছু লোকজনকে শীর্ষ পর্যায় থেকে সরাসরি সাহায্য দিয়ে ‘আপনাদের জন্য যা কিছু করার করা হবে’- এই প্রতিশ্রুতি ওই উপদ্রুত উপকূলের মাঠেই মারা গেছে মনে হচ্ছে। বাজেটে কিছুই মেলেনি। 

এমনকি এবার পাবলিক চাঁদায় অর্জিত তহবিল গঠনের কোনো ছবি ওঠাতে পারেননি বিএবির মতো করিতকর্মা সংগঠন ও এর নেতারা। রিমাল-সাধিত সর্বনাশের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের সাম্প্রতিক প্রবণতা দেখে মনে হচ্ছে উপকূলীয় অর্থনীতির প্রতি সুরক্ষা-সুবিবেচনা, দায়িত্ববোধ, উদ্ধার-উদ্যোগের চিন্তাচেতনার রাজ্যে নৈরাজ্য বিরাজ করছে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় অর্থনীতি উদ্ধার উন্নয়ন কর্মতৎপরতার মধ্যে কোনো তালমিল পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।  

বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে সুন্দরবন ১২৫ কিলোমিটার, নদীর মোহনা ও ছোট-বড় দ্বীপমালা ২৭৫ কিলোমিটার, সমতল ও সমুদ্রসৈকত ৩১০ কিলোমিটার। টেকনাফের নাফ নদীর মোহনা থেকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল-কালিন্দী পর্যন্ত খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের মোট ১৪টি উপকূলীয় জেলায় বিস্তৃত বাংলাদেশের উপকূলেই দেশের প্রধান দুটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মোংলা, বিশ্বের সেরা গহিন গরান বন সুন্দরবন এবং বিশ্বের অন্যতম অখণ্ডিত (আনব্রোকেন) সমুদ্রসৈকত বা বেলাভূমি কক্সবাজার অবস্থিত। 

দেশের শতকরা ২৫ ভাগ জনগণ যেমন এই উপকূল অঞ্চলে বসবাস করে তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপির কমবেশি প্রায় শতকরা ২৫ ভাগ অবদানও এ অঞ্চলেরই। অথচ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এই অঞ্চল, এর অবকাঠামো এবং বসবাসকারী জনগণের অর্থনৈতিক জীবন নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্বিপাক, বৈষম্য, অবহেলা আর অমনোযোগিতার শিকার। 

অথচ এটা ঠিক বঙ্গোপসাগরের তীরে ও বিশ্বের সেরা গহিন গরান বনের নীড়ে গড়ে ওঠা গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাদেশ যেন প্রকৃতির এক বিচিত্র বিলাস। তার মাথার ওপর হিমালয় পর্বত, সাইবেরিয়ার হিমবাহ ঠেকিয়ে চলে অবিরত, পায়ের নিচে বঙ্গোপসাগর তার পা ধোয়ায় প্রতিনিয়ত। সে কারণেই কর্কট ক্রান্তি রেখার ওপর দাঁড়িয়েও চরম নয় তার আবহাওয়া, নাতিশীতোষ্ণ, মৌসুমি বায়ুর বরমাল্য বরিষণে বাংলা সতত সবুজ শস্যশ্যামল।  

প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল প্রকৃতির বিরূপ আচরণের প্রথম ও প্রত্যক্ষ শিকার সব সময়েই। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির সুরতহাল রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে এটা প্রতিভাত হয়ে ওঠে যে, জাতীয় অর্থনীতির আন্তসলিলা শক্তির (রেজিলিয়েন্ট পাওয়ার) উদ্বোধন যার হাতে সেই সবচেয়ে বেদনায় বিবর্ণ। উপকূলীয় অঞ্চল যেন শুধু দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের মাথাব্যথা সূত্রে সমুপস্থিত, আকালের দিনে নাকালের মোহনায় এবং একমাত্র মিডিয়ায়। 

পাজি-পুঁথি ও সরকারি পরিসংখ্যান ঘেঁটে জানা যায়, ১৭৯৭ থেকে শুরু করে এই সেদিন ২৭ মে, ২০২৪ তারিখে সর্বশেষ রিমাল পর্যন্ত মোট ৪৯৬ বার মাঝারি ও মোটা দাগের জলোচ্ছ্বাস, গোর্কি, হারিকেন, সিডর, আইলা, নার্গিস, মাহাসেন, ফনি, বুলবুল ও আমফান, ইয়াস, রিমেল বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৭৩ বছরে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে ৩২৯টি, এসেছে গড়ে ৫-১০ বছর পর পর, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের বিগত ৫৩ বছরে ১৭৪টি ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস ঘটেছে ঘন ঘন। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ ও মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে পড়ে, তাপমাত্রার পবির্তনপ্রসূত তারতম্য সূত্রে সমুদ্রের তলদেশ স্ফীত হয়ে ওঠার ফলে পরিবেশ ভারসাম্যহীনতার যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে চলেছে বিশ্বের প্রায় সব সমুদ্র উপকূল বেষ্টনীতে বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী বাংলাদেশের জন্য তা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের অশনি সংকেত দিয়ে চলেছে। 

বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল, বিশেষ করে অদূরবর্তী দ্বীপাঞ্চল সামান্য জলোচ্ছ্বাসের ছুতানাতাতেই তলিয়ে যাচ্ছে, তা উদ্ধারে বশংবদ কোনো কার্যক্রম সফল হচ্ছে না। সুন্দরবনের প্রাণিবৈচিত্র্য বিপন্ন হতে চলেছে এর প্রভাবে। এবার রিমালের অকস্মাৎ জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের মৃত হরিণ ভেসে এসেছে লোকালয়ের নদীতে, সুন্দরবন অভ্যন্তরস্থ তিন শতাধিক সুপেয় পানির জলাধার (যা বন্যপ্রাণীদের একমাত্র পানীয় অবলম্বন) লোনা পানিতে একাকার হয়ে যাওয়ায় সেখানকার প্রাণিসম্পদ আজ নিদারুণ সংকটে। 

সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গেছে ফসলের খেত, মাছের ঘের, বিধ্বস্ত হয়েছে বাড়িঘর। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে বেশ কিছু উপজেলা। ঘূর্ণিঝড় রিমালে উপকূলীয় এলাকার ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩৫ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে, আর আংশিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ঘরবাড়ি। 

বাংলাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার প্রশাসন জানাচ্ছে, রাস্তার ওপর গাছ পড়ে থাকায় অনেক এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা চালানো যাচ্ছে না। সেই সঙ্গে ঝড়ের প্রভাব পুরোপুরি না কমায় শুরু করা যাচ্ছে না উদ্ধার অভিযান। বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় এলাকার অসংখ্য মাছের ঘের, ফসলি জমি তলিয়ে গেছে পানির নিচে।

অতীব দুঃখজনক এই যে, রিমালে অসংখ্য বেড়িবাঁধ ধসে পড়েছে। ভেঙেছে আমতলী ও পরশুনিয়ার বাঁধ। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বাঁধ টপকে পানি ঢুকেছে লোকালয়ে। ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবে খুলনার দাকোপ, পাইকগাছা, কয়রা, আশাশুনি ও শ্যামনগরের ৯৬ স্থানে বাঁধে ভাঙন ধরেছে। লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হয়েছে বহু এলাকা। ভেঙে গেছে ঘরবাড়ি। ভেসে গেছে মাছের ঘের।

উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্পর্কে ‘সমকাল’ পত্রিকায় ১৫ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত ‘বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে মার্চে’ শীর্ষক সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়- ‘ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা থেকে উপকূলীয় এলাকার জমি ও ঘরবাড়ি রক্ষায় ছয় জেলায় নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় ৬২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। এ কাজে ব্যয় হবে ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড’। 

২০২০ সালের ১৪ জুলাই সংবাদমাধ্যম বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম পরিবেশিত ‘টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়- ‘টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকার ৮ হাজার কোটি টাকার চারটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ উপমন্ত্রী। চলতি অর্থবছরে (২০২০) প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এ ছাড়া উপকূল উন্নয়ন বোর্ড গঠনের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে’।

এ বিষয়ে ২০১৯ সালের ১২ মে দৈনিক প্রথম আলোয় ‘মেরামত ও রক্ষাণাবেক্ষণে নজর দিন, ঝুঁকিতে উপকূলের বেড়িবাঁধ’ শীর্ষক সম্পাদকীয় স্তম্ভে বলা হয়- ‘ভয়ানক আতঙ্কের কথা হলো, দেশের উপকূলীয় এলাকার ৮ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালে আইলার পর উপকূল এলাকার এসব বাঁধের অনেক জায়গা ভেঙে গিয়েছিল, অনেক জায়গা বানের তোড়ে ভেসে গিয়েছিল; কিন্তু তার বড় অংশ এখনো যথাযথভাবে মেরামত হয়নি। 

তার মানে গোটা উপকূলীয় এলাকা এখন অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে’। সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০১৭ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় মোরায় প্রায় ২২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর বাইরে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলার আঘাতে ১৯ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেগুলো মেরামত এখনো শেষ হয়নি। 

সরকারের হিসাবে দেশে ১৯ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকই উপকূলীয় এলাকায়। উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। লবণাক্ত পানি ফসলি জমিতে চলে আসার পর টানা কয়েক বছর ফসল হয় না। মিঠাপানির মাছ ও অন্যান্য প্রকৃতিবান্ধব কীটপতঙ্গের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হয়। এ কারণে উপকূলের বেড়িবাঁধ সুরক্ষিত রাখায় অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। 

উদ্বেগের বিষয়, বেড়িবাঁধের রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দ সব সময়ই অপ্রতুল। পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের অধীনে থাকা বেড়িবাঁধের ওপর স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘেঁষতে দেয় না। কিন্তু অনেক জায়গায় দেখা গেছে, বাঁধে সামাজিক বনায়ন করা হলে কিংবা এলাকাবাসী ঘরবাড়ি তুললে বাঁধ অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকে। নিজেদের স্বার্থেই এলাকাবাসী বেড়িবাঁধকে সুরক্ষিত রাখতে উদ্যোগী হয়। 

এ কারণে বাঁধগুলোর সুরক্ষার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিস্বার্থের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানো যেতে পারে। আমাদের দেশে দুর্যোগের আগে নানা রকমের প্রস্তুতি নেওয়া এবং দুর্যোগের পর পর সব ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতি চালু আছে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। এ ছাড়া সরকারি বরাদ্দের অর্থ নয়ছয়ের চেষ্টাও দেখা যায়। 

জোয়ারের পানি ঠেকানোর রিংবাঁধ নির্মাণ, বাঁধ মেরামত, সংস্কার প্রভৃতি নামে প্রতি বছর নেওয়া হয় বিভিন্ন প্রকল্প। এসব প্রকল্পে অর্থ নয়ছয়ের ঘটনাও ঘটে। বর্ষা এলে বাঁধ ভেঙে যায়। নতুন প্রকল্পের নামে শুরু হয় নতুন বরাদ্দ। এভাবে বছরের পর বছর উপকূলীয় বাঁধের সংস্কারের নামে চলে অর্থের অপচয়। এই মনোভঙ্গিরও অবসান জরুরি।

লক্ষ্য করার বিষয় যে, বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে যথাযথ তদারকি, গুণগতমান পরীক্ষা ও একে টেকসই করণে দায়িত্বশীল বিভাগ ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং কারিগরি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা রয়েছে, রয়েছে সমন্বিত উদ্যোগের অভাব।

উপকূলীয় অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে বেড়িবাঁধ টেকসই আকারে নির্মাণসহ সুন্দরবন সুরক্ষা এবং উপকূলীয় জনপদ, জীবন ও জীবিকা ও কৃষি অর্থনীতির দুর্দশা লাঘব উত্তর বিকাশকে গুরুত্ব দিতে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রদত্ত বরাদ্দ ও ইতোমধ্যে ঘোষিত উদ্যোগ ও নির্দেশনা যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর কড়া নজরদারি, আগামী অর্থবছরে বিশেষ বরাদ্দদান ও তা বাস্তবায়নে দায়িত্বশীলতা নিশিচত করা। 

মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন করা। উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হলে অর্থনীতির এক চতুর্থাংশ জিডিপি সরবরাহকারী উপকূলীয় অঞ্চলের যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি থেকে উপকূল, সুন্দরবন ও লোকালয় রক্ষার সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়াস প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করবে।  

লেখক: সরকারের সাবেক সচিব। উপকূলীয় কৃষি অর্থনীতির গবেষক 

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা কেন স্বতন্ত্র পে-স্কেল চান?

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৪, ০৯:৫৮ এএম
আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৪, ০৯:৫৮ এএম
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা কেন স্বতন্ত্র পে-স্কেল চান?
ড. মো. আসাদুজ্জামান মিয়া

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনে বর্তমানে অচল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। চলছে সর্বাত্মক কর্মবিরতি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রত্যয় পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্তিকরণ বাতিল, সুপার গ্রেডে অন্তর্ভুক্তি ও স্বতন্ত্র উচ্চতর পে-স্কেল প্রবর্তনের দাবিতে গত ১ জুলাই ২০২৪ থেকে সারা বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালিত হচ্ছে। 

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের আহ্বানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ব স্ব শিক্ষক সমিতির নেতৃত্বে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৬০০০ শিক্ষক একযোগে এই কর্মসূচি পালন করছেন। ফলে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষকরা সর্বাত্মক কর্মবিরতির পূর্বে গত জুন মাস থেকে তাদের দাবির প্রেক্ষিতে মানববন্ধন, অর্ধদিবস কর্মবিরতিসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি দিয়ে তাদের দাবি সরকারের দৃষ্টিগোচরে আনার অনেক চেষ্টা করলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। 

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কথায় কেউ কর্ণপাত করেননি। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সঙ্গে রাষ্ট্রের যেসব শাখা নিবিড়ভাবে কাজ করছে, বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দায়িত্বশীল কেউ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সমস্যা এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে এগিয়ে আসেননি; এমনকি তাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের নির্দেশনাও পাওয়া যায়নি। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রধান ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয়গণের শিক্ষকদের আন্দোলনের বিষয়ে মৌন সমর্থন থাকলেও, তারাও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বোচ্চ অভিভাবক ও মাননীয় আচার্য মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে অবগত আছেন কি না, তাও কারও জানা নেই। এমতাবস্থায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কি কোনো কর্তৃপক্ষ নেই? তারা কি অভিভাবকশূন্য? কার কাছ থেকে তারা এ বিষয়ের সমাধান পাবেন? 

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এই আন্দোলনকে নাকি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করছেন। তা ছাড়া তারা আর কিইবা করতে পারেন? আর কত নিচে নামতে পারেন তারা? শিক্ষকদের তো কোনো সহিংস আন্দোলন করার সুযোগ নেই বা তা তারা করবেনও না। 

তা হলে কিসের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে? নাকি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এই আন্দোলনকে দুর্বল ভাবা হচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা তো সরকারকে বিব্রত করতে চান না, বরং উচ্চশিক্ষাবান্ধব এই সরকারের কাছ থেকে যৌক্তিকভাবে তাদের দাবি আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এই দাবির যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তাঁর সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একটি মর্যাদাসম্পন্ন স্থানে রাখতে যথেষ্ট সচেষ্ট ছিলেন। 

বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকারের দলীয় ইশতেহার (২০০৮) ও জাতীয় শিক্ষানীতিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মর্যাদাসম্পন্ন উচ্চতর স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোসহ সুপার গ্রেড প্রদানের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। তাই কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা তাদের নিজস্ব শেষ করণীয় হিসেবে ক্লাস-পরীক্ষাসহ অন্যান্য অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে কর্মবিরতি দিয়েছেন। তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আর কিইবা করার আছে?    
           
এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় অচল থাকলে দেশের আদৌ কি কোনো ক্ষতি হয়? ঈদ, পূজা, গ্রীষ্ম/শীতকালীন অন্যান্য ছুটির মতো কয়েক দিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলে তো তেমন ক্ষতি নেই। আসলেই কি তাই? কার্যত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অচল হওয়ায় লাখ লাখ আন্ডারগ্রাজুয়েট শিক্ষার্থী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। 

হাজার হাজার মাস্টার্স ও পিএইচডি ছাত্রছাত্রীর গবেষণা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অচল হওয়াটাকে কেন এত ছোট করে দেখা হচ্ছে? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এত তাচ্ছিল্য করা হচ্ছে? কেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবনমন করা হলো?

যুগ যুগ ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা মেধাবী শিক্ষার্থীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক তার শিক্ষাজীবনের সব ক্লাস ও পরীক্ষায় প্রথম সারির স্টুডেন্ট থাকেন। এরা নিঃসন্দেহে জাতির সেরা মেধাবী। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক দিয়ে তারা সবচেয়ে এগিয়ে। 

মানুষ গড়ার ব্রত নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পেশায় আসেন। শিক্ষিত ও দক্ষ জনসম্পদ গঠনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে বিভিন্ন পেশায় সরকারি চাকরি করে যারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের চেয়ে ডাবল বা ট্রিপল সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন, তারা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন- কেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা আপনার চেয়ে পেছনে থাকবে? 

কেন তাদেরকে অবনমন করা হচ্ছে? কেন তাদেরকে মর্যাদাহানিকর ও অবমাননাকর প্রত্যয় পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করা হলো? তবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের ও দুর্নীতির সাথে জড়িত হন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষকরা কখনো এসব অনিয়ম-দুর্নীতি সাপোর্ট করেন না; বরং তারা চান সরকার এসব বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিক। 

বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। উচ্চশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। নতুন নতুন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা পেশার ঐতিহ্য ও গৌরব অনেকটা ম্লান হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা পেশাকে অন্যান্য সাধারণ চাকরির মতো মনে করা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকরা হয়তো ভুলে গেছেন (!) যে, শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও তার বিতরণ একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরাই করে থাকেন। 

তা হলে কেন তাদেরকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হবে না? যুগের চাহিদায় বাংলাদেশের অন্যান্য চাকরির মতো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন বাড়লেও তাদের জন্য মর্যাদাকর স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো বা প্রতিশ্রুত সুপার গ্রেড আজও প্রবর্তন হয়নি, বরং বৈষম্যমূলক পেনশন স্কিম ‘প্রত্যয়’ চাপিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের তাচ্ছিল্য, অবমাননা ও মর্যাদাহানি করা হয়েছে। 

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা নিজেদের জন্য নয়, কারও সাথে তুলনা করে নয়- বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে, শিক্ষকতা পেশার স্বার্থে, এই পেশার মর্যাদা বৃদ্ধিতে স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো দাবি করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো প্রণয়নে কি এমন সমস্যা হবে রাষ্ট্রের? বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবদানকে ভুলে গিয়ে তাদের অবনমন করে কি আমরা বৈষম্যহীন উন্নত রাষ্ট্র গড়ব?

লেখক: অধ্যাপক, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাধীন নারী

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৪, ১১:২২ এএম
আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৪, ১১:২২ এএম
বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাধীন নারী
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বাংলাদেশে সড়কে হত্যাকাণ্ড বাড়ছে। বাড়ছে গৃহের অভ্যন্তরে আত্মহত্যাও। প্রত্যেকটি আত্মহত্যাই একেকটি মর্মবিদারক ঘটনা, পরিবারের জন্য তো অবশ্যই, সমাজের জন্যও। বোঝা যায় মানুষ কতটা যন্ত্রণার ভেতর রয়েছে। ব্যবস্থাটা এমনই যে মানুষকে তার ন্যূনতম যে অধিকার- বেঁচে থাকবার অধিকার- তারও নিশ্চয়তা দিতে সে ব্যর্থ হচ্ছে। একটি মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের বিশেষভাবে মর্মাহতও করেছিল। মেয়েটি খুবই প্রাণবন্ত ছিল। হাসিখুশি থাকত। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছে; তারপর গেছে সাংবাদিকতায়। করোনাকালে সংবাদপত্র শিল্প পড়েছে বড় রকমের ধাক্কার মুখে, সাংবাদিকদের অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। এই মেয়েটিও যে পত্রিকায় ছিল সেখানে থাকতে পারেনি; হাজির হয়েছে গিয়ে একটি অনলাইন পত্রিকায়। সেখানেও সুবিধা হয়নি। পরে যোগ দিয়েছিল একটি এনজিওতে; কিন্তু কাজটা তার পছন্দ হওয়ার মতো ছিল না। তারপর মেয়েটি একটি সাহসী পদক্ষেপ নেয়। দুঃসাহসিকও বলা চলে। 

অনলাইনে ব্যবসা শুরু করে। ঠিক করেছে রান্নার মসলা সরবরাহ করবে বাসায় বাসায়। টাকা বিনিয়োগ করেছিল, কিন্তু যতটা বিনিয়োগ প্রয়োজন ততটা করতে পারেনি। ফলে ব্যবসাটা জমছিল না। মেয়েটির বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, মা অসুস্থ। একটি মাত্র ভাই, সে ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল, টেকেনি। ঢাকা শহরে থাকত সে বাসা ভাড়া করে। একা। নিশ্চয়ই দায়িত্ববোধ ছিল; বাবা-মাকে সাহায্য করতে পারছে না, এই বোধ তাকে পীড়া না দিয়ে ছাড়বে কেন? জীবন অবশ্যই দুঃসহ এক বোঝা হয়ে উঠেছিল তার জন্য। ক্লান্ত অবস্থায় ভারমুক্ত হয়েছে আত্মহত্যা করে। 

জোর পুলিশি তদন্ত শুরু হয়েছিল, কেউ তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছিল কি না তা নিয়ে। তদন্তে কোনো রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে কি না তা আমরা জানি না, জানবার কৌতূহলও নেই; কারণ এটা তো কোনো রহস্যই নয়, আমরা পরিষ্কারই জানি যে বিদ্যমান সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাই তাকে বেঁচে থাকতে দেয়নি। চেষ্টাও করেনি বাঁচিয়ে রাখতে। ওইখানে কোনো প্রকার রহস্য নেই। আর মেয়েটি একা তো নয়, এরকম অসংখ্য মানুষ এখন বিষাদময় ও ক্লান্তিকর জীবনের ঘানি টানছে। আত্মহত্যা করছে না, আশা করি করবেও না, কিন্তু পৌঁছে গেছে একেবারে দ্বারপ্রান্তে। 

আর এই বিষাদ ও হতাশা কেবল যে বাংলাদেশের ব্যাপার তাও তো নয়, এটি ঘটেছে বিশ্বময়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। এর কারণকে ব্যক্তিগত বলে ধরে নিয়ে ব্যাপারটাকে খাটো করার উপায় নেই। ব্যক্তিগত কারণ নিশ্চয়ই আছে; একই দুর্দশায় পড়ে দুজন মানুষ একই রকমের কাজ করে না, সমান মাত্রাতে বিষণ্নও হয় না। কিন্তু তার বাইরে সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ যে খুব ভালোভাবেই রয়ে গেছে সেটাকে উপেক্ষা করলে ঘটনা বুঝবার ব্যাপারের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারব না, তা যতই গবেষণা কিংবা তদন্ত করি না কেন। আন্তর্জাতিক একটি গবেষণা সংস্থা তাদের এক প্রতিবেদনে মানসিক স্বাস্থ্যের ভেঙে পড়ার জন্য কয়েকটি রাজনৈতিক-সামাজিক কারণকে চিহ্নিত করেছে, দেখতে পেলাম। এক নম্বর কারণ দারিদ্র্য; দুই নম্বরে আছে সৎসঙ্গের দুর্লভতা।

 এর পর রয়েছে ক্ষুধা, একাকীত্ব এবং ভালো কাজের নিশ্চয়তার অভাব। কারণগুলোর চিহ্নিতকরণ মনে হয় অযথার্থ নয়। অন্যগুলো তো রয়েছেই; কিন্তু ওই যে সৎসঙ্গের অভাব ও একাকীত্ব, এ দুটিকে বিশেষ রকমের গুরুত্ব দিতে হয়। মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে; কেউ কাউকে সঙ্গ দিতে চায় না, কেবল নিজের কথাই ভাবতে ভালোবাসে, ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হয়- ক্লান্ত এবং আরও ক্লান্ত। এবং একা হয়ে পড়ে। জীবনের বোঝা বহন করাটা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। 
এই ব্যাধির প্রতিকারের প্রশস্ত উপায় হচ্ছে আন্দোলন। সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন। আরেকটি প্রসঙ্গের দিকে নজর দেওয়া যাক। সেটি হলো জনশুমারির প্রতিবেদন। 

জনশুমারি একটি ভালো খবর দিচ্ছে। খবরটি জনসংখ্যার বৃদ্ধিতে নিম্নগতি। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমান করা গেছিল; অতটা বাড়েনি, সাড়ে ১৬ কোটিতে পৌঁছে ক্ষান্ত দিয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি না ঘটার একটি কারণ প্রজনন-হারের নিম্নগতি। অন্যটি (যেটা হয়তো সেভাবে উল্লিখিত হয়নি) মানুষের মৃত্যু। বহু মানুষ মারা গেছে। স্বাভাবিক মৃত্যু তো ছিলই, সেটা অবধারিত। কিন্তু অস্বাভাবিক মৃত্যুও ঘটেছে। যেমন সড়ক দুর্ঘটনায়; বিদেশে যাওয়ার পথে পানিতে ডুবে। বজ্রাঘাতেও প্রাণহানি ঘটেছে। হত্যা, পারিবারিক সহিংসতা, চিকিৎসার অভাব, এসব ছিল। করোনা ও ডেঙ্গু উভয়েকেই তৎপর অবস্থায় দেখা গেছে। আগুনে পুড়েও অনেকে চলে গেছেন।

তবে তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে এই সংবাদ যে, এই প্রথমবারের মতো সংখ্যার দিক থেকে মেয়েরা ছাড়িয়ে গেছে পুরুষদের। এর একাধিক কারণ নিশ্চয়ই রয়েছে। একটা হলো বহুবিধ কষ্ট সহ্য করেও আমাদের দেশের মেয়েদের টিকে থাকার ক্ষমতা। আরেকটা কারণ, বহু পুরুষমানুষ বিদেশে চলে গেছে, কাজের খোঁজে। মেয়েরা রয়ে গেছে। স্কুলে-কলেজেও তাই মেয়েদের সংখ্যা বছরে বছরে বেড়েছে। আর অর্থনৈতিক জীবনে মেয়েদের অংশগ্রহণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

এমনকি ‘আদমশুমারি’কে যে এখন জনশুমারি বলা হচ্ছে সেটাও তাৎপর্যহীন নয়; শুমারিতে আদমদের গোণা হবে, হাওয়ারা কি বাদ? ভাষাগত সমস্যাটার এই মীমাংসাও ভালো খবর। কিন্তু তাই বলে একথা বলার কোনো উপায়ই নেই যে, মেয়েদের এই সংখ্যানুপাতিক অগ্রগতি বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তনের বার্তা বহন করছে না, মোটেই না। নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, বাল্যবিয়ে, মজুরি বৈষম্য, মেয়েদের কোণঠাসা করে রাখায় চেষ্টা, সবকিছুই অব্যাহত থাকবে। 

অধ্যাপক যদি ছাত্রীকে বিয়ে করেন তবে সেটা কোনো খবর হবে না, কিন্তু কোনো অধ্যাপিকা যদি ছাত্রকে বিয়ে করেন তবে হইচই পড়ে যাবে, নাটোরে যেমনটা ঘটেছিল। পুরুষতান্ত্রিক নানা প্রকারের চাপে ছাত্রকে বিয়ে করা একজন অধ্যাপিকা শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে জীবনযন্ত্রণার হাত থেকে বেঁচেছেন। এর কারণ পিতৃতান্ত্রিকতা জিনিসটা বাইরের কোনো ব্যাপার নয়, ঘটনা নয় ওপরকাঠামোগত। রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার ভেতরই সে প্রোথিত; পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও মতাদর্শের সঙ্গে এর সম্পর্ক একেবারেই অবিচ্ছেদ্য। 

হ্যাঁ, জানা গেল নারী হওয়াটা অপরাধ। নারী হলে বিপদ আছে। প্রতিবাদ করলে বড় বিপদ ঘটবে, বিশেষ করে প্রতিবাদকারী যদি নারী হয়। কিন্তু প্রতিবাদ না করলে ব্যবস্থাটা কী ভাঙবে? কী করে? ভাঙতে হলে তো প্রতিবাদ চাই। হ্যাঁ, প্রতিবাদটা হওয়া দরকার সংগঠিত ও সমবেত। সবাই যদি একসঙ্গে রুখে দাঁড়াতে পারত তাহলে ফলাফল দাঁড়াত অন্যরকম। কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয়, এবং ব্যবস্থার পক্ষে টিকে থাকার জন্য সেখানেই সুবিধা।

এটাও তাৎপর্যপূর্ণ বাসে যাচ্ছিল মেয়েটি, ছিল সে একজন গার্মেন্টস শ্রমিক। সে তার কর্মস্থলে যাচ্ছিল। অল্পবয়স এবং শ্রমিক বলেই শক্তি ছিল প্রতিবাদের। আবার শ্রমিক বলেই নির্যাতিত হয়েছে। সঙ্গে টাকাপয়সা বেশি ছিল না; তদুপরি সে প্রতিবাদ করেছে, এবং সে পুরুষ নয় মেয়েছেলে। বাস-ডাকাতির ওই ঘটনা নিয়ে যখন পত্রিকায় বেশ একটা সোরগোল চলছিল তখন, তার মধ্যেই খবর পাওয়া গেল গাজীপুরে রাতের বাসে স্বামীকে পিটিয়ে ফেলে দিয়ে স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছে বাসের চালক, হেলপার ও অজ্ঞাত পরিচয় তিনজন মিলে। 

গোটা ব্যবস্থাটাই তো অভিশপ্ত। অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া চাই, আমরা বলব; আমরা বলছি, লিখছি; কিন্তু তাতে কুলাবে কী? পুরো ব্যবস্থাটাই যখন হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবতাবিরোধী? এবং অপরাধকারী?

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ট্রাম্পের হত্যাচেষ্টা: রাজনৈতিক সহিংসতার এক ভয়ঙ্কর রূপ

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৪, ১১:১৫ এএম
আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৪, ১১:১৫ এএম
ট্রাম্পের হত্যাচেষ্টা: রাজনৈতিক সহিংসতার এক ভয়ঙ্কর রূপ
ময়রা ডোনেগান

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার প্রচেষ্টা করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার বাটলারে নির্বাচনি প্রচারের সমাবেশে একজন হত্যাকারী এই চেষ্টা করে। এতে একজন দর্শকের প্রাণহানি ঘটে এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। 

হত্যাচেষ্টাকারীও মারা গেছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডান কানে সামান্য আঘাত পেয়েছেন এবং তাকে হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক সেবা দেওয়া হয়েছে। যদিও এখন হত্যাকারীকে শনাক্ত করা এবং তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা জায়নি। ঘটনাটি তীব্র রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়াবহ যুগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে আমরা বাস করছি।

আমেরিকার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা চলছে। ২০১১ সালে অ্যারিজোনায় একটি নির্বাচনি প্রচারে গুলিতে আহত হয়েছিলেন ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস নারী গ্যাবি গিফোর্ডস। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড রিগানকে অভিনেতা জোডি ফস্টার নামে একজন গুপ্তহত্যাকারী দিয়ে হত্যা প্রচেষ্টাকালে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানরা ভোটাধিকার প্রয়োগের সময় সহিংস নিপীড়নের সম্মুখীন হয়েছেন। যেটি কয়েক দশক ধরে দেশের বেশির ভাগ অংশে শুধু আইনের মাধ্যমে নয়, বরং শক্তির প্রভাব খাটিয়ে শ্বেতাঙ্গদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছিল। ট্রাম্পের কর্তৃত্ববাদী রাজনীতিতে রয়েছে ধর্মান্ধতা, উগ্র রাজনৈতিক উপজাতিবাদ এবং তার পছন্দকে বেশি প্রয়োগ করার অনুমতি দিতেন। ট্রাম্প তার বিপক্ষের লোকদের শারীরিক সহিংসতার মাধ্যমে শাস্তি দিতেন। ২০১৬ সালে তার প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর নির্বাচনি সমাবেশে প্রচারের সময় সহিংসতার শিকার হন। সমর্থকরা প্রায়ই প্রতিবাদকারী এবং গণমাধ্যমের সদস্যদের ওপর আক্রমণ করতেন।

ট্রাম্প-সমর্থকরা তার বিপক্ষের রাজনৈতিক নেতাদের ওপর সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন। ২০১৮ সালে ফ্লোরিডাভিত্তিক ট্রাম্প-সমর্থক সিজার সায়োক একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পরিচালনা করেন। তিনি বারাক ওবামা, হিলারি ক্লিনটন, জন ব্রেনান, রবার্ট ডি নিরো, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ, জো বাইডেনসহ বিভিন্ন প্রেসিডেন্টদের ক্ষতি করার চেষ্টা করেন। ২০২২ সালে ডেভিড ডিপেপ নামে একজন ট্রাম্প-সমর্থক হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির সান ফ্রান্সিসকোর বাড়িতে ঢুকে পড়েন এবং তার স্বামী পল পেলোসিকে হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করেন। 

আধিপত্যের নৃশংস ও হিংসাত্মক রাজনীতির জন্য ট্রাম্পের উৎসাহ সংক্রামক ব্যাধির মতো বলে মনে হয়। রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে এই ধরনের রাজনীতির অনেক অনুসারী রয়েছেন। ২০১৮ সালে মন্টানার  প্রতিনিধি গ্রেগ জিয়ানফোর্ট তার কংগ্রেসনাল পুনর্নির্বাচন প্রচারের সময় হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। এর জন্য ট্রাম্প প্রশংসা করেছিলেন।  

ট্রাম্প বলেছেন, ‘যেকোনো লোকই হোক না কেন, সে যদি আঘাত করতে পারে, সে আমার লোক’ জিয়ানফোর্ট যখন অপকর্মের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তখন থেকেই তিনি মন্টানার গভর্নর হয়েছেন। ট্রাম্পের ক্ষুব্ধ ও হিংস্র সমর্থকরা ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল উল্টে দেওয়ার প্রয়াসে কংগ্রেসে হামলা করেছিলেন। সেখানে তারা কংগ্রেস সদস্যদের অপহরণ ও আক্রমণ করার হুমকি দিয়েছিলেন। 

ট্রাম্পের প্রভাব, তার স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও তর্ক  আমেরিকার রাজনৈতিক সহিংসতাকে আরও  বাড়িয়ে তোলে। ফলে দেশের কেন্দ্রীয় রাজনীতি আরও রক্তাক্ত রূপ ধারণ করে। ট্রাম্পের নির্বাচনি সমাবেশে এই প্রথম তাকে হত্যার প্রচেষ্টা করেছে। এখন  মনে হয় সময় পরিবর্তন হয়েছে। এই ধরনের সহিংসতা এই প্রথম ছোড়া হলো। 

পরবর্তী সময়ে যা ঘটবে তা আরও বিপজ্জনক হতে পারে। ট্রাম্প বুলেট এড়ানোর পর সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরা তাকে ঘিরে ফেলেন। যারা তাকে মানবঢাল হিসেবে ঘনিষ্ঠভাবে ঘিরে রেখেছিলেন। ট্রাম্প মঞ্চে উঠেছিলেন এবং তাদের ইচ্ছাকে তুচ্ছভাবে অমান্য করলেন। তিনি মুখ উঁচিয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন ‘ফাইট’। ট্রাম্প তখন খুবই প্রতিবাদী ছিলেন এবং প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ট্রাম্প-সমর্থকদের সতর্ক হওয়া উচিত। তাদের ওপর সহিংসতার ঝুঁকি রয়েছে। এর অর্থ হলো, ট্রাম্পের নেতাদের প্রতি প্রতিশোধ নেওয়ার বা শাস্তি দেওয়ার পরিমাণ বেড়ে যাবে। ট্রাম্প বা তার সহযোগীদের এই ধরনের হুমকি বা ঝুঁকি থেকে প্রতিরোধ করার কোনো প্রচেষ্টা নেই। এটা বন্ধ করার কোনো উপায় নেই। তারা কেনই বা করবে? তারা আগেও কখনো করেনি। 

হত্যাচেষ্টাকারী সম্পর্কে তথ্য প্রকাশের আগে ট্রাম্পের সমর্থকরা হামলার জন্য বিডেনকে দোষারোপ করছিলেন। জো বাইডেনের নির্বাচনি প্রচারের মূল ভিত্তি হলো যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিবাদী, তাকে যেকোনো মূল্যে হলেও থামাতে হবে।  জেডি ভ্যান্স, যিনি ওহাইও সিনেটর এবং ট্রাম্পের দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট টুইট করেছিলেন যে ট্রাম্পের উদ্ধত্যপূর্ণ বক্তৃতার কারণে তাকে হত্যার চেষ্টার প্রচেষ্টা হতে পারে। 

জর্জিয়ার রিপাবলিকান মাইক কলিন্স প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, জো বাইডেন আদেশ পাঠিয়েছেন। গুপ্তহত্যার চেষ্টায় কোনো গাম্ভীর্য নেই।  আমেরিকা কতটা নিচে নেমে গেছে, তা ভাবা যায় না।  এর কোনো তেমন প্রতিফলন দেখা যায়নি। আছে শুধু নোংরা রাজনীতি এবং একক স্বার্থপরতা। যতটা সম্ভব সহিংসতা থেকে লাভবান হওয়ার রাজনীতি এখন আমেরিকায়। 

এদিকে ডেমোক্র্যাটরা নতুনভাবে কোনো চিন্তা করছেন না। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা ট্রাম্পের নিরাপত্তার জন্য একটি বিবৃতি জারি করেছেন। তারা বলেছেন, আমাদের রাজনীতিতে সহিংসতার কোনো স্থান নেই। এটি ঠিক নয়। সহিংসতা এখন আমেরিকান রাজনৈতিক জীবনের একটি কেন্দ্রীয় অংশ। আমরা শিগগিরই এটি থেকে মুক্তি পাব না।

লেখক: গার্ডিয়ান কলামিস্ট
গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: সানজিদ সকাল

ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণরায় প্রসঙ্গে

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৪, ১১:১৬ এএম
আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২৪, ১১:২২ এএম
ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণরায় প্রসঙ্গে
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

ভারতের অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে প্রমাণ হয়ে গেছে যে ভারতের সাধারণ মানুষ এখনো ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে আস্থাশীল। আমাদের সংবিধানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বহুদিন ধরেই ভারতে তার মর্যাদা অক্ষুণ্ন ছিল। 

কিন্তু সম্প্রতি বিজেপি-আরএসএস জোট ভারতে হিন্দু রাষ্ট্র কায়েম করার যে পরিকল্পনা করেছিল, তা রুখে দিয়েছে এবারের লোকসভা নির্বাচন। এ প্রসঙ্গে নোবেলজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন মন্তব্য করেছেন, ভারত যে আদতে হিন্দু রাষ্ট্র নয়, সেই ভাবনারই প্রতিফলন ঘটেছে ভারতীয় ভোটারদের মধ্যে। সম্প্রতি বোলপুরে প্রতীচী ট্রাস্টের উদ্যোগে একটি আলোচনা সভায় যোগ দিতে এসে তিনি আবারও বলেন যে মানুষ হিন্দু রাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে কিছুটা হলেও আটকাতে পেরেছেন। 

ভারতীয় ন্যায় সংহিতা প্রসঙ্গে তিনি পরোক্ষে বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, এই বিষয়টি ঘিরে আরও বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজন ছিল। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পর্যন্ত হিন্দু রাষ্ট্রের আলোচনা ঢুকে পড়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মনে রাখা দরকার, শিশুদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ একেবারেই নেই। 

লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে বিজেপির তুরুপের তাস ছিল অযোধ্যার রামমন্দির। কিন্তু লক্ষণীয়, ভোটের ফলাফলে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। এমনকি রামমন্দির যে লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত, সেই ফাইজাবাদেও হেরে গেছে বিজেপি।

ইউপিএ সরকারের আমলে জাপানের আর্থিক সহযোগিতায় গয়ায় বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয় এবং অমর্ত্য সেনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগও করা হয়। কিন্তু বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেই তাকে পদচ্যুত করে। এমনকি শান্তিনিকেতনে তার নিজের বসতবাড়িকে কেন্দ্র করে নানান মিথ্যা অভিযোগে তাকে উচ্ছেদ করা হয়। বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ থেকে আগত ছাত্রছাত্রীদেরও প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়, শুধু তারা মুসলমান বলে। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কেও রয়েছে অনেক অভিযোগ। বোলপুরের অনুষ্ঠানে অমর্ত্য সেন আক্ষেপ করে বলেন, নালন্দায় বিশ্বব্যাপী বৌদ্ধ সংস্কৃতির যে আবহাওয়া গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলাম, বর্তমান সরকার সে বিষয়ে কোনো রকম সহযোগিতা করেনি।

প্রধানমন্ত্রীর পদে আসার পর থেকেই মোদির লক্ষ্য ছিল দেশব্যাপী ‘গুজরাট মডেল’ প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু ভারতের জনগণ গুজরাটের সেই রক্তাক্ত দিন ভুলে যায়নি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সরকারি মদদেই নির্বিচারে লাখ লাখ অসহায় মুসলমান নারী, পুরুষ ও শিশুর হত্যাকাণ্ড ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। তাই ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার সনাতন আদৰ্শকে নষ্ট করে এই ‘গুজরাট মডেল’কে বাস্তবায়িত করার সুযোগ দেয়নি জনগণ। এবারের লোকসভা নির্বাচনে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস অবশ্যই ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ভারতের অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে প্রমাণ হয়ে গেছে যে ভারতের সাধারণ মানুষ এখনো ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে আস্থাশীল। আমাদের সংবিধানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বহুদিন ধরেই ভারতে তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ ছিল। 

শান্তিনিকেতনে জন্মালেও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের আদি বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুরে। সে যুগে ভালো ছাত্রছাত্রীরা একটু বামঘেঁষা ছিলেন। জন্মের তিন মাস পরই তার মা অমিয়া সেন তাকে কোলে নিয়ে গুরুদেবের বাড়িতে চলে যান এবং গুরুদেবকে সেই শিশুর নাম ঠিক করতে বলেন। গুরুদেব নাম দিলেন অমর্ত্য। অমিয়া দেবী চলে যাওয়ার সময় গুরুদেব তাকে ডেকে বললেন, একটা রেফ দিও। সেই থেকে নাম হলো অমর্ত্য।

সদ্য সমাপ্ত ভারতের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে তিনি সম্প্রতি মুখ খুলেছেন। বোলপুরে প্রতীচী ট্রাস্টের উদ্যোগে একটি আলোচনা সভায় যোগ দিতে এসে তিনি আবারও বলেন যে মানুষ হিন্দু রাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে কিছুটা হলেও আটকাতে পেরেছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা প্রসঙ্গে তিনি পরোক্ষে বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, এ বিষয়টি ঘিরে আরও বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজন ছিল। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পর্যন্ত হিন্দু রাষ্ট্রের আলোচনা ঢুকে পড়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মনে রাখা দরকার, শিশুদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ একেবারেই নেই। একটি বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভারতীয় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার চিরাচরিত ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করে এখানে একটি হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া চলেছে। কিন্তু গান্ধীজি, রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ভারতের আপামর সাধারণ মানুষ এই সাম্প্রদায়িক নীতিতে বিশ্বাস করেন না।

উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের ব্যর্থতার কড়া সমালোচনা করেন তিনি। প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থান– এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই ভারতকে শোচনীয় জায়গায় নিয়ে গেছে এই সরকার। ন্যায়বিচার ও সাম্য প্রতিষ্ঠার কাজেও এই সরকার চরম ব্যর্থ এবং সে কারণেই ধনী সম্প্রদায় যেমন ক্রমাগত অর্থসঞ্চয় করে গেছে, গরিব মানুষ আরও গরিব হয়ে পড়েছে। মোদি সরকারের প্রতিটি জননীতি ছিল ভুলে ভরা। এই ভুলগুলো এবারে সরকারের সংশোধন করে নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন সেন। তিনি মনে করেন, এবারে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকার দরুন বিজেপি একচ্ছত্রভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, অন্যান্য দলের সহযোগিতা অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রে সারা দেশের মতো পশ্চিমবঙ্গও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।

এ ছাড়া তিনি মনে করেন, বিগত কয়েক দশক ধরে ভারতীয় রাজনীতিতে দুর্নীতি ও হিংসার যে বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থাও তথৈবচ। এ রাজ্যে রাজনীতিতে সততার বড়ই অভাব। রাজনীতিকে কেন্দ্র করে নিত্যনতুন হিংসাত্মক ঘটনা বিপর্যস্ত করছে জনজীবন। এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক