কোটা সংস্কার থেকে সরকার পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়কদের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করেছে নতুন সংগঠন ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’। এদিকে আত্মপ্রকাশকে ঘিরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কমিটিতে না রাখায় ঢাবি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যানটিনে বেলা ৩টার দিকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করার কথা ছিল নতুন সংগঠনটির। নির্ধারিত সময়ের সোয়া দুই ঘণ্টা পর হাতাহাতি আর উত্তেজনাকর পরিবেশে সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, সংবাদ সম্মেলনের মধ্যেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মধুর ক্যানটিনে প্রবেশ করে কমিটিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই পক্ষ ও ঢাবি শিক্ষার্থীদের একাংশের ম্যধ্য উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে নতুন ছাত্রসংগঠন গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় ও ঢাবি শাখা কমিটি মিছিল নিয়ে মল চত্বরের দিকে এগোলে সেখানেও কয়েক দফায় ধস্তাধস্তি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে ৩ শিক্ষার্থী আহত হন।
আহতরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স বিভাগের শিক্ষার্থী আকিবুল হোসেন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের রিয়াজ উদ্দিন, রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুহাস আলী মিশু। এর মধ্যে আকিবুল ও মিশু ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। বিষয়টি খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেছেন ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. ফারুক। এ ছাড়া অন্যজন ঢাবির শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা মেডিকেল সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
পরে এ বিষয়ে নতুন ছাত্রসংগঠনের মুখ্য সংগঠক হাসিব আল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘নতুন ছাত্রসংগঠন গঠন প্রক্রিয়ায় একটি ইতিবাচক প্রতিযোগিতা রয়েছে। এককভাবে কমিটি গঠিত হয়নি। বরং সমঝোতার ভিত্তিতে কমিটি গঠন করা হয়েছে, আমরা এটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আমরা আগে যেভাবে একত্রে জাতীয় শক্তি হিসেবে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব।’
এর আগে বেলা ৩টার দিকে ঢাবির মধুর ক্যানটিনে নতুন ছাত্রসংগঠনের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে একে একে রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘মানি না, মানব না, প্রাইভেট ছাড়া কমিটি’, ‘অ্যাকশন অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘ঢাবির সিন্ডিকেট ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘ঢাবির কমিটি, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘প্রাইভেটের অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’সহ নানা স্লোগান দিতে থাকেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া রাজধানীর কলেজ অব এভিয়েশন টেকনোলজির (ক্যাটেক) শিক্ষার্থী রায়হান মোল্লা খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এখনো বৈষম্যের শিকার। এখন নতুন দল, ছাত্রসংগঠন হচ্ছে, সেখানে কিন্তু বেসরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউকেই শীর্ষ পদে রাখা হয়নি। যাদের রাখা হচ্ছে সবাই ঢাবিয়ান। কিন্তু পুরো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। তাদের বাদ দিয়ে কীভাবে এ ছাত্রসংগঠন ঘোষণা করা হয়।’
নবঘোষিত কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে মঞ্জুরুল ইসলাম নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা নতুন এই কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করছি। এখানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। এখানে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট তৈরি করে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। তাই আমরা এই কমিটি মানি না।’
মারামারির বিষয়ে আহত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা আমাদের দাবি নিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলাম। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আমাদের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা চালিয়েছেন। এটি তাদের পূর্বপরিকল্পিত ছিল।’
শিক্ষা, ঐক্য, মুক্তি স্লোগানকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করা সাবেক সমন্বয়কদের নিয়ে গঠিত এই সংগঠনে ছয় সদস্যের কেন্দ্রীয় ও ছয় সদস্যের ঢাবি কমিটি ঘোষণা করা হয়। নতুন এই সংগঠনটি ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে পাওয়া নতুন বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটকে ধারণ করে পরিচালিত হবে। সেই সঙ্গে সংগঠনে থাকবে না কোনো দল বা ব্যক্তির লেজুড়বৃত্তি।
নেতৃত্বে এলেন যারা: কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে ঢাবির ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী আবু বাকের মজুমদার এবং সদস্যসচিব হিসেবে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ আহসান। মুখ্য সংগঠক হিসেবে বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৮-১৯ বর্ষের শিক্ষার্থী তাহমীদ আল মুদাসসির এবং মুখপাত্র হিসেবে একই শিক্ষাবর্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আশরেফা খাতুন। এ ছাড়া সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌহিদ মোহাম্মদ সিয়াম এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিফাত রশিদ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্বে এসেছেন।
অন্যদিকে ঢাবি কমিটিতে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী আহ্বায়ক আব্দুল কাদের এবং সদস্যসচিব হিসেবে একই শিক্ষাবর্ষের গণিত বিভাগের মহির আলম রয়েছেন। মুখ্য সংগঠক হিসেবে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হাসিব আল ইসলাম এবং মুখপাত্র হিসেবে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী রাফিয়া রেহনুমা হৃদি।
এ ছাড়া সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লিমন মাহমুদ হাসাম এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে আল আমিন সরকার ঢাবি কমিটির নেতৃত্বে এসেছেন।
এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন ছাত্রসংগঠন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার।
গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা
নতুন ছাত্রসংগঠনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
বুধবার রাতে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারা এ ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘এই কমিটিতে আমরা পুরো বাংলাদেশকে দেখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এখন আমরা পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখছি। সেখানে সুপার সিক্সে মাত্র একজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়া সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। আমরা আজ প্রতিবাদ জানাতে মধুর ক্যানটিনে গিয়েছিলাম। যেই কমিটি আজ ঘোষণা করা হয়েছে, সেই কমিটিকে আমরা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করছি। যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা ভুল স্বীকার করে কোনো ঘোষণা না দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তাদের কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছি না।’