ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের নতুন দলের আত্মপ্রকাশ হবে আগামীকাল শুক্রবার। এদিন রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর সামনে লক্ষাধিক লোকের জমায়েতের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দলের নাম ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক নাগরিক শক্তি’ অনেকটাই চূড়ান্ত। আর কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হতে পারে ১৫১ সদস্যের। নতুন এই দলে সম্ভাব্য শীর্ষ নেতৃত্বের ৬ জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী। আর দলে না থাকার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জোনায়েদ ও যুগ্ম সদস্যসচিব রাফে সালমান রিফাত। তারা দুজনই ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
নাগরিক কমিটির সংশ্লিষ্টরা খবরের কাগজকে জানান, নতুন দল ঘোষণার সময় তাদের টার্গেট কয়েক লাখ লোকের জমায়েত। গত ৩১ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে জুলাই ঘোষণার জন্য করা জমায়েতের মতোই পরিকল্পনা তাদের। সারা দেশে গঠিত নাগরিক কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি আন্দোলনে আহত ও শহিদ পরিবারের সদস্যরাও তাদের সঙ্গে অংশ নেবেন। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিটি কাজ করছে। দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হবে।
অপরদিকে দলের নাম নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নাগরিক কমিটির শীর্ষ ৭-৮ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নাগরিক কমিটির এক নেতা জানান, দলের নাম ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক নাগরিক শক্তি’ অনেকটা চূড়ান্ত। এ ছাড়া ছাত্র-জনতা, বিপ্লবী, নাগরিক শব্দসংবলিত নামগুলো বিবেচনায় আছে। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানের আগেই একেবারে চূড়ান্ত করা হবে।
দলটির কমিটির শীর্ষ ৬ পদে থাকবেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও মুখপাত্র সামান্তা শারমিন। তারা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী। গুরুত্বপূর্ণ পদে ঢাকার বাইরের এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের কথাও বলছেন অনেকে। চট্টগ্রামে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের খান তালাত মাহমুদ রাফি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লেখেন, নতুন রাজনীতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকাকেন্দ্রিকতা বন্ধ করা উচিত।
অপরদিকে নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জোনায়েদ ও যুগ্ম সদস্যসচিব রাফে সালমান রিফাত নিয়ে নাটকীয়তার অবসান হয়েছে। তারা দুজন ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন। নাগরিক কমিটির একটি অংশ তাদের শীর্ষ নেতৃত্বে রাখতে চায়নি। কিন্তু নতুন রাজনীতিতে ট্যাগিং কালচার বন্ধ করার জন্য তাদের নেতৃত্বে রাখার পক্ষে ছিল আরেকটি অংশ। ফলে এ নিয়ে এক ধরনের অসন্তোষ দেখা দেয় তাদের মধ্যে। এই দুই নেতার চীন সফর নিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে। নাগরিক কমিটির পরিচয় নিয়ে সংগঠনটি চীনের রাজনৈতিক দলের আমন্ত্রণ পায়নি বলে জানানো হয়। অন্যদিকে প্রেস বিজ্ঞপ্তির আগেই রাফে সালমান রিফাত ফেসবুকে জানান, তারা নাগরিক কমিটির হয়ে সফরে যাননি। অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্রনেতা হিসেবে সেখানে যান।
নাগরিক কমিটিতে থাকা সাবেক গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির নেতা ও সাবেক শিবির নেতাদের বিরোধ নিয়ে কয়েক দফা সভা হয়। সেখানে একটি সমঝোতার প্রস্তাব আসে। সে অনুযায়ী কেন্দ্রীয় পদ বাড়িয়ে আলী আহসান জোনায়েদকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করার পরিকল্পনা করা হয়। রাফে সালমান রিফাতকেও কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখার সিদ্ধান্ত ছিল। অপরদিকে দল ঘোষণার আগেই ফেসবুক পোস্টে আলী আহসান জোনায়েদ বলেন, ‘আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি তরুণদের নেতৃত্বে যেই নতুন রাজনৈতিক দলটি আসছে, সেখানে আমি থাকছি না। সে কথা আমি আরও সপ্তাহখানেক আগেই জানিয়েছি দলের নেতাদের। বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে ও জাতির নজর নতুন দলের ওপর নিবদ্ধ রাখতে নীরবতা বেছে নিয়েছিলাম। কিন্তু চারপাশের গুঞ্জন থামছে না। তাই স্পষ্ট করে রাখছি। আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারীদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দল দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন। নতুন এই রাজনৈতিক দলের প্রতি আমার দোয়া ও শুভকামনা রইল। জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সততা ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত না হোক এই দল। দুর্নীতির সব সুযোগ বন্ধ করে নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু হোক এই দলে।’
জোনায়েদ আরও লেখেন, ‘বারবার বলার পরও যদিও হয়নি, তবুও চাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যথাযথ অনুসরণ ও ইনক্লুসিভনেস এই দলের বৈশিষ্ট্য হোক। দুঃখজনক বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার পরও ট্যাগিং ও ট্যাবুর রাজনীতি থেকে মুক্ত হয়ে নতুন ধারার রাজনীতি এই দলের মাধ্যমে শুরু হোক, এই প্রত্যাশাই করি। আশা করি, অভ্যুত্থানের সময়ে আমাদের মধ্যে যেই ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও সহযোগিতার সম্পর্ক ছিল, নতুন রাজনৈতিক পথচলায়ও আমাদের পারস্পরিক এই সম্পর্ক ও শ্রদ্ধাবোধ অপরিবর্তিত থাকবে।
নতুন দল, নাহিদ ইসলাম এবং নব নেতৃত্বের জন্য শুভকামনা রইল।’
কমিটির আকার নিয়ে একজন নেতা খবরের কাগজকে বলেন, দল ঘোষণার দিন ১৫১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হতে পারে। পরবর্তী সময়ে আকার বাড়ানো বা কমানো হতে পারে।
জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক আকরাম হোসাইন সিএফ বলেন, নতুন দলের লক্ষ্য হলো গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সমতার ভিত্তিতে একটি সুশৃঙ্খল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন করা। তরুণদের শক্তি, জনগণের মতামত এবং পরিবর্তনের অঙ্গীকারই হবে এই পথচলার মূল ভিত্তি।