ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বাগযুদ্ধ বাড়ছে। দল দুটির শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে মধ্যমসারির নেতারাও এখন বাগযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন। দুই দলই একে অপরের বিরুদ্ধে ‘আওয়ামী লীগের ভাষায়’ কথা বলার অভিযোগ তুলেছেন। এ ছাড়া সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জায়গায় দল দুটির নেতারা সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন। চলমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মহলেও এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, উদ্বেগ ‘স্পর্শ’ করেছে আওয়ামীবিরোধী তথা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের জড়িত সুধী সমাজের প্রতিনিধিদেরও। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ক্ষমতার লড়াই ও পারস্পরিক অনাস্থার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনের আগেই সংঘাত বেড়ে যেতে পারে।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নানা ইস্যুতে দীর্ঘ ২৫ বছরের মিত্র জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব স্পষ্ট হয়েছে। দল দুটির নেতারা প্রকাশ্যে বাহাসে লিপ্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব প্রকাশ পাচ্ছে নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে। গত শনিবার জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং রবি ও সোমবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পর তা আরও ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে।
গত শনিবার সিলেটে আট দলের সমাবেশে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘একদল চাঁদাবাজির কারণে জনগণের ঘৃণা কুড়িয়েছে, আরেক দল আবার তার চেয়ে বেশি শক্তি নিয়ে চাঁদাবাজিতে নেমে পড়েছে। একদল দখলদার, জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে, আরেক দল বেপরোয়া দখলদার হয়ে উঠেছে। একদল জনগণের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, আরেক দল একই পথ ধরেছে, এমনকি তাদের মধ্যে মারামারিতে নিজেদের শেষ করে দিচ্ছে।’
জামায়াতের আমিরের এই বক্তব্যে বিএনপির মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, যা অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে গত রবিবার ঢাকায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে। সেখানে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, ‘তাদেরকে তো দেশের মানুষ ১৯৭১ সালেই দেখেছে। ১৯৭১ সালে তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে কীভাবে লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছে, ঠিক যেভাবে পতিত স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ার আগে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছিল ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য। শুধু হত্যাই করেনি তাদের সহকর্মীরা কিভাবে মা-বোনদের ইজ্জত পর্যন্ত লুট করেছিল। এই কথাটি আমাদের মনে রাখতে হবে।’
পাশাপাশি সাম্প্রতিককালে বিএনপিকে লক্ষ্য করে জামায়াত নেতারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দুর্নীতির বিষয়ে যেসব অভিযোগ করেছেন, তার জবাবও দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, পলাতক স্বৈরাচার বিএনপির সম্পর্কে যেভাবে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়াত, আমরা ইদানীং লক্ষ্য করছি কিছু কিছু ব্যক্তি বা দল ঠিক একই সুরে কথা বলার চেষ্টা করছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাদেরও তো দুজন ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে সেসময় সরকারে ছিল। গত সোমবারও আরেক অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেছেন, ‘এখন দেশে এক ধরনের প্রচারণা চলছে- একজন বিশেষ কেউ ভালো, আর বাকি সবাই খারাপ। এটা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিজেদের ভোট বাড়ানোর জন্য দল দুটি কথার মারপ্যাঁচে একে অপরকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছে। আর জামায়াত দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির ইস্যুকে তুলে ধরছে। তবে এই ‘চাপান-উতর’ চলমান থাকলে সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এতে নির্বাচনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, রাজনীতিতে একদল আরেক দলের প্রতি আক্রমণাত্মক কথা বলতে থাকলে সামনে সহিংসতা বাড়তে পারে। এগুলো রাজনীতির ভাষা নয়। সব দলকে অপ্র্যাশিত আক্রমণাত্মক ভাষা পরিহার করা উচিত। শেখ হাসিনা সরকারের আমলের মতো রাজাকার ও মুক্তিযুদ্ধ ব্যবহার বন্ধ করা উচিত। শেখ হাসিনার মতো আচরণ কেউ প্রত্যাশা করে না।
তিনি বলেন, সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নির্বাচন খুব জরুরি। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সব পক্ষকেই সহযোগিতা করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল আচারণ করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় উপ-উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিনাত আরা নাজনীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের এখানে রাজনৈতিক কালচার হলো নেগেটিভ। একদল আরেক দলের প্রতি পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থাহীনতায় রয়েছে বেশি। এ জন্য একে অপরের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ করে। এমন আচরণ ভালো রাজনীতির লক্ষণ নয়। আমাদের পজিটিভ রাজনৈতিক কালচার গড়ে তুলতে হবে। রাজনীতিতে পারস্পরিক সৌহাদ্যর্পূণ হতে হবে।
তিনি বলেন, একে অপরের বিরুদ্ধে দোষ-ত্রুটি না খুঁজে বরং কর্মসূচি জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত। ইশতেহার তুলে ধরলে জনগণ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কাকে ভোট দেবে। পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে ‘রাজাকার বা দুর্নীতিবাজ’ দুই দলেরই ক্রমান্বয়ে ভোট কমছে!
এর আগে দল দুটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। গত ১১ নভেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বক্তৃতায় বলেন, ‘জামায়াতের টিকিট কাটলেই কি কেউ বেহেশতে যেতে পারবে? যারা এসব মুনাফেকি করে, তাদের কাছ থেকে আমাদের সাবধান থাকতে হবে।’
এরপর ২০ নভেম্বর খুলনায় এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি এখন আওয়ামী লীগের ভাষায় কথা বলছে। তারা বর্তমানে মাহফিলে বাধা দেয়, মা–বোনদের বৈঠক বা তালিম প্রোগ্রামে বাধা দেয়। এটি করে তারা জামায়াতকে নয়, মূলত ইসলামকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এরপর বিএনপি নেতারা জামায়াতের বিরুদ্ধে ধর্ম ব্যবহারের অভিযোগ তুলে কড়া ভাষায় তার জবাব দিয়েছেন। গত ৩ নভেম্বর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, ‘জামায়াতের জন্য আওয়ামী লীগই ভালো ছিল। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের বিরুদ্ধে ছিল, তারা এখন ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে।’
এরপর শিবির নেতা ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেছেন, ‘লন্ডন, দিল্লি, পিন্ডিতে বসে আর কোনো রাজনীতি চলবে না। নতুন বাংলাদেশের রাজনীতি-দেশেই হবে সিদ্ধান্ত।’
সবশেষ গত সোমবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জামায়াতকে উদ্দেশে করে বলেন, তারা (জামায়াত) কেবলই বলছে যে, এখানে একটু মার্কাতে ভোট দিলে তরতরাইয়া জান্নাতে যাবে। তার আগে ইহকালে কীভাবে চলব এর কোনো বক্তব্য নেই। শুধুমাত্র ধর্মের নামে একটা ট্যাবলেট বিক্রি করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করার পরিকল্পনা করছে।
এদিকে, বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে উভয় দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও। নিজ দলের প্রশংসা ও প্রতিপক্ষ দলকে ইঙ্গিত করে সমালোচনামূলক নানা পোস্ট করতে দেখা যাচ্ছে তাদের। এতে দল দুটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে তিক্ততা বেড়েই চলছে। এই ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ চলমান পরিস্থিতিতে সম্প্রতি পাবনা, চট্টগ্রাম, ঝিনাইদহ, চাঁদপুর, রাজশাহী ও নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু খবরের কাগজকে বলেন, ওরা (জামায়াতে ইসলামী) ১৯৭১ সালের গায়ের দাগ মুছতে না পারলে তো বাগযুদ্ধ হতে থাকবে। ইতিহাসের সত্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই আমরা কথা বলছি। কিন্তু তারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য যা বলছে, তার কোনো প্রমাণ নেই।
তিনি বলেন, তারা বিভিন্ন চোরাগোপ্তা হামলা করছে। রাজনীতিতে হামলা হবে কেন? চোরাগোপ্তা হামলা হলে জনগণ তা প্রতিহত করবে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো কেউ কারও শত্রু নয়। সামনে নির্বাচন, তাই দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতামূলক কথাবার্তা থাকবে। তবে সবাইকে অতীত ও বর্তমানের অবস্থান ভেবে বক্তব্যে দেওয়া উচিত।’