জুলাই-অভ্যুত্থানের পর রাজনীতির সমীকরণ ক্ষণে ক্ষণে বদলেছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আসন বণ্টনের গোপন আলোচনাও চলেছে দিনের পর দিন। গত বেশ কয়েকদিন ধরেই চলেছে জোটের নানা সমীকরণ। কয়েকটি জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এরই মধ্যে।
নির্বাচনে লড়তে চূড়ান্ত হয়েছে জোটের সমীকরণ। গতকাল সোমবার ছিল মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। এর পরেই শুরু হবে নির্বাচনের প্রচার। কয়েকদিন পরই শুরু হবে প্রার্থীদের গণসংযোগ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এলাকায় প্রার্থীদের যত প্রভাবই থাকুক না কেন; প্রচারে জোটের প্রভাবই মুখ্য হয়ে উঠবে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে ভিড়েছে নিবন্ধিত, অনিবন্ধিত ১০টি রাজনৈতিক দল। কয়েকটি ছোট দলের জোটও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এই জোটে। অনেক নাটকীয়তার পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভিড়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে। এর বাইরে রয়েছে- ৭টি বাম দলের জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। জাপার দলছুট নেতাদের নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) এবং তিনটি ধর্মভিত্তিক দলের বৃহত্তর সুন্নি জোট। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনে মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াত জোটের।
শরিকদের নিয়ে দ্বন্দ্ব তৃণমূলে, ভাবনায় বিএনপির থিঙ্ক ট্যাংক
বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের দলগুলো হলো- বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণফোরাম, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, ভাসানী জনশক্তি পার্টি; জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) নেতৃত্বাধীন ১২-দলীয় জোট; ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের ১১টি দল ও গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য। শেষ মুহূর্তে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও যুক্ত হয়েছে এই জোটে।
দল নিবন্ধিত হলেও ভোটের মাঠে প্রভাব বিস্তার করতে নিজ দলের প্রতীক ছেড়ে ধানের শীষ প্রতীক বেছে নিয়েছেন শরিক দলের কোনো কোনো নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন, গণঅধিকার পরিষদের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান (ঝিনাইদহ-৪); জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ (ঢাকা-১৩)। দল বিলুপ্ত করে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম (লক্ষ্মীপুর-১); বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা (কিশোরগঞ্জ-৫)। এলডিপি ছেড়ে এসে দলের মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি কুমিল্লা-৭ আসনে নির্বাচন করবেন।
শরিক দলগুলোর জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনে বিএনপি প্রার্থী দেয়নি। সে কারণে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বিক্ষুব্ধ রয়েছেন। তাদের ভাষ্যে, গত ১৭ বছরে যারা বিএনপির রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন কিংবা জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন, তাদের উপেক্ষা করা হয়েছে। অন্য দলের প্রার্থীকে মেনে নিতে না পেরে অনেক বিএনপি নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। দল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে জেনেও তাদের এমন পদক্ষেপ ভাবিয়ে তুলছে বিএনপির থিঙ্ক ট্যাঙ্ককে। নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের বাক্সে ভোট বেশি পড়লে শরিক দলগুলোর নেতাদের ভরাডুবি হতে পারে, এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনের আগে বেশ কয়েকটি আসনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী পরিবর্তন করলেও শরিক দলগুলোর আসনে কোনো পরিবর্তন আনেনি। এতে ক্ষোভ আরও বাড়ছে।
এনসিপি, এবি পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে চাঙা জামায়াত জোট
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে দলের সংখ্যা এখন ১১। রবিবার জোটে যোগদান করে এলডিপি ও এনসিপি। সোমবার জোটে সংযুক্ত হয় এবি পার্টি। জামায়াতের জোটে এই তিনটি দল ছাড়া আরও রয়েছে, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে এনসিপির যোগদানের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এনসিপিকে ঘিরে তারুণ্যনির্ভর নতুন রাজনীতির যে প্রত্যাশা ছিল, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি জোট গঠনের সিদ্ধান্তে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে দলটির ভেতরে বিভাজন দেখা দিয়েছে। কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা আপত্তি জানিয়েছেন, কেউ কেউ পদত্যাগ করেছেন, অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই জোটে যোগদান করায় এনসিপির আদর্শ ও জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যরা এটিকে কৌশলগত নির্বাচনি সমঝোতা হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, জোট হলেও নিজস্ব পরিচয় বজায় রাখা জরুরি। সামগ্রিকভাবে ভোটের প্রচার শুরুর আগে থেকেই আবারও দুটি বড় জোটে বিভক্ত হচ্ছে দেশের রাজনীতি।
জাপার দলছুটদের জোট আছে নানা সংশয়ে
জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কারের পর দলটির সাবেক সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আলাদা দল গঠন করেছেন। তিনি তার দলটিকে ‘আসল জাতীয় পার্টি’ হিসেবে দাবি করেছেন। তবে এখন তিনি লাঙ্গল প্রতীকের কর্তৃত্ব নিয়ে জি এম কাদেরের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি লাঙ্গল প্রতীক পাবেন কি না, সে প্রশ্ন রয়ে গেছে। তবুও ভোটের মাঠে প্রার্থী হতে চান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও তার সঙ্গীরা। তাই জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) নামে নতুন একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করেছেন তারা। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টি (জেপি) ছাড়াও গত নির্বাচনের ‘কিংস পার্টি’খ্যাত তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে (বিএনএম) জোটে ভিড়িয়েছেন তারা। সম্প্রতি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য ১১৯ আসনে ১৩১ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে এনডিএফ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের দায়ে এনডিএফের শীর্ষ নেতারা ভোটের মাঠে দাঁড়াতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। নির্বাচনি প্রচার শুরুর অপেক্ষা করছেন এনডিএফভুক্ত দলগুলোর নেতারা। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে; তা নিয়ে সংশয়ে আছেন দলগুলোর নেতারা।
এখনো ছক কষেননি বাম নেতারা
বাম গণতান্ত্রিক জোটের ৬টি দলের সঙ্গে সম্প্রতি নির্বাচনি ঐক্য করেছে বাংলাদেশ জাসদ। এ দলগুলোর নতুন জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টে ভোটের শোরগোল নেই। সিপিবি প্রাথমিকভাবে একটি প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে। তবে তা চূড়ান্ত নয়। বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ জাসদ শেষ পর্যন্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেনি।
এ বিষয়ে সিপিবির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের বিষয়ে আরও কিছু দিন পরে সিদ্ধান্ত হবে। এখন দলগুলোর প্রার্থীরা আলাদা আলাদাভাবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এখন তাদের কতজন জোটভুক্ত হয়ে ভোটের মাঠে থাকবেন, কতজন উন্মুক্তভাবে লড়বেন, তা চূড়ান্ত করা হয়নি।’
বৃহত্তর সুন্নি জোট
এর বাইরে ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’ ইতোমধ্যে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
যারা জুলাই চেতনা ধারণ করে, তারাই এগিয়ে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এ বিষয়ে খবরের কাগজকে বলেন, বিএনপি সম্পর্কে মানুষের নেতিবাচক ধারণা আছে। এক হলো- তারা ৫ আগস্টের পর সারা দেশে চাঁদাবাজি শুরু করেছে। দুই- তারা আওয়ামী লীগঘেঁষা কয়েকজন নেতাকে মনোনয়ন দিয়েছেন- এমন অভিযোগ আছে। তিন- তারা কয়েকজন ঋণখেলাপিকে মনোনয়ন দিয়েছে। তাই বিএনপির অবস্থান একটু নড়বড়ে। তাদের জোটসঙ্গীদের বিষয়ে লোকের ধারণা খুব ভালো না। তবে জোটসঙ্গী ছোট দলের নেতারা এককভাবে নির্বাচন করে জিততে পারবে না। তারা বড় দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন করেই জিতে আসতে হবে।
জামায়াতের জোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা খুব কৌশলগতভাবে অগ্রসর হচ্ছে। একাত্তরে তাদের ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে মানুষ আর কথা শুনতে পছন্দ করে না। আর সম্প্রতি এনসিপি তাদের সঙ্গে জোটে যোগ দিয়েছে। এতে জামায়াতের ইমেজ কিছুটা ভালো হয়েছে।’
বাম দলগুলোর জোট নিয়ে তিনি বলেন, ‘শহর ছাড়া গ্রামে বাম দলগুলোর কোনো প্রভাব নেই। একদম জিরো।’
শেষে তিনি বলেন, ‘জোটের সমীকরণে তারাই এগিয়ে থাকবে যারা জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা বেশি ধারণ করছে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে জোট গঠন। এটাকে তো বাঁকা চোখে দেখার কোনো সুযোগ নেই।’