২০২৩ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে হাতপাখার প্রার্থী ও ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীমের দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী তার স্ত্রীর নামে কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ ছিল না; নগদ অর্থ বা স্বর্ণালংকারও ছিল না। তবে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ফয়জুল করীমের স্ত্রী কয়েক কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। একই সময়ে ফয়জুল করীমের নিজস্ব সম্পদ বেড়েছে প্রায় ১১৩ শতাংশ। ২০২৩ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং এ বছর সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দাখিল করা দুটি হলফনামা বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তির আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে।
দুটি হলফনামার তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ফয়জুল করীমের স্ত্রী ছিলেন গৃহিণী। চলতি নির্বাচনের হলফনামায় তাকে ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ব্যবসা থেকে তার আয় কত–সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। ২০২৩ সালে তার কোনো নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত কিংবা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ছিল না। বর্তমানে তার নামে ব্যাংকে জমা রয়েছে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং রয়েছে ১৮৭ ভরি স্বর্ণালংকার। স্থাবর সম্পদের ঘর খালি থাকলেও তার নামে ৩ কোটি ৪১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন সম্পদের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
হলফনামায় আয়ের উৎস উল্লেখ না থাকলেও আয়কর রিটার্নে তার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ টাকা এবং সম্পদের পরিমাণ ৩২ লাখ ৬০ হাজার ২০০ টাকা। তিনি বছরে ১৫ হাজার টাকা আয়কর পরিশোধ করছেন।
ফয়জুল করীম নিজের পেশা হিসেবে শিক্ষকতা ও দাওয়াত উল্লেখ করেছেন। তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টাসহ তিনটি মামলা ছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে। আয়ের উৎস হিসেবে তিনি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া থেকে বছরে ৩ লাখ ২২ হাজার টাকা, মাহফিল থেকে ৪ লাখ টাকা এবং শিক্ষকতা থেকে ৭ লাখ ৬ হাজার টাকা আয় দেখিয়েছেন।
ফয়জুল করীমের অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নগদ রয়েছে ৩১ লাখ ১২ হাজার ৪৭ টাকা। ব্যাংকে জমা রয়েছে মাত্র ১ হাজার ১৭৬ টাকা। ২০ হাজার টাকা মূল্যের একটি আগ্নেয়াস্ত্র ও কিছু আসবাবপত্র রয়েছে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ১ হাজার ৬০ শতাংশ কৃষিজমির মূল্য দেখানো হয়েছে ১০ লাখ ১৬ হাজার ২৫৬ টাকা এবং ৩৭ দশমিক ৬০ শতাংশ অকৃষিজমির মূল্য ৩ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৮ টাকা। তার অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য দেখানো হয়েছে ৩৩ লাখ ১৩ হাজার ২২৩ টাকা।
স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৬০ টাকা মূল্যের কৃষিজমি, ৩ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৮ টাকা মূল্যের ২ দশমিক ৪০ শতাংশ অকৃষিজমি, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ৬৬১ বর্গফুটের বাণিজ্যিক ভবন (দোকান) এবং ২ হাজার ১৩ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট। এসব স্থাবর সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ১৫ লাখ ২০ হাজার ১২৪ টাকা, যা অর্জনকালে ছিল ১ কোটি ৫ লাখ ৬ হাজার ৭০৮ টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে ফয়জুল করীমের নিট আয় দেখানো হয়েছে ১৪ লাখ ২৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং আয়করযোগ্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মূল্য ১ কোটি ৬৪ লাখ ৯ হাজার ৯৩১ টাকা। এ হিসাবে তিনি চলতি অর্থবছরে ৯৬ হাজার ৪৭৫ টাকা আয়কর পরিশোধ করেছেন।
অন্যদিকে ২০২৩ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় দেওয়া হলফনামায় তিনি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া ব্যবসা ও শিক্ষকতা থেকে বছরে ১৪ লাখ ৩৩ হাজার টাকা আয় দেখিয়েছিলেন। সেই সময় তার অস্থাবর সম্পদে নগদ ৩৪ লাখ ৭৪ হাজার ৫১০ টাকা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ১ লাখ ২১ হাজার ৭৬৯ টাকাসহ মোট ৩৫ লাখ ৯৬ হাজার ২৭৯ টাকা দেখানো হয়েছিল। স্থাবর সম্পদের মধ্যে ছিল ৮২৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ কৃষিজমি, ৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ অকৃষিজমি, দুটি অ্যাপার্টমেন্ট ও একটি দালান।
ওই বছর তার আয়করযোগ্য মোট আয় ছিল ১১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা এবং আয়করযোগ্য মোট সম্পদের মূল্য ৭৭ লাখ ৪৩০ টাকা। তিনি ১ লাখ ৬ হাজার ৮০০ টাকা আয়কর পরিশোধ করেছিলেন।
সচেতন নাগরিক কমিটি বরিশাল জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক জাহিদ হোসেন বলেন, ‘অল্প সময়ের মধ্যে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করছে।’