ঢাকা-৪ সংসদীয় আসন রাজধানীর শ্যামপুর ও কদমতলী থানা নিয়ে গঠিত। এ আসনে সাড়ে তিন লাখেরও বেশি ভোটার রয়েছেন এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। জনসংখ্যার তুলনায় এ এলাকার নাগরিক সুযোগ-সুবিধা অত্যন্ত সীমিত। তাই এই এলাকাকে একটি পরিকল্পিত, নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক হিসেবে গড়ে তুলতে ভোটারদের সহযোগিতা চেয়েছেন ঢাকা-৪ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন।
সম্প্রতি এ এলাকার বিদ্যমান সমস্যা, সম্ভাব্য প্রতিকার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন তানভীর আহমেদ রবিন।
এলাকার বড় সমস্যা মাদক ও জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানে পরিকল্পনার বিষয়ে তানভীর আহমেদ বলেন, ‘ঢাকার দক্ষিণ সিটির মধ্যে এই এলাকাটি সবচেয়ে অবহেলিত। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গঠনের সাত-আট বছর পার হলেও এখানে কার্যকর কোনো নাগরিক সেবা একেবারেই নেই। সাড়ে তিন লাখেরও বেশি ভোটার এ আসনে। প্রায় ১০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। কিন্তু কোনো খেলার মাঠ নেই, কমিউনিটি সেন্টার নেই, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য জেনারেল হাসপাতাল নেই। আপনি দুটি সমস্যার কথা বলেছেন। কিন্তু মূলত এখানে আরও অনেক সমস্যা আছে। মাদক একটি বড় সমস্যা। মাদক ব্যবসায়ীরা সাধারণত প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেছি এবং উঠান বৈঠকের মাধ্যমে এলাকাবাসীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। এসব তথ্য প্রশাসনকে দিয়েছি। তারা ইতোমধ্যে কয়েকজন বড় মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে, বাকিরা পলাতক। মাদক ব্যবসায়ী ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আমার নীতি হবে জিরো টলারেন্স।’
কিশোর গ্যাং সমস্যা মোকাবিলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মূলত এই এলাকারই সন্তান। কিন্তু এখানে খেলার মাঠ বা বিনোদনের জায়গা নেই। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে তারা রাস্তায় আড্ডা দেয় এবং সহজেই বখাটে ছেলেদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এভাবেই তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে আমার পরিকল্পনা হলো–প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে একটি করে পাঠাগার নির্মাণ করব। এসব পাঠাগারে থাকবে মননশীল পরিবেশ, যেখানে নবীন-প্রবীণ, নারী-পুরুষ–সবাই এসে বই পড়বেন। এলাকার যেকোনো মানুষের জ্ঞানচর্চা, সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ থাকবে। এতে নবীন-প্রবীণদের মধ্যে দূরত্ব কমবে, সামাজিক বন্ধন তৈরি হবে এবং তরুণরা মাদক ও কিশোর গ্যাং থেকে দূরে সরে আসবে এবং পড়ালেখা ও সৃজনশীল কাজে মনোযোগী হবে।’
জলাবদ্ধতা সমস্যার মূল কারণ কী এবং সমাধান কীভাবে সম্ভব–এমন প্রশ্নের উত্তরে বিএনপির মনোনীত এই প্রার্থী বলেন, ‘জলাবদ্ধতা আমাদের এলাকার যুগের পর যুগের একটি অভিশাপ। এটি মূলত গ্রাম ছিল। নিচু এলাকা হওয়ায় মাছের ঘের ও কৃষিকাজ হতো। এ অঞ্চলে অপরিকল্পিত নগরায়ণ গড়ে উঠেছে। এখানে ড্রেনেজব্যবস্থা সেইভাবে গড়ে ওঠেনি। খালগুলো দখল হয়ে গেছে, পরিষ্কার রাখা হয়নি। পানি নিষ্কাশন হয় না ঠিকমতো। এখানের পানি বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যায় নিষ্কাশিত হয়। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগকে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। বর্ষা মৌসুমের আগেই ড্রেন ও খাল পরিষ্কার করা গেলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমবে।’
অলিগলি ও রাস্তাঘাটের সমস্যা নিয়েও এলাকার জনগণের নানা অভিযোগ রয়েছে, এই বিষয়ে কী ভাবছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে রবিন বলেন, ‘মূল সড়কের কিছুটা উন্নয়ন হলেও অলিগলিগুলো এখনো কাঁচা এবং সেখানে কোনো ড্রেনেজব্যবস্থা নেই। ফলে শুষ্ক মৌসুমেও বাসাবাড়ির নিচতলায় পানি জমে থাকে। মসজিদ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেখানে ড্রেনেজ নেই, সেখানে নতুন করে প্রশস্ত ড্রেনেজ নির্মাণ করতে হবে। আগের ভুল পরিকল্পনা সংশোধন না করলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’
প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন এবং নির্বাচনি মাঠের পরিস্থিতি কেমন–এমন প্রশ্নের উত্তরে তানভীর আহমেদ বলেন, ‘২০০৮, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন এবং ২০২০ সালের উপনির্বাচনে আমি আমার বাবার প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট ছিলাম। ফলে নির্বাচন করার অভিজ্ঞতাও আমার আছে। ওই নির্বাচনগুলো ছিল মূলত প্রতারণার নির্বাচন। সেখানে মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত হয়নি। বর্তমানে আমরা মাঠে যাচ্ছি, মানুষের কাছে যাচ্ছি এবং স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দেখতে পাচ্ছি। মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য উদগ্রীব। তারা ভোট দিতে চান এবং নিজেদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে চান। আমি মনে করি, একটি উৎসবমুখর পরিবেশে মানুষ উদ্দীপনা নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং ভোট দেবেন।’
বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীদের ওপর হামলা হচ্ছে ও নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা রয়েছে কি না, এ প্রশ্নের উত্তরে তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, ‘বিগত ১৮ বছরে আমরা গুলির মুখেই আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। এগুলো মোকাবিলা করার জন্য নেতা-কর্মীরা মানসিকভাবে প্রস্তুত আছেন, কিন্তু পরিবারগুলো সব সময় উদ্বিগ্ন থাকে। আমি মনে করি, এটি নির্বাচন বানচাল করার একটি বড় ষড়যন্ত্র। বিগত ১৮ বছরের আন্দোলন ও গণ-অভুত্থানের সম্মুখ সারিতে থাকা নেতা-কর্মীদের টার্গেট করা হচ্ছে। আমি মনে করি না যে এটা নির্বাচনে বাধাগ্রস্ত করবে। তারপরও একটা শঙ্কা থাকেই। আমাদের দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের জীবনের শঙ্কায় আমরাও আছি। সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে, প্রশাসনকে শক্তিশালী করে যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে সরাসরি অভিযান পরিচালনা করতে। তফসিল ঘোষণার আগেই এই অভিযান শুরু করা প্রয়োজন ছিল। আওয়ামী লীগের গুন্ডাপান্ডারা এখনো দেশে আছে। তাদের একটি দল ছত্রচ্ছায়াও দিচ্ছে।’
ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি এই এলাকার সন্তান। আমার পূর্বপুরুষরা এখানকারই মানুষ। আমার বাবা বারবার এই এলাকার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার সময় তিনিও প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তখন থেকেই এই গ্রাম অঞ্চলকে শহরে রূপান্তরের যাত্রা শুরু হয়। এখানে অনেক সমস্যা আছে। আমিও এর ভুক্তভোগী। এলাকার সন্তান হওয়ায় সমস্যাগুলো সুনির্দিষ্ট করে জানি। আমি চাই, এই এলাকাকে একটি পরিকল্পিত, নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে এবং এ জন্য ভোটারদের সহযোগিতা চাই।’