বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুরে দলটির বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের ভোট মানেই ‘ধানের শীষের পক্ষে’– অনেক বছর ধরে এমনটি মনে করা হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাস্তবতায় আগের সেই চিন্তায় পরিবর্তন এসেছে। জামায়াতের নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহিণী ও তরুণীদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনে গত দেড় বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে অর্থসহ নানান সহযোগিতা করে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থীরাও থেমে নেই। তারা উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের ভোটব্যাংক মজবুত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জেলার চারটি আসনে ১৬ লাখের বেশি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৮ লাখই নারী। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এই নারী ভোটাররাই জয়-পরাজয় নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করবেন। এ জন্য ভোটের মাঠের প্রার্থীরা তাদের মন জয় করতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি ও জামায়াত আগে একসঙ্গে রাজনীতি করায় নারীদের ভোট একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে যেত। কিন্তু এখন দল দুটি আলাদা হওয়ায় সেই ভোটব্যাংক ভাগ হয়ে যেতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১ হাজার ৪৪০ দশমিক ৩৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের জেলা লক্ষ্মীপুর। ৬টি থানা, ৫টি উপজেলা, ৪ পৌরসভা ও ৫৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ জেলার চারটি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৬ লাখ ২২ হাজার ৮৬৬ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৭ লাখ ৯০ হাজার। পুরো জেলায় তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন চারজন। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি, জেএসডি ও স্বতন্ত্রসহ ২৯ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিএনপির ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত নারী ভোটারদের নিজেদের দিকে টানতে এরই মধ্যে লক্ষ্মীপুরের প্রতিটি গ্রামে জামায়াতের নারী কমিটি করা হয়েছে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি উঠে এসেছে দলটির জেলা কমিটির সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মহসিন কবির মুরাদের ভাষ্যে।
তিনি বলেন, ‘নারীদের ভোট দলের পক্ষে নিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। নারীরা নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারলে জামায়াতের প্রার্থীরা ভোটে এগিয়ে থাকবেন। জেলার প্রতিটি এলাকায় নারীদের নিয়ে টিম করে দেওয়া হয়েছে। তারা প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে ভোটারদের দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করে যাচ্ছেন।’
লক্ষ্মীপুর শহরের হাসপাতাল রোডের বাসিন্দা ফাতিমা খাতুন বলেন, ‘ভোট চাইতে বিএনপি ও জামায়াতের নারী কর্মীরা বাড়ি-বাড়ি যাচ্ছেন। জামায়াতের নারী কর্মীরা ভোটের আগে থেকেই আসছেন। ঘরে ঘরে কোরআন হাদিস ও ইসলামী বই বিতরণ করছেন। নামাজ, রোজা ও ধর্ম-কর্মের ব্যাপারে তারা উৎসাহিত করছেন। ছোটখাটো অর্থনৈতিক ও পারিবারিক সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে আসছেন। তারা সুদ-ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে থাকেন। ন্যায় ইনসাফের পক্ষে কথা বলছেন। তাদের ব্যবহার ও কার্যক্রমে আকৃষ্ট হয়ে এবার অনেক নারীই জামায়াতকে ভোট দিতে ইচ্ছা পোষণ করছেন।’
অন্যদিকে জেলা বিএনপির নেতা অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান বলেন, ‘নারী ভোটে এ জেলায় বিএনপি বরাবরই এগিয়ে থাকে। তারপরও নারী ভোটারদের দলের পক্ষে রাখতে, ধানের শীষ মার্কায় ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠক ও নারী সমাবেশ চলমান রয়েছে।’
কথা হয় লক্ষ্মীপুর সদরের দেওপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খালেদা আক্তার এবং পালপাড়া ডিএম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজী মাসুমাসহ কয়েকজন নারী ভোটারের সঙ্গে। তারা প্রত্যেকেই সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে প্রার্থীদের নারী উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
তাদেরই একজন সদরের পাঁচপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাজেদা বেগম। তিনি বলেন, ‘বিগত বহু বছর আমরা ভোট দিতে পারিনি। ভোটার হয়েছি ঠিকই, কিন্তু ভোট দিতে পারিনি।’ মনোহরপুরের বাসিন্দা গৃহিণী বিলকিস আক্তার বলেন, ‘এবার আমরা সবাই নিজেদের মতো করে প্রার্থী বাছাই করতে পারব। আমরা আমাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারব।’
এদিকে নতুন ভোটারদের মধ্যেও ভোটকে কেন্দ্র করে বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। তবে তারা সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার নিশ্চয়তা চেয়েছেন। কথা হয় সদর উপজেলার দাউদপুরের বাসিন্দা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী রুমী বিনতে ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এটা আমার প্রথম ভোট। তাই আগ্রহের পাশাপাশি আমি খুবই আশাবাদী। সদরের বরইতলা এলাকার কলেজ শিক্ষার্থী কুলসুম বেগম বলেন, ‘আশা করি সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। স্বাভাবিক সুন্দর পরিবেশে ভোট দিতে পারব।’
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার জয়রামপুর গ্রামের বাসিন্দা ও উত্তর জয়পুর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মহিলা সদস্য দেলোয়ারা বেগম দাবি করেন, ‘আগে জামায়াত-বিএনপি একসঙ্গে নির্বাচন করায় অধিকাংশ ভোটই ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে যেত। এবার দুই দল আলাদা আলাদা নির্বাচন করায় ভোট ভাগ হয়ে যাবে। এবার বেশির ভাগ নারী ভোট দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
এদিকে সব প্রার্থীর সমান সুযোগের কথা জানিয়ে নির্বাচন কমিশন বলছে, অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট করতে তারা বদ্ধপরিকর। এ বিষয়ে তাদের নীতি জিরো টলারেন্স। লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুর রশিদ বলেন, ‘নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। আমরা আশা করি, নারী ভোটাররা তাদের মেধা-মনন ও চিন্তা-চেতনার মাধ্যমে সৎ, যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেবেন।’