ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে মুখর। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার প্রকাশের আগেই ভোটারদের কাছে তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির ‘ভিশন’ ও ‘রূপরেখা’ তুলে ধরছে। বিশেষ প্রাধান্য পাচ্ছে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বেকারত্ব দূরীকরণ, রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসনের বিষয়গুলো। মূলত ইশতেহারের আগাম বার্তা হিসেবেই দলগুলো তাদের এই প্রাথমিক অঙ্গীকারগুলো ভোটারদের সামনে নিয়ে আসছে। ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের নতুন প্রত্যাশা তৈরি করছে।
জানা গেছে, বিএনপি এবং জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহার তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দুই দলই ইশতেহার পুস্তক আকারে প্রকাশ করবে। ইশতেহারের নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে দল দুটির শীর্ষ নেতারাসহ সংসদ সদস্য প্রার্থীরা সাধারণ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। আগামী সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করতে পারে দল দুটি। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের নির্বাচনি ইশতেহারও প্রায় চূড়ান্ত।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনি ইশতেহার তৈরির কাজ চলমান। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কাজ করছেন। এবারের ইশতেহার হবে দেশবাসীর সামনে আগামীর বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি।’
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মওলানা আবদুল হালিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ইশতেহার তৈরির কাজ চলমান। বিভিন্ন মহলের বিশেষজ্ঞ ও নেতাদের মতামত নিয়ে একটি কমিটি ইশতেহার তৈরির কাজ করছে। শিগ্গিরই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হবে।’
ভোটারদের কাছে বিএনপির যেসব প্রতিশ্রুতি
নির্বাচন সামনে রেখে গত ২২ জানুয়ারি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর পুণ্যভূমি সিলেট থেকে বিএনপির নির্বাচনি প্রচার শুরু করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এদিন সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষকে বিজয়ী করলে দেশের মানুষকে স্বাবলম্বী করা হবে। নতুন করে খাল খনন, কৃষকদের কার্ড প্রদান, নারীদের ফ্যামিলি কার্ডের মতো বিশেষ সহায়তা প্রদানসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বেকার সমস্যা সমাধান করে দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। এরপর তারেক রহমান মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে জনসভায় যোগ দিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। এরপর ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জে জনসভা করেন তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও ঢাকার উত্তরায় জনসভায় যোগ দেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
এসব জনসভা থেকে ভোটারদের কাছে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি; নতুন করে খাল খনন; কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড প্রদান; নারীদের ফ্যামিলি কার্ড; তরুণদের কর্মসংস্থান; বিভিন্ন ভাষা শিক্ষা ও আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ; মাদক নিয়ন্ত্রণ; কৃষি খাতে আমূল পরিবর্তন করে আধুনিকায়ন করা; যুবকদের দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলা; ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও হালাল উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা; পরিবেশ সুরক্ষায় ৫০ কোটি গাছের চারা রোপণ; বায়ুদূষণ কমাতে ধাপে ধাপে পুরোনো ও জরাজীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার; ঢাকার বাইরে স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলা; ঢাকা শহরের ভেতরের চক্রাকার মনোরেল রেল চালু; উপজাতিদের অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা; গ্রামীণ এলাকায় এক লাখ প্রাথমিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ; যুক্তরাজ্যের (ইউকে) ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচসি) আদলে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা’; প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা; কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন ও আধুনিকায়ন করা; বিদেশে চাকরি ও শিক্ষার জন্য সহজ শর্তে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করা; কুমিল্লায় শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা; বস্তিবাসীর পুনর্বাসনসহ দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
গতকাল ময়মনসিংহ জনসভায় তারেক রহমান বলেছেন, প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে স্লোগান হবে একটাই– করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। সবার মনে রাখতে হবে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেই জনগণের শাসন কায়েম করা সম্ভব হবে, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেই জনগণের প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আসুন, আমাদের আজকে শপথ হোক, আমরা এই বাংলাদেশকে জনগণের বাংলাদেশে পরিণত করব, আমরা বাংলাদেশকে জনগণের বাংলাদেশে রূপান্তরিত করব।
জামায়াত যেসব প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে
চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও দুঃশাসনমুক্ত ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই নির্বাচনি প্রচার শুরু করেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ে নির্বাচনি জনসভার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন জামায়াত। এরপর পঞ্চগড়, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, শেরপুর, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, খুলনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গায় ও ঝিনাইদহ জনসভায় নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন জামায়াতের আমির। সবশেষ গতকাল যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটে জনসভায় যোগ দেন শফিকুর রহমান।
এসব জনসভায় থেকে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ; ধনী-গরিব, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, নারী-পুরুষ, শিশু, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য ন্যায়বিচার; জনগণের চাওয়া অনুযায়ী বদলে যাওয়া বাংলাদেশ; দিনাজপুর ও বগুড়াকে পৃথক সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করা; বগুড়ায় একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা; দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ; উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী বানানো; কৃষিকে আধুনিকায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ ও জায়গায় জায়গায় সংরক্ষণাগার তৈরি; বিগত সাড়ে ১৫ বছরে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনা; চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়া; নারীদের সম্মান অটুট রাখা; মায়েদের জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থা করা; কুষ্টিয়ার নদীগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা; চালের ট্রাক থেকে সব ধরনের চাঁদা আদায় বন্ধ করা; মামলাবাণিজ্য বন্ধ করা; যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা; বন্ধ কলকারখানা চালু; জনগণের চৌকিদার হয়ে তাদের সম্পদের আমানত হেফাজত করা; জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের প্রতিবছর জনগণের সামনে প্রকাশ করা; শুকিয়ে যাওয়া নদীগুলোর প্রাণ ফিরিয়ে আনা; কর্মস্থল ও রাস্তায় নারীদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; যুবকদের বেকার ভাতা নয় বরং সরকারি খরচে উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা; শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা এবং প্রবীণদের জন্য পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার ব্যবস্থা, চাঁদাবাজদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সুপথে ফিরিয়ে আনা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা; দলের কোনো জনপ্রতিনিধি কালোটাকার দিকে হাত বাড়াবে না; বিদেশি কাউকে প্রভুর মতো আচরণ করতে দেব না; ৬৪ জেলায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেন জামায়াতের আমির।
জানা গেছে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জামায়াতের মতোই একই প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
গতকাল খুলনার জনসভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি আমরা একটি অভিশাপমুক্ত বাংলাদেশ চাই। আমরা যুবকদের হাতে বেকার ভাতা নয়, তাদের হাতে হাতে কাজ তুলে দিতে চাই। যুবসমাজকে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের সম্মানিত করতে চাই। জুলাই বিপ্লবে তাদের যে অবদান, কিছুটা হলেও তার ঋণ শোধ করতে চাই।
তিনি বলেন, একটি দল একদিকে দিচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড, অন্যদিকে দিচ্ছে মা-বোনদের গায়ে হাত। যারা মাকে অসম্মানিত করছে, তাদের ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানাই।
চরমোনাই পীরের প্রতিশ্রুতি
জামায়াত জোট থেকে শেষ মুহূর্তে বেরিয়ে গিয়ে এককভাবে নির্বাচন করছেন চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। এ ছাড়া কোরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে একটা শান্তিময় বাংলাদেশ গড়ে তোলা; দুর্নীতি-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা; বিদেশে অর্থ পাচার বন্ধ করা, সব ধর্ম-বর্ণভেদে ধনী-গরিব সবার সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা; সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাসহ নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছে।
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের ১৮ অঙ্গীকার
নির্বাচনের ইশতেহারে ১৮টি বিষয়ে অঙ্গীকার করেছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। এর মধ্যে রয়েছে, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন; গণতান্ত্রিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমন; স্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ; নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার ও প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা; অর্থনৈতিক পুনর্গঠন; কর্মসংস্থান; দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস; শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন; জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার গণমুখী সংস্কার; খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি সংস্কার; শ্রমিক অধিকার ও ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা; নারী অধিকার ও লিঙ্গসমতা; যুবশক্তির বিকাশ; পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো; পরিবেশ, জলবায়ু ও প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষা; বিজ্ঞান-প্রযুক্ত ও গবেষণার গণমুখী সংস্কার; গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা; সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চেতনা এবং পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সংহতি।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেছেন, লুটপাটের অর্থনীতি বন্ধ, প্রতিটি মানুষের ও দেশের মর্যাদা নিশ্চিত করতে সংসদে ভূমিকা নেবেন কাস্তে প্রতীকের প্রার্থীরা। ঢাকা সচল করতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমনভাবে উন্নয়ন করতে হবে, যাতে ওইসব এলাকায় মানুষ কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা পায়। দেশে দরিদ্রতা বাড়ছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র গড়ে উঠছে না। বন্ধ কলকারখানা চালু করে অবস্থা পরিবর্তনে ব্যবস্থা করতে হবে।