ভোটকেন্দ্রের সামনে কোন লাইনে দাঁড়াবেন? এই একটি প্রশ্নেই আটকে যায় রাজশাহীর বহু তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার–ভোট দেওয়ার ইচ্ছা। কেউ লাইনে দাঁড়ান না, কেউ কেন্দ্রে ঢোকেন না, কেউ আবার ঢুকেও ফিরে আসেন অপমানের ভার নিয়ে। ফলে ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে আত্মসম্মান বজায় রাখতে ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে তারা নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন। সাংবিধানিক অধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারছেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বিষয়ে এখনই ব্যবস্থা না নিলে অনেক তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ভোটবর্জন করবেন।
জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম মারুফ। কিন্তু রাজশাহীর তৃতীয় লিঙ্গের কমিউনিটিতে তিনি পরিচিত মিস পূর্ণিমা নামে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের এই ভোটার একাধিক নির্বাচন দেখেছেন, কিন্তু কখনোই ভোট দিতে যাননি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘অন্য তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি, ভোটকেন্দ্র মানেই অস্বস্তি, কটূক্তি আর অপমানের জায়গা।’
পূর্ণিমা বলেন, ‘আমার পোশাক ও পরিচয়ের সঙ্গে এনআইডির নাম মেলে না। আলাদা কোনো লাইন বা বুথ নেই। পুরুষদের লাইনে দাঁড়াতে হয়। তখন সবাই তাকিয়ে থাকে। কেউ কেউ বাজে মন্তব্য করে। আত্মসম্মান নিয়ে এমন জায়গায় দাঁড়ানো যায় না। এ কারণেই আমার মতো বহু তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এখন আর ভোটকেন্দ্রের পথ মাড়ান না। এবারও যাব না।’
রাজশাহীর এই বাস্তবতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। স্থানীয় সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, মহানগর ও জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য রয়েছেন। ২০১৮ সালের গেজেট প্রকাশের আগের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে অন্তত ১ হাজার জন নারী ও পুরুষ হিসেবে ভোটার নিবন্ধিত হয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে তাদের উপস্থিতির হার থাকে খুবই কম।
রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের গেজেট প্রকাশের পর এই অঞ্চলের ৩৯টি সংসদীয় আসনে তালিকাভুক্ত তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার মাত্র ১৭২ জন। অথচ ভোটার সংখ্যা কম হলেও তাদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। নেই পৃথক লাইন, আলাদা বুথ কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্তদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা।
কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার ভোটার শাবনুর (এনআইডিতে নাম মো. জনি হোসেন) বলেন, ‘ভোটের দিন এলেই আমাদের মধ্যে এক ধরনের নীরবতা কাজ করে। ভোটকেন্দ্রে গেলে পুরুষ নাকি নারী, কোন লাইনে দাঁড়াব সেটাই ঠিক করতে পারি না। অনেকে এনআইডি বানাতে গিয়ে এত বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন যে, পরে আর ভোটারই হননি।’
পবা উপজেলার লিলিহলের মোড় এলাকার উদ্যোক্তা রাত্রির অভিজ্ঞতা আরও তিক্ত। গত নির্বাচনে (২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচন) ভোট দিতে গিয়ে তাকে কেন্দ্রেই ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘কেউ পরিষ্কার করে বলেনি কোথায় দাঁড়াব, কোন কক্ষে ভোট দেব। পোশাক আর পরিচয়ের কারণে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভোট না দিয়েই ফিরে এসেছি।’
‘দিনের আলো হিজড়া সংঘ’র সভাপতি মোহনা মুহিন বলেন, ‘সমস্যাটা শুধু অবকাঠামোগত নয়, মানসিকতারও। ভোটকেন্দ্রগুলো তৃতীয় লিঙ্গবান্ধব নয়। আলাদা লাইন বা বুথ নেই, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ নেই। অনেক সময় আমাদের দেখলে তারা এড়িয়ে চলেন। ফলে সাংবিধানিক অধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ করা যায় না।’
তিনি মনে করেন, ‘প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা, নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণ এবং হয়রানি প্রতিরোধের নির্দেশনা ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়।’
তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করা বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নাগরিকতা প্রকল্পের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর নাহিদা পারভীন বলেন, ‘এটি কেবল সামাজিক দায় নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। ২০১৮ সালের গেজেট অনুযায়ী তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ভোটার হতে পারছেন। কিন্তু এর আগে যারা ভোটার হয়েছেন, তাদের অনেকের এনআইডিতে লিঙ্গ সংশোধন হয়নি। এই অসামঞ্জস্যই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনার কারণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়বে, যা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে। কিন্তু সে উদ্যোগ না এলে বাস্তবতা একটাই, রাজশাহীর বহু তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ভোটের দিন কেন্দ্রে যাবেন না। এটি ভোটাধিকার হারানোর কারণে নয়, বরং আত্মসম্মান হারানোর ভয়ে।’