জাতীয় সংসদের ২৯৮নং আসন খাগড়াছড়ি। পাহাড়ি-বাঙালির বসবাস থাকা এই আসনে এখন নির্বাচনি আমেজ বিরাজ করছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা-কর্মী সম্প্রতি বিএনপিতে যোগ দেওয়ায় দলটির প্রার্থীকে বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া মারমা জনগোষ্ঠীর সমর্থন পাওয়ায় অন্য দলের প্রার্থীর থেকে তিনি বেশ এগিয়ে আছেন। পিছিয়ে নেই জামায়াতের প্রার্থীও। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর একটি অংশ প্রথমবারের মতো দলটির প্রার্থীর প্রচারে অংশ নেওয়ায় তিনিও বেশ ফুরফুরে। তবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী। তাদের মধ্যে একজন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত। পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনের অঘোষিত সমর্থন থাকায় তাদের ভোটের হিসাব পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। সামগ্রিক বিবেচনায় এই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাজনৈতিক শক্তির চেয়েও বেশি নির্ভর করছে ব্যক্তিগত প্রভাব, পাহাড়ি-বাঙালি সমাজের সমর্থন এবং ভোটের দিনের পরিস্থিতির ওপর।
৯টি উপজেলা, তিনটি পৌরসভা ও ৩৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ২৬৯৯.৫৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় সংসদীয় আসন মাত্র একটি। এই আসনে এবার বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ জাতীয় পর্যায়ের আট দলের প্রার্থীর পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আরও তিনজন পাহাড়ি স্বতন্ত্র প্রার্থী। আসনটিতে ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন। এর মধ্যে বাঙালি ভোটার ২ লাখ ৮২ হাজার ৯৮৬ জন এবং পাহাড়ি ভোটার ২ লাখ ৭১ হাজার ১২৩ জন। বাকি চারজন তৃতীয় লিঙ্গের।
খাগড়াছড়ি আসনে ভোটের হিসাবে জাতীয় পর্যায়ের দলের পাশাপাশি বড় ফ্যাক্টর আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তি। আসনটিতে পাহাড়ি এবং বাঙালি ভোটের বিভাজন বরাবরই জটিল সমীকরণ তৈরি করে। এবারে খাগড়াছড়ি আসনে মোট ১১জন প্রার্থী থাকলেও ভোটযুদ্ধ হবে মূলত চারজনের মধ্যে। তারা হলেন, বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের ওয়াদুদ ভূঁইয়া, জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী, ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপির বহিষ্কৃত বিদ্রোহী প্রার্থী) সমীরণ দেওয়ান ও ঘোড়া প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী দীঘিনালা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ধর্মজ্যোতি চাকমা। ভোটে অংশ নেওয়া কলস প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অপসারিত চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরা অবশ্য তাদের তুলনায় পিছিয়ে আছেন।
জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দৃশ্যত এগিয়ে আছেন বিএনপি প্রার্থী ওয়াদুদ ভূঁইয়া। এর পরের অবস্থানে জামায়াতের এয়াকুব আলী চৌধুরী। এ ছাড়া পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনীতির সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ান এবং ধর্মজ্যোতি চাকমাও এবার টেক্কা দেবেন জাতীয় পর্যায়ের দলের প্রার্থীদের সঙ্গে।
জেলা সদরসহ নয় উপজেলার মধ্যে পাঁচটিতে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো বেশ শক্তিশালী। এসব জায়গায় জোরে-শোরে চলছে ধানের শীষের প্রচার। তবে জেলার লক্ষ্মীছড়ি, মহালছড়ি, দীঘিনালা এবং পানছড়ি উপজেলার দুই তৃতীয়াংশ এলাকায় প্রচার ঝুঁকি বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে বিএনপিকে। দলটির সঙ্গে জোট বেঁধেছে খাগড়াছড়ির মারমা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের পদ-পদবিধারী নেতাসহ আওয়ামী ঘনিষ্ঠ অনেক নেতা-কর্মীর বিএনপিতে যোগ দেওয়ার ঘটনাও খাগড়াছড়ির বিএনপি প্রার্থীর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
এদিকে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় অন্যান্য সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার খাগড়াছড়ি আসনে বেশি ভোট টানার সম্ভাবনা রয়েছে জামায়াতের। আগে কখনো পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে জামায়াতের নির্বাচনি প্রচারে দেখা না গেলেও এবার চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীও যোগ দিয়েছে দাঁড়িপাল্লার প্রচারে।
অন্য দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ান এবং ধর্মজ্যোতি টেক্কা দেবেন পাহাড়ি ভোট নিয়ে। এই দুই প্রার্থীর মধ্যে সমীরণ দেওয়ানকে সমর্থন দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বিভক্ত দুই গ্রুপ এবং ধর্মজ্যোতি চাকমাকে সমর্থন দিয়েছে ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)।
বিএনপি প্রার্থী ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, ‘২০০১-২০০৬ সালে এমপি থাকাকালে আমার উন্নয়ন কাজ, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ত্যাগ-কারাভোগ এবং মাঠে সক্রিয় অংশগ্রহণের সার্বিক বিবেচনায় সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালিরা সাম্প্রদায়িক বিভাজন না করে আমাকে ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিজয়ী করবে।’ জামায়াত প্রার্থী এয়াকুব আলী চৌধুরী বলেন, ‘চাঁদাবাজি, দুর্নীতিমুক্ত এবং অসাম্প্রদায়িক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিনির্মাণে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই আমাদের পক্ষে এক হয়েছে।’
বিএনপির বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ান বলেন, ‘আমি এর আগে পাহাড়ি-বাঙালির ভোটে নির্বাচিত জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলাম। এবার নির্বাচিত হলে আগের মতোই সব সম্প্রদায়ের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখব।’
আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্মজ্যোতি চাকমা বলেন, ‘এর আগেও আমি সকল সম্প্রদায়ের ভোটে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছিলাম। এবারও পাহাড়ি-বাঙালি ভোটের বিভাজন না রেখে খাগড়াছড়ি আসনের ভোটাররা আমাকেই নির্বাচিত করবেন বলে বিশ্বাস করি।’