সুস্থতা আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ নেয়ামতগুলোর অন্যতম। সুস্থ ব্যক্তি দ্বীনি দুনিয়াবি সব কাজেই প্রশান্তি লাভ করে। সব কাজেই সে একাগ্রতা বজায় রাখতে পারে। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) সব সময় আল্লাহতায়ালার কাছে সুস্থতার নেয়ামত চাইতেন। তিনি উম্মতকে সুস্থতার নেয়ামতের মূল্যায়ন করার নির্দেশনা দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা অসুস্থতা আসার আগেই সুস্থতার মূল্যায়ন কর।’ (শুআবুল ঈমান, ১০২৫০)
এক. অসুস্থতা কল্যাণের বার্তাবাহী: অনাকাঙ্ক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও আমরা মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমাদের চারপাশে কত মানুষ অসুস্থতায় ভোগে। সম্প্রতি ভাইরাস জ্বর, ডেঙ্গু জ্বরসহ নানা অসুস্থতায় অনেকেই বিপর্যস্ত। অসুস্থতা কেবল গোনাহের পরিণতিতেই আসে- এমন ধারণা অমূলক। অসুস্থতা আল্লাহতায়ালার অসন্তুস্টির প্রমাণ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মতো পুতপবিত্র মানুষও মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়তেন। অসুস্থতা মুমিনের জীবনে সমূহ কল্যাণ বয়ে আনে। অসুস্থতা মুমিনের জীবনকে ধুয়ে-মুছে আরও পাক-পবিত্র করে দেয়। অসুস্থতাসহ অনেক বিপদাপদ মুমিনের প্রতি আল্লাহর ভালোবাসার নিদর্শন বহন করে। মুআবিআ ইবনে আবি সুফিয়ান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ যার ব্যাপারে কল্যাণ চান তাকে বিপদাপদ দান করেন।’ (বুখারি, ৫৬৪৫)
দুই. অসুস্থতা গোনাহ মোচনকারী: অসুস্থতা বিপদাপদ মুমিনের গোনাহের কাফফারা। মুমিন অসুস্থ হলে আল্লাহ তার গোনাহ মাফ করে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সত্যের নিকটবর্তী থাকো এবং সরল-সোজা পথ অবলম্বন করো। মুমিনের যে কষ্টই হোক না কেন, এমনকি তার গায়ে যদি কোনো কাঁটা বেঁধে বা সে কোনো বিপদে পতিত হয়—সবকিছুই তার গুনাহের কাফফারা হয়।’ (তিরমিজি, ৩০৩৮)
তিন. অসুস্থতা পবিত্রকারী: অসুস্থতা একজন মুমিনকে পাক-পবিত্র বানিয়ে দেয়। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তি রোগাক্রান্ত হলে আল্লাহ তাকে (গোনাহ থেকে) এমনভাবে পরিচ্ছন্ন করেন, যেমন হাপর লোহাকে পরিচ্ছন্ন করে।’ (ইবনে হিব্বান, ২৯৩৬)
চার. সুস্থতাকালীন আমলের সওয়াব: অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ থাকাকালীন সময়ে যেসব নেক আমল, ইবাদত-বন্দেগি করত, অসুস্থ হওয়ার পর আল্লাহতায়ালা ওই ব্যক্তিকে সুস্থ থাকাকালীন সময়ের ইবাদত-বন্দেগির সাওয়াব দান করেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি রোগাক্রান্ত হলে সেই অবস্থায় সে তার সুস্থাবস্থায় যেরূপ আমল করত সেরূপ সাওয়াব তার জন্য লেখা হয়।’ (শুআবুল ঈমান, ৯৪৭৫)
পাঁচ. সওয়াব ও মর্যাদা বৃদ্ধি: রোগের কষ্টে ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে মুমিন বান্দার নেকি অর্জিত হয় এবং মহান আল্লাহ রোগীকে এমন মর্যাদা দান করেন, যা সে আমলের মাধ্যমে অর্জন করতে সক্ষম ছিল না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এমন মর্যাদা নির্ধারিত থাকে, যা সে তার আমলের মাধ্যমে লাভ করতে সক্ষম ছিল না। তখন আল্লাহ তার দেহ, সম্পদ অথবা তার সন্তানকে বিপদগ্রস্ত করেন। অতঃপর তাকে সেই বিপদে ধৈর্য ধারণের সক্ষমতা দান করেন। অবশেষে তাকে সেই মর্যাদায় পৌঁছে দেন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ছিল।’ (মুসনাদে আহমাদ, ২২৩৩৮)
ছয়. জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ: অসুস্থ ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়। ফলে সে আখিরাতে জাহান্নামের আগুন থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে পারে। একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু হুরায়রা (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে একজন জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখতে গেলেন। তিনি রোগীকে বলেন, ‘সুসংবাদ গ্রহণ করো! কেননা মহান আল্লাহ বলেন, ‘এই (রোগ) আমার আগুন, যা আমি দুনিয়াতে আমার মুমিন বান্দার ওপর চাপিয়ে দেই, যাতে আখিরাতের আগুনের পরিপূরক হয়ে যায়।’ (ইবনে মাজাহ, ৩৪৭০)
সাত. জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম: আল্লাহ রোগব্যাধি দিয়ে মুমিন বান্দাকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে থাকেন। বান্দা যদি এই পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করতে সক্ষম হয়, তা হলে দুনিয়ার এই কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ তাকে আখিরাতে সম্মানিত করেন এবং তাকে এত বিশাল পুরস্কার প্রদান করেন যে দুনিয়ার সুস্থ ব্যক্তিরা নিজেদের রোগ না হওয়ার জন্য আক্ষেপ করবে। জাবের (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন বিপদে পতিত ব্যক্তিদের যখন প্রতিদান দেওয়া হবে, তখন (পৃথিবীর) বিপন্মুক্ত মানুষরা আফসোস করে বলবে, হায়! দুনিয়াতে যদি কাঁচি দ্বারা তাদের শরীরের চামড়া কেটে টুকরো টুকরো করে দেওয়া হতো!’ (তিরমিজি, ২৪০২)
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখযানুল উলুম, টঙ্গী