আমাদের সমাজে প্রায়শই এমন পরিস্থিতি আসে, যখন একজন ব্যক্তি নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, অথবা কোনো অন্যায় ও জুলুমের শিকার হন। এমন অবস্থায় সেই জুলুম থেকে মুক্তি পেতে বা অধিকার ফিরে পেতে ঘুষ ছাড়া কোনো বিকল্প পথ খোলা থাকে না। প্রশ্ন হলো, ইসলামি শরিয়তে এই ধরনের পরিস্থিতিতে ঘুষ দেওয়া কি বৈধ?
ইসলামি দৃষ্টিকোণ: নিরুপায় হলে করণীয়: ইসলামে ঘুষ গ্রহণ ও প্রদান উভয়ই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ঘুষ গ্রহণকারী ও প্রদানকারী উভয়ের ওপরই আল্লাহ্র অভিশাপ রয়েছে। তবে ইসলাম জীবনকে সহজ ও স্বাভাবিক করার জন্য কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যগত অবস্থার (একান্ত নিরুপায়) ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে।
যদি কোনো মুসলিমের প্রাপ্য অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, বা তার ওপর জুলুম করা হয় এবং সেই জুলুম থেকে বাঁচার জন্য ঘুষ ছাড়া আর কোনো উপায় না থাকে, তখন তার জন্য ধৈর্য ধারণ করাই সর্বোত্তম। কারণ আল্লাহ ওপর ভরসা করলে তিনিই হয়তো জুলুম থেকে মুক্তি বা অধিকার আদায়ের উত্তম কোনো পথ খুলে দেবেন।
বিশেষ পরিস্থিতি: গুনাহ থেকে মুক্তির শর্ত: তবে যদি সকল বৈধ উপায় যাচাই করার পরও কোনো সমাধান না পাওয়া যায় এবং ব্যক্তিটি একান্ত বাধ্য হয়ে জুলুম থেকে বাঁচতে বা নিজের অধিকার ফিরে পেতে ঘুষ দেয়, তা হলে এক্ষেত্রে ঘুষদাতার কোনো গুনাহ হবে না। বরং গুনাহের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে ঘুষ গ্রহণকারীর ওপর বর্তাবে।
ইসলামি চিন্তাবিদ ও ওলামায়ে কেরাম এই ধরনের পরিস্থিতিকে 'বিশেষ প্রয়োজন' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এক্ষেত্রে কিছু শর্ত পালন করা জরুরি:
১. অন্যান্য উপায় যাচাই: ঘুষ দেওয়ার আগে অবশ্যই অন্য সকল বৈধ উপায় খুঁজে দেখতে হবে। ২. উদ্দেশ্য: ঘুষ দেওয়ার উদ্দেশ্য হতে হবে শুধুমাত্র নিজের ওপর থেকে জুলুম দূর করা বা প্রাপ্য অধিকার আদায় করা। ৩. অন্যের ক্ষতি: এই ঘুষের কারণে যেন অন্য কোনো নিরীহ ব্যক্তির অধিকার নষ্ট না হয় বা তার ওপর কোনো জুলুম না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
রাসুল (সা.)-এর একটি দৃষ্টান্ত ওলামায়ে কেরাম এই যুক্তির সমর্থনে একটি হাদিস উল্লেখ করেন। একবার উমার (রা.) রাসুল (সা.)-কে কয়েকজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে বলেন যে, তারা আপনার দান পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। তখন রাসুল (সা.) বলেন যে, অনেককেই তিনি তার চেয়েও বেশি দিয়েছেন, কিন্তু তারা কখনো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি। এরপর তিনি বলেন, তোমাদের কেউ আমার কাছ থেকে তার দাবি-চাওয়া প্রার্থনা করে তা বগলদাবা করে নিয়ে যায়। বস্তুত সে বগলে করে আগুন নিয়ে যায়।
এ কথা শুনে উমার (রা.) প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহ্র রাসুল, তা হলে আপনি তাদের তা দান করেন কেন? রাসুল (সা.) বলেন, তা হলে আমি কী করব? তারা (আমার কাছে তাদের) দাবি-চাওয়ার ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করতেই থাকে, চাওয়া পূরণ করা ছাড়া যেতে চায় না। আর এদিকে আল্লাহতায়ালা আমার জন্য কৃপণতার কোনো সুযোগ রাখেননি।
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, যখন কোনো মানুষ তার অধিকার আদায়ের জন্য প্রচণ্ড পীড়াপীড়ি করে, তখন রাসুল (সা.) এমনকি সেই জিনিসটি দিতেও বাধ্য হয়েছেন, যা তিনি জানেন যে গ্রহণকারীর জন্য ক্ষতিকর। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, নিরুপায় ও বাধ্যগত অবস্থায় জুলুম প্রতিহত করতে বা অধিকার আদায়ের জন্য যদি ঘুষ দিতে হয়, তবে তা বৈধ হতে পারে।
সাধারণ অবস্থায় ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া উভয়ই গুরুতর অপরাধ। তবে যদি কোনো ব্যক্তি একান্ত নিরুপায় হয়ে নিজের ওপর থেকে জুলুম সরাতে বা প্রাপ্য অধিকার ফিরে পেতে বাধ্য হয়ে ঘুষ দেয়, তা হলে ইনশাআল্লাহ তার কোনো গুনাহ হবে না। গুনাহের বোঝা পড়বে শুধু ঘুষ গ্রহণকারীর কাঁধে। তবে মনে রাখতে হবে, এটি কোনো সাধারণ পরিস্থিতি নয়, বরং চরম বাধ্যগত অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক