রাজধানীর অপরাধজগৎ (আন্ডারওয়ার্ল্ড) নিয়ন্ত্রণ করছেন দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী পলাতক শীর্ষ ৬ সন্ত্রাসী। সম্প্রতি এদের তিনজন কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েই আবার পলাতক জীবনে চলে গেছেন। বাকি তিনজন বিদেশে আত্মগোপনে রয়েছেন। বিদেশে পালিয়ে থাকা ৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ইন্টারপোলের রেড নোটিশে রয়েছে। এদিকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিন পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ, ভুক্তভোগীদের পরিবার, অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
পলাতক শীর্ষ ৬ সন্ত্রাসী
২০০১ সালে সরকার ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও অনেকেরই নামই ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। সেই তালিকায় রয়েছে পলাতক ওই ৬ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম। এরা-নাঈম আহমেদ টিটন, খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু, তারিক সাঈদ মামুন, জাফর আহমেদ মানিক, জিসান আহমেদ ও সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল।
সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন টিটন, রাসু ও সাঈদ মামুন। মুক্তির পর থেকেই তারা পলাতক রয়েছেন, হাজিরা দিচ্ছেন না আদালতেও। এ ছাড়া মানিক, জিসান ও চঞ্চল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে রয়েছেন। ব্যক্তিগত বিরোধ, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, জমি-বাড়ি দখল, কেবল টিভি ও ঝুটব্যবসাকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীরা টার্গেট কিলিংয়ের মতো ঘটনা ঘটাতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গত সেপ্টেম্বর মাসে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর মামুনের ওপর হামলা হয়। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারাবন্দি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সহযোগীরা ওই হামলা চালিয়েছেন। দুই দশক কারাবন্দি থাকার পর জামিনে মুক্তি পান টিটন, রাসু ও মামুন। এর মধ্যে টিটন সন্ত্রাসী ইমনের শ্যালক। এই সন্ত্রাসীরা নতুন করে আরও কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা।
টিটন: টিটন হাজারীবাগ এলাকার বাসিন্দা। এই এলাকায় সব ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন টিটন। ২০০৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অ্যাডভোকেট বাবর এলাহী হত্যা মামলার আসামি টিটন। সে বছরই টিটনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
রাসু: ২৩ বছর কারাগারে থাকার পর চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে জামিন পান রাসু। রাসু চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার আসামি। রাসুর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে। তিনি রাজধানীর মৌচাক মার্কেটের পেছনে মালিবাগ, মৌচাক-আনারকলি মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় হকার বসানো, মার্কেটের ভেতরে জায়গা দখল, দোকান তৈরি এবং চাঁদাবাজি করতেন। কারাগারে থাকার সময়ও চলে তার এসব কর্মকাণ্ড। হত্যা, চাঁদাবাজিসহ ১৩টি মামলা রয়েছে রাসুর নামে। রাজধানীতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ক্যানটিনবয় হিসেবে কাজ করেন তিনি। সে সময়ে ফারুক-রশিদদের ফ্রিডম পার্টির সঙ্গে মিলে অস্ত্রবাজি শুরুর পর তার নাম হয়ে যায় ফ্রিডম রাসু। পরে তিনি যুবদলে যোগ দেন।
মামুন: সম্প্রতি শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন জামিনে মুক্ত হন। মামুন একসময় ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার আতঙ্ক ছিলেন। মামুন চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি।
বিদেশে পলাতক তিন সন্ত্রাসী
মানিক: সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিক যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পালা করে অবস্থান করেন। বিদেশে থেকেও মতিঝিল এলাকায় টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি। মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যার ঘটনায় মানিকের সংশ্লিষ্টতা খুঁজছেন গোয়েন্দারা।
জিসান: প্রায় দুই দশকের বেশি সময় বিদেশে পলাতক রয়েছেন জিসান। তার ভারতীয় ও ডমিনিক রিপাবলিকানের পাসপোর্ট রয়েছে। বর্তমানে দুবাইয়ে থেকে খিলগাঁও, রামপুরা, বাড্ডা ও গুলশান এলাকায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি। জিসানের বিরুদ্ধে ছয়টি হত্যাসহ অন্তত আটটি মামলা রয়েছে। আলোচিত মামলার মধ্যে রয়েছে ২০০৩ সালে গোয়েন্দা পুলিশের দুই কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যার ঘটনা। বর্তমানে তার নির্দেশে সহযোগীরা কমলাপুর, গোপীবাগ, মতিঝিল, খিলগাঁও, শাজাহানপুর, মগবাজার, রামপুরা, বনশ্রী, তেজগাঁও, কালাচাঁদপুরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
চঞ্চল: ২০১৩ সালের ৩ আগস্ট যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কী হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন তৎকালীন যুবলীগ নেতা চঞ্চল। মতিঝিল এলাকার টেন্ডার ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে সে সময়ে দাবি করে পুলিশ। বর্তমানে চঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। তার বিরুদ্ধে খুন, চাঁদাবাজি, জবরদখল, মাদক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও প্রায় দুই ডজন মামলা রয়েছে। দেশে থাকার সময়ে তিনি লাইসেন্সধারী অস্ত্র বহন করতেন। গুলশান-বাড্ডা এলাকায় স্বঘোষিত ক্ষমতাবান ছিলেন চঞ্চল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানান, সন্ত্রাসীরা এক দেশে অবস্থান করেন না এবং সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ভিপিএন (ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) ব্যবহার করেন। ফলে প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েও তাদের সঠিক অবস্থান জানা যায় না। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে দিতেও সহায়তা করতে চায় না।
গত সেপ্টেম্বর মাসে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে মামুনের প্রাইভেট কার লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়েন ইমনের সহযোগীরা। ওই হামলায় মামুন বেঁচে গেলেও সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে ভুবন চন্দ্র শীল নামের এক নিরপরাধ ব্যক্তি প্রাণ হারান।
৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর জামিনে উদ্বেগ
তিন শীর্ষ সন্ত্রাসীর মুক্তি পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ, সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী ভুবনের পরিবার।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের চায়ের দোকানদার মনির বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগ ও চিন্তার বিষয়। তাদের কিছুই হয় না। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছে। এই ঘটনার পর থেকে এখন বেশি রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখেন না।’
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিহত ভুবনের শ্যালক পলাশ চন্দ্র শীল। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের জন্য বোনের পরিবার শেষ হয়ে গেল। এখন বাকিদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকি। এক দিকে হরতাল অবরোধ, অন্যদিকে সন্ত্রাসীদের ভয়। নিরাপত্তা দেওয়ার যেন কেউ নেই।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন জিয়া রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘শীর্ষ অপরাধীরা জামিন পান আইনি দুর্বলতার কারণে। জামিন ব্যবস্থায় অনেক সমস্যা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা বিচারকদের বলতে শুনি, তারা নাকি হিয়ারিং ঠিকমতো শুনতে পান না। এ ছাড়া নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে থাকে। তাই তাদের জামিন উদ্বেগের, ভয়ের ও হতাশাজনক।’
এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) ড.খ. মহিদ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, দেশে ও দেশের বাইরে পলাতক সন্ত্রাসীদের ধরতে পুলিশ কাজ করছে। তাদের সহযোগীরা এখনো রাজধানীর অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া ভুবনের মৃত্যুর ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। আশা করি, খুব শিগগির ওই সন্ত্রসীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘পলাতক ও কারাগারে থেকে যেসব সন্ত্রাসী অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের বিষয়ে তথ্য পেলে পুলিশ সদর দপ্তর ও কারা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। এ ছাড়া এসব অপরাধীর সহযোগীদের তথ্য সংগ্রহ করে আইনের আওতায় আনা হয়।’
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল খবরের কাগজকে বলেন, অপরাধীদের বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনা ও ইন্টারপোলের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করে থাকে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। বিদেশ থেকে সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনতে অনেক জটিলতা রয়েছে। বিদেশে যারা পালিয়ে আছেন তাদের ফেরাতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনের আগে কারাগার থেকে তিন শীর্ষ সন্ত্রাসীর জামিনে মুক্তি পাওয়া ও ভুবনের মৃত্যুর ঘটনায় বিভিন্ন মহল উদ্বেগ জানিয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জামিন দিয়েছেন বিজ্ঞ আদালত। নির্বাচনের মাঠে রাজনৈতিক দলগুলোর সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করার শঙ্কা রয়েছে কি? এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভুবন হত্যাকাণ্ডের পর থেকে সন্ত্রাসীরা পলাতক রয়েছেন। তাদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান অব্যাহত রেখেছে।’