দ্বাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানো এবং কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নৌকার প্রার্থীর বিপরীতে দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বসিয়ে না দেওয়ার কৌশল নিয়েছে আওয়ামী লীগ। ফলে তৃণমূলে নেতা-কর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়ছেন, বাড়ছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামী লীগের দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বীরা একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিষোদগার করছেন। আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন ১৪ দলের নেতারাও। তারা এ নিয়ে আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের কাছে ক্ষোভ জানিয়েছেন। আগামী ১৭ ডিসেম্বর মনোনয়ন প্রত্যাহার শেষে ভোটের মাঠে প্রকাশ্য লড়াই শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন তৃণমূলের নেতারা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, ৩০০ আসনে ২৭১৬টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। গত ৪ ডিসেম্বর যাচাই-বাছাই শেষে ১৯৮৫টি মনোনয়নপত্র বৈধ বলে বিবেচিত হয়। এর মধ্যে ২৯৮ জন নৌকার প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অন্য দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগেরই অন্তত ৪৪২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। দলের কেন্দ্র থেকে সায় থাকায় আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসনসহ প্রায় ৯০ ভাগ আসনেই দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান ৬১ জন এমপিও দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়েছেন। তাদের সবারই নিজস্ব বলয়ে ভোটের মাঠে রয়েছে বলে জানা গেছে।
দলটির কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছে, আগামী ১৭ ডিসেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে এ বিষয়ে খোলাসা করা হবে। গত বৃহস্পতিবার দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও তার জেতার অধিকার আছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যদি জনগণের ভোটে জিতে যান, সেখানে আমাদের কিছু করার নেই। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, নির্বাচন হবে ফেয়ার, প্রতিযোগিতামূলক, এখানে কোনো মারামারি-সংঘাত নেই।
আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী কৌশলে ক্ষুব্ধ হয়েছেন জোট শরিকরাও। কারণ শরিকদের আসনেও দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। বিষয়টি ১৪ দলের নেতারা দলীয় জোটের নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছেন। জোটনেত্রী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনে থাকার পক্ষে আগেই সবুজ সংকেত দিয়েছেন। নৌকার মনোনীত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর কুষ্টিয়া-২ আসনে। এখানে ৯ জন প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র হয়ে মাঠে আছেন মীরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও অব্যাহতি নেওয়া উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুল আরেফিন।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বরিশাল-২ ও ৩ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে কোন আসন বেছে নেবেন, তা এখনো পরিষ্কার করেননি। দুটি আসনেই আওয়ামী লীগের একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন।
বরিশাল-২ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য ও বানারিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মনিরুল আসলাম মনিসহ ৪ জন প্রার্থী আছেন। বরিশাল তিন আসনে আওয়ামী লীগ নেতা খালিদ হোসেন স্বপনসহ ২ জন নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।
গতকাল শনিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনে সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইলেকশন এক্সপার্ট মিশন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মাঠে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, শরিকদের আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে আওয়ামী লীগের পদধারী কারও নির্বাচন করা জোটের নীতিবিরোধী। এ বিষয় ইতোমধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগকে।
ইনু আরও বলেন, যেখানে জোটের প্রার্থী দেবেন, সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতা দেবেন না। তাহলে তো সেই আওয়ামী লীগের সঙ্গেই লড়াই করতে হচ্ছে। জোটের মনোনীত প্রার্থীর জায়গায় আমরা আওয়ামী লীগের প্রার্থী চাই না।
এ ছাড়াও দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী সারা দেশেই আছেন। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, পিরোজপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে জটিলতা রয়ে গেছে। একই দলের হলেও তৃণমূল পর্যায়ে নৌকা ও দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিবাদ বেড়েই চলছে।
নরসিংদীর মাধবদীতে ‘নৌকার লোকেরা পলাইবার জায়গা পাবে না’ বলে উল্লেখ করে ইতোমধ্যেই আলোচনায় এসেছেন মাধবদী থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম। নরসিংদী-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. কামরুজ্জামানের পক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। ওই আসনে নৌকার প্রার্থী নজরুল ইসলাম। গত বুধবার নরসিংদীর মাধবদী থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ ওই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও নরসিংদী পৌরসভার সাবেক মেয়র কামরুজ্জামান কামরুলের পক্ষে আয়োজিত সভায় ওই বক্তব্য দেন।
মানিকগঞ্জ-২ আসনে নৌকার প্রার্থী মমতাজ বেগমের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও বর্তমান হুইপ সামশুল হক চৌধুরী এবারের নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন হননি। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ইতোমধ্যে আচরণবিধি ভেঙেছেন। এই আসনে ‘নৌকার’ প্রার্থী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী। ফরিদপুরে কাজী জাফর উল্যাহ ও মজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন) এবং বরিশাল সদরে দলীয় প্রার্থী প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী- বরিশালের সাবেক সিটি মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর মধ্যে যে দ্বন্দ্বের সঞ্চার হয়েছে, তা দলের অভ্যন্তরেই শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। ঋণখেলাপের দায়ে বাতিল ঘোষিত হয়েছে নোয়াখালী-৩ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কিরণের মনোনয়নপত্র। এই আসনে আওয়ামী লীগের দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন।
বরিশাল-৪ আসনে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে। তবে বর্তমান সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় সেখানে দলে ইতোমধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে। পঙ্কজ নাথের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেছেন নৌকার মনোনীত প্রার্থী শাম্মী আহমেদ। গত শনিবার নির্বাচন কমিশনে শাম্মী আহমেদের প্রতিনিধি খালেদ মাসুদ আপিল আবেদনটি করেন। আবেদনে পঙ্কজ নাথের বিরুদ্ধে তিনি হলফনামায় সম্পদের তথ্য গোপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচন করতেই পারেন। তাদের অধিকার রয়েছে। এখানে দল থেকে বসানোর কিছু নেই। তৃণমূলে সংঘাত বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনে এমন সংঘাত আগেও ছিল, এমন দু-একটি ঘটনা ঘটেই থাকে। পরিস্থিতি বুঝে সময় হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দলীয় নেতারা জড়াচ্ছেন হামলা-মামালায়
মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন (৩০ নভেম্বর) থেকেই নৌকার প্রার্থী ও দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের সংঘর্ষ প্রকাশ্যে আসে। সারা দেশে প্রায় ২০টি আসনে নৌকা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হন। মামলাও হয়েছে একাধিক।
গত ৩০ নভেম্বর শরীয়তপুরের নড়িয়ায় নৌকার প্রার্থী এনামুল হক শামীমের সমর্থকদের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও প্রয়াত ডেপুটি স্পিকার কর্নেল শওকত আলীর ছেলে ডা. খালেদ শওকত আলীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এতে দুপক্ষের ১০জন নেতা-কর্মী আহত হন।
গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রয়াত ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়ার মেয়ে ফারজানা রাব্বি বুবলির গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ ওঠে। গত ৩০ নভেম্বর চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ মোতালেব স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে তাকে বহিষ্কারের দাবিতে ঝাড়ু মিছিল করে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ। পাশাপাশি তার ছবিও পোড়ানো হয়। ঝাড়ু মিছিল ও ছবিতে আগুন দেওয়ার ঘটনার পেছনে সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভীর অনুসারীরা রয়েছেন বলে দাবি করেন এম এ মোতালেব। ওই সময় তিনি বলেন, নদভীর লোকজন নির্বাচনের শুরুতেই অন্যায় করছেন। তারা ঝাড়ু মিছিল ও ছবিতে আগুন দেওয়ার মতো জঘন্য কাজ করেছেন। তা ছাড়া, উপজেলায় আমার সঙ্গে দেখা করতে আসার সময় কিছু লোককেও আটকে রেখেছিলেন তারা।
কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রউফের কর্মী আজিজুর রহমান সুমনকে মারধরের অভিযোগে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর আটজন কর্মী ও সমর্থকের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় গত সোমবার (৪ ডিসেম্বর) রাতেই এস এম শাহীন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি পৌর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে থাকব। নির্বাচনে প্রতিযোগিতা থাকবেই। দলের অনেকেই প্রার্থী হয়েছেন। কেউ বিশৃঙ্খলা করতে চাইলে প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। দল কাউকে চাপ প্রয়োগ করে নির্বাচন থেকে সরাবে না। তারপরেও ১৭ তারিখ প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষে দল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’