সাধারণত সাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গিয়ে থাকেন যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও সুদানের মতো দেশগুলোর নাগরিকরা। অথচ তাদের সঙ্গে নিয়মিত বাংলাদেশি নাগরিকরাও ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাচ্ছেন একই নৌকায়। দেশি-বিদেশি পাচার চক্র এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাচারের ছক কষা হয় তুরস্ক ও দুবাইতে বসে।
গত শনিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, ইউরোপ যাত্রাকালে লিবিয়া হয়ে সাগরপথে তিউনিসীয় উপকূলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ৯ জন অভিবাসীর অধিকাংশই বাংলাদেশি নাগরিক। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি লিবিয়া উপকূল থেকে ৫২ জনের অভিবাসী দল সাগরপথে ইউরোপ যাচ্ছিল। তিউনিসীয় উপকূলে তাদের বহনকারী নৌকাটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, অবৈধভাবে ইউরোপ অভিমুখে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি মারা যান। গত ১০ বছরে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশ থেকে মোট ১৮টি রুটে লোকজন ইউরোপে যাওয়ার কম-বেশি চেষ্টা করেন। পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে ইউরোপে ঢুকতে মোট ৯টি পথ আছে। বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যেটি সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট হিসেবে পরিচিত, সেটি। এই পথে ৩৭ হাজার ১৯৮ জন বাংলাদেশি ইউরোপে ঢুকেছেন। গত কয়েক বছরে বলকান রুট দিয়েও প্রায় সাড়ে ছয় হাজার বাংলাদেশি প্রবেশ করেছেন।
ভিজিট ভিসায় দুবাই, তারপর ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা
ব্র্যাক বলছে, এসব মানব পাচারের ছক কষা হয় মূলত দুবাই ও তুরস্কে বসে। পাচারের ক্ষেত্রে চক্রটি অবশ্য অনেক দেশের রুট ব্যবহার করে। সম্প্রতি ভিজিট ভিসায় দুবাই গিয়ে সেখান থেকে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা বেশি দেখা গেছে। গত দুই বছরে দেড় থেকে দুই লাখ লোক এভাবে ভিজিট ভিসায় দুবাই গেছেন। এদের অনেকেরই এখন কাজ নেই। ফলে অনেকেই ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
দুবাই এবং ওমানে নতুন যাওয়া বাংলাদেশি তরুণরাই মূলত পাচারকারীদের প্রধান টার্গেট। তবে যারা বিভিন্ন জায়গায় অনিয়মিত চাকরি করেন কিংবা স্বল্প বেতনের চাকরি করেন। কিন্তু বেশি বেতনের স্বপ্ন দেখেন এবং যারা কয়েক বছর ধরে চাকরি করে ভালো সঞ্চয় করেছেন, তারাও তাদের টার্গেট গ্রুপ।
দুবাই এবং ওমান থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ওমানের মাসকাট বন্দরে। মাসকাট বন্দর থেকে স্পিডবোটে ওমান উপসাগর অতিক্রম করে নিয়ে যায় ইরানের বন্দর আব্বাসে। তারপর ইরানের বিভিন্ন শহর ও জঙ্গলে আটকে রাখা হয় তাদের। সেখান থেকে ইরাক ও তুরস্ক হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করার চেষ্টা চলে।
রিক্রুটিং এজেন্টদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটি এজেন্সিসের (বায়রা) যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতান খবরের কাগজকে বলেন, দালালদের দৌরাত্ম্য রোখা খুব কঠিন। এদের নেটওয়ার্ক তো দেশের বাইরেও। কাজেই মানুষকে সচেতন হতে হবে। যাতে দালালদের প্রলোভনে তারা সাড়া না দেয়।
বিচারে দীর্ঘসূত্রতা
মানব পাচার প্রতিরোধে সরকার ২০১২ সালে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন করে। এই আইনে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ পাচারের শিকার। এতে মোট আসামির সংখ্যা সাড়ে ২৪ হাজারেরও বেশি। ছয় হাজার মামলার মধ্যে ২৮২টি মামলার এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩৬টি মামলায় মাত্র ৭১ জনের সাজা হয়েছে। বাকিরা অব্যাহতি পেয়ে গেছেন। এই হিসাবে সাজা হয়েছে এক শতাংশেরও কম।
ব্র্যাক আরও জানায়, ২০১৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের ইউরোপের প্রলোভন দেখিয়ে ইরানে নিয়ে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করেছে মানব পাচারকারীরা। ইরান থেকে সিআইডির মাধ্যমে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় ভিকটিমদের দেশে ফেরত আনার পর বিভিন্ন এলাকায় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা করেছিলেন কয়েকজন। কিন্তু তারাও ন্যায়বিচার পাননি।
এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, এ ক্ষেত্রে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মানুষই এভাবে ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ যান না। নির্দিষ্ট অঞ্চলের ১০-১২টি জেলার মানুষই ঘুরেফিরে এভাবে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যান নিয়মিত। অঞ্চলগুলো হলো ফরিদপুর অঞ্চল, সিলেট অঞ্চল এবং ঢাকার আশপাশের কয়েকটি জেলা। যারা সাগর পাড়ি দেন, তারা জানেন বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ, তারপরও তারা ১৫-২০ লাখ টাকা দালালদের দিয়ে এভাবে ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় ওঠেন। তাই সর্বপ্রথম এসব মানুষকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এ ক্ষেত্রে। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা দরকার। এটা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিরও প্রশ্ন। এভাবে সাগর পাড়ি দেন মূলত ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও সুদানের মতো দেশের নাগরিকরা। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষেরও সাগর পাড়ি দেওয়া মানে এটা ভাবমূর্তিরও প্রশ্ন।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র যুদ্ধবিধ্বস্ত ওই সব নাগরিকের সঙ্গে বাংলাদেশিদেরও নৌকায় তুলছে। এই পাচারকারী চক্র তুরস্ক ও দুবাইতে বসে এমন কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে পারে।
লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের বিবৃতি
তিউনিসীয় উপকূলে আগুন লাগা নৌকার বিষয়ে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়, লিবিয়া উপকূল থেকে ৫২ জনের একদল অভিবাসী সাগরপথে ইউরোপ যাত্রাকালে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তিউনিসীয় উপকূলে তাদের বহনকারী নৌকাটিতে অগ্নিকাণ্ডের দুর্ঘটনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে তিউনিসিয়ার নৌবাহিনী নৌকাটি থেকে ৯ জন অভিবাসীর লাশ এবং ৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। জীবিত অবস্থায় উদ্ধারকৃত অভিবাসীদের মধ্যে ২৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ছাড়া বর্ণিত দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারী অধিকাংশ বাংলাদেশি নাগরিক বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
উদ্ধারকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দূতাবাস তিউনিসিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং আইওএমের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। এ ছাড়া স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও উদ্ধারকৃতদের সঙ্গে সাক্ষাৎপূর্বক তাদের কল্যাণ নিশ্চিতকরণ এবং মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশিদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে দূতাবাসের একটি টিমকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিউনিসিয়া পাঠানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, বিভিন্ন দেশের উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ গমনের চেষ্টাকালে ২০২৩ সালে তিন হাজারেরও বেশি অভিবাসী মৃত্যুবরণ করেছেন এবং নিখোঁজ হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অবৈধ অভিবাসনের বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। লিবিয়া ও তিউনিসিয়ার নৌবাহিনী তাদের নজরদারি জোরদার করেছে। ফলে বর্তমানে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাত্রা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ।
দূতাবাসের পক্ষ থেকে সবাইকে দালাল ও পাচারকারীদের প্ররোচনা-প্রতারণায় পড়ে এইরূপ জীবনের ঝুঁকি না নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। লিবিয়ায় কর্মরত/বসবাসরত প্রবাসীদের বর্ণিত বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতদেরও সতর্ক করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।