নজিরবিহীন এক তারল্যসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। মোট ৬২টি দেশি-বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংক আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় তারল্য সরবরাহে টান পড়েছে গোটা ব্যাংকিং খাতে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর শাখায় গিয়ে টাকা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। ক্ষেত্রবিশেষে ৫-১০ হাজার টাকার চেকও ভাঙিয়ে দিতে পারছে না দুর্বল ব্যাংকের অনেক শাখাই। এ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ দিন দিন বাড়ছে। ক্ষোভে উত্তেজিত গ্রাহকরা অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার মুন্সীগঞ্জে একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখায় ব্যাংকারদের বের করে দিয়ে গ্রাহকরা তালা মেরে দিয়েছেন।
গতকাল রবিবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে অপর একটি বেসরকারি দুর্বল ব্যাংকের শাখায় কর্মকর্তাদের ওপর মারমুখী হয়ে তেড়ে আসেন কিছু গ্রাহক। এতে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে শাখায় শাখায় এক অস্বস্তিকর অস্থিরতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন ব্যাংকাররা।
এদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগও খুব একটা কাজে আসছে না। এ পরিস্থিতিতে গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে দেওয়া তারল্য সহায়তার অর্থ কতটুকু কাজে আসছে কিংবা আদৌ কাজ হচ্ছে কি না অক্টোবরের শেষে তার পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে হবে ওই পর্যালোচনা সভা। সব ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী এবং পর্ষদের চেয়ারম্যানরা ওই সভায় যোগ দেবেন বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী গ্রাহক বিশ্বজিৎ দত্ত খবরের কাগজকে বলেন, ‘(গতকাল রবিবার) বেলা ১১টার দিকে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় আমি টাকা তুলতে যাই। এ সময় শাখাটির ভেতরে আগে থেকেই একটা হট্টগোল চলছিল। জানতে পারলাম দুই সপ্তাহ ধরে কয়েকজন গ্রাহক টাকা তুলতে এসে টাকা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এ সময় আবারও শাখাটির কর্মকর্তারা টাকা দিতে পারবেন না বলে অস্বীকৃতি জানালে ওই গ্রাহকরা ক্ষোভে উত্তেজিত হয়ে মারমুখী আচরণ করেন। শাখাটির কর্মকর্তারা তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। দু-একজন কর্মকর্তাকে তখন ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা কিল-ঘুষি মারেন। এ সময় অন্য গ্রাহকদের উদ্যোগে শাখাটির ব্যবস্থাপককে বেলা ৩টার মধ্যে তাদের চাহিদামাফিক টাকা সংগ্রহ করে দেওয়ার শর্ত দিলে ক্ষুব্ধ ওই গ্রাহকরা নিবৃত্ত হন এবং চলে যান।’
সন্ধ্যায় ফোনে যোগাযোগ করলে ওই শাখাটির কর্মকর্তা এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিনই শাখায় নগদ টাকা তুলতে গ্রাহকরা আসেন। কিন্তু চাহিদা পূরণ করার মতো নগদ টাকা আমাদের নেই। প্রধান কার্যালয় থেকেও সেভাবে সহযোগিতা পাওয়া যায় না। আমরা শুধু একের পর এক আশ্বাস দিয়ে গ্রাহকদের বিদায় করছি। এভাবে আমরা এক চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে চাকরি করছি।’ একই রকম কথা বলেছেন আরও কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার ব্যবস্থাপকরা।
গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নিয়ে ব্যাংকিং খাতে গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে মনোযোগী হয়। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুনদের ব্যাংকে বসানো হয়েছে। এরপর দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজ গ্যারান্টিতে তারল্য সহায়তা দেওয়া শুরু করে। কিন্তু তারল্য সহায়তার অর্থের ব্যবহার ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তদারকির ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগও রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী খবরের কাগজকে বলেন ‘তারল্যসংকট নিরসন করে ব্যাংকে গ্রাহকের আস্থা ফেরাতেই শর্ত সাপেক্ষে তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে। এর মধ্যে অন্যতম শর্ত হলো আমানতকারীর অর্থ ফেরত দেওয়া। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় কিছু ব্যয় এই তহবিল থেকে ব্যাংক করতে পারবে মর্মে অনুমোদন দেওয়া রয়েছে।’
এক প্রশ্নের উত্তরে সহকারী মুখপাত্র বলেন, “তারল্য সহায়তার অর্থে নিজেদের বেতন-ভাতা পরিশোধের ব্যাপারটি সরাসরি নিষেধ করা নেই। তবে একটি ব্যাংক যখন তারল্য সহায়তা নেয়, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক যে গ্যারান্টি ইস্যু করে তখনই ‘প্রাপ্ত অর্থ ব্যবহারের’ একটি রূপরেখা বা পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়। আমাদের অফসাইট সুপারভিশন এ নিয়ে কাজ করছে। আমি নিজেও দু-একটি ক্ষেত্রে সরাসরি দেখেছি ও তদারকি করেছি। তবে অনলাইন সুপারভিশন এখন হচ্ছে না। অক্টোবর শেষে এর মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে পুনরায় নীতিনির্ধারণীবিষয়ক পরিবর্তন আনা হবে।”
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে দেওয়া তারল্য সহায়তার পূর্বশর্ত ছিল- ব্যাংকগুলো এই অর্থ কাজে লাগিয়ে নিজেদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করবে। তা করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটি নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে মার্জার বা একীভূতকরণ কিংবা কোনো শক্তিশালী ব্যাংক কর্তৃক অধিগ্রহণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমবার সেপ্টেম্বরের শেষে ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ও দ্বিতীয়বার অক্টোবরের ২২ তারিখে ৯২০ কোটি টাকা মিলিয়ে দুই দফায় সাত দুর্বল ব্যাংক মোট ৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা পেয়েছে।
অর্থদাতা ব্যাংকগুলোর রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা দিয়েছে। অন্য ছয়টির মধ্যে দ্য সিটি ব্যাংক পিএলসি দুই দফায় ১ হাজার ৯০ কোটি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক দুই দফায় ৬০০ কোটি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক দুই দফায় ৪৫০ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংক দুই দফায় ৪০০ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক দুই দফায় ৩২৫ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ২২০ কোটি ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক ২০ কোটি টাকা দিয়েছে।
তারল্য সহায়তার কার্যকারিতা নিয়ে একটি বেসরকারি দুর্বল ব্যাংকের নবগঠিত পর্ষদ চেয়ারম্যান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা নতুন পরিকল্পনা করছি। তারল্য সহায়তার পরিমাণ সামান্য বাড়াতে হবে। নভেম্বরের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিতব্য পর্যালোচনা সভায় গভর্নরসহ নীতিনির্ধারকদের সামনে আমরা এ বিষয়টি তুলে ধরব।’
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সুপরিচিত সিনিয়র ব্যাংকার সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এ প্রসঙ্গে খবরের কাগজকে বলেন, ‘শুধু টাকা বা তারল্য সহায়তা দিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলো নিজেদের উন্নতি ঘটাবে, এমন ধারণা কাজে আসবে না। ওই সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা বিভাগ ও পর্ষদ মিলে সমন্বিত পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। সেটা হতে পারে ইতোমধ্যে যেসব গ্রাহক অসন্তুষ্ট হয়েছেন তাদের ফেরানোর চেষ্টা করা, রিকভারি বাড়ানো বা বিনিয়োগকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার এবং নতুন আমানত সংগ্রহ করা। এ ছাড়া সাময়িকভাবে গ্রাহকের জন্য কার্যকর তারল্য বাড়াতে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় পুনর্বিবেচনা বা কাটছাঁট করা যেতে পারে।’