একটি কোম্পানির গো-খাদ্য বিক্রি করার লক্ষ্যে উৎপাদনমুখী রাষ্ট্রায়ত্ত ফিড কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মিল্ক ভিটার সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান শেখ নাদির হোসেন লিপুর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে গত ১০ বছরে সাবেক চেয়ারম্যান ও কিছু অসাধু কর্মকর্তা লুটপাট করেছেন মিল্ক ভিটার কোটি কোটি টাকা।
জানা যায়, গো-চারণ ভূমি হিসেবে খ্যাত সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়ার লাখ লাখ গবাদি পশুর জন্য দানাদার আর সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে ২০২৪ সালে ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় মিল্ক ভিটা গো-খাদ্য কারখানা। উল্লাপাড়া উপজেলার লাহিড়ী মোহনপুর এলাকায় এটি নির্মাণ করা হয়। প্রতিদিন ওই কারখানা থেকে প্রতি ঘণ্টায় ৫ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন হতো। বলা হয়েছিল সমিতির সদস্যদের সহায়তায় অলাভজনক উদ্দেশ্যে কারখানাটি পরিচালিত হবে। একমাত্র খামার মালিকরাই গো-খাদ্য কিনতে পারবেন স্বল্প দামে। এ জন্য প্রতি মাসে দুধের দাম থেকে কর্তন করে রাখা হতো গো-খাদ্যের দাম। এমনকি কারখানাটির খাদ্য বাইরের বাজারে বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। মানসম্পন্ন হওয়ায় অল্প সময়ে জনপ্রিয়তা পায় এই পুষ্টিকর খাদ্য প্রকল্পটি।
খাদ্যের গুণগত মান ভালো থাকায় সেই সময় প্রতিটি খামারে গরু হৃষ্টপুষ্ট হচ্ছিল এবং দুধের মাত্রাও বেশ ভালোই বেড়েছিল। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই কারিগরি ত্রুটি দেখিয়ে ২০১৬ সালে কারখানাটি বন্ধ করে দেন তৎকালীন চেয়ারম্যান নাদির হোসেন লিপু। সেই সঙ্গে মিলের ফান্ডে থাকা সাড়ে ৬ কোটি টাকা উত্তোলন করে নেওয়া হয়। এ ছাড়া আইনের তোয়াক্কা না করে বিশেষ একটি কোম্পানির গো-খাদ্য বিক্রি করতে বাধ্য করা হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
খামারিদের অভিযোগ, চড়া দামে ওই কোম্পানির খাদ্য কিনতে বাধ্য করে মিল্ক ভিটা। এই খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে অনেক গবাদি পশু। কমে যায় দুধের উৎপাদন। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে লিপুর রোষানলে পড়তে হয়েছে খামারিদের।
আবুল হোসেন নামে এক খামারি বলেন, মিল্ক ভিটা কারখানায় তৈরি গো-খাদ্যের মান অনেক ভালো ছিল। আমরা দুই বছর খাদ্য পেয়েছিলাম। তারপর কারখানাটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই খাবারটি আর পাইনি। তার পরিবর্তে রুমি ফিড নামে এক ধরনের ফিড দিয়েছিলেন তারা।
হানিফ সরকার নামে আরেক খামারি বলেন, রুমি ফিড যদি না নেওয়া হতো মিল্ক ভিটায় আমাদের দুধ নেওয়া হতো না। ফলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতেন খামারিরা। নিম্নমানের ফিড খাওয়ানোর পর অনেক গবাদি পশু অসুস্থ হয়ে মারাও গিয়েছিল। সেই সঙ্গে গাভির দুধ উৎপাদন ক্ষমতা অনেক কমে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিল্ক ভিটার কয়েকজন কর্মচারী বলেন, রুমি ফিড বিক্রি করে দেওয়ার জন্য সেই সময় প্রত্যেক ইনচার্জকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। চেয়ারম্যানের কথা না শুনলে বদলি করে দেওয়া হতো। সেই কারণে বাধ্য হয়ে খামারিদের কাছে রুমি ফিড বিক্রি করতে হয়েছে। মিলের ফান্ডে থাকা সাড়ে ৬ কোটি টাকা ৩টি চিঠির মাধ্যমে প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে উত্তোলন করা হয়। এরপর মিল্ক ভিটাও দুবস্থার মধ্যে চলে যায়।
মিল্ক ভিটা গো-খাদ্য কারখানার ব্যবস্থাপক ডা. বাবুল আক্তার বলেন, এই মিলটি লিপু সাহেব সুপরিকল্পিতভাবে বন্ধ করে দিয়ে রুমি ফিড নামে এক ধরনের ফিডের মার্কেটিং করেছেন। এ কারণে আমাদের কারখানার তৈরি ফিডটি নিরুসাহিত করা হয়েছে। এমনকি রুমি ফিডটি যেন গো-খামারিদের মধ্যে সরবরাহ বেশি হয় এ জন্য আমাদের কিছু অফিসারকে ব্যবহার করা হয়েছে।
মিল্ক ভিটার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম তালুকদার বলেন, নীতিগত সমস্যা দেখিয়ে মিলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। টেকনিক্যাল তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি কমান্ডার জাহিরুল আলিম বলেন, দুর্নীতির যে বিষয়গুলো আছে সেগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই মিলটি চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারখানাটি চালু হলে মানসম্মত খাদ্য পাবেন গো-খামারের মালিকরা। আগের মতোই বাড়বে দুধের জোগান।